ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর উপর গবেষণা ও প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে। ইউরোপ-আমেরিকার বিদ্যায়তনে এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা রয়েছে। সেখানে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে গুরুত্বসহকারে জিজ্ঞাসাবাদের উপর বিশেষ কোর্স পরিচালনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এর উপর  একক কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই।

বর্তমান ফৌজদারি তদন্ত জগতে জিজ্ঞাসাবাদের তিনটি কৌশল বা মডেল প্রচলিত আছে। যদিও বাংলাদেশের পুলিশ তদন্তকারীগণ এ সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত নন।

জিজ্ঞাসাবাদের রিড কৌশলটি ১৯৪৭ সালে চালু হয়। এ কৌশলের সাফল্য যেমন উল্লেখযোগ্য তেমনি এর বিদ্যাতায়নিক ও আদালতি স্বীকৃতিও রয়েছে। তিনটি স্তরে পরিচালিত এ  কৌশলের মূল পর্বে নয়টি ধাপ আছে। সন্দিগ্ধের সকল প্রকার আইনগত অধিকার রক্ষা করে কোনো প্রকার শারীরিক শক্তি প্রয়োগ না করেই তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ে রিড কৌশল অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত ইতিহাসে সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলনের প্রক্রিয়া বিগত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে শুরু হলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশে তা শুরু হয়েছে ঐ শতাব্দীর শেষ দশকে। জন ই. রিড জিজ্ঞাসাবাদের উপর নিবেদিত প্রশিক্ষণ শুরু করেন ১৯৪৭ সালে। ব্রিটিশ পুলিশের জন্য ১৯৮৪ সালের পূর্বে সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদের উপর কোনো আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। আমাদের দেশে তো এ প্রশিক্ষণ এখনও শুরুই হয়নি। 

বৈজ্ঞানিক তদন্তের ইতিহাসের সাথে জন ই. রিডের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বহুল আলোচিত-সমালোচিত পলিগ্রাফি বা লাই ডিটেকটরের ক্রমোন্নতির  ক্ষেত্রে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাষ্ট্রের বার্কলি পুলিশের অফিসার জন লার্সনের পরেই জন ই. রিডের নাম উচ্চারিত হয়। পৃথিবীর পুলিশের ইতিহাসে প্রথম অপরাধ গবেষণাগার স্থাপিত হয়েছিল ১৯২৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো পুলিশ বিভাগে। জন ই. রিড ছিলেন সেই ক্রাইম ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান। অপরাধ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। একই সাথে সন্দিগ্ধদের সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদের উপর তিনি ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। ১৯৪৭ সালে জন ই. রিড একটি বেসরকারি জিজ্ঞাসাবাদ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেন। সম্ভবত ফৌজদারি তদন্তের ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ প্রশিক্ষণের রেওয়াজ চালু করেন।

রিড ও তার সহকর্মীগণ তাদের উদ্ভাবিত কৌশলের খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা করে ১৯৬২ সালে  শিরোনামে একটি পুস্তক প্রকাশ করেন। রিডের বইটির পরিবর্তিত ও বর্ধিত পর পর কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে যার সর্বশেষ ও পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০১১ সালে। রিড ও তার সহকর্মীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত রিড ইন্সটিটিউট রিড কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অবস্থিত এ ইন্সটিটিউট প্রতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৪০০টির মতো প্রশিক্ষণ-সেমিনার আয়োজন করেন।

রিড ইন্সটিটিউটের ওয়েবসাইটের (www.reid.com) তথ্যানুসারে ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত রিড কৌশলের উপর প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি সরকারি-বেসরকারি তদন্তকারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

ফৌজদারি অপরাধের তদন্তক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এখন পর্যন্ত রিড ভিন্ন দুইটি কৌশল বা মডেল রয়েছে। এদের একটি হল ডগলাস উইকল্যান্ডার  ও ডেভিড ই. জুলাওয়াস্কি  প্রবর্তিত ‘ডব্লিউ-জেড’ মডেল এবং ব্রিটিশ হোম অফিস কর্তৃক প্রবর্তিত ‘পিস’ মডেল। ডব্লিউ-জেড মডেলটি উইকল্যান্ডার ও জুলাওয়াস্কির বহু দিনের গবেষণার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এর তাত্ত্বিক ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিদ্যাতায়নিক পরিমণ্ডলে তা ব্যাপক চর্চা করা হয়। কিন্তু ‘পিস’ মডেলটি এখন পর্যন্ত কেবল ব্রিটিশ পুলিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটা মূলত কতিপয় পদ্ধতির সমন্বয়।

কিন্তু রিড কৌশলটির প্রচার প্রসার ও অনুশীলন অত্যন্ত ব্যাপক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে এর অনুশীলন শুরু হয়েছে। এ পদ্ধতির বিদ্যাতায়নিক ও আদালতি উভয় প্রকারের স্বীকৃতি রয়েছে। আমেরিকার উয়েনি স্টেট ইউনিভার্সিটির (Wayne State University) আইন বিভাগের অধ্যাপক জোসেফ গ্রানোর মতে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে রিড কৌশলই একমাত্র জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল যা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের পুলিশ বিভাগ অনুশীলন করতে পারে।

২০০৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্ট একটি মামলার রায়ে উল্লেখ করেছেন যে রিড ও তার সহকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ কৌশলই একমাত্র কৌশল যা মিরান্ডা শতর্কীকরণের সকল দিক পরিপূর্ণভাবে শিক্ষা দিয়ে থাকে।

রিড কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদের তিনটি স্তর, যথা- তথ্য বিশ্লেষণ, সন্দিগ্ধের সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও সর্বশেষ মূল স্তর দোষারোপমূলক জিজ্ঞাসাবাদ।

তথ্য বিশ্লেষণ  স্তরে আলোচিত অপরাধ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে থাকে অপরাধ স্থল সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা, অপরাধস্থলে প্রাপ্ত যাবতীয় আলামত বা সাক্ষ্য-প্রমাণের বর্ণনা, ভিকটিমদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যাবলী এবং সন্দিগ্ধদের সম্পর্কে ইতোমধ্যে প্রাপ্ত তথ্যাবলীর চুলচেরা  বিশ্লেষণ করে জিজ্ঞাসাবাদকারী সম্ভাব্য অপরাধী সম্পর্কে মূল্যবান ধারণা পেয়ে থাকেন। অপরাধ, অপরাধস্থল, অপরাধ প্রক্রিয়া, অপরাধের সহযোগী, ভিকটিম এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা জিজ্ঞাসাবাদকারীকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ ও জিজ্ঞাসাবাদ অব্যহত রাখতে সহায়তা করবে।

