ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমেরিকার পুলিশ পেশাদারিত্বের অগ্রনায়কদের অন্যতম ছিলেন অগাস্ট ভলমান যিনি বার্কলে নামক ক্ষুদ্র একটি পুলিশ বাহিনীর শেরিফ নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে পুলিশ-জীবন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় রাষ্ট্রের পুলিশ প্রধানের দায়িত্ব পালন করে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানের দায়িত্ব পর্যন্ত পালন করেছিলেন। আজকের বিশ্বের পুলিশ সদস্যদের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে তিনি আজকের দিনের বহুল আলোচিত লাই ডিটেকটর পর্যন্ত  প্রবর্তন করেছিলেন। তার প্রবর্তিত পুলিশ-ব্যবস্থা বিংশ শতাব্দীর  সত্তুরের দশক পর্যন্ত প্রায় অপরিবর্তিতই ছিল।

না, অগাস্ট ভলমানের জীবন ও কীর্তি নিয়ে আমার এ নিবন্ধ নয়। আমার নিবন্ধ মাদক সমস্যার সমাধান নিয়ে। অগাস্ট ভলমারের প্রসঙ্গ নিয়ে আসার কারণ হল, মাদক সমস্যাটি কোন জাতীয় সমস্যা তার একটি বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে। কারণ সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সমস্যার প্রকৃতি নির্ধারণ করতে না পারলে তার সমাধানের পথ নির্দেশও সম্ভব নয়। সমস্যাটি যদি আইনি সমস্যা এবং আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ফৌজদারি অপরাধমূলক সমস্যা না হয় কিংবা এর কারণ, উৎপত্তি, বিকাশ ও সমাধানের ক্ষেত্রটির অবস্থান যদি ফৌজদারি অঙ্গনের সাথে সামান্যভাবে সম্পর্কিত ও পুরোটাই সামাজিক পরিমণ্ডলে অবস্থিত হয়, সেই সমস্যার সমাধানের জন্য আইনপ্রয়োগকার এবং স্থূলভাবে পুলিশের উপর নির্ভর করাটি অধিকতর স্থূলতা দোষে দুষ্ট হতে বাধ্য।

অগাস্ট ভলমার যে যুগে পুলিশের সংস্কার বা প্রফেশনালিজম প্রতিষ্ঠার মিশন শুরু করেছিলেন সেই সময়টা যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে চলছিল প্রহিবিশন প্রিয় যখন মাদকের উৎপাদন, সরবরাহ, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার আইনগতভাবে সীমিত করা হয়েছিল। কিন্তু যে সমাজে মাদক ভিন্ন কোন পারিবারিক অনুষ্ঠানও সম্পন্ন হয়না সেখানে মাদকদ্রব্য বিশেষ করে এলকোহল জাতীয় মাদকের উপর কড়াকড়ি কোনভাবেই হালে পানি পায়না। সমাজের বিশাল চাহিদার বিপরীতে যখন সরবরাহ  বৈধ পথে সরবরাহ কমে গেল, তখন বৈধ পথ বিদায় নিয়ে অবৈধ পথকে পরিষ্কার করে দিল। ঐ সময় অবৈধ মাদক ব্যবসায় বিনিয়োগ করা সবচেয়ে লাভজনক হয়ে দেখা দিল। আর প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর এলাকা দলখল নিয়ে চলল দাঙ্গাহাঙ্গামা। এই প্রেক্ষাপটেই জন্ম নিয়েছিল মাদক ডন আল কেপুনের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসী যাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বিভাগগুলোকে নাকানি চুবানি খেতে হয়েছিল।

