ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশি তদন্তের সিংহভাগ জুড়ে থাকে সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদ। এ দুটো প্রত্যয়ের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও পৃথক পৃথক মাত্রা থাকলেও বাংলাদেশের ফৌজদারি মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এ দুটোকে একই নামে প্রকাশ করতে অভ্যস্ত, আর তা হল জিজ্ঞাসাবাদ। যাদিও Interview এবং Interrogation উভয় ক্ষেত্রেই সন্দিগ্ধ বা আসামীকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসার মাধ্যমে তার কাছ থেকে অপরাধ সম্পর্কিত তথ্য আদায়ের চেষ্টা করা হয়। তবুও জিজ্ঞাসাবাদের (Interrogation) চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থাকে অপরাধীর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা।

সাক্ষাৎকার এবং জিজ্ঞাসাবাদ উভয় ক্ষেত্রেই সন্দিগ্ধ ব্যক্তি, সাক্ষী কিংবা অন্য কোন প্রকারে তথ্য প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিরা যদি সত্য কথা না বলেন এবং তথ্যগোপনে তৎপর হন, তাহলে সাক্ষাৎকারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যহত হয়। তাই সাক্ষাৎকার বা জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়ার শুরুতেই সাক্ষাৎকারদাতা বা সন্দিগ্ধ ব্যক্তির  সত্যবাদিতার পরীক্ষা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। সাক্ষাৎকারদাতার কথা বলার ধরন, শব্দচয়ন, বাক্য বিন্যাস, কন্ঠস্বরের ওঠানামা থেকে শুরু করে তার শারিরীক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও তার সত্যবাদিতা কিংবা তথ্য-প্রবঞ্চনা চেষ্টা শনাক্ত করা যায়।

বৈজ্ঞানিক সাক্ষাৎকারে নানা ধরনের পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন, এমআইটিটি, এফএআইএনটি (ফেইন্ট), রিডস পদ্ধতি ইত্যাদি। এ আলোচনায় মরগানের ইন্টারভিউ থিম টেকনিক বা এমআইটিটি (MITT) পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করব।

 

মরগানের কৌশলের মূল কথা:

সন্দিগ্ধ বা সন্দেহভাজনকে কিছু ছবি বা স্কেচ দেখিয়ে এসব নিয়ে গল্প তৈরি করার নির্দেশনার মধ্য দিয়েই মরগানের ইন্টারভিউ শুরু হয়। মরগানের কৌশলের মূল কথা হল, মানুষ যখন কোন কিছু কল্পনা করে বানিয়ে বানিয়ে বলে তখন সে তার পূর্ব অভিজ্ঞতাকেই অনুসরণ করে। কোন ব্যক্তিকে একটি কাল্পনিক প্রেমের গল্প লিখতে বলা হলে তিনি গল্পের মধ্যে তার নিজের অভিজ্ঞতাকেই বর্ণনা করবেন। এমনকি এ গল্পের নায়ক-নায়িকা ও পাত্র-পাত্রীদের নামও তার নিজের সাথে সম্পর্কিত বা পরিচিতদের মধ্য থেকেই হবে। এমনকি নায়ক-নায়িকার নামগুলোও তার বাস্তব জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠ এমনকি নিজের প্রেমিক-প্রেমিকার নামটিও হতে পারে।

মানুষ তার অব্যবহিত পূর্ব-অভিজ্ঞতা মনের মধ্যে গোপনে পুষে রাখে। এ অভিজ্ঞতা তার অবচেতন মনে বাস্তব কাজকর্মের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। অপরাধ সংগঠনকারীকে অপরাধের অনুরূপ ছবি, বর্ণনা ইত্যাদি দারুণভাবে প্রভাবিত করে। শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট নাটকে হ্যামলেট তার পিতার হত্যাকারী ‍হিসেবে তার চাচা রাজা ক্লডিয়াস ও মা গারট্রুডের ষড়যন্ত্র এবং হত্যার ঘটনা নাটকের মাধ্যমে উথাপনের করে সেই নাটকের দৃশ্যাবলিতে অপরাধীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেই তাদের হত্যাকারী হিসেবে শনাক্ত করেছিল। মরগানের থিম কৌশল এ ধরনের অনুমানের উপরই প্রতিষ্ঠিত।

