ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ভূমিকাঃ কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা আধুনিক পুলিশিং জগতে একটি অপরিহার্য পুলিশিং দর্শনে পরিণত হয়েছে। সনাতনী পুলিশিং ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতাসমূহ দূর করতে গিয়ে অপরাধ বিজ্ঞানী ও পুলিশ গবেষকগণ গত শতাব্দীর যাটের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত গবেষণা করে যে পুলিশিং মতবাদে স্থির হয়ে রয়েছেন, তা হল, কমিউনিটি নির্ভর পুলিশিং বা কমিউনিটি পুলিশিং। পাশ্চাত্য জগতে কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের বাস্তবায়ন গত শতাব্দীর শেষের দিকে ব্যাপক গতিশীলতা পায়। বর্তমান শতাব্দীর শুরুতেও তা অব্যহত রয়েছে। অন্যদিকে সনাতনী পুলিশিং মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত ও প্রাক্তন ঔপনিবেশিক দেশগুলোর পুলিশ সংস্কারের একটি অন্যতম অনুসঙ্গ হল কমিউনিটি পুলিশিং। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত দেশগুলোতে কমিউনিটি পুলিশিং, বর্তমানে, উত্তম পুলিশিং এর সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে।

কমিউনিটি পুলিশিং কীঃ কমিউনিটি পুলিশিং হল এমন একটি পুলিশিং ব্যবস্থা যেখানে কমিউনিটি সদস্যদের উদ্বেগ সৃষ্টিকারী সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ বিষয়ক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য পুলিশ ও জনগণ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যৌথভাবে কাজ করে। পুলিশ এখানে শুধু অপরাধীদের গ্রেফতার, তদন্ত, আলামত বা নিষিদ্ধ বস্তু উদ্ধার কিংবা অপরাধীদের আদালতের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করার মধ্যে সীমীত থাকে না। কমিউনিটি পুলিশিং অপরাধের কারণগুলো খুঁজে বের করে সেসব দূর করা এবং অপরাধীদের পুনর্বাসনের মতো সামাজিক কল্যাণকর কাজেও অংশগ্রহণ করে।

কমিউনিটি পুলিশিং শুধু কোন সীমাবদ্ধ পুলিশি অভিযান বা কর্মসূচি নয়। এটা একটি দর্শন যা পুলিশের সংগঠন থেকে শুরু করে এই সংগঠনের পুরো কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচনা করে। তাই এই দর্শনে উন্নীত হতে হলে কোন দেশের পুরো পুলিশ ব্যবস্থাকেই পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু, সুদৃঢ় আমলাতান্ত্রিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত একটি পুলিশ সংগঠনকে পরিবর্তন করা অত্যন্ত দূরুহ কাজ। এই পরিবর্তন অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ। অন্যদিকে যে কোন পরিবর্তন সংগঠনের ভিতরে ও বাহিরের শক্তি দ্বারা সহজেই বাধাপ্রাপ্ত হয়। শুধু পরিবর্তনের ফলে প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরাই নয়, বরং পরিবর্তনের পক্ষের ব্যক্তিরাও নানাবিধ অজানা আশংকায় পুরাতনকে ছেড়ে নতুনকে গ্রহণে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে পারেন। তাই সনাতনি ব্যবস্থা থেকে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রত্যাশি পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এর জন্য সুদৃঢ় ও সতর্ক পদক্ষে গ্রহণ করতে হয়।

কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থায় উত্তোরণের পূর্বশর্তসমূহঃ সনাতনী পুলিশিং ব্যবস্থা থেকে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থায় উত্তোরণের জন্য কমিউনিটি পুলিশিং গবেষক গোল্ডস্টাইন নিম্নলিখিত পূর্বশর্তগুলো পূরণের তাগিদ দিয়েছেন[1]।

প্রথমত, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়ন করতে হলে এই দর্শনকে পুরো পুলিশ বিভাগের সাংগঠনিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং তা পুলিশ সংগঠনের সর্বস্তরেই অনুশীলন করতে হবে। অনেক সময় কমিউনিটি পুলিশিংকে একটি বিশেষায়িত ইউনিটের অধীনে ন্যাস্ত করে। অন্যান্য ইউনিটের অফিসারগণের সাথে এই বিশেষ ইউনিটের কোন সম্পর্কই থাকে না। এমতাবস্থায়, পুলিশ বিভাগের মধ্যে “কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার” ও তথাকথিত প্রকৃত পুলিশ অফিসার নামে দুইটি ভিন্ন মানসিকতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এর ফলে তথাকথিত গুরুতর অপরাধ নিয়ে কাজ করা চটকদার খবর তৈরিকারক পুলিশ অফিসারদের সাথে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে নিয়োজিত পুলিশ অফিসারদের মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রকল্পের অধীন কমিউনিটি পুলিশিং বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়ন করা হলে কমিউনিটি পুলিশিং অফিসারদের জন্য বিশেষ কিছু বাড়তি সুবিধার ব্যবস্থা করা হতে পারে। এর ফলে অন্যান্য ইউনিটে কর্মরত পুলিশ অফিসারদের সাথে কমিউনিটি পুলিশিং অফিসারদের ঈর্ষার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ সংগঠনের মধ্যে একটি ভিন্নধর্মী কর্ম-পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সাধারণত পুলিশ-আমলাতন্ত্রে নতুন ধারণাকে গ্রহণ না করা তথা প্রচলিত ধারণাকে আঁকড়ে ধরে থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়ন ও তার স্থায়ীত্বের জন্য পুলিশ বিভাগের অভ্যন্তরে নতুনত্বকে গ্রহণ করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পুলিশ সংগঠনের সকল স্তরেই এই নতুন পরিবেশের বিস্তার ঘটাতে হবে।

