ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন আলিম পরীক্ষার দিন সকালে পরীক্ষা শুরুর পূর্বেই নুসরাত জাহান রাফিকে কৌশলে পরীক্ষা কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী একটি নির্জন ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় অপরাধীরা। আগুনে  হাত-পায়ের বাঁধন পুড়ে সে মুক্ত হলে অগ্নিদগ্ধ শরীর নিয়ে বাঁচার জন্য দৌড় দিয়ে ভবনের নিচে নেমে আসে নুসরাত। মাদ্রাসার কর্মচারী ও পুলিশ সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। অগ্নিদগ্ধ রাফি সারা দেশের সচেতন মানুষের ভালোবাসা আর প্রার্থনায় জায়গা করে নেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত  বাঁচতে পারেনি সে।

নুসরাতের হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চলে। স্থানীয় প্রশাসন জেনে-বুঝে হোক, আর না বুঝে হোক, প্রথম দিকে তাদের কর্মচ্যূতির (Omission) মাধ্যমে অপরাধীদের প্রতিই সহানুভূতি দেখাতে থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের স্থান হয় জেল হাজতে।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পরিচালিত অভিযানে সকল আসামী ধরা পড়েছে, উদঘাটিত হয়েছে ঘটনার আদ্যপান্ত। আশা করা যায় অপরাধীদের উচিৎ সাজা হবে।

নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার অপরাধটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর বা জঘন্য অপরাধ  (Serious Crime)। নুসরাতের বিরুদ্ধে যে অপরাধ করা হয়েছে তার প্রেক্ষিতে ঐ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ-উদ-দৌলার নামে দুই সময়ে দুইটি মামলা হয়েছে । নুসরাতকে পুড়িয়ে  হত্যার জন্য একটি হত্যা মামলা আর  যৌন হযরানি করার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ চেষ্টার মামলা।

হত্যা ও যৌন হয়রানি- এ দুটো অপরাধের মধ্যে কোন অপরাধটি জঘন্যতর বা অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুতর? অনেকেই বলবেন, পুড়িয়ে হত্যা করাটাই হলো সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ; আর যৌন হয়রানি বা উত্ত্যক্ত বা ইভটিজিং করা বা পাশ্চাত্যের স্টকিং হল অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর। 

এই অংশে ভিন্ন একটি অপরাধ ঘটনার উল্লেখ করব। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জয়পুর হাটের ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা চুরি হয়। চুরির ঘটনাটি ফলাও করে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে তোলপাড় চলে সারা দেশে। পুলিশ অতি দ্রুত আসামীদের গ্রেফতার করে সে টাকা আবার উদ্ধারও করে।

প্রায় একই সময় নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ থানার রহমতপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক বসির উদ্দিনের ১৮ হাজার টাকা দামের একটি হালের গরু চুরি যায়। গরু চুরির ঘটনায় দিশেহারা পড়েন কৃষক বসির উদ্দীন। তিনি নাওয়া-খাওয়া ভুলে গরু উদ্ধারের চেষ্টা করেন। থানায় গিয়ে মামলা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু  থানাও মামলা নেয়নি, গরুও উদ্ধার হয়নি।

বসির উদ্দিনের ১৮ হাজার টাকা দামের একটি হালের গরু চুরি আর ব্র্যাক ব্যাংকের ভল্ট থেকে দুই কোটি টাকা চুরির মধ্যে কোন অপরাধটি বেশি জঘন্য?

অনেকেই বলবেন, কোথায় ১৮ হাজার টাকার একটা হালের গরু আর কোথায় ব্যাংকের ভল্টের দুই কোটি টাকা চুরি । ব্যাংক ডাকাতি যে গুরুতর অপরাধ বা Serious Crime  সে বিষয়ে কে সন্দেহ করবে?

আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় খুন, জখম , ডাকাতি কিংবা ব্যাংকের ভল্ট ভেঙ্গে কোটি টাকা চুরি অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুতর। এ ধরনের অপরাধকে আমজনতা থেকে শুরু করে থানা পুলিশ হয়ে আদালত  পর্যন্ত Serious offence বলে বিশ্বাস করেন। কোনো স্কুল ছাত্রীর যৌন হয়রানি, কোনো প্রান্তিক কৃষকের হালের গরু চুরি, কলেজ শিক্ষার্থীর মেস থেকে ২০ হাজার টাকা দামের একটি মোবাইল সেট চুরি কিংবা রাস্তাঘাটে বখাটেদের পথচারীদের ভয়ভীতি দেখানোকে আমরা আমলেই নিতে চাই না।

