ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার  একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্ব পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে সোমালিয়ার মত ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলো পর্যন্ত এ সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো মাদক ব্যবসায় মদদ দেয়ার অভিযোগে  স্বাধীন সার্বভৌম দেশ পানামায় রীতিমত অভিযান চালিয়ে সেই দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তারপরও তারা মাদক সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারেনি।

বিশ্ব সম্প্রদায়ের মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের ব্যর্থতার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে সরল কারণ হল, চাহিদা-যোগান তত্ত্বের কার্যকরিতা। কোনো পণ্যের চাহিদা থাকলে তার উৎপাদন হবেই। আর যদি সেই পণ্যের অস্তিত্বই না থাকে তবে চাহিদাই সেই পণ্যের সৃষ্টি করবে, এক শ্রেণির মানুষ সেই চাহিদা পূরণের জন্য তৎপর হয়ে সেই পণ্য আবিষ্কার করবে।

মাদকদ্রব্য মানুষের জন্য কতটুকু প্রয়োজনীয় সে নিয়ে তর্ক না করেই বলা যায়, পৃথিবীর আদি থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোনো সময় ছিল না যখন মানুষ মাদক বা নেশা জাতীয় দ্রব্যের প্রতি আকৃষ্ট ছিল না। এ নিয়ে বর্তমানের মতো পূর্বেও চলত দর কষাকষি। পূর্বেও এক দেশে থেকে মাদক দ্রব্য অন্য দেশে যেত;  এর ব্যবসা হত।

ইংরেজরা তো আফিম রফতানি করে চীনের বাজার ভরিয়ে দিয়ে চীনের সক্ষম মানুষদের নেশায় বুঁদ করে রেখে তাদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার ঘৃন্য কৌশল পর্যন্ত অবলম্বন করেছিল।

পূর্বের মতো এখনও এক শ্রেণির মানুষ মাদক দ্রব্য সরবরাহের ব্যবসাকে একটি নিয়মিত ব্যবসা বলেই মনে করে। তারা মাদক দ্রব্যের চোরা কারবারি নয়, বরং নিজেদের একটি চাহিদাপূর্ণ পণ্যের সরবরাহকারী বলে মনে করে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে সরকার এবং তাদের কর্মীবাহিনী, পুলিশ এটাকে সাধারণের শান্তি ও স্বাস্থ্য ভঙ্গের কারণ বলে মনে করে। এমতাবস্থায়, ক্ষতিকারক মাদকদ্রব্যের উৎপাদন, ব্যবহার, পরিবহন, সংরক্ষণ কিংবা ব্যবসার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এত তৎপর থাকে।

নেশার কবলে পড়া ব্যক্তিরা শারীরিক অস্বস্তি দূর করার জন্য অভ্যস্তদ্রব্য না পেলে ভিন্ন কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করার ঝুঁকিতে থাকে। কেউ যদি গাঁজাখোর হয়, তবে গাঁজার পরিবর্তে সে সহজেই আফিম ধরতে পারে। হিরোইনখোর ফেনসিডিল ধরতে পারে। তাই কোনো সমাজে একটি মাদকাসক্ত শ্রেণি তৈরি হলে নেশার বস্তু কোনো না কোনো ভাবে বাজারজাত হয়েই থাকে।

কোনো এক সময় দেশে হিরোইনসেবীর সংখ্যা বেশি ছিল। কিন্তু হিরোইনের দুষ্প্রাপ্যতা ও ফেনসিডিলের সহজলভ্যতা নেশাগ্রস্তদের ফেনসিডিলসেবিতে পরিণত করে। আর ফেনসিডিলও যখন দামি হয়ে পড়ে তখন অতিদ্রুত বাড়তে শুরু করে ইয়াবার বাজার।

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে যে ইয়াবার প্রচলন শুরু হয়েছে সে ইয়াবার আমদানির একমাত্র পথ হল কক্সবাজারের টেকনাফ অঞ্চল। ইয়াবাসহ সকল মাদকের বিরুদ্ধে  অভিযান জোরদার হলে,  দেশে এবার আমদানি শুরু হয়েছে ভিন্ন এক ধরনের মাদক।

ইতোমধ্যেই  ‘খাত’ নামের এই মাদকের কয়েকটি চালান ধরা পড়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খাতের প্রথম চালানটি ছিল ১০৭ কেজির। এটা এসেছিল গ্রিনটি হিসেবে। এরমাত্র কয়েকদিন পর উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় ৩৩০ কেজি ওজনের একটি চালান।