সন্দিগ্ধের সাক্ষাৎকার গ্রহণ সাক্ষাৎকার হল ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত কিংবা ঘটনা সম্পর্কে তথ্যদানে সক্ষম ব্যক্তিদের সাথে তদন্তকারীদের সাধারণ তথা অভিযোগহীন মিথস্ক্রিয়া। রিড জিজ্ঞাসাবাদকারীগণ বিশেষভাবে কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সন্দিগ্ধের সত্যবাদিতা কিংবা প্রবঞ্চনার বিষয়টি ব্যক্ত ও অব্যক্ত আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শনাক্ত করার চেষ্টা করে। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সন্দিগ্ধের কাছ থেকে অপরাধ, ভিকটিম বা সম্ভাব্য অপরাধীদের সম্পর্কেও সাধারণ তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর পূর্বে সন্দিগ্ধের পলিগ্রাফ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। তবে পলিগ্রাফ বা লাই ডিটেকটর পরীক্ষার ফলাফল অপ্রকাশিত থাকে কিংবা পলিগ্রাফ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও সন্দিগ্ধকে জানান হয় যে তিনি সেখানে অকৃতকার্য হয়েছেন। এর ফরে সন্দিগ্ধের প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়।

দোষারোপমূলক জিজ্ঞাসাবাদ  রিড কৌশলের তৃতীয় স্তরটি হল প্রকৃত জিজ্ঞাসাবাদ বা প্রত্যাশিত স্তর। যদি তথ্য সংগ্রহকালীন এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণকালীন স্তরে সন্দিগ্ধ তার অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার না করে কিংবা বিস্তারিত তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করে তবে তাকে মূল স্তর তথা দোষারোপমূলক জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখী করা হয়।

রিডের মূল জিজ্ঞাসাবাদ নয়টি থাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে সরাসরি অভিযোগ উত্থাপন করে দ্বিতীয় ধাপে থিম গঠন করে সন্দিগ্ধের অপরাধকে লঘু করা কিংবা তাকে একটি মুখরক্ষার অযুহাত তৈরি করতে সহায়তা করা হয়। তৃতীয় ধাপে সন্দিগ্ধের অস্বীকৃতি প্রতিরোধ করা হয়। চতুর্থ ধাপে অযুহাত খণ্ডন, পঞ্চম ধাপে অযুহাতের প্রেক্ষিতে তার মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়। ষষ্ট ধাপে অভিযুক্তের অবসাদগ্রস্ততাকে আমলে নেয়া হয়। সপ্তম ধাপে সন্দিগ্ধকে কিছু বিকল্প প্রশ্ন করে তার উত্তরদানের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি দানের জন্য প্রস্তুত করা হয়। অষ্টম ধাপে সন্দিগ্ধ তার অপরাধ সম্পৃক্ততার কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করবেন। আর সর্বশেষ বা নবম ধাপে অভিযুক্তের মৌখিক স্বীকারোক্তিকে লিখিতরূপ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পাশ্চাত্য জগতে যেখানে পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দী আদালতে গ্রহণযোগ্য সেই সব দেশে পুলিশ নবম ধাপে লিখিত স্বীকারোক্তিতে সন্দিগ্ধের স্বাক্ষর গ্রহণ করেন এবং এ কাজে নিরপেক্ষ সাক্ষীও তলব করা হতে পারে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে যেখানে পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দী আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়, সেখানে জিজ্ঞাসাবাদকারী অতিদ্রুত স্বীকারোক্তিদাতাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থিত করে তার স্বীকারোক্তি রেকর্ড করাবেন।

প্রথম ধাপ ( প্রত্যক্ষ অভিযোগ)
এ ধাপের শুরুতেই পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে জিজ্ঞাসাবাদকারী সন্দিগ্ধকে বলবেন যে পুলিশ ইতোমধ্যেই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন, সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এসব থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে সন্দিগ্ধ আলোচিত অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তবে জিজ্ঞসাবাদকারীর এ দাবী সত্য নাও হতে পারে। কিন্তু সন্দিগ্ধকে তা কোনভাবেই জানতে বা বুঝতে দেয়া যাবে না। জিজ্ঞাসাবাদকারীর হাতে সন্দিগ্ধের জড়িত থাকার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য না থাকলেও তিনি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়েই আসামীকে অভিযুক্ত করেই যাবেন। এক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদকারী আসামিকে বিশ্বাস করার মতো কিছু মেকি বিষয়ের আশ্রয় নিতে পারেন। যেমন, তার হতে থাকতে পারে আসামির নামে বড় বড় করে লেখা কোনো ফাইল বা ডোসিয়ার যা দেখে আসামি মনে করবে যে তার নামে যখন এত বড় ফাইল তৈরি হয়েছে তখন নিশ্চয়ই পুলিশ তার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে ফেলেছে।

এ পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদকারী সন্দিগ্ধের শরীরিক অভিব্যক্তি ব্যাখ্যার চেষ্টা করবেন। লক্ষ করবেন তার মুখমণ্ডল তথা চেহারায় কী কী পরিবর্তন আসে। আসামির মনোভাবে নিস্ক্রিয়তা দেখা দিলে এটা তার প্রবঞ্চনার প্রতি ইঙ্গিত দিবে। তবে জিজ্ঞাসাবাদকারী অভিযুক্তের প্রতি সরাসরি অভিযোগপূর্ণ বক্তব্য রেখেই চলবেন। তিনি আসামিকে বোঝাবার চেষ্টা করবেন যে তিনি যখন পুলিশের তদন্তে সবদিক থেকেই আটকা পড়েছেন, তখন ঘটনা আর তথ্য গোপন করে লাভ কি, বরং তার সবকিছু স্বীকার করাই উত্তম । এটা তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎতের জন্য মঙ্গলজনক । তবে জিজ্ঞাসাবাদকারী অবশ্যই আসামীকে কোনো বেআইনি প্রতিশ্রুতি দেবেন না । সরাসরি অভিযুক্তকরণ পর্ব অবশ্যই একমুখী আলোচনা বা মনোলগ হবে এসময় কেবল জিজ্ঞাসাবাদকারীই কাথা বলে যাবেন। তিনি আসামিকে কোনো কথা বলার সুযোগই দিবেন না । তবে জিজ্ঞাসাবাদকারীকে মনে রাখতে হবে, ঘটনা ও আসামি সম্পর্কে বিস্তারিত না জানলে  সন্দিগ্ধের সাথে বেশিক্ষণ একতরফা অভিযোগ করে যাওয়া সম্ভব হবে না। এ পর্বে কথা বলার সময় জিজ্ঞাসাবাদকারীর আত্মবিশ্বাস কিংবা কথা বলার পর্যাপ্ত অভ্যাস না থাকলে তা সন্দিগ্ধের কাছে দুর্বলতারূপে দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে পেশাদার ও ধূর্ত সন্দিগ্ধগণ অস্বীকৃতির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। রিড কৌশলের প্রথম স্তর তথা বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ স্তরের সাফল্য এখানে প্রতিফলিত হবে।

