ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সর্ব উত্তরের থানা উত্তরখান। উত্তরখানের কিয়দংশ সিটি কর্পোরেশনের বাইরে। গত ০৭/১২/২০১০ খ্রিঃ তারিখে পুলিশ সংস্কার কর্মসূচী (পিআরপি) কর্তৃক আয়োজিত একটি যৌথ কর্মশালায় অংশ নিতে আসেন সেলিম মিঞা ও তার সাথে অন্য পাঁচজন দরিদ্র মানুষ। এলাকায় এদের পরিচিতি কমিউনিটি পুলিশ হিসেবে। সেলিম ও তার দল ছাড়াও কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম (সিপিএফ) এর ২২ জন সদস্য কর্মশালায় অংশ নেন। সেলিম ও তার দল সিপিএফ এর সদস্য নয়। কর্মশালায় অংশ গ্রহণকারী সিপিএফ সদস্যরা পরিচয়ের সময় কেউ বললেন, তিনি ব্যবসায়ী, কেউ বললেন, তিনি অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী। কিন্তু, সেলিম ও তার দল জানালেন, তারা কমিউনিটি পুলিশ। অর্থাৎ তারা কমিউনিটি পুলিশিংকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। প্রকৃত পক্ষে, সেলিম ও তার সহকর্মীরা এলাকায় রাত্রিকালীন পাহারা দলের (night watch) সদস্য। এলাকার জনসাধারণ নিজেদের মধ্যে স্বেচ্ছা ভিত্তিতে মাসিক চাঁদার অর্থে এই পাহারা দলের বেতন বহন করেন। অত্র এলাকায় চোর, ডাকাতদের উৎপাত বেড়ে গেলে স্থানীয় জনগণ পুলিশের সহায়তায় বেতনভোগী রাত্রিকালীন পাহারা দল তৈরী করে। এরা শ্রেফ নাইট গার্ড। তবে তাদের পোশাকের উপর একটি হলুদ রঙের ওভার কোর্ট দিয়ে তাতে লেখা হয়েছে, কমিউনিটি পুলিশ।

কিন্তু, কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনে কমিউনিটি পুলিশ বলতে কোন শব্দ নেই। কেননা, কমিউনিটি পুলিশিং একাধারে একটি দর্শন ও একটি পুলিশি কর্মপদ্ধতি। এই দর্শনের মূল কথা হল জনগণের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে স্থানীয় সমস্যা সমূহের কারণ গুলো অনুসন্ধানপূর্বক স্থানীয় উৎস থেকে আহরিত সম্পদ ব্যবহার করে সেসব দূর করার চেষ্টা করা। রাত্রিকালীন পাহারা দল গঠন করে এলাকায় পাহারা দেয়া কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের একটি বাস্তব কর্মপদ্ধতি। ডেভিড বেইলির মতে, অপরাধ প্রতিরোধ ও কমিউনিটি পুলিশিং এর তিনটি বহুল প্রচলিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে রাত্রিকালীন পাহারা দল প্রধানতম[1]। অন্য দুইটি হল কমিউনিটি পরিচয়পত্র এবং নিরাপত্তা জরিপ।

তবে রাত্রি বেলায় সংঘটিত সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ, যেমন, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি প্রতিরোধের জন্য পাহারা দল গঠন করাই কমিউনিটি পুলিশিং এর সব কিছু নয়। উপরে আলোচিত সেলিম ও তার দল যে নৈশ পাহারার কাজ করেন তা সম্পূর্ণরূপে অর্থের বিনিময়ে। প্রতিমাসে তারা প্রত্যেকে তিন হাজার টাকা করে বেতন পান। এটা অবশ্যই তার পেশা । তিনি নাইট গার্ডের চাকরী করেন। কিন্তু, সেলিমের দলের সদস্যদের পোশাকের সাথে কমিউনিটি পুলিশ খচিত একটি ওভার কোর্ট চড়িয়ে তাদের এক প্রকারের পুলিশ সদস্য বানানো হয়েছে যা কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের শিক্ষা থেকে অনেক দূরে।

