ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

সাত দিনের ছুটিতে রুয়ান্ডা দেখার জন্য সময়  পেলাম মাত্র দুটো পূর্ণ  দিন। প্রথম দিন কিগালিতে পৌঁছিলাম অতি ভোরে। উগান্ডা থেকে বাসে করে প্রায় সারারাত ভ্রমণ। আগের দিনটাও গেছে ভ্রমণেই। তাই গত ৪৮ ঘন্টায় কেবল বাসের মধ্যেই যতটুকু ঘুম হয়েছিল সেটার উপর ভর করেই সকাল সকাল বের হলাম কিগালি শহর দেখতে। রুয়ান্ডার কিগালি শহরটি নিজেই একটি প্রাকৃতিক সৌনদর্যের লীলাভূমি। শত শত পাহাড়ের উপর খাঁজকাটা কারুকার্য যেন শহরটি। সমুদ্র সমতল থেকে এর উচ্চতা ১,৫৬৭ মিটার যা আমাদের দেশের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ বিজয় বা তাজিং ডঙের চেয়েও বেশি উঁচুতে।

 

আমাদের হোটেল থেকে অল্প দূরেই অবস্থিত রুয়ান্ডার গণহত্যার নিরব সাক্ষী জেনোসাইড মিউজিয়াম। তাই আমাদের কিগালি দর্শন এ জাদুঘর দিয়েই শুরু করব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। সাথে আমার সহকর্মী এসপি মাহবুব হাসান। সকালে হোটেল থেকে নেমে ভাড়া করলাম দুটো ভোডা ভোডা। ভোড়া ভোড়া হল মোটর সাইকেল। পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে সুলভ যান হল মোটর সাইকেল। মোটর সাইকেলকে এখানে ভোডা ভোডা বলে। কিগালি শহরে ভোডা ভোডার প্রচলন অত্যধিক। শহরে টেক্সি থাকলেও তা বেশ ব্যয়বহুল। ৫০০ থেকে শুরু করে ৫০০০ রুয়ান্ডান ফ্রাঁ খরচ করলে কিগালি শহরের যে কোন স্থানে যাওয়া যায়। বাংলাদেশের ১ টাকার বিপরীতে পাওয়া যায় রুয়ান্ডান ১০ ফ্রাঁ। হিসাবটা তাই সহজ। রুয়ান্ডার মূদ্রার অংক থেকে একটা শূন্য বাদ দিলেই তা বাংলাদেশি মূদ্রায় রুপান্তরিত হয়ে গেল।

 

আমরা ৫০০ ফ্রাঁ দর করে দুটো ভোডা ভোডা ভাড়া করলাম। ডাউন টাউনে আমাদের হোটেলের পরে একটি পাহাড়ের পরের পাহাড়েই কিগালির জেনোসাইড মিউজিয়াম। তাই ভোড়া ভোডায় চড়তে না চড়তেই জাদুঘর এসে গেল। জাদুঘরের ফটকে ডিউটি করছে দুজন পুলিশ সদস্য। মিশনে থাকার সুবাদে কয়েকটা রুয়ান্ডান ভাষার শব্দ শিখেছিলাম। ভোড়া ভোডা থেকে নেমেই পুলিশদের সম্বোধন করলাম, ‘আমা কুরু’? তার বলল, ‘নিমে এ জা’।

 