দ্বিতীয় ধাপ (থিম গঠন)
থিম হল এক প্রকারের স্বগোক্তি  বা এক তরফা ভাষণ যার মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদকারী অভিযুক্তের অপরাধকর্মের স্বপক্ষে নৈতিক ও মানসিক যুক্তি সরবরাহ করে। জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে সন্দিগ্ধের সাথে কোমল ও সহানুভূতিশীল আচরণ করে তার বিশ্বাস অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষে জিজ্ঞাসাবাদকারী নানা ধরনের থিম গঠন করেন। এসব থিমের মাধ্যমে আসামীর কৃত অপরাধের নৈতিক জঘন্যতা হ্রাস করে তাকে ঐ অপরাধটি সংগঠনের ক্ষেত্রে একটি নৈতিক অজুহাত প্রদানের চেষ্টা করা হয়। এতে সন্দিগ্ধ একটি মুখরক্ষার মতো কিছু যুক্তি বা সান্তনা খুঁজে পেতে পারে। এর মাধ্যমে সন্দিগ্ধ অপরাধের বাহ্যিক দায়-দায়িত্ব গ্রহণে রাজি হওয়ার সাথে সাথে এর অন্তর্নিহিত দায়দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে  নিতে প্রবৃত্ত হয়।

রিড কৌশলের প্রবক্তাগণ বলেন, এ ধরনের থিম গঠনের সাফল্য সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় আবেগপ্রবণ অপরাধীদের ক্ষেত্রে যারা জীবনে এই প্রথম অপরাধ কর্মে লিপ্ত হয়েছে। এ ধরনের অপরাধী ঘটনার পরে লজ্জা ও অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকে। তাই তাদের কাছে অপরাধ লঘুকরণ কিংবা নৈতিক যুক্তির কিছু থিম তুলে ধরতে পারলে তারা স্বীকারোক্তি প্রদানের দোরগোড়ায় উপস্থিত হন। থিমসমূহে প্রকৃত অপরাধীর অপরাধ সংগঠনের জন্য অজুহাত প্রদান করে।

তবে এ ধরনের থিম এমনভাবে ব্যবহার বা বর্ণনা করতে হবে যেন তা দোষ স্বীকারোক্তির সাক্ষ্যমূল্য নষ্ট না করে।  থিমের মধ্যে প্রলোভন, ভীতি বা প্রতিশ্রুতি দেয়া যাবেনা যাতে তা আদালতের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে অপারগ হয়।

অপরাধের প্রকৃতি, সন্দিগ্ধের ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি বিবেচনায় জিজ্ঞাসাবাদকারী প্রতিটি ক্ষেত্রেই পৃথক পৃথক থিম গঠন করবেন। একটি হত্যা মামলার অভিযুক্তের জন্য থিম একটি ধর্ষণ মামলার থিম থেকে পৃথক হবে। একইভাবে একজন পেশাদার অপরাধীর জন্য থিম একজন আবেগপ্রবণ অপরাধীর জন্য প্রযোজ্য থিম থেকে পৃথক হবে। তাই কোন পূর্বপ্রস্তুতকৃত থিম কাজ নাও দিতে পারে। এরপরও কিছু কিছু থিমের নমুনা নিম্নে তুলে ধরা হল।

আবেগ প্রবণ সন্ধিগ্ধের জন্য থিম
(১) একই ধরনের অবস্থা বা পরিবেশে পড়লে যে কেউ একই ভুল করতে পারে ।
এ ধরনের থিম অভিযুক্তের প্রতি জিজ্ঞাসাবাদকারীর সহানুভূতি প্রকাশিত হয়। এতে অপরাধের জঘন্যতা হ্রাস পায়। ফলে সন্দিগ্ধ দোষ স্বীকার করা সহজ মনে করে। অনেক সময় এ ধরনের থিম জিজ্ঞাসাবাদকারীর নিজস্ব নৈতিক স্তরও অতিক্রম করতে পারে। রিড তার প্রকাশিত পুস্তকে যৌন অপরাধীদের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত থিম প্রস্তাব করেছেন।  জিজ্ঞাসাবাদকারী বলতে পারেন, অনেক সম্মানিত ব্যক্তিও এমন ভুল করে থাকে। এমনকি জিজ্ঞাসাবাদকারী নিজেও কোনো এক সময় একই ধরণের যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিলেন কিংবা পড়ার উপক্রম হয়েছিলেন। এ ধরনের থিমে অভিযুক্ত তার অপরাধকে অত্যন্ত মানবিক কর্ম বলে মনে করে নিজের দোষকে লঘু ভাবার ফুসরত পায় এবং স্বীকারোক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

(২) নৈতিক জঘন্যতা কমিয়ে অপরাধীর অপরাধবোধ হ্রাস করা
এ ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদকারী অভিযুক্তকে বলতে পারেন, তিনিই কেবল একমাত্র ব্যক্তি নন ‍যিনি এই অপরাধ করেছেন। বরং তার চেয়েও উচ্চ মর্যাদার মানুষ এ ধরনের ভুল কর্মে লিপ্ত হয়। এমন কি তাদের ভুল বা অপরাধের তীব্রতা ও মাত্রা তার করা ভুলের চেয়েও অনেক বেশি মারাত্মক। এ ধরনের থিম অভিযুক্তের কৃতকর্ম সম্পর্কে বিব্রতবোধ বা অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণ করে। সাধারণত যৌন অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ থিম অধিক কার্যকর। তবে অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ কাঙ্খিত সুফল বয়ে আনতে পারে।

(৩) অপরাধ সংগঠনের স্বপক্ষে সন্দিগ্ধকে কিছু নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য যুক্তি তুলে দেয়া
এ ধরনের থিমে জিজ্ঞাসাবাদকারী তুলে  ধরবার চেষ্টা করেন যে অভিযুক্ত হয়তো কাজটি সুস্থ অবস্থায় করেননি। হতে পারে তিনি মাতাল ছিলেন। কিংবা তিনি ভিকটিমের কোন ক্ষতি করতে চাননি। যা ঘটেছে তা তার অনিচ্ছা কিংবা দুর্ঘটনা বসতই ঘটেছে। এতে অভিযুক্তের অপরাধের তীব্রতা কমে এবং তিনি পূর্ণ স্বীকারোক্তিদানে উৎসাহিত হন। এসবই তাকে একটি সম্মানজনক বা গ্রহণযোগ্য মান বাঁচানোর (Face Saving) অযুহাত দিয়ে থাকে।