মরগান কে ছিলেন?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সানডিয়াগো পুলিশ বিভাগের টহল অফিসার হিসেবে মরগান (Raymond Morgan) তার পুলিশি জীবন শুরু করেন। এরপর একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সানডিয়াগো কাউনট্রির এটর্নি অফিসে অরগানাইজড ক্রোইম ইউনিটে কাজ শুরু করেন। এ ইউনিটে মোটর সাইকেল চুরির দলগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করে মরগান যথেষ্ঠ সাফল্য অর্জন করেন। মোটর সাইকেল চুরির সংঘবদ্ধ দলগুলোর মধ্যে হেলস এনজেলস (Hell’s Angels) গ্যাংটি ছিল অত্যন্ত জঘন্য প্রকৃতির। অল্প সময়ের মধ্যে মরগান এ দলের ৩২ জন সদস্যকে গ্রেফতারে সমর্থ হন। তার আক্রমণাত্মক অভিযান ও কৌশলী তদন্তের সাফল্যে গ্যাং লিডারগণ অত্যন্ত ভীতু হয়ে পড়ে। তারা মরগানকে হত্যার ঘোষণা দেয় এবং একটি অক্রমণের প্রস্তুতিকালে গ্যাং এর দুই সদস্য অস্ত্রসহ ধরা পড়ে।

এ ঘটনার পর মরগান তার নিজ শহর আইডাহোতে ফিরে যান। যেখানে তিনি পরামর্শক মনোবিজ্ঞানের উপর ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্ন করে আইডাহো পুলিশ বিভাগেই তার দ্বিতীয় কর্মজীবন শুরু করেন। তবে এবার মাঠের পুলিশিং নয়, পুলিশের প্রশিক্ষক হিসেবে। এখানে পুলিশ অফিসারদের তিনি আচরণ বিজ্ঞান (Behavioral Science) পড়াতেন। এর পাশাপাশি তিনি বইসি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে (Boise State University) ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার উপরও লেকচার দিতেন।

সাক্ষাৎকার কৌশল সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ও একজন দক্ষ প্রশিক্ষক হিসেবে গোটা আইডাহো রাজ্যে তার নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তিনি সিভিল ও মিলিটারি বিভাগে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে মানসিক পরীক্ষা পরিচালনাসহ অন্যান্য সাক্ষাৎকার পরিচালনা করতেন।  এক পর্যায়ে তাকে যুক্তরাষ্টের নেভাল ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটিক সার্ভিসে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০০৫ সালে অবসরের পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানেই কর্মরত ছিলেন।

মরগানের এমআইটিটি পদ্ধতির পটভূমি:

মরগানের থিম্যাটিক ইন্টারভিউ টেকনিক প্রবর্তনের একটি বিশেষ পটভূমি রয়েছে। ১৯৩০ এর দশকে ব্যক্তিত্ব পরীক্ষার জন্য আমেরিকার দুই মনোবিজ্ঞানী, হেনরি এ মুরাই এবং ক্রিস্টিয়ানা ডি মরগান ‘থিম্যাটিক এপারসেপশন টেস্ট’ (Thematic Apperception Test) বা ‘ট্যাট’ নামে একটি পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অনুমান করার চেষ্টা করা হয়। কোন মানুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, তীব্রতর ঝোঁক, পছন্দ, প্রেষণা ইত্যাদি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা করা যায়। ট্যাট এ ব্যক্তির অস্পষ্ট উদ্দীপকের প্রতি মানসিক সাড়া থেকে তার অন্তর্নিহিত আবেগ ও দ্বন্দ্ব পরিমাপের চেষ্টা করা হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে অস্পষ্ট কিছু ছবি বা স্কেচ দেখিয়ে এর উপর মন্তব্য করা তথা এগুলো বর্ণনা করতে বলা হয়। যেমন, কোন অস্পষ্ট দৃশ্যের ছবি দেখিয়ে প্রশ্ন করা হয়, এ দৃশ্যগুলো কি? দৃশ্যের পূর্বের অবস্থা কি ছিল বা হতে পারে এবং পরবর্তী অবস্থাই বা কি? এরপর পরীক্ষক বা মনোবিজ্ঞানী প্রার্থীর বর্ণনাগুলো বিশ্লেষণ করে ব্যক্তির  মানসিক দ্বন্দ্ব, প্রেষণা, মনোভাব ইত্যাদির উপর ধারণা লাভ করত। পরীক্ষার্থী এসব অস্পষ্ট স্কেচের উপর তাদের অবচেতন মনের প্রেষণা ও মনোভাব প্রতিফলিত করত বলে একে ‘প্রক্ষেপনমূলক পরীক্ষা’ (Projective Test) বলা হত।

 

ছবি নং- ১

মরগান অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ কালে ‘ট্যাট’ পদ্ধতি ব্যবহারের এক পর্যায়ে চার বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযুক্তকে তিনি যৌনতা বিষয়ক একটি স্কেচ দেখান যেখানে এক নারী অসংলগ্ন বসনে বিছানায় শুয়ে আছে। এক পুরুষ তার ‍দিকে পিছন ফিরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে যার এক হাত দিয়ে চোখমুখ ঢাকার চেষ্টা করছে। (ছবি নং- ১)।

এ ছবির উপর আসামী মন্তব্য করেন- ‘এটা দেখে মনে হচ্ছে, একজন পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করছে। তিনি প্রতিদিন প্রতিজ্ঞা করেন যে, এ ধরনের কাজ আর কখনো করবেন না। তাকে দেখে অনুতপ্ত মনে হচ্ছে। সে এ কাজ আর কখনো করবে না।’ যৌন হয়রানির অভিযুক্ত এ আসামীর কাছ থেকে নিয়মিত জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মরগান তার পূর্ণ স্বীকারোক্তি আদায়ে সমর্থ হন। এ অভিজ্ঞতা থেকে মরগান মনে করেন, এ ধরনের আরো স্কেচ দিয়ে আসামীর মনোভার যাচাই করা হলে আসামীর জবানবন্দীর সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসাবাদ হাতিয়ার হতে পারে।

এমআইটিটি পদ্ধতি:

মরগানের সাক্ষাৎকার কৌশলে সাক্ষাৎকারদাতা বা সন্দিগ্ধকে কিছু অস্পষ্ট ছবি বা স্কেচ দেখানো হয়। স্কেচ থেকে সন্দিগ্ধকে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়।ছবিতে কি দেখা যাচ্ছে? এ অবস্থার পূর্বের অবস্থাটি কি ছিল বা হতে পারে? এবং পরের অবস্থা কি হতে পারে?

যেমন, কোন ছবিতে কোন ব্যক্তিকে গাড়ি চালানো অবস্থায় দেখা গেল। এখন তাকে প্রশ্ন করা হতে পারে, তিনি কি কারণে বা কোত্থেকে গাড়ি চালিয়ে আসছেন, কেন গাড়ি চালাচ্ছেন, গাড়ি চালিয়ে কোথায় যাচ্ছেন এবং এরপর কি করবেন?