পাহাড়ের কিছুটা ঢালুতে জাদুঘরটি। তাই আমরা এক সিঁড়ি বেয়ে এক ধাপ নিচে নেমে রিসিপশনে ঢুকলাম। এ জাদু ঘরে প্রবেশের জন্য কোন ফি দিতে হয় না। তবে জাদুঘরের বিভিন্ন পয়েন্ট কি কি স্থাপনা বা কবর আছে সেগুলোর বর্ণনা সম্বলিত ছোট মোবাই সদৃশ একটি অডিও ডিভাইস আছে। এ যন্ত্রটি সাথে নিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে বোতাম টিপলেই সেই পয়েন্টের পরিচায়সহ ধারা বিবরণী বাজতে থাকবে। এটা ভাড়া করা ঐচ্ছিক। তবে ভাড়া করলে ১০ ডলার দিতে হবে। আমরা অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে চাইলাম না। তবে আমাদের সাথে থাকা ইউরোপিয়ানরা ঠিকই ওটা ভাড়া করল। রিসিপশনের পিছনেই একটি ছোট কক্ষ আছে। এখানে একটি ডকুমেন্টারি দেখান হয়। দর্শনার্থীর সংখ্যা সাত/আট জন হলে ওরা তাদের একটা গ্রুপে ভাগ করে এ ফিলমটি দেখায়। মাত্র আধাঘন্টার একটি ডকুমেন্টারিতে এ জাদুঘর তথা রুয়ান্ডার গণহত্যার সমূদয় ইতিহাস তুরে ধরা হয়।

1

 

কেবল রুয়ান্ডা নয় পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর অন্যতম হল ১৯৯৪ সালের গণহত্যা বা জেনোসাইডঐ বছরের ৭ এপ্রিল থেকে ১৫ জুলাই মাত্র একশ দিনে এ গণহত্যায় প্রায় ১০ লাখের মতো মানুষ নিহত হয় রুয়ান্ডায় জাতিগতভাবে তিনটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়- তুতসি, হুতু ও তা্ওয়া এদের মধ্যে হুতুরা হল সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা মোট জনসংখ্যার ৮৫% বাকী১৫% হল তুতসি ও সামান্য কিছু তাওয়া তবে রুয়ান্ডানদের মধ্যে এমন জাতিগোষ্ঠীর বিভাগ প্রাচীন কালে ছিল না বলেই ইতিহাস প্রমাণ দেয় আর এখানে পৃথক পৃথক জাতীগোষ্ঠীর মানুষ প্রাগৈতিহাসিক যুগে অবস্থান করলেও কালের প্রবাহে তারা একটিমাত্র জাতিগোষ্ঠীতে লীন হয়ে যায়, ঠিক যেন বাঙালিদের মতো কারণ ঐতিহাসিক কালে প্রবেশের পরে রুয়ান্ডার সকল গোষ্ঠীই  একই ভাষা ও কৃষ্টির অধিকারী হয়ে পড়ে

 

তবে তুতসি বলে যাদের শনাক্ত করা হয় তারা প্রথম থেকেই ছিল অগ্রসর একটি সামাজিক গোষ্ঠী সাধারণত অগ্রসর ও ধনী ব্যক্তিদের বলা হত তুতসি তুতসি শব্দের অর্থই হল, গরু-ওয়ালা ধনী ব্যক্তি রুয়ান্ডার অগ্রসর পরিবারের মানুষগুলো কৃষিকাজ না করে গরু পালনে ঝুঁকে পড়ে আর অনগ্রসরগণ কৃষি কাজেই পড়ে থাকে অনেক সময় কোন অনগ্রসর পরিবারের মানুষ ধনী হয়ে পড়লে তাকে তুতসি উপাধী দেয়া হত তার মানে হুতু বা তা্ওয়া সম্প্রদায়ের মানুষরাও কালক্রমে তুতসিতে উন্নীত হত অন্য দিকে অসংগঠিত রাজনৈতিক অবস্থা থেকে রুয়ান্ডা যখন রাজতন্ত্রে উন্নীত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তুতসিরাই রাজতন্ত্রের নিয়ন্ত্রক হয় অর্থাৎ তুতসিরাই ক্ষমতার শীর্ষে চলে আসে

 

বলাবাহুল্য, হাজারও জাতিগোষ্ঠীতে শতধা বিভক্ত হলেও জাতিতে জাতিতে  আফ্রিকানরা  তেমন খুনাখুনি করত না প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব এলাকা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকত কিন্তু ইউরোপিয় উপনিবেশিক শক্তির কবলে পড়ে আফ্রিকা তার জাতিগত সহঅবস্থান হারিয়ে ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে এর প্রধানতম কারণ হল, তাদের ভাগ কর আর শাসন কর নীতি ভাগ কর আর শাসন কর নীতি দিয়ে ইউরোপিয়ানরা কেবল আফ্রিকাকে ভৌগোলিকভাবেই ছিন্নভিন্ন করেনি, তাদের ভ্রাতৃত্ববোধকেও ধূলিস্যাৎ করেছে