(৪) সন্দিগ্ধের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধির মাধ্যমে অপরাধের দোষারোপ করে তাদের নিন্দা করা
অভিযুক্তের অপরাধের দায় দায়িত্বের কিয়দংশ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে অভিযুক্ত নিজেকে হালকা মনে করে। এ জন্য ভিকটিমকে দোষারোপ করা সহযোগীদের প্ররোচনা ইত্যাদি বিষয় সামনে আনা যেতে পারে। যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে নারী ও শিশু ভিকটিমকে দোষারোপ করা কার্যকর ভাল দিতে পারে।

(৫) সন্দিগ্ধের ব্যক্তিত্বের প্রশাংসা ও তার তোষামোদ করা
প্রশংসা ও তোষামোদে আমল দেয়া মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা। মানুষ সবসময় নিজের ব্যক্তিত্বকে উঁচুতে তুলতে পছন্দ করে। তার কোন কাজের সামাজিক স্বীকৃতি তাকে দুর্বল করে তোলে। অভিযুক্তের ব্যক্তিত্বের বিশেষ গুণাবলী তার জীবনের সাফল্য ইত্যাদি উল্লেখ করে তার অহমিকায় নাড়া দিলে তিনি অপরাধের দায় স্বীকারে প্রবৃত্ত হন। তার মতো ধর্মপ্রাণ মানুষ সামান্য ভুলটুকু স্বীকার করবেন না, এমনটি হতে পারে না। তার মতো বুদ্ধিমান মানুষ এটা কিছুতেই হতে দিতে পারেন না ইত্যাদি মন্তব্য তোষামোদপ্রবণ অভিযুক্তকে তার নিজ অপরাধ ও সহযোগীদের সর্ম্পকে সম্পূর্ণ তথ্য দিতে উৎসাহিত করে। অশিক্ষিত/অল্প শিক্ষিত অভিযুক্ত যারা অন্যদের অনুমোদনকে বেশি গুরুত্ব দেন তাদের বিরুদ্ধে এ কৌশল বেশি কার্যকর।

(৬) সন্দিগ্ধের অপরাধকে অহেতুক ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করা হয়েছে বা অতিসায়িত করেছে বলে  জাহির করা
অভিযুক্তের অপরাধকে বড় করে দেখানো হয়েছে। যা ঘটেছে  সেটা ততো বেশি জঘন্য নয়। তার অপরাধকে অযথাই বড় করে দেখানো হয়েছে। তাই তিনি সহজেই এই সামান্য সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে ভার মুক্ত হতে পারেন।

(৭) সন্দিগ্ধকে বোঝানো হয় তার নিজের মঙ্গলের জন্যই এ অপরাধ কর্ম অব্যহত রাখা সমীচীন নয়

অপরাধে জড়িত হওয়া এবং তা অব্যহত রাখা কোন মানুষের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। অভিযুক্ত যা করেছেন তা কেবল ক্ষণিকের ভুল মাত্র। তিনি কোনক্রমেই খারাপ লোক নন। খারাপ কাজে আত্মনিয়োগ করা মানুষের কাম্য হতে পারে না। তাই এখন পর্যন্ত যা হয়েছে তা স্বীকার করে সুস্থ  জীবন বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া উচিত। তার দোষ স্বীকারোক্তি ভবিষ্যত জীবনের মঙ্গলের জন্যই। সাধারণত তরুণ বয়সের প্রথমবার অপরাধীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের থিম বেশি কার্যকর।

আবেগহীন বা পেশাদার অপরাধীর জন্য থিম

(১) ঘটনাচক্রে উল্লেখ করা অভিযুক্তের মিথ্যাকে ধরে ফেলুন

জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্তগণ বিভিন্নভাবে মিথ্যা বলতে পারে বা তথ্য গোপন করতে পারে। কিন্তু তারা যে মিথ্যা বলছেন, সেটা জিজ্ঞাসাবাদকারী ধরতে পারেন না বলেই অভিযুক্ত বিশ্বাস করে। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদকারীর হাতে থাকা ইতোমধ্যেই সংগৃহীত তথ্য থেকে তিনি বুঝতে পারেবেন যে সন্দিগ্ধ মিথ্যা বলছে। পেশাদার অপরাধীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের মিথ্যা শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদকারী তাকে এক প্রকার তথ্যের ফাঁদে ফেলতে পারেন। জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালে এ ধরনের মিথ্যা অত্যন্ত তুচ্ছ হতে পারে। কিন্তু এ মিথ্যার ফাঁদে পড়লে অভিযুক্ত মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। এ সময় তিনি বলতে থাকবেন যে তিনি হয়তো ঐটাই মিথ্যা বলেছিলেন কিন্তু এখন যা বলছেন তা সত্য। তবে অনেক সময় নির্দোষ অভিযুক্তরাও নানা কারণে মিথ্যা বলতে পারেন। তাই জিজ্ঞাসাবাদকারীকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

(২) সন্দিগ্ধকে কোন না কোনভাবে অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত বলে ধরে ফেলুন
এ থিমটি অন্যান্য থিমের অংশ হিসেবে কিংবা পৃথকভাবেও ব্যবহার করা যায়। জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতেই এই থিম ব্যবহার করা উচিত যে সময় অভিযুক্ত তার সম্পৃক্ততার পরিপূর্ণ গুরুত্ব উপলব্দি করতে অপারগ হয়। উদাহরণ স্বরূপ অভিযুক্ত হয়তো স্বীকার করবেন না যে তিনি অপরাধের সাথে সরাসরি জড়িত বা অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু তিনি এটা সহজেই স্বীকার করতে পারেন যে, তিনি কোন না কোন ভাবে অপরাধ স্থলের কাছাকাছি ছিলেন কিংবা বিষয়টি জানতেন। একবার এ ধরনের স্বীকারোক্তি দিলে পরবর্তীতে তাকে মূল ঘটনায় প্রবেশ করান সহজ হবে।

(৩) ঘটনার পিছনে সন্দিগ্ধের খারাপ  উদ্দেশ্য ছিল না
অপরাধ কর্মটি নিতান্তই দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে কিংবা অভিযুক্ত স্রেফ আত্মরক্ষার জন্য কাজটি করেছে, এ ধরনের থিমের মাধ্যমে অভিযুক্তকে ঘটনার সাথে তার শারীরিক বা সম্পর্ক উপস্থিতি স্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এতে অভিযুক্ত ঘটনার ভয়াবহতাকে হালকা করে দেখে নিজের সম্পৃক্ততাকে গৌণ বলে ভাবে এবং স্বীকারোক্তি দিতে উদ্বুদ্ধ হন। দুর্ঘটনা কিংবা আত্মরক্ষা হিসেবে বিবেচনায় আসামী তার অপরাধবোধকে পরিহার করার সুযোগ পায়। এ ধরনের থিমে নির্দোষ ব্যক্তিরাও স্বীকারোক্তি দিতে উৎসাহিত হতে পারে।