হয়তো এসব একই ট্রানজাকশনের  অংশ। একটু আগেপিছে হয়ে দেশে ঢুকেছে। কেউ কেউ হয়তো গ্রিনটি হিসেবে এগুলো ব্যবহারও শুরু করেছে। তবে খাতের আমদানির সময় যাই হোক না কেন এ সব আমদানি প্রমাণ করে  দেশে খাতের একটি ভোক্তাশ্রেণি ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে এবং তারই উপর ভিত্তি করেই আমদানিকারকগণ  সুদূর ইথিওপিয়া থেকে তা বিমানযোগে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিল।

খাত বাংলাদেশে নতুন হলেও আমার কাছে কিন্তু এ দ্রব্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে দক্ষিণ সুদানে দ্বিতীয়বার শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করার সময়  পাবলিক প্রটেকশন সাইটে  প্রবেশ পথে  কলার পাতায় মোড়ানো অবস্থায়  এক প্রকার গাছের কচি কচি তাজা তাজা পাতাসহ এক যুবককে আমরা গ্রেফতার করেছিলাম।

পাতাগুলো দেখতে ঠিক চায়ের পাতার মতো। গাছ থেকে উত্তোলনের নীতিও চায়ের মতো; একটি কুঁড়ি আর তিনটি পাতা একসাথে তোলা হয়।  তারপর সাত-আটটি কুঁড়ি কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে আলাদা আলাদা বান্ডেল তৈরি করা হয়। বান্ডিল খুলে দেখে মনে হয়েছিল আমাদের দেশের চা-শ্রমিকগণ যেন কিছুক্ষণ আগেই এই কুঁড়িগুলো কারখানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বাগান থেকে তুলেছে। কিন্তু এটি চা ছিল না।  লুগান্ডি ভাষায় নাম ছিল মেইরুনগি  বা মিরুঙ্গি বা মিরা। এগুলো দক্ষিণ সুদানে আনা হয়েছিল উগান্ডা থেকে।

মিরুঙ্গি বা খাতের ঐ চালানটির পরিমাণ ছিল আমাদের দেশের উরিয়ার বস্তার অর্ধেকের মতো। ঐ সময় এর দাম দক্ষিণ সুদানিজে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পাউন্ডের মতো যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় চৌদ্দ হাজার টাকার মতো ছিল। মূল্য হিসেবে এ মাদক খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু এটা ক্রয় করার ক্ষমতা খুব সংখ্যক দক্ষিণ সুদানিজের ছিল।

এক ফাঁকে একটি বান্ডেল খুলে কয়েকটি পাতা মুখে দিলাম। সবুজ পাতাগুলো প্রথমে চায়ের পাতার মতোই মনে হল। নানা দেশের পুলিশ অফিসার সহকর্মীগণ এ নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। ইথিওপিয়ানরা বললেন, এটা তো নিষিদ্ধ কিছু না।এটাকে আমরা ‘চাথ’ বলি। সোমালিয়ার লোকজন এটা খুবই খায়। তাই এগুলো ইথিওপিয়া থেকে আমরা সোমালিয়া রপ্তানি করি। পূর্ব আফ্রিকার এটা বেশ প্রচলিত।

মিরুঙ্গি নিয়ে আমার বেশ কৌতুহল হল। তাই পরে ইন্টারনেট ঘেঁটে এর চৌদ্দগোষ্ঠীর খবর বের করলাম।  এই মিরুইঙ্গি বা মিরার আদি আবাসস্থল হল আরবের লোহিত সাগরের তীরাঞ্চলে। হর্ন অব, আফ্রিকা বা আফ্রিকার শিং বলে পরিচিত সোমালিয়া থেকে শুরু করে উত্তর পূর্বে আরব উপকুলের ইয়ামেন পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এ বস্তুকে ‘কাথ’ ‘খাত’ বা ‘কাট’ বলে। এর বোটানিকাল নাম হল Catha edulis ; মানে ভক্ষণযোগ্য কাথ। অনেক স্থানে এটাকে সোমালি চা, আরবি চা, কিংবা কাফটাও বলে।