থানা পুলিশের খাতায় ডাকাতি হলো সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ। একই থানা এলাকায় পর পর কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটলে ডাকাতি প্রতিরোধের ব্যর্থতার জন্য থানার অফিসার-ইন-চার্জের চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে; জেলার এসপি সাহেবের নেতি-পাতি সাংবাদিক থেকে শুরু করে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স পর্যন্ত জবাব দিতে দিতে জান যাবার মতো অবস্থা হয়। কিন্তু একই থানা এলাকার রাস্তাঘাটে বখাটেদের উৎপাত বেড়ে গেলে, রাস্তার ফুটপাত থেকে শুরু করে টেন্ডারের জন্য চাঁদাবাজির মতো ঘটনা পত্রিকার শিরোনাম হলেও পুলিশ কর্তাদের বোধোদয় হয় না। থানার অফিসার-ইন-চার্জকে তেমন উদ্বিগ্ন বলেও মনে হয় না।

তবে বিষয়টি যে কেবল বাংলাদেশেই হতাশাজনক, তা কিন্তু নয়। খোদ ইউরোপ আমেরিকাতেও গুরুতর অপরাধ বলতে মানুষ খুন, জখম, বোমা বিষ্ফোরণ কিংবা ডাকাতি, রাহাজানিকেই বোঝে।

১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি জরিপে জঘন্য অপরাধ নিয়ে নাগরিকদের মতামত যাচাই করা হয়। ২০৪টি অপরাধের মধ্য থেকে তাদের সবচেয়ে গুরুতর ও সবচেয়ে সাধারণ অপরাধের মধ্য থেকে তাদের সবচেয়ে গুরুতর ও সবচেয়ে সাধারণ অপরাধের ক্রম করতে বলা হয়।

এই জরিপে সর্বোচ্চ ৭২  দশমিক ১ শতাংশ মানুষের মতে আমেরিকার সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হলো কোনো পাবলিক ভবনে বোমা রেখে বিষ্ফোরণ ঘটানো, যেখানে কমপক্ষে ২০ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

শতকরা ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ নাগরিকের মতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জঘন্য অপরাধ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল, কোনো নারীকে ধর্ষণ পূর্বক হত্যার অপরাধ।

আমেরিকার জনগণের মতে তৃতীয় জঘন্যতম অপরাধ ছিল, পিতামাতার দ্বারা  ‍ঘুষি মেরে সন্তানকে হত্যা করা;  ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ আমেরিকান তাই জানান জরিপে।

অপরাধ কতটা জঘন্য তার উপর মতামত যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশে কোনো জরিপ হয়েছিল বলে আমার জানা নেই। যদি এমন কোনো জরিপ চালানো হয় তার ফলাফল যে যুক্তরাষ্ট্রের জরিপের অনুরূপই হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কিন্তু অপরাধের জঘন্যতা সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা দিচ্ছেন অনেক অপরাধ বিজ্ঞানী ও পুলিশ গবেষক। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন জেমস কিউ কেলিং। ১৯৮২ সালে ‘ভাঙ্গা জানালা’  (broken window) তত্ত্বের অবতারণা করে ইউলসন ও কেলিং বলেন, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপরাধ ও অবহেলাই গুরুতর অপরাধের জন্ম দেয়।

তাদের মতে, কোনো অপরাধ অধিকতর গুরুতর হবে যদি প্রেক্ষাপট তার তীব্রতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয় এবং সংঘটনের পরে যা জনমনে অপেক্ষাকৃত বেশি ভীতির সঞ্চার করে সামগ্রিকভাবে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আরো খোলাসা করে বলা যায়। প্রথমত, অপরাধ ছোট হোক আর বড় হোক তার জঘন্যতার মাত্রা নির্ভর করবে যে প্রেক্ষাপটে তা সংঘটিত হচ্ছে তার উপর। দ্বিতীয়ত, অপরাধের জঘন্যতার মাত্রা কেবল অপরাধের সরাসরি ভিকটিমের ক্ষতি বা ভীতির উপর নির্ভর করবে না। যে অপরাধের ফলে গোটা সমাজে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে কিংবা গোটা সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই অপরাধ হবে বেশি জঘন্য।

নুসরাত হত্যার ঘটনা যতই নৃশংস হোক না কেন এ জাতীয় ঘটনা কদাচিৎ ঘটে। নুসরাতের মতো অন্যদেরও পুড়ে মরতে হবে, সমাজের যুবতী-কিশোরীগণ সেটা কতটুকু বিশ্বাস করে তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণের ছাত্রী বা মহিলা সহকর্মীদের যৌন হয়রানির ঘটনায় সমাজে যে ভীতির ছড়িয়ে পড়ে তা নিয়ে কারো মনে সন্দেহ থাকার কথা নয়।

পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলগুলো নারীর জন্য নিরাপদ হবে এটাই সকলের প্রত্যাশা। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থল কিংবা পরিবারই যদি হয় অপরাধের মূল ঘটনাস্থল, তবে সমাজের বিশৃঙখলা  চরমে ওঠে, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস তলানিতে ঠেকে।