(৪)  অপরাধের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করার চেষ্টা নিষ্ফল
জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে  কার্যকর থিম হল অভিযুক্তের কাছে তার কৃত অপরাধের সকল তথ্য প্রমাণ হাজির করা। এতে অভিযুক্ত তার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু সমস্যা হল, যখন অপরাধের আদ্যপান্ত জিজ্ঞাসাবাদকারীর কাছে অজানা থাকে। সাধারণত তদন্ত শুরুর দিকে অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তদন্তকারীগণ এ সমস্যায় পড়েন। কিন্তু তারপরও তদন্তকারীকে ভান করতে হবে যে, তিনি আলোচিত অপরাধ এবং সেখানে অভিযুক্তের জড়িত থাকার সকল সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ  করেছেন। অভিযুক্ত স্বীকার করুক বা নাই করুক এতে তার তদন্তের কোন ক্ষতি হবে না। তার স্বীকারোক্তি ছাড়াই তাকে দণ্ডিত করা যাবে। তাই অস্বীকার করাতে তার কোন লাভ নেই জিজ্ঞাসাবাদকারীর বা তদন্তেরও কোন ক্ষতি নেই। বরং ঘটনার সম্পর্কে তার নিজের ব্যাখ্যা তাকে সুবিধা দিতে পারে যা কেবল স্বীকারোক্তির মাধ্যমেই সম্ভব।

(৫) দুষ্কর্মের সহযোগীদের পরষ্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করুন
তদন্তকারীদের জন্য এ পদ্ধতি নতুন কিছু নয়। ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের শুরু থেকেই পুলিশ এক অপরাধীকে অন্য জনের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিয়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে এবং শেষ পর্যন্ত উভয় অপরাধীর বিরুদ্ধেই অপরাধ প্রমাণে সক্ষম হয়। সাধারণত একজন অপরাধী সবসময় সন্দেহ বা অবিশ্বাসের মধ্যে থাকেন যে হয়তো তিনি না বললেও অন্য সহযোগীরা ঘটনা ফাঁস করে দিবে। তাই যখন জিজ্ঞাসাবাদকারী এমন তথ্য দিবেন যে অভিযুক্তের  অন্য সহযোগীরা ইতোমধ্যেই দোষ স্বীকারোক্তি দিয়ে ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ত তার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই ঘটনা সম্পর্কে তার নিজের বক্তব্য তাকে সুবিধা দিতে পারে। এজন্য তার স্বীকারোক্তি দেয়া তার জন্যই মঙ্গলজনক।

তবে এ থিমে নির্দোষ অভিযুক্তগণ মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে পারে। অনেক থানায় দেখা গেছে পুলিশের অসত্য তথ্যে বিভ্রান্ত হয়ে অনেক নিরীহ মানুষ দোষ স্বীকার করে এবং যাদে অনেক নির্দোষ মানুষকেও জড়িত করা হয়। অপরাধ তদন্তের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইউরোপ/আমেরিকায় এ ধরনের স্বীকারোক্তি ইতোপূর্বে যথেষ্ট বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

তৃতীয় ধাপ (অস্বীকৃতি প্রতিরোধ)
এটা অনস্বীকার্য যে অধিকাংশ অভিযুক্তই দোষ স্বীকারে  অনীহা প্রকাশ করে। কিছু ব্যতীক্রম ছাড়া প্রায় সকল অপরাধীই নিজেকে নির্দোষ দাবী করে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। তাই জিজ্ঞাসাবাদকারীকে অস্বীকৃতি প্রতিরোধের উপায়সমূহ আয়ত্ব করতে হবে। কোন অভিযুক্ত যদি একবার না বলে তবে তাকে হ্যাঁ বলানো কঠিন হয়ে পড়ে। যত বেশি না বলবে বা অস্বীকৃতির হার যত বেশি বেড়ে যাবে দোষ স্বীকারোক্তি আদায়ের সম্ভাবনা ততো বেশি কমে যাবে। তাই যে কোন প্রকারেই হোক অভিযুক্তকে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনে নিবৃত্ত করতে হবে। অভিযুক্ত যতবারই না, না বলবে কিংবা তার জড়িত থাকার পিছনে যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করবে জিজ্ঞাসাবাদকারীকে ততোবারই তাকে থামিয়ে দিতে হবে। তাকে বলতে হবে, আমি আপনার কথা পরে  ‍শুনব। আপনি পরে সব বলবেন। কিন্তু এখন আমার কথা শুনুন

দোষী এবং নির্দোষ ব্যক্তির অস্বীকৃতির মধ্যে দৃশ্যমান পার্থক্য রয়েছে।  এসব পার্থক্য ব্যক্ত ও অব্যক্ত উভয় ভাষার মাধ্যমেই প্রকট হয়ে ওঠে। উদাহরণ স্বরূপ নির্দোষ ব্যক্তির অস্বীকৃতি হবে স্বতস্ফূর্ত,  শক্তিশালী ও প্রত্যক্ষ। অপর পক্ষে দোষী ব্যক্তির অস্বীকৃতি হবে প্রতিরোধ মূলক (Defensive), অপেক্ষাকৃত বেশি যুক্তি প্রদর্শনমূলক এবং উপস্থাপনে ইতস্ততা থাকবে। নির্দোষ ব্যক্তি জিজ্ঞাসাবাদকারী চোখের দিকে সরাসরি তাকাবে; চেয়ারে বসা অবস্থায় সামনের দিকে অবনত থাকবে। তারা শক্তভাবে বসে থাকবেন না। অস্বীকৃতি প্রতিরোধের সময় অভিযুক্তের সাথে বিভিন্ন কৌশলে ব্যবহার করা যেতে পারে। সেটা হতে বন্ধু-শত্রু (Friendly-Unfriendly) কৌশল। এ কৌশলকে অনেকে ‘মাট অ্যান্ড জেফ’ (Mutt and Jeff) কিংবা ‘ভাল পুলিশ-মন্দ পুলিশ’ কৌশলও বলে থাকেন। একাধিক জিজ্ঞাসাবাদকারী থাকলে একজন অবন্ধুসুলভ আচরণ করলে কিংবা সন্দিগ্ধের কাছ থেকে বেশি মাত্রায় অস্বীকৃতির সম্মুখীন হলে অন্যজন এসে জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং সন্দিগ্ধের সাথে কোমল আচরণ করবেন।  অনেক সময় একই জিজ্ঞাসাবাদকারী বন্ধু-অবন্ধু উভয় ভূমিকাই পালন করতে পারে।