প্রাথমিকভাবে মরগান পূর্ববর্তী ট্যাট স্কেচের ২০টি স্কেচ থেকে কয়েকটি স্কেচ নিয়ে তার থিমেটিক কৌশল শুরু করেন। পরবর্তীতে এর সাথে তার নিজের করা কিছু স্কেচ যোগ করেন। এসব স্কেচ ছিল অপরাধস্থল সংক্রান্ত।

মরগান তার স্কেচগুলোকে চারটি মৌলিক ভাগে ভাগ করেন। যথা- অপ্রাসঙ্গিক, প্রাসঙ্গিক, প্রক্ষেপণমূলক এবং দোষ ও অনুশোচনামূলক। প্রাসঙ্গিক স্কেচগুলোকে আবার অহিংস অপরাধ নির্দেশক, সহিংস অপরাধ নির্দেশক এবং যৌন অপরাধ নির্দেশক- এ তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়।

মরগানের এমআইটিটি পদ্ধতিতে সর্বমোট ৪২টি স্কেচ আছে যাদের মধ্যে পাঁচটি হল অপ্রাসঙ্গিক, ১৮টি প্রাসঙ্গিক অহিংস অপরাধ নির্দেশক, আটটি প্রাসঙ্গিক সহিংস অপরাধ নির্দেশক ও ছয়টি প্রাসঙ্গিক যৌন অপরাধ নির্দেশক। এছাড়া তিনটি হল প্রক্ষেপণমূলক এবং দুইটি দোষ ও অনুশোচনামূলক।

ছবি নং- ২

.

মরগানের কর্মধারা:

 

অপ্রাসঙ্গিক ছবি: এমআইটিটি পদ্ধতির শুরুতেই সন্দিগ্ধকে পাঁচটি স্কেচ দেখানো হয়। প্রথমেই তাকে একটি অপ্রাসঙ্গিক ছবি দেখানো হয় (ছবি নং-২)। এ ছবি দেখিয়ে তাকে একটি গল্প তৈরি করতে বলা হয়। এর মধ্যে থাকবে- ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে তার পূর্বাবস্থা কি ছিল? এখন কি হচ্ছে? এবং এর ফলাফল বা পরবর্তী ঘটনা কি হতে পারে?       

জেন্ডার নির্দেশক অপ্রাসঙ্গিক ছবি:

ছবি নং-৩ এবং ৪

মরগান কিছু জেন্ডার কেন্দ্রিক ছবি তৈরি করেন। এর মধ্যে একটি হল- একজন মহিলা তার ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে তাকাচ্ছে। (ছবি নং-৩)। আরেকটি ছবি স্যুট পরিহিত দাঁড়ানো একজন পুরুষ (ছবি নং-৪)। মরগান সাধারণত পুরুষ সন্দিগ্ধকে পুরুষের ছবি ও মহিলা সন্দিগ্ধকে মহিলার ছবি দেখাতেন। অবশ্য কোন ঘটনায় পুরষ ও মহিলা উভয় লিঙ্গের অপরাধী জড়িত থাকলে তাদের দুইটি ছবি একই সাথে দেখানো হয়। মরগান মনে করেন যে, জেন্ডার নির্দেশক অপ্রাসঙ্গিক ছবিগুলো সন্দিগ্ধদের মূল ঘটনার ভেতর প্রবেশের ক্ষেত্র তৈরি করবে।

 

প্রাসঙ্গিক ছবি: এরপর মরগান সন্দিগ্ধকে একটি প্রাসঙ্গিক ছবি দেখান। (ছবি নং- ৫)। এ ছবি সন্দিগ্ধ কর্তৃক কৃত অপরাধের যতদূর সম্ভব কাছাকাছি হবে। সত্যবাদী সন্দিগ্ধ ছবিটিকে বাস্তবতার খুব কাছাকাছি রেখে বর্ণনা করবে। তার বর্ণনা সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের তদন্তাধীন অপরাধের বেশ কাছাকাছি নিয়ে যাবে। অন্যদিকে অসত্যবাদী বা প্রবঞ্চক সন্দিগ্ধ সর্বদাই মূল ঘটনাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে এবং প্রায়শই অপরাধের দায় অন্যদের উপর চাপানোর চেষ্টা করবে।