ঠিক এ সময়ই আগস্ট ভলমান প্রশ্ন তুলেছিলেন, মাদক সমস্যাটি কোনো ফৌজদারি সমস্যা কি না এবং এর সমাধান পুলিশের হাতে আছে কি না বা থাকার কোন যৌক্তিক কারণ আছে কি না। ভলমার বিশ্বাস করতেন এটা কোন ভাবেই ফৌজদারি বা পুলিশি সমস্যা নয়; এটা নিতান্তই সামাজিক সমস্যা যার সমাধানের সমাজের সকল প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর সমভাবে বর্তায় এবং পুলিশ যেখানে একটি অংশমাত্র। বলাবাহুল্য, সমাজের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এক সময় মাদক সীমীতকরণ সংক্রান্ত  নীতি থেকে দূরে সরে এসেছিল এবং সামাজিক সমস্যার সামাজিক সমাধানের পথ বের করে এ থেকে সমাজকে রক্ষা করেছিল। তবে ফৌজদারি  প্লেয়ারগুলো যে একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিল তা নয়। তারাও ছিল পুরোমাত্রায় সক্রিয়। তারা এ সমস্যা সমাধানের জন্য  সমন্বিত ও বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।

মাদক ডন  আল কেপুনের বিরুদ্ধে পুলিশ কোন ক্রমেই পেরে উঠছিল না। এফবিআই তার টিকিটি ছুঁইতে পারছিল না। তবে তাকে যে এক দম ছেড়ে দেয়া হয়েছিল তাও নয়।  কিন্তু তাকে মাদক সংক্রান্ত কোন অপরাধে সাজা দেয়া তো দূরের কথা গ্রেফতারও করা যায়নি।  এফবিআই তাকে গ্রেফতার করেছিল গাড়ি চুরির মামলায়। তাকে সাজা দেয়া হয়েছিল কর ফাঁকির মামলায়। লক্ষ্য করুন, নামে ও কাজে মাদক সম্রাট। কিন্তু সাজা দেয়া হল কর ফাঁকির অপরাধে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের মাদক সংক্রান্ত আইনেও বড় ফাঁক রয়েছে। এখানে নিজ দখলে মাদক না থাকলে কাউকে গ্রেফতার করা যায় না, সাজা দেয়া যায় না। একজনের স্বীকারোক্তি অন্যজনের বিরুদ্ধে প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু তাই বলে যে আমরা সম্পূর্ণ অপারগ হব এমনটাও নয়। মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের পুলিশ ও অন্যান্য বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে যেমন কাজ করেছিল, আমাদেরও তেমনভাবে কাজ করা দরকার। তাহলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হাতে একটি বড় আইন আছে যা হল মানি লন্ডারিং আইন। এ আইন অনুসারে মাদক থেকে অর্জিত সম্পদের হিসাব-নিকাশ গ্রহণের পথ ধরেই মাদক সম্রাটদের সায়েস্তা করা যায়। কিন্তু বিষয়টি অবশ্যই সময় সাপেক্ষ, জটিল ও ব্যয়বহুল। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর যেমন দক্ষতা বাড়ানোর প্রশ্ন রয়েছে তেমনি অনেক বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্তের প্রয়োজনও রয়েছে।

ইতোপূর্বে আমি এ সম্পর্কে আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতালব্ধ মতামত বহুবার তুলে ধরেছিলাম। এবারও তাই করছি।

