ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশ সমাজের জন্য জরুরী কি না — এই ধরণের প্রশ্ন অনেকেই করতে পারেন। সম্প্রতি একটি টিভি টকশোতে বাংলাদেশ পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পুলিশের অপরিহার্যতা বোঝাতে বলেছিলেন, ভাবুন তো যদি একটি ঘন্টা পুলিশ না থাকে তবে দেশের কি অবস্থা হবে? দেশের আইন-শৃঙ্খলা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে? পুলিশ কর্মকর্তার এই মন্তব্যের পাল্টা বক্তব্য হিসেবে অন্য একটি টিভি টকশোতে একজন প্রাক্তন সংসদ সদস্য তথা রাজনীতিবিদ পুলিশের প্রয়োজনহীনতার প্রমাণ দিতে গিয়ে বাংলাদেশের সকল পুলিশসদ্যদের এক মাসের ছুটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেছিলেন। তার মতে, পুলিশকে এক মাসের ছুটিতে পাঠালে এই এক মাসের মধ্যে দেশে অপরাধ সংগঠনের হার শূন্যতে নেমে আসবে। তার মতে, পুলিশ আছে জন্যই দেশে অপরাধ সংঘটিত হয়। পুলিশ না থাকলে কোন অপরাধও সংঘটিত হবে না। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাস এই প্রকল্প-প্রস্তাব সমর্থন করে না।

দারিদ্র্য-জর্জরিত হোক বা প্রাচুর্যশীল হোক; গণতান্ত্রিক হোক কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক হোক — কোন সমাজই পুলিশ ছাড়া চলতে পারে না। ইতিহাসের পাতায়, তাই, কোন না কোন রূপে পুলিশ সংগঠনের অস্তিত্ব মিলবেই। প্রাচীনকালে সুসংগটিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রচলনের পূর্বে মানুষ গোত্রবদ্ধ হয়ে বসবাস করত। প্রতিটি গোত্রই তাদের নিজেদের রক্ষার জন্য নিজেদের মধ্য থেকে পালাক্রমে পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনা করত। ইতিহাসে এই ব্যবস্থা গোত্রীয় পুলিশিং বলে পরিচিত ছিল। এই সময় লিখিত কোন আইনের অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু লিখিত আইনের প্রচলনের সাথে সাথে এই আইন বাস্তবায়ন বা প্রয়োগের জন্য বিধিবদ্ধ পুলিশ সংস্থারও প্রয়োজন দেখা দেয়। খ্রীস্টপূর্ব ২০৫০ অব্দে সুমেরীয় শাসক উর-নামু সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম প্রচলিত আইনসমূহের একটি সংকলন প্রকাশ করেন যা বিখ্যাত হাম্মুরাবীর কোড নামে পরিচিত। হাম্মুরাবীর আইন সমূহ প্রয়োগের জন্য পৃথিবীতে সর্বপ্রথম পুলিশ সংগঠনের সৃষ্টি করা হয়।

নীল নদ ও সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান দমনের নিমিত্তে মিশরীয় শাসক আমেনহোটেপ খ্রীস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দে একটি নৌ টহল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটা ছিল পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম শুল্ক পুলিশ। অবশ্য পরবর্তীতে মিশর নীল নদে নিয়মিত টহলের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি নৌপুলিশ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। একই ভাবে গ্রীসের ইতিহাসে রাজা পেরিক্লিসের শাসন আমলে নিয়মিত পুলিশ বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। এই পুলিশের দায়িত্বে ছিলেন ১১ জন কমিশনার।

রোমান শাসকদের মধ্যে অগাস্টাস সিজারের আমলে সম্রাটের সুরক্ষার জন্য প্রিটোরিয়ান গার্ড, নগরে ফৌজদারি অপরাধ নিবারণের জন্য আর্বান কোহর্ট ও অগ্নিনির্বাপন ও রাত্রিকালীন পাহারার জন্য ভিজিলি নামের তিন প্রকারের পৃথক পুলিশ বাহিনীর সৃষ্টি করা হয়েছিল।