যৌন হয়রানির মত অভিযোগগুলো পুলিশ ও প্রশাসনের সকল স্তরেই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে সেগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা  গ্রহন করা হবে- এটাই তো জনগণ তথা  ভুক্তভোগিদের একান্ত কামনা।  কিন্তু নুসরাতের যৌন হয়রানির অভিযোগটি নিয়ে মাদ্রাসার প্রশাসন, রাজনৈতিক মহল ও থানা পুলিশের যে উপেক্ষার রেকর্ড তৈরি করেছে তা পরবর্তীতে যত জঘন্য বলেই মনে করা হোক প্রথম দিকে কেউ তা মনেই করেনি।

স্থানীয় দায়িত্বশীল মহলগুলোর আচরণ বিশ্লেষণে মনে হয়,  মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল কর্তৃক একজন ছাত্রীকে নির্জনে অফিসে ডেকে বুকে-পিঠে হাত দেওয়াটা তেমন কোনো অপরাধই নয়। থানার অফিসার ইন-চার্জের মতে এমন কিছু হয়নি যে কাঁদতে হবে, কিংবা মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির প্রশাসক  সভাপতির মতে, যৌন হয়রানি হজম করতে না পারা কিংবা থানায় মামলা করাটাই ছিল নুসরাতের অপরাধ; আর  সিরাজ-উদ-দৌলা ও তার সহযোগীদের একমাত্র অপরাধ হলো নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা।

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার নৈতিকতার জানালা হয়তো আগেই ভেঙ্গেছিল। সেই জানালা দিয়ে প্রবেশ করে  এসএম সিরাজ-উদ-দৌলার মতো অনেক ছাত্র-শিক্ষকই মাদ্রাসায় স্থায়ী আসন গেড়েছিল। আর প্রশাসন ভাঙ্গা জানালা মেরামত না করে অপরাধীদের মনে এই ধারণাই তৈরি করেছিল যে এখানে তারা যাই করবে, কেউ কিছু বলবে না।  তাই নুসরাতকে যৌন হয়রানি করে তাকে পুড়িয়ে মারাটাও হজম করা যাবে।

প্রান্তিক কৃষকের ১৮ হাজার টাকার হালের গরু চুরির বিপরীতে  ব্র্যাক ব্যাংকে দুই কোটি টাকা চুরির অপরাধটি নিয়ে আবার একটু বিশ্লেষণে আসা যাক। একটি ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা থাকে। এত টাকার মধ্যে নিয়মিত খেলাপি আর লোপাটের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা চলেও যাচ্ছে। তাই কোটি কোটি  টাকা লোপাটের পরিমাণটা আমজনতার চোখে যত বেশিই  মনে হোক না কেন,  কোনো ব্যাংক প্রশাসনের কাছে এটা নিতান্তই সামান্য ঘটনা । ব্যাংক ডাকাতির ফলে কোনো ব্যাংক মালিক তো দূরের কথা, ব্যাংকের কোনো ক্যাশিয়ারও পথে বসেছে বলে জানা নেই। কিন্তু গ্রামের একজন কৃষকের একটি গরু চুরি যাওয়ার ফলে হাজার হাজার কৃষকের রাতের ঘুম হারাম হয়। তারা দিনে চাষ করেন;  রাতের বেলা গোয়াল ঘরে বিনিদ্র কাটান ।

কৃষকের চোরাই গরু উদ্ধার তো দুরের কথা, থানায় এই চুরির কোনো মামলাই হয় না। আর ব্র্যাক ব্যাংকের দুই কোটি টাকা উদ্ধারের জন্য পুলিশের বড় কর্তাদের চোখে ঘুম আসে না।

অপরাধের জঘন্যতা সম্পর্কে আমাদের সনাতনি ধারনার দ্রুত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নুসরাত হত্যার অপরাধের মতোই সমান কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনাগুলো। ব্যাংক ডাকাতির মতোই গুরুত্ব দেওয়া উচিত কৃষকের গরু চুরির ঘটনাকেও।

বড় বড় মানুষের বড় বড় ব্যথাগুলো কোনো ক্রমেই গুরুত্বহীন নয়। কিন্তু ছোট ছোট মানুষের ছোট ছোট কষ্টগুলো কেন উপেক্ষিত হবে?

দায়িত্বশীলদের  উদাসীনতার সুযোগে একে একে ভেঙ্গে গেছে সমাজের জানলাগুলো। একটি জানলা ভেঙ্গেছে কেউ কিছু বলেনি, কেউ কিছু করেনি। তাই ভেঙ্গেছে দ্বিতীয় জানালা। তারপর তৃতীয়।

এখন সময় এসেছে এসব জানালা মেরামত করার। শূন্য সহনশীলতার নীতি কেবল কোনো বিশেষ অপরাধের বিরুদ্ধেই নয়, সকল অপরাধের বিরুদ্ধেই গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই দমন করা যাবে নুসরাতের হত্যাকারী এসএম সিরাজ-উদ-দৌলাদের। 

মন্তব্য ৭ পঠিত