ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

সমাজে কোনও কারণে অপরাধ বেড়ে গেলে বা অপরাধমূলক ঘটনার খবর প্রকাশের হার বেড়ে গেলেই এক শ্রেণির মানুষ দাবি তোলে, অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করা হোক, সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করা হোক। অনেকের ধারণা, একটা কঠিন শাস্তির আইন তৈরি করলেই আলোচিত অপরাধ বন্ধ হবে। আর মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেই এ জাতীয় অপরাধ করার মতো কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ছবি – রয়টার্স

কিন্তু আমজনতার দাবির মধ্যে যে কতটা ‘স্থুলতা’ আছে সেটা অপরাধ তত্ত্ব যারা একটু হলেও পড়েছেন তারা সহজেই বুঝতে পারবেন। কেবল শাস্তির ভয় দেখিয়ে যেমন শিশুর কান্না থামানো যায় না, তেমনি মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখিয়ে মানুষের অপরাধের ফলে মৃত্যুকে নিবারণ করা যায় না। তবে নীতিগতভাবে আমি মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি সমর্থন করি না। আমাদের প্রচলিত আইনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও বিশ্বাস রেখেও নীতিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির পক্ষপাতিত্ব থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। 

যে শাস্তির পর অপরাধীর পার্থিব জীবনের বোধ থাকেনা সেটা কোনও শাস্তিই নয়। এ ধরনের শাস্তি অতি প্রাচীন দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক আর জীবনের বদলে জীবন হরণ ব্যাবিলনের হাম্মারাবি কোডের নীতি।

স্বাভাবিক আচরণ থেকে বিচ্যুত কোনও মানুষ যখন অন্য মানুষকে খুন করে বা খুনের শাস্তি উপযোগী কোনও অপরাধ করে, তার বিচার করে তাকে হত্যার নির্দেশ দান কোনক্রমেই স্বাভাবিক আচরণ নয়। একজন অপরাধীর প্রাণ হরণের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে সম্ভাব্য অপরাধীদের অপরাধকর্ম থেকে বিরত রাখার নীতি যেমন কার্যকরী নয়, তেমনি গ্রহণযোগ্যও নয়।

তথাকথিত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য কোনও সমাজে অপরাধ কমেছে বলে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-উপাত্ত বা প্রমাণ নেই। বাবুই পাখি ক্ষেতের ধান সাবাড় করে বলে একটি বাবুইকে ক্ষেতের মাঝখানে খুঁটির সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে ধৃত পাখির দুর্দশা দেখিয়ে যেমন বাবুই পাখির ঝাঁককে ক্ষেতের ধান খাওয়া থেকে বিরত রাখা যায় না, তেমনি এক অপরাধীর শাস্তির ভয় দেখিয়ে অন্য অপরাধীদের সম্ভাব্য অপরাধ থেকে বিরত রাখা যায় না।

ইতিহাসের পাতায় প্রমাণ মিলবে, অপরাধের শাস্তিদান অনুষ্ঠানেও সমজাতীয় অপরাধ অহরহই সংগঠিত হত।

মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে একটি সাত বছরের শিশুকেও একটি রুমাল চুরির অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হত। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার হাজার মানুষের সামনে। কিন্তু ঐ বলিদান মাঠ বা এক্সিকিউশন গ্রাউন্ডে যে জনতার সমাগম হতো তার মধ্যেও অনেক মানুষের পকেট কাটা পড়ত, রুমালও চুরি হতো।

আধুনিক মানুষ যদি মনে করে, এ ধরনের অমানুষিক কোনও শাস্তিরীতি মানুষের অপরাধমূলক স্বভাবে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারবে তবে সেটাকে আধুনিকতা বলা যায় না।

গ্রিক সম্রাট ড্রাকোর আইন ছিল নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাত। তার সাম্রাজ্যের প্রায় সকল অপরাধের দণ্ডই ছিল মৃত্যুদণ্ড। একবার  তাকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল, তিনি কেন শাস্তি হিসেবে শুধু মৃত্যুদণ্ড দেন। ড্রাকো উত্তরে বলেছিলেন, এর চেয়ে কঠিন শাস্তি তার জানা নেই। থাকলে তিনি সেটাই দিতেন।