ইংল্যান্ডে প্রাচীন যুগে ছিল টাইথিং প্রথা। দশটি পরিবারের সুরক্ষার জন্য গঠন করা হত একটি টাইথিং। দশটি টাইথিং মিলে হত শতক যার দায়িত্বে থাকতেন রীভ নামের এক কর্মকর্তা। একশটি শতকের সমন্বয়ে গঠিত হত শায়ার। শায়ারের দায়িত্বে থাকতেন একজন শায়ার-রীভ। পরবর্তীতে বৃটেনে মধ্যযুগে পুলিশিং নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। অবশেষে ১৮২৯ সালে স্যার রবার্ট পীলের হাতে গঠিত হয় আধুনিক মেট্রোপলিটন পুলিশ।

আমেরিকার নতুন জগতে প্রথম দিকে পুলিশিং ব্যবস্থা কলোনীবাসিদের নিজ উদ্যোগেই পরিচালিত হত। তবে তারা ক্রমান্বয়ে বৃটিশ আদোলে তাদের নগর সমূহসুরক্ষার জন্য পুলিশি ব্যবস্থার প্রচলন করে। তবে যুক্তরাজ্যের পুলিশি ব্যবস্থার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশি ব্যবস্থার মৌল পার্থক্য হল, যুক্তরাজ্যের পুলিশি ব্যবস্থা প্রায়শই কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীন। কিন্তু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশি ব্যবস্থা অতিমাত্রায় স্থানীয়। এখানে ফেডারেল ও রাষ্ট্রীয় পুলিশের বাইরে হাজার হাজার ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র নগর বা সিটি পুলিশ সংগঠন রয়েছে।

ভারতীয় সভ্যতায় মনু সংহিতাই ছিল সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক আইন। এই আইন প্রয়োগের জন্য বিধিবদ্ধ পুলিশ না থাকলেও তৎকালীন শাসকগণ নানাভাবে পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। প্রাচীন যুগে গ্রামাঞ্চলের জন্য স্থানিক ও শহরের জন্য নাগরিক নামের দুই শ্রেণির কর্মকর্তার সন্ধান পাওয়া যায় যারা সাধারণ শাসনকার্যসহ পুলিশি কার্যক্রমও পরিচালনা করতেন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুশারে তৎকালীন শাসকগণ গোয়েন্দা কর্মকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতেন। এই ধরণের পুলিশিং ব্যবস্থা মধ্যযুগে মুসলিম আগমনের পূর্ব পর্যন্ত চালু ছিল। মুসলিম সুলতানগণ মুহতাসিব নামে একজন প্রধান পুলিশ কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করেছিলেন। মুহতাসিবের অধীনে বড় বড় শহরের জন্য কোতওয়াল ও গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি সরকার (জেলা) জন্য ফৌজদার নামে এক শ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। গ্রামে ফৌজদারের অধীনে টহলের জন্য ঘোড়সওয়ার কনস্টেবল থাকত। প্রতিটি সরকারকে আবার থানায় বিভক্ত করে সেখানে একজন করে থানাদার নিয়োগ করা হত। অন্যদিকে প্রতিটি গ্রামের জন্য স্থানীয় ব্যবস্থায় নিয়োগ করা হত চৌকিদার।

ইংরেজগণ ১৭৫৭ সালে ভারত দখলের পর মুসলিম শাসকদের পুলিশি ব্যবস্থা বেশ কিছুদিন অক্ষুন্ন রাখে। পরে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত পৃথকভাবে প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের পুলিশিংকে তাদের মতো করে সাজানো শুরু করে। ১৮৬১ সালে ইন্ডিয়ান পুলিশ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তা পূর্ণতা পায়। অদ্যাবধি এই পুলিশি ব্যবস্থা বাংলাদেশেও অব্যহত রয়েছে।