কোন গণতান্ত্রিক দেশে পুলিশ বাহিনী নির্বাহের আসল উদ্দেশ্য হল অপরাধ প্রতিরোধ করা। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিষ্ঠাতা স্যার রবার্ট পীলের মতে, পুলিশের সাফল্য পরিমাপের মূল মানদণ্ডই হল দেশে অপরাধের অনুপস্থিতি অর্থাৎ অপরাধ প্রতিরোধ করা। অপরাধ প্রতিরোধের অনেক কৌশলের মধ্যে অন্যতম হল সম্ভাব্য অপরাধ স্থলে পুলিশের উপস্থিতির মাধ্যমে সম্ভাব্য অপরাধীদের অপরাধকর্ম ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা। কোন স্থান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পাহারাদান ঠিক এই লক্ষ্যটিই পূরণ করে। পুলিশ বা কমিউনিটি সদস্যদের মধ্যে যারাই পাহারাদানে নিয়োজিত থাকুক না কেন, সম্ভাব্য অপরাধ স্থলে আইন মান্যকারী নাগরিকদের সরব উপস্থিতি অপরাধ কর্মকে কঠিন করে তোলে; অপরাধীদের ধরা পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

যদিও কোন দেশে পুলিশের সদস্য সংখ্যা পর্যাপ্ত হলেই অপরাধ প্রতিরোধের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না, তবুও আমাদের পুলিশ বাহিনীর বর্তমান জনবল দিয়ে সার্বক্ষণিক পাহারা দানের মাধ্যমে নাগরিকদের সন্তুষ্টি বিধানের মতো কার্যকররূপে অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। পুলিশিং একটি অতি শ্রমঘন সরকারী সেবাদান প্রক্রিয়া। পুলিশের খাতে প্রদত্ত বাজেটের শতকরা প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ অর্থ ব্যয় হয় বেতন-ভাতা খাতে।[2] অন্য দিকে কার্যকর অপরাধ প্রতিরোধের জন্য একজন নাগরিকের বিপরীতে ৪০০ জন পুলিশ সদস্য একটি সন্তোষজনক সংখ্যা। এই সংখ্যা নাগরিক প্রতি ৬০০ তে উন্নীত হলেই পুলিশের জন্য অপরাধ দমন কর্ম কঠিন হয়ে দাঁড়ায়[3]। কিন্তু, দুঃখ জনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশে প্রায় ১২০০ জন নাগরিকের বিপরীতে একজন পুলিশ সদস্য রয়েছে। তাই রাত্রিকালীন পাহারা সহ অন্যান্য পুলিশি কাজে জনগণের সক্রিয় অংশ গ্রহণের বিকল্প নেই।

যদি কোন লোকালয়ের জনগণ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নিজেরাই পাহারাদানের ব্যবস্থা করতে পারেন, তাহলে সম্পত্তির বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ সমূহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। তবে এই পাহারাদান কার্য সম্পূর্ণরূপে বেতনভূক্ত কর্মচারীদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। কেননা, পুলিশ বা ভূক্তভোগী জনগণ ভিন্ন অন্য কোন ব্যক্তিদের দ্বারা গ্রাম বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পাহারা দেয়ার মাধ্যমে সমস্যাটির সাময়িক সমাধান হলেও চূড়ান্ত বিচারে এই ব্যবস্থা কার্যকর নয়। অর্থের বিনিময়ে নিয়োগকৃত তথাকথিত কমিউনিটি পুলিশ সদস্যরা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিম্নলিখিত সমস্যার জন্ম দিয়ে থাকেঃ-