 (১) আইন প্রয়োগ সংক্রান্ত

  • মাদক সমস্যা সমাধানের জন্য একটি জাতীয় পর্যায়ের টাক্সফোর্স গঠন বা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে যুগোপযুগী করা দরকার।
  • মাদক সম্রাটদের সম্পদের খোঁজ নিয়ে নোটিশ প্রদান করা হোক। এক্ষেত্রে দুদক, পুলিশ, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করবে।
  • এনবিআরকে সম্পৃক্তকরণ। মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যেই ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে সাদা করা হয়েছে। আবার অনেক সম্পদ ট্যাক্সের বাইরে রয়ে গেছে। এ সম্পদের উপর বিশেষ অনুসন্ধান করে মাদক সম্রাটদের ট্যাক্সফাঁকির মামলা করা, মামলায় অর্থদণ্ডের পরিবর্তে কারাদণ্ড প্রদান, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ইত্যাদি করা। একই সাথে অন্য বিভাগগুলোকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করা।
  • মাদক ব্যববসায়ীদের অনেক যানবাহন আছে যেগুলোর সঠিক দলিলাদি নেই। সেগুলো জব্দ করা। এমনকি ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলেও জেল দেয়া যায়।
  • মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পদের একটি বড় অংশ অন্যান্য পার্টনারদের সাথে বৈধ ব্যবসায় নিয়োজিত করা হয়েছে। এগুলোর সাথে অনেক রাঘব বোয়ালও জড়িত। এদের ঐ সব বিনিয়োগ থেকে আলাদা করতে হবে।
  • মাদক ব্যবসায়ীদের  অর্থের একটি বড় অংশ রিয়েল স্টেট কোম্পানিগুলোতে গোপন করা হয়েছে। যেমন একটি ফ্লাটের দাম এক কোটি টাকা হলেও তা মাত্র ত্রিশ লাখ টাকায় কেনার ডকুমেন্ট থাকতে পারে। অনুসন্ধানে ঐ রিয়েল  এস্টেট কোম্পানিগুলোও আসবে। এখন এ ধরনের বৈধ পার্টনারের অবৈধ সংযোগ কিভাবে দেয়া হবে সেটাও পলিসি সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পড়ে।
  • মাদক ব্যবসায়ীদের অনেক স্থাপনাই অবৈধ স্থানের উপর কিংবা অবৈধভাবে নির্মিত থাকতে পারে। এগুলো বিল্ডিং কোর্ড, নির্মাণ শর্ত জমাজমি সংক্রান্ত বিধি ইত্যাদি প্রয়োগের মাধ্যমে গুড়িয়ে দেয়া যেতে পারে।

 (২) শিক্ষণ, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন

মাদক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আইনপ্রয়োগ যতটা না জরুরি তার চেয়েও বেশি জরুরি হল,  মাদক দ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ, গণসচেতনতা বৃদ্ধি তথা শিক্ষণ প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন। বাংলাদেশের থানায় রুজুকৃত মোট ফৌজদারি মামলার প্রায় অর্থেকই মাদক সংক্রান্ত। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের সিংহভাগই মাদক মামলার আসামী। জেলখায় শতকরা ৭০ ভাগ বিচারাধীন বন্দী মাদক মামলায় আটক। তাই গ্রেফতার, উদ্ধার, বিচার, সাজা—এসব এখন অনেকটাই গৌন হয়ে পড়েছে। তাই দরকার বর্তমান ব্যবস্থার পাশাপাশি অন্য প্রকার ব্যবস্থা। এজন্য নিম্ন লিখিত পথ গ্রহণ করা যেতে পারে।

  • গণ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে শিক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য ঢেলে সাজাতে হবে।তাদের মূল কাজই হওয়া দরকার প্রতিরোধমূলক, প্রতিকারমূলক।
  • মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতেরর তত্ত্বাবধানে প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষক থাকা দরকার যারা বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ইত্যাদির মাধ্যমে গণসচেতনতা তৈরি করবে।
  • এ ক্ষেত্রে সরকারের গণযোগাযোগ অধিদফতরকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
  • মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে প্রতি মাসে থানা বা উপজেলা ভিত্তিক অন্তত একশ করে শিক্ষককে মাদক বিরোধী লেকচার দেয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে।
  • প্রতি মহল্লার ইমামদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের বিশেষ মাহফিলের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।
  • মাদকাশক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব থাকা চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে, অচল গুলোকে সচল করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন নতুন চিকিৎসাকেন্দ্র খুলতে হবে।
  • চিকিৎসাপ্রাপ্ত মাদকাসক্তদের পরবর্তী কর্ম ফলোআপের জন্য সমাজ সেবা অধিদফতর, কমিউনিটি ক্লিনিকের ইনচার্জ প্রমূখদের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।
  • মাদক ব্যবসায় জড়িত গডফাদারদের নিষ্ক্রিয়া করা হলে চুনোপুঁটি ব্যবসায়ী ও কেরিয়ারগণ দ্রুতই বেকার হয়ে পড়বে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

আমার দেয়া প্রস্তাবগুলো অবশ্যই স্বয়সম্পূর্ণ নয়। এগুলোর বিপরীতে অনেক ক্রিয়া-বিক্রিয়া, যোজন-বিয়োজন, বিন্যাস-সমাবেশ, বিচার-বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এগুলোকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে কোন সমাধানই সম্ভব নয়।