এ ধরনের কৌশলের ফলে অভিযুক্ত তার অস্বীকৃতির অবস্থান থেকে সরে এসে বন্ধুসুলভ জিজ্ঞাসাবাদকারীর কাছে সব কিছু খুলে বলতে পারে। অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বের অধিকারী অনড় স্বভাব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একৌশল বেশি কাজ দিতে পারে।

চতুর্থ ধাপ(অযুহাত উত্তরণ)
এ পর্যায়ে অভিযুক্তের কৈফিয়ত বা অযুহাত মোকাবেলার জন্য জিজ্ঞাসাবাদকারীকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অভিযুক্ত ঘটনার বিষয়ে তার নির্দোষতা প্রমাণের জন্য নানা ধরনের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে পারেন। এক্ষেত্রে নির্দোষ ও দোষী অভিযুক্তের অযুহাত প্রদর্শনের মধ্যে ব্যক্ত ও অব্যক্ত পার্থক্য নির্ণয় করা উচিৎ। নির্দোষ অভিযুক্তের অযুহাত হবে সাদামাটা ও সরাসরি অস্বীকৃতি। তিনি কাজটি করেননি কিংবা এর সাথে জড়িত নন- এমন ধরনের সাধারণ দাবী হবে। কিন্তু দোষী অভিযুক্তরা সাধারণ মানে অস্বীকৃতি থেকে শুরু করে সক্রিয় অযুহাত প্রদর্শন করে জিজ্ঞাসাবাদকে তার নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করবে। দোষী অভিযুক্তের অস্বীকৃতি যখন যুক্তি বা তথ্যের ভিত্তিতে নাকচ হবে তখন তার অস্বীকৃতির তীব্রতাও কমে আসবে। যখন তিনি বুঝতে পারবেন যে তার প্রতিরোধ কেন কাজ দিচ্ছে না, তখন তিনি শান্তভাব প্রদর্শন করবে এবং জিজ্ঞাসাবাদে তার স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থেমে যাবে। এ সময় তার মানসিক শক্তি থাকবে অত্যন্ত নিম্নস্তরে। জিজ্ঞাসাবাদকারীকে ঠিক এ মুহূর্তটির সদ্ব্যবহার করে সন্দিগ্ধতে পূর্ণ স্বীকারোক্তির জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

পঞ্চম ধাপ( সন্দিগ্ধের মনোযোগ আকর্ষণ)
নিরাসক্ত ভাব দেখার সাথে সাথেই অভিযুক্তের সাথে জিজ্ঞাসাবাদকারীর মানসিক দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য তৎপর হতে হবে। অভিযুক্তের পূর্ণ মনোযোগ আকর্ষণের জন্য এ পর্যায়ে উভয়ের মধ্যে বাহ্যিক দূরত্ব কমিয়ে আনা যেতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদকারী তার আসনটি অভিযুক্তের অতি কাছাকাছি নিয়ে আসবেন তার দিকে ঝুঁকে পড়বেন এবং  এক পর্যায়ে তাকে মৃদুভাবে স্পর্শ করবেন, তার ঘাড়ে কিংবা পিঠে হাত দিয়ে শান্তনার ভাব প্রদর্শন করবেন। এ পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদকারী অভিযুক্তের ডাক নাম ধরে সম্বোধন করবেন এবং তার চোখে চোখ রেখে কথা বলার চেষ্টা করবেন। এ অবস্থায় সন্দিগ্ধ সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়ে পুরো অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। তিনি তখন জিজ্ঞাসাবাদকারীর পরামর্শের প্রতি মনোযোগী হবেন যা তাকে পূর্ণ স্বীকারোক্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করবে।

ষষ্ট ধাপ(অভিযুক্তের নিরাসক্ত ভাব মোকাবেলা করা)
এ ধাপটি পূর্ববর্তী তথা পঞ্চম ধাপের অনুক্রম। যখন অভিযুক্ত জিজ্ঞাসাবাদকারীর প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং নতি স্বীকারের ভাব প্রদর্শন করে জিজ্ঞাসাবাদকারী তখন অভিযুক্তের মনকে অপরাধের কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী কারণটির প্রতি নিবন্ধ করার চেষ্টা করেন। এ পর্যায়ে তিনি অভিযুক্তের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি প্রকাশ করবেন, তার সাথে সমব্যথী হবেন এবং তাকে সত্য প্রকাশের জন্য উদ্বুদ্ধ করবেন। এ পর্যায়ে অভিযুক্তকে আরো বেশি অনুশোচনার দিকে ধাবিত করতে হবে। এজন্য সন্দিগ্ধের সম্মানবোধ কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত করতে হতে পারে। এ পর্যায়ে সন্দিগ্ধের মনে এখনও যেটুকু প্রতিরোধ শক্তি আছে তাও  দূর করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। তাই তার সকল প্রকার দুর্বলতার দিকে নজর দিতে হবে। প্রতিরোধের সব শক্তি নিঃশেষ হলে সন্দিগ্ধ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না শুরু করতে পারে। কান্না হল অভিযুক্তের সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ার বহিঃপ্রকাশ এবং সম্পূর্ণ স্বীকারোক্তি দিতে সম্মত হওয়ার পূর্বাভাষ। সন্দিগ্ধের ভাবলেশহীন চাহনি এবং পূর্ণ নিরবতা আভাষ দেয় যে তিনি পরবর্তী ধাপ তথা বিকল্প প্রশ্নমালার মুখোমুখী হতে প্রস্তুত হয়েছেন।