যারা সকল  অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন এবং সেটা অবধারিতভাবে মৃত্যুদণ্ডই দাবি করেন, তাদের মানসিকতা সম্রাট ড্রাকোর মানসিকতার অনুরূপ। মানবাধিকার প্রশ্নে আড়াই হাজার বছর আগের ড্রাকোনিয়ান যুগের সাথে আধুনিক মানবাধিকার যুগের পার্থব্য থাকল কই? 

চার হাজার বছর পূর্বের হাম্মুরাবির শাস্তির নীতি আর আড়াই হাজার বছর আগের ড্রাকোর আইনের নিষ্ঠুরতায় যদি একবিংশ শতাব্দীর মানুষের আকাঙ্ক্ষার ধন হবে তবে কে বলবে আমরা সামনের দিকে হাঁটছি?

মনে হতে পারে, যা বোঝাতে চাইছি তা  এই অস্থির সময়কে অস্বীকার করার নামান্তর। উত্তরোত্তর সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে, মানুষের মনে জন্ম নিচ্ছে অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতা। কর্তৃপক্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে এক শ্রেণির মানুষ নাগরিক শান্তি বিনষ্ট করছে। চার বছরের নাবালিকা থেকে শুরু করে ষাট বছরে বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষিত হচ্ছে। নিরীহ মানুষকে হত্যা করে অপরাধীরা শত টুকরা করে তা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে রেখে  বীভৎসতার শীর্ষ ছুঁইছে। মানুষ হত্যা করে আলামত ধ্বংসের জন্য নিহতের শরীর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলছে, এসিডে গলিয়ে ফেলছে। শিশুদের পায়ূপথে যন্ত্রে সাহায্যে বাতাস ঢুকিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। এই যে ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও নিষ্ঠুরতা, তার সাজা কি কেবল জেল-জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে? জঘন্য অপরাধের শাস্তি কঠোর হোক- এটা কি দেশবাসী প্রত্যাশা করে না?

প্রত্যেক সমাজের বিচার ও শাস্তি ব্যবস্থা কোনও না কোনও নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। উপনিবেশিক কাঠামোর উপর দাঁড়ানো আমাদের বিচার ব্যবস্থায় আমরা অপরাধীদের শাস্তিদানকে দুটি নীতির সমন্বয়ে গড়ে তুলেছি।

এর একটা হল দৃষ্টান্ত তৈরি করা, অন্যটি হল সম্ভাব্য অপরাধীদের নিষ্ক্রিয় করা। অর্থাৎ কঠিন শাস্তি হলে সম্ভাব্য অপরাধীরা একই জাতীয় অপরাধ করতে চিন্তাভাবনা করবে ও ভয় পাবে এবং চূড়ান্তভাবে অপরাধ করা থেকে বিরত থাকবে। আর যারা অভ্যাসগত অপরাধী, তাদের জেলখানায় বন্দি করে রাখলে তারা আর অপরাধ করতে পারবে না।

দ্বিতীয় কারণটির যৌক্তিক প্রয়োগ আছে। অপরাধের সুযোগ কমিয়ে দিলে অপরাধ কম হবে। কিন্তু আমাদের দেশের জেলখানা বা হাজতখানাগুলোতে যত মানুষ বন্দি থাকে তাদের মধ্যে কতজন অভ্যাসের কারণে?

এদেশে যারা অপরাধকে তাদের জীবন-যাপনের অবলম্বন বানিয়েছে তাদের কতজন জেলখানায় বন্দি আছে? যারা জেলখানায় বা কারাগারে বন্দি আছে তাদের সিংহভাগই হচ্ছে প্রথমবার কিংবা একবারের অপরাধকারী।

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এধরনের একবার কিংবা দুর্ঘটনা বা রাগের বশবর্তী হয়ে অপরাধকাণ্ড ঘটানো মানুষগুলোর জন্য সংশোধনের ব্যবস্থা আছে। ওদের দেশের বন্দিকারখানাগুলোকে কারাগার বলে না, বলে সংশোধনাগার। কিন্তু আমাদের দেশের কারাগার সম্পর্কে আমাদের ধারণা কী?