2

 

বেলজিয়ান উপনিবেশিক শক্তির কবলে পড়ে রুয়ান্ডার জনগোষ্ঠী ১৯৬০ সালের পর থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হুতুরা সংখ্যা লঘু তুতসিদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত নিপীড়ন শুরু করে তাদের নির্যাতনে প্রায় লক্ষধীক তুতসি পার্শ্ববর্তী দেশ উগান্ডা, কেনিয়া ও তানজানিয়ায় উদ্বাস্তু হয়ে পড়েবছরের পর বছর তারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতাসীন হুতু সরকারের সাথে সমঝোতা করে স্বদেশে ফিরে আসতে চেষ্টা করে কিন্তু সরকার তাদের প্রকাশ্য বলে দেয় রুয়ান্ডা হল হুতুদের দেশ এখানে তুতসিরা বহিরাগত তারা ইথিওপিয়া কিংবা আফ্রিকার পূর্ব উপকুলের কোন ভূখণ্ড থেকে এখানে গরু চরাতে চরাতে এসে পড়ে স্থায়ী হয়েছে মাত্র তাই তারা যখন রুয়ান্ডার বাইরে চলে গেছে, তখন তাদের রুয়ান্ডার ভূখণ্ডে আসার অনুমতি দেয়ার জন্য আহম্মক তারা হতে পারে না তবে তুতসি নেতারা নির্বাসনে থাকলেও রুয়ান্ডায় এক বিরাট জনগোষ্ঠীর তুতসী রয়ে যায় হুতু সরকার দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য তাদের নানাভাবে নির্যাতন করতে থাকে

 

নির্বাসিত তুতসিরা উগান্ডা থেকে অভিযান চালিয়ে রাজধানী কিগালির দিকে অগ্রসর হতে থাকেএ মুহূর্তে জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং তুতসিদের নেতা রাজধানীর অদূরেই অবস্থান গ্রহণ করে। এর কিছু পরে রুয়ান্ডার হুতু রাষ্ট্রপতি  হাবিয়ারিমানা রুরুন্ডি থেকে বুরুন্ডির রাষ্ট্রপতিসহ বিমানে করে কিগালিতে আসার সময় কিগালি বিমানবন্দরের কাছেই তার বিমানটি ভূপতিত হয় তবে এটা দুর্ঘটনা ছিল না ছিল পরিকল্পিত নাশকতা কিন্তু এই নাশকতার জন্য আসলে তুতসিরা না হুতুরা দায়ি তা আজও নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি

১৯৯৪ সালের ৭ এপ্রিল এ বিমান বিধ্বংসের  ঘটনার পরপরই ক্ষমতাসীন হুতুরা তুতসিদের হত্যা করা শুরু করে প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে তুতসিদের বিরুদ্ধে হুতুরা সাধারণ জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল এখন তারই চূড়ান্ত পরিণতি ঘটতে থাকে হুতুরা প্রচার করতে থাকে যে তাদের রাষ্ট্রপতিকে তুতসিরাই হত্যা করেছে তাই এখন তুতসিদের হত্যা করার পালা রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম রেডিও টেলিভিশনে আহব্বান জানান হয় যে হুতুরা যেন তাদের সকল শক্তি দিয়ে তুতসিদের হত্যা করা শুরু করে এত দিনের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-ভালবাসা, ভুলে সংখ্যা গরীষ্ঠ হুতুরা তাদের প্রতিবেশিদের হত্যা করতে শুরু করে রাস্তায় রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে সরকারি পুলিশ ও সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা বেছে বেছে তুতসিদের হত্যা করতে শুরু করে এমনকি এ হত্যাকাণ্ডে গির্জার ফাদারগণও অংশগ্রহণ করে প্রার্থণা সভা পরিচালনা শেষে গির্জার ফাদার ঘোষণা দেন, এরা তুতসি, এদের হত্যা কর এমনি একটি গির্জা এখন দেশের অন্যতম গণহত্যা যাদুঘর তবে তুতসিদের নেতৃত্বে রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিত ফ্রন্ট কিগালির দখল নিয়ে গণহত্যার ইতিটানে
3