সপ্তম ধাপ (বিকল্প প্রশ্ন)
বিকল্প প্রশ্ন হল দুই অংশ বিশিষ্ট এমন কিছু প্রশ্ন যা অভিযুক্তকে উত্তরদানের জন্য দুইটি পছন্দ দিয়ে থাকে যার একটি হাঁ-বোধক অন্যটি না-বোধক । উত্তরদানের জন্য অভিযুক্ত যে অপশনটিই বেছে নিক না কেন তা অপরাধ স্বীকার করার নামান্তর হবে।  দুইটি বিকল্প উত্তরের মধ্যে অভিযুক্ত তার সম্মান বাঁচানোর জন্য উপযুক্ত একটি উত্তর বেছে নিবেন। রিড কৌশলের নয়টি ধাপের মধ্যে বিকল্প প্রশ্নমালার ধাপটিই সবচেয়ে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধাপ অনেকটাই জবদস্তিমূলক। কারণ দুটো উত্তরের মধ্যে তাকে যে কোন একটি বেছে নিতে কেবল উৎসাহিতই নয়, মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হয়। এ ধাপের একটি বিপজ্জনক দিক হল যে স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তার নিম্নে অবস্থানকারী সন্দিগ্ধরা এক্ষেত্রে মিথ্যা স্বীকারোক্তি করতে পারে। কারণ, যখন দুটো অপশনের কোনটিই অস্বীকৃতির পর্যায়ে থাকে না এবং সন্দিগ্ধকে অবশ্যই একটি বেছে নিতে হয়, তখন নিম্ন মেধার সন্দিগ্ধগণ নির্দোষ হলেও উত্তরে বিরত থাকতে পারেন না এবং স্বীকারোক্তি দিয়ে বসেন। তাই জিজ্ঞাসাবাদকারীকে এ পর্যায়ে নির্দোষ ও দোষী সন্দিগ্ধের মৌখিক ও দেহভঙ্গিমার যথাযথ ব্যাখ্যা বুঝতে হবে। অন্যথায় একটি স্বীকারোক্তি আদায় হবে বটে, কিন্তু  বিচারের প্রহসন ঘটে যেতে পারে।

বিকল্প প্রশ্নমালার মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হল, কোন ব্যক্তিকে কোন বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সামান্য দূর পর্যন্ত অগ্রসর করা গেলে তার পক্ষে স্বীকৃতির কাজটি সহজতর হয়। বিকল্প প্রশ্নমালা হল সাধারণ স্বীকৃতিমূলক কাজ। এটা দোষী ব্যক্তিকে সত্য বলার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।

তবে বিকল্প প্রশ্ন ব্যবহারের কালিক উপযোগীতা নির্ণয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিজ্ঞাসাবাদকারীকে সন্দিগ্ধের ব্যক্ত ও অব্যক্ত আচরণ তথা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ লক্ষ করে নিশ্চিত হতে হবে যে সন্দিগ্ধের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙ্গে পড়েছে। তিনি এখন বিকল্প প্রশ্নমালার মুখোমুখী হতে প্রস্তুত। সঠিক সময়ে উপস্থাপন করতে পারলে শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই বিকল্প প্রশ্ন মালা দোষ স্বীকারের সুচনা করবে। বাকি শতকরা ২০ ভাগ সন্দিগ্ধ, যারা দোষ স্বীকার করবে না তাদের মধ্যে কিছু অংশ থাকবে সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং বাকীরা পেশাদার অপরাধী যারা জিজ্ঞাসাবাদের বিরুদ্ধে মানসিক ঢাল তৈরি করে নিয়েছেন।

বিকল্প প্রশ্নমালার কিছু উদাহরণ নিম্নরূপ।

(ক) অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেফতার ব্যক্তির কাছে প্রশ্ন হতে পারে, আপনি কি এ প্রথম ক্যাশ থেকে টাকা সরিয়েছিলেন, না পূর্বেও দু একবার সরিয়েছিলেন?

(খ) আচ্ছা, গ্রহণকৃত টাকার সবটাই কি আপনি জুয়ায় ঢেলেছিলেন, না কিছুটার সদ্বধ্যবহারও করেছিলেন?

হত্যার অপরাধে গ্রেফতার ব্যক্তির কাছে বিকল্প প্রশ্ন হতে পারে-  আপনি কি নিজেই গুলিটা ছুড়েছিলেন, না আপনার সহকর্মীদের মধ্যে কেউ করেছিল?

স্ত্রী হত্যার দায়ে গ্রেফতার ব্যক্তির কাছে প্রশ্ন হতে পরে, আচ্ছা, আপনি কি এ প্রথমবার আপনার স্ত্রীকে আঘাত করেছিলেন, না ইতোপূর্বেও এমনিটি ঘটেছিল?

অষ্টম ধাপ(অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ)
পূর্ববর্তী ধাপের বিকল্প প্রশ্নমালার উত্তরে সন্দিগ্ধ অপরাধের কিয়দংশ স্বীকার করলে তিনি স্বীকারোক্তিদানে প্রস্তুত বলে ধরে নেয়া হবে। এ পর্বে সন্দিগ্ধ কর্তৃক সংঘটিত অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করা হয়। এখানে তিনি জিজ্ঞাসাবাদকারীর সাথে মন খুলে কথা বলবেন। পূর্ববর্তী ধাপে যার সূচনা হয়েছে এ পর্বে তার পূর্ণ প্রকাশ ঘটবে। ব্যক্তির মনোবৈজ্ঞানিক গঠন এমনই যে তিনি একবার কোন ব্যক্তির কাছে তার লুকানো ভাব বা বেদনা প্রকাশ করা শুরু করলে তার সবটুকু প্রকাশ না করে থাকতে পারেন না। এ পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদকারী কেবল তাকে প্রত্যাশিত দিকে নিয়ে যাবেন। সামান্য কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে বা অধিকতর ব্যাখ্যার জন্য তিনি কিছু মন্তব্য করতে পারেন যাতে জবানবন্দীতে আইনের সকল শর্ত পূরণ হয়।

এখন পর্যন্ত সাধারণভাবে একজন তদন্তকারীই জিজ্ঞাসাবাদে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু এ পর্যায়ে একাধিক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করতে পারে। ইউরোপ আমেরিকায় স্বীকারোক্তিকারী তার অনুলিখিত জবাবনবন্দীতে সই করতে না চাইলে দ্বিতীয় জিজ্ঞাসাবাদকারী তার সাক্ষী হতে পারে। বাংলাদেশের পেক্ষাপটে দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রথম ব্যক্তিকে জবানবন্দী লিখতে ও তা আইনের খুঁটিনাটি অন্তর্ভুক্ত করতে সহায়তা করতে পারেন।

নবম ধাপ( স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করা)
পূর্ববর্তী আটটি ধাপে সন্দিগ্ধের কাছ থেকে পুরো সত্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। নবম ধাপে কেবল সেই স্বীকারোক্তিকে আদালতে গ্রহণযোগ্য করা কিংবা তার সাক্ষ্যমূল্য বৃদ্ধির  চেষ্টা করা হবে। ইউরোপ-আমেরিকায় পুলিশের কাছে দেয়া আসামীর জবানবন্দী আদালতের বিচারকাজে গ্রহণযোগ্য। যদি আসামী এতে স্বাক্ষর করেন, তা দোষ-স্বীকারোক্তি বা কনফেশন রূপে পরিগণিত হয়। যদি আসামী তা সই না করেন, তা হবে কেবল সাধারণ স্বীকৃতি। মাত্রাগত ভিন্নতাসহ উভয় বিবৃতিই আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে।