সভ্যতার ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত পাঠ থেকে এটা বুঝতে বাকি থাকে না যে পুলিশ ছাড়া কোন সমাজ নেই বা ছিল না। সুমেরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে আধুনিক পৃথিবীর কোন সমাজই পুলিশ বিহীন ছিল না বা এখনও নয়। সমাজ তাদের প্রয়োজনেই দলগতভাবে পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বা নিয়মিত পুলিশ সংগঠন তৈরি করেছে। যেখানে আইনের অস্তিত্ব ছিল, সেখানেই পুলিশি কার্যক্রম ছিল। যেখানে আইন থাকবে, সেখানে পুলিশি কার্যক্রম থাকবেই। আইনের প্রয়োগ তথা আইন মান্যকারীদের সুরক্ষা ও আইন ভঙ্গকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সমাজে অবশ্যই পুলিশ সংগঠনের প্রয়োজন রয়েছে।

এখন আমরা পুলিশহীনতার কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করব। পুলিশের বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ থাকলেও সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন কোন মানুষই পুলিশকে বিলুপ্ত করার ঘোষণায় একমত পোষণ করতে পারেন না। তাই, পুলিশবিহীন দেশ বা সমাজ কল্পণা করা যায় না। তবে পুলিশবিহীন কিছু কিছু মুহূর্ত পৃথিবীর মানুষ অনুভব করতে পেরেছে। এই সব অনাকাঙ্খিত মুহূর্ত আসে পুলিশ যখন ধর্মঘট বা কর্মবিরতি পালন করে। আমাদের দেশে পুলিশদের ধর্মঘট বা কর্মবিরতি করা অবৈধ। এদেশে পুলিশ কোন ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারে না। কিন্তু, পৃথিবীর অনেক দেশের পুলিশের ভিতর ট্রেড ইউনিয়ন বৈধ। এই সব দেশে পুলিশ সদস্যরা তাদের দাবি আদায়ের জন্য রীতিমত ধর্মঘটও করতে পারে। যদিও পৃথিবীর ইতিহাসে পুলিশের ধর্মঘট একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, তবু্‌ও কিছু কিছু দেশে পুলিশ সংগঠন রীতিমত ধর্মঘট করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল বা এখনও করে। আর পুলিশ যে সমাজের জন্য কতটা অপরিহার্য, তা বোঝা যায়, পুলিশ যখন ধর্মঘট বা কর্মবিরতি শুরু করে।

১৯১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বরে আমেরিকা যুক্ত রাষ্ট্রের বোস্টন শহরে পুলিশের সদস্যরা তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করণের জন্য ধর্মঘট করেছিল। ধর্মঘটের প্রথম দিনে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। এমনকি নৌঘাঁটি থেকে জাহাজের নাবিকগণ শহরের রাস্তায় এসে বাড়িঘরের জানালা, যানবাহনের গ্লাস ভাঙ্গে, পথচারীদের প্রতি ইঁটপাটকেল ছোড়ে এবং দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট করতে শুরু করে। শহরের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চল পুরোপুরি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলগুলোর দখলে চলে যায়। নিরপেক্ষ পরিসংখ্যান মতে আজ থেকে প্রায় ৯৩ বছর পূর্বে বোস্টন শহরে মাত্র দুই দিনে প্রায় ৩৫ হাজার ডলারের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ।

১৯৬৯ সালের ৯ অক্টোবর মাসে কানাডার মন্ট্রিল পুলিশ মাত্র এক দিনের ধর্মঘট পালন করে। পুলিশের মাত্র ১৪ ঘন্টার কর্ম বিরতিকালীন মন্ট্রিল শহরে ব্যাংক ডাকাতি বেড়েছিল ৫০ গুণ এবং চুরি ও সিঁধেল চুরি বেড়েছিল প্রায় ১৪ গুণ ।