শাস্তিদানের প্রথম নীতিটি একেবারেই অকার্যকর। আমি রচনার শুরুতেই উল্লেখ করেছি যে চুরির জন্য মৃত্যুদণ্ডদান অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে মধ্যযুগের ইংল্যান্ডবাসীরা পুনরায় চুরির শিকারে পরিণত হতেন। বাংলাদেশের  উদাহরণ হয়তো আরো মর্মজ্বালার হবে।

কেবল মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে বলেই সেই অপরাধটি মানুষ করবে না- এমন ভাবনা অতি সরল ও নিতান্তই সেকেলে। বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন/২০০০ (সংশোধনী/২০০৩) এ সর্বমোট আটটি ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনটি পাশ হওয়ার পর নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কমেছে কি?

অপরাধ প্রতিরোধের জন্য অপরাধের শাস্তি যে যথেষ্ট নয়, তা বুদ্ধিমান মানুষই স্বীকার করবেন। সংঘটিত অপরাধের ক্ষতিপূরণ বিভিন্নভাবে দেবার চেষ্টা হতে পারে। সে চেষ্টা ফলপ্রসূও হতে পারে। কিন্তু শাস্তির নৃশংসতা বা কঠোরতা দিয়ে অপরাধ নিবারণ কোনও কালেই সম্ভব হয়নি। অপরাধ বিজ্ঞানী সিজার ব্যাকারিয়ার বলেছিলেন, বিচার প্রক্রিয়া হতে হবে দ্রুত। শাস্তিদানে কঠোরতা নয়, শাস্তি প্রদানের বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা ও সুস্পষ্টতাই কেবল অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকর অবদান রাখতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী দ্রুত বিচার আইন এবং সম্প্রতি মহিলাদের উত্ত্যক্তকরণ বা ইভটিজিং নিবারণে মোবাইল কোর্টের ব্যবহার সিজার ব্যাকারিয়ার মতকে পরিপূর্ণভাবে সমর্থন করে।

সিজার ব্যাকারিয়া সেই ১৭৬৭ সালেই মত প্রকাশ করেছিলেন যে, শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা উচিৎ নয়। তবে তিনি অপরাধীদের দীর্ঘ সময় জেলখানায় বন্দি রাখার পক্ষপাতি ছিলেন। আবার একই সাথে জেলখানার বন্দিদের সুযোগ-সুবিধা ও সংশোধনের বিষয়েও আলোকপাত করেছিলেন

আমাদের বিচার ব্যবস্থা থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দূর-ভবিষ্যতেও উঠে যাবে বলে মনে হয় না। কারণ আইন হল সমাজের মানুষেরই ইচ্ছার প্রতিফলন। যে সমাজের জ্ঞানী-গুণী, মূর্খ-বিদ্বান, ছোট-বড়, চাচা-খুড়ো সবাই মিলে যখন তখন অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডের জন্য দাবি তোলেন, বিক্ষোভের জন্য রাস্তায় নামেন, বড় বড় কলামে পত্রিকা ভরিয়ে তোলেন, অধুনা কেবল টিভির পর্দা কাঁপান, সেই সমাজে কোন সরকারই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারবে না।

তবে প্রত্যাশা করাই যায় এ অবস্থার একদিন অবসান ঘটবে। মানুষ অপরাধের কারণ জানতে উৎসাহী হবে, অপরাধ নিবারণের সর্বজন গ্রহণযোগ্য পথ আবিষ্কারে সমর্থ হবে। তখন মৃত্যুদণ্ডের মত কঠোর শাস্তির আর প্রয়োজন হবে না।