ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অভ্যাস বসতঃ ইন্টারনেটে কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ক খবরগুলো ঘাঁটাঘাঁটির এক পর্যায়ে কক্সবাজার এলাকার একটি স্থানীয় খবর আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিল। খবরটি গত ২৪ নভেম্বর, ২০১১ তারিখে কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত ‘দৈনন্দিন’ নামের একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় ছাপানো হয়েছে । খবরটিতে বলা হয়েছে কক্সবাজার জেলার উখিয়া থানার ৩ নং হলদিয়াপালং ইউনিয়নের কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যরা ইউনিয়নের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দিকে মনোযোগ না দিয়ে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির দিকেই বেশী নজর দিচ্ছেন। ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল কালাম শিকদারে কাছে জমিজমা নিয়ে একটি সমস্যা এলে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের ইউনিয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি মাহমুদুল হক শিকদার নোটিশ করে বাদি ও বিবাদীকে ‘কমিউনিটি পুলিশের’ অস্থায়ী কার্যালয়ে ডেকে পাঠান। এর ফলে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের সালিশী কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের দায়িত্ব, কর্তব্য ও কার্যক্রমের এখতিয়ার কতটুকু তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মতো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যরাও বহুলাংশে অজ্ঞ। উল্লেখিত খবরের এক স্থানে সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য মন্তব্য করেছেন, জমিজমার শালিস করতে ‘কমিউনিটি পুলিশের’ এখতিয়ার রয়েছে কি না তা খোঁজ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের ইউনিয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি দাবী করেছেন, ‘আমাদের দায়িত্ব ইউনিয়ন ভিত্তিক নয়, বাংলাদেশ কমিউনিটি পুলিশিং হিসেবে দেশের যে কোন স্থানের শালিস করার এখতিয়ার আমাদের রয়েছে’।

কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণার অধিকারী যে কোন ব্যক্তিকে এই খবরটি নাড়া দিবে। কারণ, এই খবরে কমিউনিটি পুলিশিং চর্চাকারী স্থানীয় ব্যক্তি ও স্থানীয় নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি কর্তৃত্বের লড়াইয়ের উপাদান রয়েছে। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কী সে সম্পর্কে স্থানীয় ইউপি সদস্যের যে ভাল ধারণা নেই, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু, কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের ইউনিয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি সাহেবের অজ্ঞতার মাত্রা সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কেননা, তিনি তার কর্তৃত্ব তথা এখতিয়ার কেবল তার নিজ ইউনিয়ন এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন নি। তিনি ‘দেশের যে কোন স্থানের শালিস করার’ এখতিয়ার দাবী করেছেন। কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ৰেত্রে এই জাতীয় মানসিকতা দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সাথে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যদের একটি বড় ধরণের সমস্যার সৃষ্টি করবে। আলোচ্য প্রবন্ধে তাই, আমি কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যদের শালিস করা ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে তাদের সম্পর্ক বিষয়ে আলোকপাত করব।

প্রথমেই আসা যাক, বিচার-শালিসের বিষয়ে। বিচার করার দায়িত্ব পুলিশের নয়। যে দায়িত্ব পুলিশের নয়, সে দায়িত্ব জনগণেরও নয়। তাই বিচার নয়, সালিশ করার কথাটিই এখানে আলোচিত হবে। এখানে বলা দরকার, বিরোধ মীমাংসা করে ফৌজদারি অপরাধ রোধ করা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা কমিউনিটি পুলিশিং এর অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে সালিশ/ বিরোধ মীমাংসা করা কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যদের প্রধান কাজ নয়। ছোট-খাট অধর্তব্য অপরাধের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার পথ অত্যন্ত মঙ্গলজনক। মামলায় জড়ানো কোন পক্ষের জন্যই লাভজনক নয় । ছোট-খাট বিরোধে থানায় মামলা হলে বা কোর্টে বিচার প্রার্থী হলে এক দিকে যেমন পক্ষসমূহ আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েন, তেমনি তাদের মধ্যে সম্পর্কেরও অবনতি ঘটে। তাই, স্থায়ী শানত্দিরক্ষা ও মামলা-মোকদ্দমা থেকে কমিউনিটি সদস্যদের রক্ষা করতে মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করা কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন সমর্থন করে। তবে অপরাধ প্রতিরোধের অন্য সব বিষয় বাদ দিয়ে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যরা যদি সালিস বা বিরোধ মীমাংসা করাকেই প্রধানতম বা একমাত্র কাজ মনে করেন, তবে বুঝতে হবে সেই ফোরামের সদস্যরা কমিউনিটি পুলিশিং এর সঠিক দর্শনটি আত্মস্থ করতে পারেন নি।