(ক) পাহারা দলের সদস্যরা নিজেদের পুলিশ সদস্য মনে করে পুলিশ সদস্যদের মতো আইন প্রয়োগে উৎসাহী হয়। পুলিশের ক্ষমতা পাওয়ার মতো ভ্রান্ত বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তারা আইন বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়েন। তারা অনেক সময় নিরীহ ব্যক্তিদের গ্রেফতারের ভয়-ভীতি দেখিয়ে উৎকোচ সংগ্রহ করেন। অনেক সময় দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যগণ তাদের উৎকোচ সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে যা পরবর্তীতে পত্রিকার খবর হয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে।

(খ) পুলিশ-পাবলিক সম্পর্কের মাঝে এই সব পাহারাদার একটি বাড়তি প্রাচীর তুলে দেয়। বাংলাদেশে এক শ্রেণীর অপরাধী বা আধা-অপরাধী পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে। বেতনভোগী পাহারাদলের সদস্যরা কালক্রমে এই সব বহুল নিন্দিত সোর্সের মতো আচরণ শুরু করে।

(গ) পাহারাদারদের বেতন অত্যন্ত অপ্রতুল। শুধু কর্মহীন হওয়ার ফলেই তারা এত অল্প বেতনে রাত জেগে পাহারা দেয়ার মতো পেশা গ্রহণ করে। তাই আর্থিক অনটনের কারণে তারা নিজেরাই মনিবের বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরি বা ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটাতে পারে কিংবা পেশাদার ডাকাতদের ডাকাতির সুযোগ তৈরী করে দিতে পারে। রাজধানীর কর্নফুলি গার্ডেন সিটি বা ব্রাক ব্যাংকের লকার থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার চুরি এ জাতীয় ঘটনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বেসরকারী পেশাদার কর্মচারী দিয়ে পাহারাদান কোন কমিউনিটি পুলিশিং কৌশল নয়। অধিবাসীগণ চাঁদা তুলে অল্প খরচে বয়স্ক পাহারাদার না রেখে ব্যক্তিগতভাবে অধিক অর্থ ব্যয়ে এলিট ফোর্স বা ফ্যালকন গ্রুপের সিকিউরিটি গার্ড ভাড়া করতে পারতেন। প্রকৃতপক্ষে, নিজ অর্থ ব্যয়ে পাহারাদল নিয়োগ করা যদি কমিউনিটি পুলিশিং হতো, তা হলে দেশের সিকিউরিটি গার্ড সরবরাহকারী কোম্পানী গুলোই হতো কমিউনিটি পুলিশিং এর বৃহত্তম মিশনারী।

মোদ্দা কথা, কমিউনিটি পুলিশিং শুধু অর্থের বিনিময়ে পাহারা দল গঠন করার মধ্যে সীমিত কোন স্থূল কর্মসূচী নয়। কমিউনিটি পুলিশিং হল নিজের বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিজেই এবং নিজেদের গ্রাম গ্রামবাসিরা সবাই মিলে নিজেরাই পালা ক্রমে পাহারা দেয়া। কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে বহুল ব্যবহৃত শ্লোগান, জনতাই পুলিশ, পুলিশই জনতা এর ফলিত রূপ হল, পুলিশ সদস্যদের সাথে একত্রে কমিউনিটি সদস্যগণ নিজেরাও পুলিশি কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণ করবেন। এই অংশ গ্রহণ কেবল পুলিশকে গোপনে নিষ্ক্রিয়ভাবে সংবাদ দেয়ার মধ্যেই সীমিত নয়; বরং পুলিশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাত্রিকালীন পাহারাদান থেকে শুরু করে পুলিশি পরিকল্পনা তৈরীতে অংশ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে এই বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও জনগণকে বোঝান সম্ভব হয় নি। অবশ্য কমিউনিটি পুলিশিং বাংলাদেশে এখনও একটি নতুন ধারণা। তাই এর বিস্তৃতি ঘটতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। এমতাবস্থায় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে গণ-শিক্ষা কার্যক্রম (Community Education) জোরদার করতে হবে।

——————————————————————————–
[1] পুলিশ ফর দি ফিউচার—ডেভিড বেইলী, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, নিউইয়র্ক
[2] ঐ
[3]ঐ