কিন্তু বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় পুলিশের কাছে দেয়া আসামীর স্বীকারোক্তি কোন ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়।   আসামীর স্বীকারোক্তি আদালতের মাধ্যমে রেকর্ড না করা পর্যন্ত, কেবল ঘটনা উদ্ঘাটনে সহায়তা ভিন্ন এর কোন সাক্ষ্যমূল্য নেই। তাই পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দীকে পুনরায় ম্যাজিস্ট্রেট তথা আদালতের সামনে বিবৃত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। আদালত তা নিজ কানে শুনে নিজ হাতে লিখে আসামীর দস্তখত নিবেন। এ জন্য আসামীকে অতি দ্রুত আদালতে উঠাতে হবে।

রিড কৌশলের সর্বশেষ ধাপ কার্যকর করা বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ। জিজ্ঞাসাবাদের অষ্টম ধাপে আসামী পূর্ণ তথ্য দিতে রাজি হলে তা কেবল লিখে রাখা যায়। এতে অপরাধের অন্যান্য দিক উদ্ঘাটিত হবে। অপরাধের অন্যান্য সহযোগীদের শনাক্ত করা, আলামত উদ্ধার করা সহজ হবে। কিন্তু পুলিশের কাছে পূর্ণ স্বীকারোক্তি দেয়ার পর সেই স্বীকারোক্তি দেয়ার পর সেই স্বীকারোক্তি পুনরায় আদালতে দেয়ার মধ্যবর্তী সময়ে আসামীর মনোভাবে যথেষ্ঠ পরিবর্তন আসে।

দোষ স্বীকারের পূর্বে আসামীকে তার আইনগত অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা, স্বীকারোক্তির পরিণাম সম্পর্কে বুঝানোর রীতি সব দেশের বিচার ব্যবস্থাতেই বিদ্যমান। কিন্তু পাশ্চাত্য জগতে এ সতর্কীকরণ সম্পন্ন হয়, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর প্রথমেই এবং তা পুলিশের মাধ্যমেই। এতে সন্দিগ্ধ তার সকল অধিকার সম্পর্কে অবগত হয়ে ও পরিণাম জেনেই পুলিশের কাছে মুখ খোলেন। কিন্তু বাংলাদেশে এ কাজটি করা হয় সন্দিগ্ধ পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হওয়ার পর তাকে যখন আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

এমতাবস্থায়, তার আইনি সুরক্ষা ও পরিণাম জানার পর  আসামী স্বীকারোক্তি দেয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার চিন্তা করে। এর ফলে অনেক আসামী পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিলেও আদালতের কাছে তা দিতে অস্বীকার করে কিংবা তার মনের মতো করে আদালতে দোষ স্বীকার করে যেখানে হয় তিনি নিজেকে বাঁচার চেষ্টা করেন, সত্য গোপন করেন অথবা অপ্রাসঙ্গিকভাবে আসল ব্যক্তিকে ছেড়ে অন্যদের জড়িত করার চেষ্টা করেন।

জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অনুশীলন শুরু হয় মার্কিন যুক্তরাষ্টে গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে। জন রিডই এ অনুশীলনের সূচনাকারী। ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি জন রিড প্রতিষ্ঠিত রিড ইন্সটিটিউট সারা বিশ্বে তার জিজ্ঞাসাবাদ মডেল নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। রিড অনুসারীদের দাবী মতে এতে তাদের সাফল্যের হার শতকরা ৮০ ভাগ। তারা দাবী করেন এ ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য গির্জার পাদ্রিদের চেয়েও বেশি। কারণ গির্জার ফাদারের কাছে অপরাধী স্বেচ্ছায় গিয়ে স্বীকারোক্তি দেয়। কিন্তু পুলিশের কাছে কেউ স্বেচ্ছায় জবানবন্দী দিতে যায় না। গির্জার ফাদারের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে যে অপরাধের কথা স্বীকার করা হয় তার কোন আইনি পরিণাম নেই। তা ভিকটিম, ফাদার ও অপরাধী ভিন্ন অন্য কেউ জানে না। কিন্তু পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দী কেবল জনসমুখে চাউরই হয়না, পরিণামে স্বীকারোক্তিদাতার জেল-জরিমানা এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হয়।

পূর্বেই বলেছি জিজ্ঞাসাবাদের উপর বিদ্যায়তনিক আলোচনা, গবেষণা ও পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পাঠদান অতি সাম্প্রতিক ঘটনা। ১৯৮৪ সালের পূর্বে খোদ লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদের উপর কোন নিবেদিত প্রশিক্ষণ কোর্স ছিল না। তবে ব্রিটিশ পুলিশের জন্য বর্তমানে তিন পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রশিক্ষণ চালু আছে।

বাংলাদেশের পুলিশ অফিসারদের জন্য জাতীয়ভাবে এখনও জিজ্ঞাসাবাদের উপর কোনো নিবেদিত প্রশিক্ষণ কোর্স বা মডিউল নেই। কয়েকটি ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিচ্ছিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদের উপর কয়েক ঘন্টার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে । কিন্তু এজন্য নির্দিষ্ট কোন প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল নেই। প্রশিক্ষকগণ তাদের নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের উপর ভর করে প্রশিক্ষণার্থীদের সামনে লেকচার দিয়ে থাকেন।

অধিকন্তু জিজ্ঞাসাবাদের উপর বাংলায় এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশ হয়নি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রেনিং একাডেমিতে এ বিষয়ের উপর লেকচার দিতে গিয়ে আমি প্রশিক্ষণার্থীদের জিজ্ঞাস করলে এখন পর্যন্ত কোন তদন্তকারী রিড কৌশলের নামটি পর্যন্ত শোনেননি বলে আমাকে জানিয়েছেন। এমনকি সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের মধ্যেও রিড কৌশল সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা নেই। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে রিড কৌশলের অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করি। 

 

তথ্যসূত্র:

(১) Criminal Interrogation And Confessions,Fred E. Inbau , John E. Reid , Joseph P. Buckley (2011),5th,Jones & Bartlett Learning

(২) Practical Aspects of Interview and Interrogation by  David E. Zulawski and Douglas E. Wicklander, (2002), 2nd edition,  CRC Press

(৩) Fundamentals of Police investigation, Charles E. O’Hara, (1956),1st Edition,Thomas Books

(৪) The Psychology of Interrogations and Confessions: A Handbook ,Gisli H. Gudjonsson ,(2003),Wiley

(৫) Investigative Interviewing Rights, Research, Regulations,(2006), Tom Williamson, Willan Publishing