এবার আসা যাক স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে সম্পর্কের বিষয়টিতে। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা বিরোধ মীমাংসা বা সালিসের চেয়ে অনেক বড় কাজের জন্য স্থানীয় জনগণের সাথে পুলিশের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। কমিউনিটি পুলিশিং এর আওতায় ফোরাম সদস্যগণ অপরাধের কারণ সমূহ দূর করার চেষ্টা করবে। কিন্তু এই কাজে তারা সমাজের বিদ্যমান প্রাকৃতিক অভিভাবকক্তকে ভেঙ্গে দিবেন না। ইউনিয়ন পরিষদ ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারের প্রথম সোপান । গণতন্ত্রের প্রাথমিক অনুশীলন শুরু হয় ইউনিয়ন পরিষদ ব্যবস্থার মাধ্যমে। গ্রাম আদালত আইন-২০০৬ এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের কাছে আদলত গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এই আদালত ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্য মানের দেওয়ানী ও ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি করতে পারেন । স্থানীয় বিরোধের সালিশ করা তাদের আইনী কর্তব্যও বটে। তাই স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের আইনী ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে খাট করার কোন অবকাশ নেই। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম সদস্যদের এমন সব বিরোধের মীমাংসায় উৎসাহী হওয়া উচিৎ নয় যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কর্তৃত্বকে খাট করে। তারা বিরোধের প্রাথমিক পর্যায়েই হস্তক্ষেপ করবেন। ভাইয়ে-ভাইয়ে বিরোধ, স্বামী-স্ত্রীতে মনোমালিন্য, দুই শরীকের মালিকানার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি বিষয়ে প্রাথমিক উদ্যোগ কেবল ফোরাম সদস্যরা নয়, যে কেউ নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের কর্তৃত্ব খর্ব হয় না, বরং এর ফলে তিনি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আত্মনিয়োগের সুযোগ পান। কোন বিষয় যদি জটিল রূপ ধারণ করে, তা চেয়ারম্যানের দৃষ্টিতেই নেওয়া দরকার। বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারদেরও সম্পৃক্ত করা দরকার।

অধিকন্তু, বিরোধ মীমাংসা কিংবা গ্রাম-আদালত যাতে সঠিকভাবে কাজ করতে পারে এবং জনগণ যাতে গ্রাম আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের কাছে আসতে উৎসাহী হয়, সিপিএফ সদস্যগণ সে জন্য প্রয়োজনীয় গণসচেতনতা তৈরি করবেন। কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন মনে করে, সমাজের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের প্রয়োজনেই তৈরি হয়েছে এবং অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তাদের কোন না কোন ভাবে অবদান রয়েছে। এগুলো অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই, এই সব প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট করা বা দুর্বল করা নয় বরং এদের সক্ষম করে তোলাই কার্যকর অপরাধ প্রতিরোধের বাস্তবধর্মী কৌশল।

পরিশেষে বলব, কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণার জন্যই মাঠ পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সাথে ইউনিয়ন পরিষদের দ্বন্দ্বমূলক অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। ধারণার অস্বচ্ছতার জন্যই পুলিশ, কমিউনিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করার প্রয়াশ পাচ্ছেন। এর ফলে প্রচার মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা নিয়ে বিরূপ প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে যা সাধারণ মানুষকে আরো বেশী বিভ্রান্তিতে ফেলে দিচ্ছে। এমতাবস্থায়, কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে সঠিক ধারণার বিস্তার ঘটানো জরুরী।