অতি সম্প্রতি (১-১২ ফেব্রুয়ারী/১২) ব্রাজিলের বাহিয়া রাজ্যের পুলিশ সদস্যরা বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে প্রায় ১২ দিন ব্যাপী ধর্মঘট করে । পরবর্তীতে রিওডি জেনারীও শহরের পুলিশও বাহিয়া পুলিশের পথ অনুসরণ করে । পুলিশের স্বল্পতা দূর করতে রাস্তায় নামানো হয় সেনাবাহিনী ও ফেডারেল পুলিশের সদস্যদের। কিন্তু এর পরও ধর্মঘটকালীন বাহিয়া রাজ্যের রাজধানী সালভাদরে মনুষ্য খুনের হার দিগুণ বেড়েছিল দিগুণ । একই সাথে শহর জুড়ে ধুম পড়ে যায় দোকান পাটে লুট তরাজের। পুলিশ ধর্মঘটের জন্য ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহি কার্নিভাল অনুষ্ঠান উজ্জাপন প্রায় ভেস্তে যাবার উপক্রম হয়। কারণ এই বাৎসরিক অনুষ্ঠানে কোটি জনতার সাথে যোগ হয় প্রায় আট লক্ষ বিদেশী পর্যটক। শুধু পুলিশ ধর্মঘটের জন্য সম্ভাব্য অরাজকতার আশঙ্কায় বিদেশী পর্যটকগণ ব্রাজিল ভ্রমণের পরিকল্পণা বাতিল করতে থাকে। সরকার তড়িঘড়ি করে ধর্মঘটিদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়। পুলিশের বেতন প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয় ও ভবিষ্যতে আরো বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ।

অনেকে পুলিশের প্রয়োজনীয়তাকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত উদ্দেশ্যের মধ্যেই সীমীত রাখতে চান। তারা মনে করেন, পুলিশের কাজ হল শুধু অপরাধ দমন করা কিংবা সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করা। তাদের মতে, পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান পরিচালনার কাজেই তাদের সহায়-সম্পদ নিয়োজিত করে। কিন্তু, অপরাধ দমন কিংবা আইন প্রয়োগ করা পুলিশের কাজের সামান্য অংশ মাত্র। পুলিশের কাজের সিংহভাগই হল সেবাধর্মী। ১৯৮১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি মেট্রোপলিটন এলাকায় জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, এই সব এলাকার জনগণ যেসব কাজে পুলিশের সাহায্য প্রার্থনা করেন, সেগুলোর মধ্যে শতকরা মাত্র ১৯ ভাগ হল অপরাধ সম্পর্কিত; বাকী শতকরা ৮১ ভাগ হল নিছক সেবাধর্মী । তাই পুলিশ যতটা না অপরাধযোদ্ধা, তারচেয়ে অনেক বেশি জনসেবক।

