ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

২৩ জানুয়ারি, ২০১৭ সাল। সকাল সাড়ে আটটা। বসে আছি দক্ষিণ সুদানের রাজধানীতে ‘জুবা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে’। ২১ দিনের ছুটিতে বাংলাদেশে যাব। চূড়ান্ত গন্তব্য ঢাকা হলেও প্রথমে যাব কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে। জুবা থেকে নাইরোবিতে জাতিসংঘের ফ্রি-ফ্লাইট। নাইরোবি থেকে শুরু হবে কমার্শিয়াল ফ্লাইট। জাতিসংঘের নিয়মিত ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছি। আমাদের সাথে অপেক্ষা করছে প্রায় অর্ধশত যাত্রী। আমরা মাত্র তিনজন বাংলাদেশি। নেপালের যাত্রী আছে চার/পাঁচজন। এদের মধ্যে দুইজন মহিলা। এরা নেপাল সেনাবাহিনীর সদস্য। হঠাৎ চোখে পড়ল নেপালী সেনাবাহিনীর দুই মহিলা সদস্যের ঊর্ধ্বাঙ্গে ওড়না জড়ানো। যদিও এ দু হিমালয়ান ললনার পড়নে জিন্সের প্যান্ট, তবুও তারা ঊর্ধ্বাঙ্গে ওড়না পরতে ভোলেনি।

বাঙালিদের কাছে নারীদের ওড়না পরার দৃশ্যটা কোনভাবেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সম্প্রতি পাঠ্য বইয়ে ও-তে ওড়না নিয়ে যা হৈ চৈ হয়েছে সেটা মনে করেই নেপালী মেয়েদের এই ওড়না পরার দৃশ্যটা আমার কাছে ভিন্ন এক অর্থ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।

২০১৭ সালের শিশু শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে বানানের ভুল, নামের ভুল, ছাপার ভুল, সূচিপত্রের ভুল ইত্যাদির পাশাপাশি সরকার ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পড়ে ‘ও-তে ওড়না’ লেখার জন্য। পাঠ্যবই বাচ্চাদের হাতে আসার সাথে সাথে সমালোচকদের হাতেও যেন আসে একটি বড়সর মারণাস্ত্র। প্রগতিশীল বলে কথিত গোষ্ঠী দাবি করে, শিশুপাঠে কৌশলে সরকার সাম্প্রদায়িকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রবেশ করিয়েছে। ওড়না হল একটি ইসলামী পোশাক। তাই ও-তে ওড়না বলে আমাদের কোমলমতি শিশুদের মনে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেটা কোনভাবেই কাম্য নয়।

এ ওড়না নিয়ে একই সাথে উঠেপরে লাগে কিছু নারীবাদী বলে কথিত ব্যক্তিত্ব, লেখক ও বুদ্ধিজীবী। তাদের দাবি হল, ওড়না একটি মেয়েদের পোশাক, যে পোশাক কেবল প্রাপ্ত বয়স্ক বা যুবতী মেয়েরাই পরে। তারা ওড়নাকে বোরখার লঘু সংস্করণ হিসেবে মনে করে আওয়াজ তুলতে থাকেন, আমাদের কোমলমতি শিশুদের ওড়না পড়ার সবক দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকে ধাবিত করা কাঙ্খিত নয়।

নারীবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদার— এ দুই ঘরানার লেখক-বুদ্ধিজীবী বা আন্দোলনকর্মীগণ যে তাদের স্ব স্ব মতে কতাটা গোঁড়া বা ঠুনকো, সেটা প্রমাণ করার জন্যই আমার এ নিবন্ধের অবতারণা। নিবন্ধের শুরুতেই উল্লেখ করা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় নেপালী মেয়েদের ওড়না পরা কি এটা প্রমাণ করে না যে ওড়না কিংবা ঊর্ধ্বাঙ্গের বাড়তি এ আবরণ তার স্বমহিমায় ধর্ম নিরপেক্ষ? নেপালী মেয়েরা ধর্মে হিন্দু। তাই ওড়না যে কেবল মুসলমান মেয়েদের পোশাক নয়, নেপালী মেয়েদের ওড়না পরায় সেটা কি প্রমাণিত হয় না? আবার একটি ভিন্ন সংস্কৃতির মেয়েরা যখন আমাদের বাঙালি মেয়েদের অনুরূপই ওড়না পরছে, তাতে কি প্রমাণিত হয় না যে ওড়না কেবল ফ্যাশনই নয়, শালিনতা রক্ষারও একটা বড় মাধ্যম যা দেশ-কাল- ধর্ম-সংস্কৃতি নির্বিশেষে স্বীকৃত? কিন্তু এরপরও আমরা বাঙালি সমাজে ওড়না নিয়ে একটু বিস্তারিত বিশ্লেষণে যাব। প্রাসঙ্গিক হওয়ায় আমরা মাহমুদ শামসুল হক কর্তৃক রচিত ‘হাজার বছরের বাঙালি নারী’ (পাঠক সমাবেশ:২০০০) থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিব।

