ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

banen

মুশিকি ক্যাম্পে যখন উপস্থিত হলাম, তখন সূর্য পাহাড়ের ওপারে ঢলে পড়ে পড়ে অবস্থা। কিন্তু পশ্চিমের পাহাড়ের ওপারের সূর্যের আলো পূর্বের পাহাড়ের গায়ে লেগে প্রতিফলিত হচ্ছে বলে মুশিকি উপত্যাকায় এখনও অন্ধকার নেমে আসেনি। ক্যাম্পের ক্যাম্পাসে গাড়ি থেকে নেমেই বুঝতে পারলাম, এ স্থান ভিন্ন রকম কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেই নয়, তাপমাত্রার পার্থক্যের জন্যও। মুনিগি ক্যাম্পেই মেজর হাবিব আমাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন যে আমাদের সাথে শীত নিবারণের জন্য পর্যাপ্ত কাপড় চোপড় আছে কি না। যদিও আমরা সেই সময় হ্যাঁ বলেছিলাম, কিন্তু মুশিকি উপত্যকায় পা দেবার পরেই মনে হচেছ আমাদের সাথের গরম কাপড় হয়তো এখানে পর্যাপ্ত হবে না।

আমি সাথে কোন জ্যাকেট নিয়ে আসিনি। কারণ আমার মিশন এলাকা দক্ষিণ সুদানে শীত বলতে কিছু নেই।সেখানে আছে বর্ষাকাল আর গ্রীষ্মকাল। সেখানে মে মাস থেকে বৃষ্টি শুরু হয়ে নভেম্বর মাস পর্যন্ত কম বেশি চলতে থাকে। তাপমাত্রা বাংলাদেশের গরম কালের অনুরূপ। তারপরও যদি রাতের বেলার ডিউটিতে শীত শীত লাগে তাই গতবার বাংলাদেশ থেকে আসার সময় আমার স্ত্রী আমার ছেলের ব্যবহার করা একটা ফুটপাথেয় হুডওয়ালা গরম কাপড় ধরিয়ে দিয়েছিল। কঙ্গোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার সময় সেটাই সাথে এনেছিলাম। এর সাথে অবশ্য একটা ফুলহাতা টি-শার্ট রয়েছে। তাই সন্ধ্যেটা কোন রকমে কাটিয়ে দেয়া যাবে।

মুশিকি ক্যাম্পের ডেপুটি কমান্ডার মেজর মাহমুদক আমাদের স্বাগত জানালেন। আমাদের খোঁজ নিলেন, পথে কোন সমস্যা হয়েছিল কিনা। মেজর মাহমুদ ও মেজর রোজিনা ছাড়াও এ ক্যাম্পে বর্তমানে দুজন ডাক্তার ক্যাপ্টেন ইকরাম, ক্যাপ্টেন এনায়েত ও ভিন্ন একজন মেজর রয়েছেন। মেজর সাহেবের নাম মোজাম্মেল হোসেন। তবে গভীর পরিচয়ে জানলাম তিনি বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর ইএমই কোরের বেসামরিক ইন্জিনিয়ার। তিনি একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর স্কেল ধারণ করেন বলে তাকে মেজর র্যাঙ্ক দেয়া হয়েছে।

আমরা গাড়ি থেকে নেমেই দ্রুত ছবি তোলা শুরু করলাম। আমার সফর সঙ্গি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিনের সেলফি স্টিকটি এত কাজে লাগবে আগে বুঝিনি। সেটা যথেচ্ছা ব্যবহার করা হল।

আমাদের জন্য বিকালের নাস্তা অপেক্ষা করছিল। তাই সোজা ডাইনিং রুমেই বসলাম। তবে এর ফাঁকে আমাদের জন্য থাকার কক্ষ বরাদ্দ করা হলে নিজ কক্ষে গিয়ে হাতমুখে পানি দিয়ে আসলাম। ট্যাপের পানি আমাদের দেশের শীতকালের পানির মতোই ঠাণ্ডা মনে হল।

সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ২,২০০ মিটার উঁচুতে এ মুশিকি ক্যাম্প। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইন্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের বর্তমান রোটেশনটি সাত নম্বর। এর পূর্বে এখানে আরো ছয়টি ব্যাটালিয়ন এসেছে, গেছে।

ban-en-mushiki

 