সারা পৃথিবীতে পুলিশই একমাত্র সরকারি সেবাদানকারী সংস্থা যার সেবা নিঃশর্তভাবে দিবারাত্র ২৪ ঘন্টা পাওয়া যায়। পূজায়-পার্বণে, জনারণ্যে-নির্জনে, অবসরে বা কর্মস্থলে এমন কোন সময় বা স্থান নেই যেখানে আধুনিক সভ্য মানুষ পুলিশের সেবা প্রত্যাশা করেন না। পুলিশের এই সেবা হয়তো কোন বিশেষজ্ঞের সেবা নয়। কিন্তু, জনগণের সাধারণ প্রয়োজনে রাত বিরাতে একমাত্র পুলিশকেই সর্বপ্রথম কাছে পাওয়া যায়। ইতিহাসের সূচনালগ্নে এমন সব সেবা শুধু পুলিশই প্রদান করত, আজকের সমাজে যেগুলোর জন্য সরকারের বিশেষায়িত এক বা একাধিক পৃথক সংস্থা রয়েছে। কিন্তু, ঘরেবাইরে নিরবিচ্ছিন্ন উপস্থিতির জন্য এই সব সেবায় প্রথম সাড়াদানকারী এখনও পুলিশ সদস্যরাই। যেমন, অগ্নি নির্বাপনের দায়িত্ব পুলিশের না হলেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশকেই সর্বপ্রথম উপস্থিত পাওয়া যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের উপর আইনী নির্দেশ নেই। কিন্তু গভীর রাতে মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনাস্থলে পুলিশকেই পাওয়া যায়। আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটি তাই পুলিশকেই পালন করতে হয়। এমনি হাজার রকমের ঘটনায় পুলিশকেই প্রথম সেবাদান শুরু করতে হয়। নিভৃত পল্লীর পঙ্কিল পুকুরে অসময়ে আবিষ্কৃত বেওয়ারিশ লাশের সৎকার থেকে শুরু করে শহরের বিলাশী-ব্যবসায়ীর বাসার নিখোঁজ পোষা কুকুরটির সন্ধানের দায়িত্ব একমাত্র পুলিশকেই পালন করতে হয়। পুলিশকে সমাজের সেই সব অস্পৃশ্য কাজের ভার গ্রহণ করতে হয়, যেগুলোর ভার অন্য কেউ নিতে চায় না। পরিস্থিতির শিকার সাধারণ মানুষের যখন অন্য কোথাও যাবার সব স্থান রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন তাদের সামনে শুধু পুলিশের কাছে যাবার পথটিই খোলা থাকে।

নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সার্ভে সংস্থা ‘ সেইফার ওয়ার্ড’ কর্তৃক ২০০৯ সালে পরিচালিত ‘বাংলাদেশে বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা : একটি জন উপলব্ধিমূলক জরিপ’ শীর্ষক একটি খানা জরিপের ফলাফল এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এই জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বাংলাদেশর শতকরা ৮৫ জন নাগরিক তাদের এলাকায় আরো অধিক সংখ্যক পুলিশ প্রত্যাশা করে। প্রায় সম সংখ্যক নাগরিক প্রত্যাশা করেন, পুলিশ শুধু অপরাধ সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অপরাধ বহির্ভূত সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়েও কাজ করুক।

পুলিশ সমাজে বসবাসকারী মানুষের জন্য অক্সিজেনের মতো। স্বাভাবিক অবস্থায় শ্বাসকাজে অক্সিজেন গ্রহণ করে মানুষ বেঁচে থাকলেও তারা পৃথকভাবে এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। কিন্তু, বাতাস থেকে অক্সিজেন সরিয়ে নিলেই বোঝা যাবে, অক্সিজেন ছাড়া মনুষ্য জীবন অচল। পত্রিকার পাতা খুললেই আমরা যেমন দেখতে পাই পুলিশের অদক্ষতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে হাজারো মানুষ অতিষ্ট। পত্রিকার প্রতিবেদক থেকে শুরু করে টেলিভিশনের টকশো পর্যন্ত সব স্থানেই কতিপয় মানুষ পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে তাই বলছেন। কিন্তু, সমাজ থেকে পুলিশকে বিলুপ্ত করার কথা কেউ বলছেন না; বরং পত্রিকার পাতায় পাতায় দেখতে পাই বিভিন্ন এলাকায় মানুষ পুলিশ ফাঁড়ি ও থানা স্থাপন বা তাদের এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য আকুল আবেদন করছে। দেশের রাজনীতিবিদগণ নির্বাচনী মেনুফেস্টোতে বা জনসভার বক্তৃতায় তাদের নির্বাচনী এলাকায় নতুন থানা-ফাঁড়ি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ডাকুন বা নাই ডাকুন; রক্ষক ভাবুন কিংবা ভক্ষক ভাবুন; গালি দিন বা অচ্ছুত বলুন; পুলিশ আধুনিক জীবনের এক অপরিহার্য বাস্তবতা ।