“ওড়না ছিল প্রাচীন ভারতীয় তথা বাঙালি নারীর ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাক। মেয়েদের পোশাকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন ঘটেছে ওড়নায়। অনেকের মতে, শাড়ি ওড়নারই ক্রমবর্ধিত রূপ। শাস্ত্রকার পাণিনি যাকে বলেছেন প্রাবার বা উত্তরীয়। রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, আধনা (আধখানা)। শাড়ি এক বস্ত্রে পরিণত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওড়না ছিলো স্বয়ংসম্পূর্ণ বক্ষাবরণ। পরবর্তীকালে এর স্থান দখল করে স্তনপট্ট বা কাঁচুলি”।

উপরের উদ্ধৃতি থেকে এটা বোঝা যায় যে ওড়না যেমন বিজাতীয় কোন পোশাক নয়, তেমনি এটা কোন ইসলামী পোশাকও নয়। এ পোশাকখণ্ড আগাগোড়াই একটি বাঙালি ও বৃহদার্থে পূর্ববঙ্গীয়। তবে এটা ঠিক যে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এ পোশাকে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আজকের মতো প্রাচীন বাংলায় শাড়ি কোন অখণ্ড পোশাক ছিল না। তখন বাঙালি মেয়েরা কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত যে বস্ত্রখণ্ড পড়ত তাকে বলা হত শাড়ি। আর কোমরের উপরে যে পৃথক বস্ত্রখণ্ড পরত তাকে বলা হত ওড়না, ওড়নী, উড়ানী কিংবা চাদর। ক্রমান্বয়ে শাড়ি যখন অখণ্ড বস্ত্র হিসেবে মেয়েদের গোটা শরীর জুড়ে বসল তখন ওড়না পরা হত শাড়ির উপরে; অনেকটা চাদরের মতো।

শাড়ির ব্যবহারের স্বর্ণযুগেই বাংলায় আসে মুসলিম শাসন। তখন অনেকে শাড়ির পরিবর্তে সালোয়ার কামিজ পরা শুরু করে। এ সালোয়ার-কামিজ পোশাকটি আসে উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে; সম্ভবত রাজস্থান থেকে। আর এ সালোয়ার কামিজের সহযোগী পোশাক হিসেবে ওড়না আবার তার সমহিমায় ফিরে আসে। ১২ হাত লম্বা শাড়ির আঁচল স্থান দখল করে ওড়নার। আর ওড়না স্থান নেয় সালোয়ার কামিজের সাথে।

উপরিউক্ত বিশ্লেষণে ওড়নাকে বিজাতীয় বা ইসলামী পোশাক বলে সার্টিফিকেট দেয়া অত্যন্ত স্থূল মানসিকতার পরিচয় বলেই মনে করি। বলাবাহুল্য, নারী জাতির মূল্য নির্ধারণে ইতিহাস পরিক্রমায় নানাবিধ মানদণ্ড স্থাপন করা হত। এসব মানদণ্ড স্থাপন করত পুরুষরাই। কিন্তু বর্তমানে সেই যুগ আর নেই। এখন নারীরাই তাদের মূল্যের মানদণ্ড নির্ধারণ করেন। কিন্তু সেই মানদণ্ড যদি একটি ওড়নাতে এসেই থিতু হয়ে যায়, সেটা আর যাই বলি, অগ্রগতি বলতে পারি না। পরিশেষে ওড়না নিয়ে আর একটি অভিজ্ঞতার কথা বলে নিবন্ধের ইতি টানব।

জানুয়ারি, ২০১৭ মাসেরই কোন এক সময় দক্ষিণ সুদান থেকে কানাডার এক শহরে বসবাস করা আমার সাবেক পিআরপি প্রকল্পের এক মহিলা সহকর্মীকে ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারে ভিডিও কল দিলাম। ঐ সময় আমার মহিলা সহকর্মী তার বাসায় রাতের খাবার তৈরি করছিলেন। আমার কলটি রিসিভ করার পরেই তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আমাকে লাইনে রেখে অন্য ঘরে গেলেন তার ওড়নাখানা পরতে। বলাবহুল্য, আমার এ সহকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, আপন কর্মে তিনি প্রতিষ্ঠিতা। আর জীবিকার সন্ধানে কানাডায় প্রবাসী। এই নারীকে আমি সাধারণ নারী বলব কিভাবে? আর যদি তিনি অসাধারণ হন, তাহলে কি ওড়না পড়ার জরুরত প্রকাশ করে তিনিও প্রতিক্রিয়াশীল বা মৌলবাদী বনে যাবেন?  (৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, রংপুর, বাংলাদেশ)।