 

গণহত্যার প্রায় সকল স্থানই সযত্নে জাদুঘররূপে  সংরক্ষণ করা হচ্ছে। রাজধানীর বাইরেও অনেক কয়েকটি জাদুঘর আছে যেগুলোর মধ্যে সেই গির্জাটিও আছে যার পুরোহিত প্রার্থনা শেষে তার গির্জায় আশ্রয় নেয়া তুতসিদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল।আমরা যে যাদুঘরটি পরিদর্শন করেছি তা রাজধানি কিগালিতেই। এটা ছিল একটি কবরস্থান। এখানে হাজার হাজার তুতসিকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়। যাদুঘরের তথ্যমতে এ বদ্ধভূমিতে প্রায় ২,৫০,০০০ নারী-পুরুষ ও শিশুর কবর বা দেহাবশেষ রয়েছে।

 

যাদুঘরের ব্যবস্থাপনা অতি চমৎকার!  ভিতরের কোন বস্তুর ছবি তোলা নিষেধ একটি ডকুমেন্টারি দেখানোর মাধ্যমে পরিদর্শন শুরু হয় এবং অন্য একটি ডকুমেন্টারি দেখানোর মাধ্যমে পরিদর্শন শেষ হয় মানুষ মানুষের প্রতি কিরূপ বিভৎস নৃশংসতা প্রদর্শন করতে পারে রুয়ান্ডার গণহত্যা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে অনেক গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসীদের ইহুদি নিধন, ১৯৭১ সালে  পাকিস্তানিদের বাঙালি নিধন ইত্যাদি অনেক গণহত্যাই পৃথিবীবাসি প্রত্যক্ষ করেছে কিন্তু রুয়ান্ডার গণহত্যাটি ছিল দ্রুততায় সবগুলোর চেয়ে ব্যতীক্রমী মাত্র একশ দিনে হুতু সরকার ও তাদের সহযোগিরা আট লাখ তুতসিসহ প্রায় দশ লাখ লোক হত্যা করেছিল মানে প্রতিদিন তারা গড়ে ১০,০০০ মানুষকে হত্যা করেছিল

 

কেবল রাজনৈতিক কারণে একই দেশের শত শত বছর একত্রে বাসবাস করা একটি জনগোষ্ঠীর মানুষ অন্য জনগোষ্ঠীর বা অন্য শ্রেণির মানুষের প্রতি কিরূপ নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারে রুয়ান্ডার গণহত্যা জাদুঘরগুলো তার উৎকৃষ্ট উদারহণ।এখানে যারা বেড়াতে আসেন, তারা যেমন অনুভব করেন রুয়ান্ডার তৎকালীন হুতু নিয়ন্ত্রিত সরকার ও তার সাথে তাদের সহযোগিদের নিষ্ঠুরতার কাহিনী তেমনি জানতে পারেন সেই মৃত্যুপুরির উপর পরবর্তী সরকারসমূহ কি সুন্দর অট্রালিকা তৈরি করেছেন, একটি বিভক্ত সমাজকে কিভাবে একত্রিত করে রুয়ান্ডান জাতিকে আফ্রিকার অন্যতম সুস্থ-সুন্দর ও অনুকরণীয় জাতিতে পরিণত করেছেন। জাদুঘরটি কেবল পুরাতন বস্তু রাখার স্থানই নয়, এটা একই সাথে একটি শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্রও বটে। রুয়ান্ডার গণহত্যার কাহিনী শুনতে এসে মানুষের নৃশংসতার চিহ্ন দেখতে এসে পর্যটকগণ এখান থেকে পৃথিবীর সকল গণহত্যা সম্পর্কেই সাধারণ জ্ঞান লাভ করতে পারে।