ক্যাম্পের স্থানটি অত্যন্ত মনোরম। প্রায় তিন দিকে উঁচু পাহাড়। পাহাডের গা বেয়ে বেয়ে উঠে গেছে তৃণভূমি। দক্ষিণের পাহাড়গুলোতে প্রচুর গবাদী পশু চরছে। উত্তরের পাহাড়টা ক্যাম্পের গা ঘেঁসে উপরে উঠে গেছে। এ পাহাড়ের উপর একটি আধুনিক বাংলো। বাংলোর মালিকার নাম নাকি রিকো। এ অঞ্চলের তিনি ল্যান্ডলর্ড। মেজর মাহমুদের কাছ থেকে জানতে পারলাম এ মহিলার পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে দো-আঁশলা। তার মা স্থানীয় কঙ্গোলিজ হলেও বিয়ে করেছিলেন এক বেলজিয়ানকে। কঙ্গো ১৯৬০ সাল পর্যন্ত বেলজিয়ামের কলোনি ছিল। কঙ্গোলিজ-বেলজিয়ানের মিলিত সন্তান রিতা বেগমের ছেলেমেয়েদেরও বিয়ে হয়েছে ঐ রকম অকঙ্গোলিজদের সাথে। তাই ছেলেমেয়ে-নাতিনাতনিরা যখন একত্রিত হয় তখন তার বিস্তৃত পরিবারের সদস্যদের একটি মিনি বিশ্ব বললেও ভুল হয় না। কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ শ্যামলা আবার কেউ বা দুই এর মাঝামাঝি।

 

এখানে আসার পূর্বে আমাদের মেজর হাবিব বলেছিলেন, এ অঞ্চলটি হল কঙ্গোর সুইজারল্যান্ড। এখানকার আহাওয়া, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সব কিছুই যে কাউকে ইউরোপের কথা মনে করিয়ে দিবে। এখানে এসে বুঝতে পারলাম, মেজর হাবিবের কথা সঠিক। তবে আমি নিজে কোন দিন কোন ইউরোপিয় দেশে পা রাখিনি। তাই বই পুস্তক আর প্রচার মাধ্যমের মাধ্যমে পরিচিত ইউরোপের সাথে এর তুলনা করে একশতে আশি দিয়ে মেজর হাবিবের সাথে একমত পোষণ করলাম।

 

রাত্রি বাড়ার সাথে সাথে শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকে। রাতের খাবারের পূর্বে আমরা টিভি রুমে বসলাম। এখানে বাংলাদেশি চ্যানেল দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। স্যাটেলাইট টিভির সুবাদে দেশ থেকে সাত হাজার কিলোমিটার দূরেও দেশের বিনোদনের সাথে আমাদের সেনাবাহিনীর ভাইরা একাত্মবোধ করেই আছেন। তারা নিয়মিত খবর দেখছেন, গান শুনছেন, নাটক দেখছেন, টিভির টকশো দেখে বিদগ্ধও হচ্ছেন। আমি কিছুক্ষণ থাকার পর ঠাণ্ডার জন্য খান্ত দিলাম।

 

রাতের খাবারও খেলাম ঠাণ্ডার মধ্য দিয়ে। ডাইনিং রুমটি একটু খোলামেলা হওয়ায় এখানে ঠাণ্ডা আরো বেশি। তাই খাওয়ার পরে আর আড্ডায় মন সরল না। আমি দ্রুত আমার কামরায় গিয়ে কম্বলের শরণ নিলাম।কিন্তু মধ্য রাতের শীত আর সহ্য হচ্ছিল না। ডাবল সাইজের পুরু কম্বলেও শীত নিবারণ হচ্ছিল না। কারণ বেডের নিচ থেকে ঠাণ্ডা আসছিল। তখন কি আর করা! বৃহৎ কম্পলটিকে চোঙ্গের মতো ভাঁজ করে তার ভিতর ঢুকে পড়লাম। সুইজারল্যান্ডে কোন দিন না গেলেও রাতের বেলা সুইজারল্যান্ডের ঠাণ্ডার অনুভূতিটুকু পেয়ে গেলাম। (চলবে–)