 

ছবি নং- ৫

সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীগণ সন্দিগ্ধের দৈহিক পরিবর্তন বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ লক্ষ্য করবে। অপ্রাসঙ্গিক ছবি থেকে যখন প্রাসঙ্গিক ছবিতে আসা হবে ঐ সময় সন্দিগ্ধের দ্রুত পরিবর্তন তদন্তকারীদের লক্ষ্য করতে হবে। তথ্য গোপনকারী বা মিথ্যাবাদী সন্দিগ্ধ প্রাসঙ্গিক ছবি দেখানোর সাথে সাথে ধরা পড়ার ভয়ে তার উদ্বেগ বেড়ে যাবে। এর ফলে অবচেতন ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে শাব্দিক ও দৈহিক পরিবর্তনগুলো প্রকটতর হবে।

 

প্রক্ষেপণমূলক ছবি: প্রাসঙ্গিক ছবির পরে সাক্ষাৎকারদাতাকে একটি প্রক্ষেপণমূলক ছবি দেখানো হয় (ছবি নং- ৬)। এ ছবির মাধ্যমে তথ্যগোপনকারী বা প্রবঞ্চক সন্দিগ্ধকে গল্পের মধ্যে তার ধরা পড়ার ভয়কে প্রকট করে তোলে।

 

ছবি নং- ৬

একটি শিল্প কারখানার অর্থ খোয়া যাওয়ার ঘটনার এক সাসপেক্ট ৬নং ছবি সম্পর্কে নিম্নলিখিত বর্ণনা দেন- “একজন বালক। আমি জানিনা। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে কোন সমস্যায় পড়েছে। এ অবস্থার কারণ বা পূর্ব অবস্থা কি? অনেক কারণে এমন সমস্যায় সে পড়তে পারে। সে ক্লান্ত। তার খাবার কিছু নেই। তার কাছে টাকা নেই। তাই তার পিছনের হাতটি তাকে সাহায্য করছে। তার জন্য কিছু খাবার আনছে এবং তাকে সুখী করছে। এটাই আমার বিশ্বাস। কারণ বাস্তব জীবনে তাকে আপনারা চাকরি দিতে পারেননি। আপনাদের উচিৎ তাকে খাদ্য দেওয়া। এটাই আসল কথা। এটা অত্যন্ত কঠিন।”

মরগানের কাছে পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে এই সন্দিগ্ধ কারখানা থেকে অর্থ চুরির কথা স্বীকার করেছিল।

  

  ছবি নং-৭

দোষ ও অনুশোচনামূলক ছবি: মরগানের সর্বশেষ কৌশলে দোষ ও অনুশোচনামূলক ছবি দেখানো হয় (ছবি নং-৭)। এ ছবি সাধারণত জেন্ডার নিদের্শক হয়। নারী-পুরুষ উভয় ছবিতে তারা মাথায় বা কপালে হাত দিয়ে তার মুখমণ্ডল ঢেঁকে রাখছেন যা অনুশোচনা প্রকাশ করে। প্রতারণার আশ্রয় নেয়া তথ্যগোপনকারী সন্দিগ্ধরা তাদের অপরাধের অনুরূপ ছবিগুলোর বিপরীতে তাদের অনুশোচনা আচরণ ও দেহভঙ্গিমার মাধ্যমে প্রকাশ করে।

 

সন্দিগ্ধদের সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্ত:

  • সত্যবাদী সন্দিগ্ধগণ সাধারণত প্রাসঙ্গিক স্কেচগুলো শনাক্ত করতে পারে। এ সম্পর্কে তারা প্রকাশ্যেই কথা বলে এবং প্রাসঙ্গিক গল্প তৈরি করে। কিন্তু অসত্যবাদী বা প্রবঞ্চক সন্দিগ্ধরা অপরাধ সম্পর্কে কথাই বলতে চায় না। যদি স্কেচগুলো সংশ্লিষ্ট অপরাধ স্থলের হয়ও এবং সে সম্পর্কে কোন গল্প তৈরি করতে বললে তারা এমন গল্প তৈরি করবে যার সাথে কোন অপরাধের সম্পর্ক নেই।
  • সত্যবাদী সন্দিগ্ধরা স্কেচ থেকে মিলনাত্মক (upbeat) গল্প তৈরি করবে। কিন্তু প্রবঞ্চকরা বিয়োগাত্মক (downbeat) বা নেতিবাচক গল্প তৈরি করবে।
  • সত্যবাদী সাক্ষাৎকারদাতাগণ স্কেচ থেকে যৌক্তিক গল্প তৈরি করবে। কিন্তু প্রবঞ্চকরা অযৌক্তিক গল্প তৈরি করবে। এমনকি তারা অপ্রাসঙ্গিক স্কেচকেও প্রাসঙ্গিক মনে করতে পারে।
  • সত্যবাদী সন্দিগ্ধরা গল্পটি সুন্দরভাবে শেষ করতে পারে। কিন্তু প্রবঞ্চকরা তা পারে না। কারণ, তারা জানে না যে তাদের শেষ পরিণতি কি হবে।

 মরগানের পদ্ধতির সুবিধাসমূহ:

 মরগানের এমআইটিটি কৌশলটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মিনিট সময় লাগতে পারে। এ কৌশলের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে-

  • মরগানের এ পদ্ধতিতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রস্তুতকৃত গল্প থেকেই প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
  • এ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাবলী পরবর্তী জিজ্ঞাসাবদে ব্যবহার করা যাবে।
  • এ কৌশল ব্যবহারের ফলে সত্যাবাদী সাক্ষাৎকারদাতাদের সাথে প্রাথমিক মিথস্ক্রিয়ার পরিবেশ তৈরি হয় এবং সাক্ষাৎকারকে ঘিরে তাদের উদ্বেগ হ্রাস পায়। অন্যদিকে বঞ্চনাকারী সাসপেক্টদের উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়, যেটা তার সম্পৃক্ততাকে প্রকট করে তোলে।
  • এ কৌশল সকল সাক্ষাৎকারদাতাকে কিছু না কিছু কথা বলতে উৎসাহিত করে যা সাক্ষাৎকার বা জিজ্ঞাসাবাদের পরবর্তী ধাপগুলোকে সহজতর করে তোলে।
  • একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকার ঘটনাগুলোর তদন্তের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি তদন্তকারীদের কাছে তদন্তের পরিধি হ্রাস করতে সাহায্য করে।

মরগানের ইন্টারভিউ থিম কৌশলটি অত্যন্ত সহজ প্রক্রিয়া। মাত্র কতিপয় স্কেচের মাধ্য ৫-৬ মিনেটের মধ্যেই একজন সাসপেক্টের সত্যবাদিতা কিংবা প্রবঞ্চনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। সন্দিগ্ধদের সাথে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে স্কেচগুলো নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিৎ। স্থান, সময়, ঘটনা ও সন্দিগ্ধভেদে প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক স্কেচগুলোর তৈরি করা উচিৎ।

বিষয়টিকে অনেকে মনোবিজ্ঞানীর কাজ মনে করতে পারেন। কিন্তু তদন্তের ক্ষেত্রে একজন পুলিশ অফিসারকে কেবল মনোবিজ্ঞানীই নয়, ডাক্তার, সমাজসেবক, অভিভাবক কিংবা ধর্মগুরুর ভূমিকাও পালন করতে হয়। বাংলাদেশের কোন তদন্ত ক্ষেত্রে মরগানের কৌশল কোথাও অনুসরণ করা হয় বলে আমার জানা নেই। কিন্তু এ কৌশল প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্র:

  1. Effective Interviewing and Interrogation Techniques (3rd Edition) by Nathan J. Gordon & William L.Fleisher (Elsevier Ltd)