আফ্রিকার সিং অঞ্চলে কফির প্রচলন শুরু হওয়ার বহু বছর পূর্বেই এ অঞ্চলে কাথের প্রচলন শুরু হয়েছিল। ক্রমে এটা আরব, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া হয়ে উগান্ডা, রুয়ান্ডা হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকুল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কাথ এর সবচেয়ে বেশি চাহিদা হল ইয়ামেনে। এখানে এটা আমাদের বাংলাদেশ পান সুপারির মতোই সামাজিক, ধর্মীয় ও প্রত্যিহিক আড্ডায় ব্যবহার করা হয়।

ইয়ামেনে নাকি ফলমূল আবাদের চেয়ে কাথ আবাদ অনেক বেশি লাভজনক। কাথ গাছ দুই থেকে পাঁচ মিটারের মতো লম্বা হয। এতে প্রচুর পানির দরকার। প্রতি বছর তিন চার বার করে এর পাতা তোলা যায়। তাই ইয়ামেনের সেচ প্রকল্পগুলোর ৪০ শতাংশ পানিই কাথ উৎপাদনে ব্যয় হয়।

প্রশ্ন হল, এত মাদক থাকতে বাংলাদেশে খাত ঢুকছে কেন? ইতোপূর্বে আমি উল্লেখ করেছি যে নেশাখোরগণ তাদের সুনির্দিষ্ট নেশার বস্তুটি দুষ্প্রাপ্য হলে তার একটি সহজলভ্য বিকল্প খোঁজে। খাত একটি মৃদু উত্তেজনা সৃষ্টিকারি মাদক বলে বিশ্ব সংস্থা ১৯৮০ সালেই নিশ্চিত করেছে। খাত এম্পিথেটামিন সমৃদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেটের মতো উত্তেজক। তাই ইয়বাার বিকল্প হিসেবে এই খাত পাতা ব্যবহার করা যায়। দেশে মাদকের বিরুদ্ধে চলতে থাকা কঠোর অভিযানের প্রেক্ষিতে ইয়াবার বিকল্প হিসেবে খাত হয়তো ইতোমধ্যে নেশাখোরদের কাছে পৌঁছে গেছে।

তবে খাত ও ইয়াবার মধ্যে ক্রিয়াগত কিছু পার্থক্য আছে।  ইয়াবার ক্রিয়া শুরু হয় সেবনের আধা ঘন্টা পরে। কিন্তু কাথের ক্রিয়া শুরু হয় ১৫ মিনিট পরেই। তাই ইয়াবার চেয়ে খাতের চাহিদা বেশিই হওয়ার কথা। ইয়বার মতো খাতেও  ক্ষুধা মন্দা, অনিদ্রা ইত্যাদি উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

তবে খাত ব্যবহারের কিছু সমস্যা আছে। খাত পাতা আমাদের দেশের পান পাতার মতোই তাজা তাজা খেতে হয়। শুকনো খাত পাতাকে গ্রিনটি এর মতো করেও পান করা যায়। আমাদের দেশের মাদক কারবারিগণ গ্রিনটির মতো ব্যবহারের দিকটি  বিবেচনায় রেখেই খাত আমদানির প্রকল্প হাতে নিয়েছেন।

কাথ বা মিরুইয়ার মতো কোনো মাদক আমাদের দেশে  নেই। গাঁজা, ভাং, চরস ইত্যাদি আমাদের দেশের স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাদক দ্রব্য। এই কাথ গাছের আদি উৎস লোহিত সাগরের উপকূলে বলে আমি একে বলি ‘লোহিত মাদক’। ঐ সময় লেখা একটি ফেইসবুক নোটে আমি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম যে, খাত উৎপাদনকারী এলাকার ভূমি ও আবহাওয়ার সঙ্গে  আমাদের দেশের যথেষ্ট মিল রয়েছে। আর যেভাবে বিশ্ব ছোট হয়ে আসছে, আফ্রিকার সাথে আমাদের যোগাযোগ বাড়ছে, তাতে কোন দিন না আবার এ কাথ পাতার উৎপাদন ও ব্যবহার বাংলাদেশেও শুরু হয়।

আমার আশঙ্কা যে এত দ্রুত সত্যে পরিণত হবে বুঝতে পারিনি। এখন খাত সেবন আমাদের দেশের একটি নতুন সমস্যা। বর্তমানে এটার আমদানি শুরু হয়েছে।  আশঙ্কা করা যায়, কিছুদিন পর  এটা আমাদের দেশে উৎপাদিত হবে। আর আমাদের পার্শ্ববর্তী মায়ানমার তো এক পায়ে খাড়া রয়েছে এমন কিছু মাদক আমাদের দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য।