তৃতীয়ত, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের বিদ্যমান সংস্কৃতির বিরোধীতা মোকাবেলা করতে হবে। সনাতনী পুলিশের সংস্কৃতিতে ভীতিকর অবস্থার মোকাবেলা করা, কর্তৃত্বপরায়ণতা এবং তথাকথিত পুলিশি দক্ষতার উপাদানসমূহ বিদ্যমান থাকে। সনাতনী পুলিশের বিদ্যমান সংস্কৃতি পুলিশকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। পুলিশের নিম্নস্তরের কর্মচারী থেকে শুরু করে উচ্চতর নেতৃত্বের মধ্য থেকেও কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে বিরোধীতা আসতে পারে। কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন বাস্তবায়নকারী নেতৃত্ব বা কর্তৃপক্ষকে এই বিরোধীতা মোকাবেলা বা প্রশমনের জন্য কার্যকর পদক্ষে গ্রহণ করতে হবে।

চতুর্থত, কমিউনিটি পুলিশিং কমিউনিটি ও পুলিশ সদস্যদের কাছে সমভাবে গ্রহণযোগ্য করার জন্য জনগণের উদ্বেগ সৃষ্টিকারী বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃত বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শুধু জনগণের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য চটকদার কর্মসূচি গ্রহণ করলেই চলবে না। এ জন্য আশু ফল প্রদানে সক্ষম কিছু কিছু কর্মসূচিও গ্রহণ করে কমিউনিটি পুলিশিং এর কার্যকরিতার প্রতিফলন দেখাতে হবে। কেবল ফাঁকাবুলি সর্বস্ব কর্মকাণ্ড দিয়ে কমিউনিটির সম্পৃক্ততা ধরে রাখা যাবে না।

বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের আদি উদ্যোগসমূহঃ বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের কিছু কিছু উপাদান স্বাধীনতার অব্যবহিত পর হতে প্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেলেও কমিউনিটি পুলিশিং ভাবধারা বাস্তবায়নের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৯০ এর দশকে। এই সময় দেশের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকেই মাঠ পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে তৎপর হন। ১৯৯২ সালে ময়মনসিংহ জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার জনাব এটি আহমেদুল হক চৌধুরীর[2] পৃষ্ঠপোষকতায় শহরের কিছু স্থানে স্থানীয় জনগণ টাউন ডিফেন্সপার্টি নামে একটি রাত্রিকালীন পাহারাদল গঠন করেন। প্রাথমিকভাবে ৬০টি দলের সমন্বয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয় এবং সাফল্যের সাথে প্রায় ২.৫ লক্ষ লোকের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে[3]। এই পাহারাদল স্থানীয় জনগণের অর্থায়নে পরিচালিত হত। টাউন ডিফেন্স পার্টির কার্যক্রম এখনও ময়মনসিংহ শহরে বিদ্যমান রয়েছে। ১৯৯৫-৯৭ সনে ঢাকা মহানগরীর তৎকালীন ডেমরা থানা এবং বর্তমান কাফরুল থানা এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করা হয়[4]। ২০০০ সনে রংপুর শহরে গোমস্তাপাড়া-মুন্সিপাড়ায় কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করা হয়[5]। এ ছাড়াও চাঁদপুর জেলা, নাটোর জেলা, রাজশাহী মহানগরীসহ দেশের অনেক এলাকায় দিবা/রাত্রিকালীন পাহারাদল গঠিত হয়েছিল। কিন্তু, কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণা, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, পুলিশ নেতৃত্বের অনাগ্রহ ইত্যাদি কারণে এগুলো হয় বিলুপ্ত হয়েছে কিংবা নামমাত্র অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে।

বলা বাহুল্য, কমিউনিটি পুলিশিং এর এইসব উদ্যোগ প্রকৃত দর্শনকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে পারে নি। কারণ, এইসব পাহারাদল পরিচালনার জন্য স্থানীয় জনগণ অর্থায়ন করলেও পুলিশের সাথে অপরাধ প্রতিরোধমূলক কাজে যৌথ অংশীদারিত্বের বিষয়টির সাথে তারা পরিচিত ছিল না। অন্যদিকে এই উদ্যোগ কতিপয় পুলিশ অফিসারের ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফসল ছিল। বাংলাদেশ পুলিশ কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের জন্য তাদের সাংগঠনিক অংগীকার তখন পর্যন্ত ঘোষণা করে নি।

কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের সাম্প্রতিক উদ্যোগঃ কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের সত্যিকার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৭ সালে। এই সময় রাজশাহী রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি জনাব একেএম শহীদল হক বিপিএম[6] এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উত্তরাঞ্চলের ১৬ টি জেলায় এক যোগে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালানো হয়। জনাব হক রচিত কমিউনিটি পুলিশিং কী ও কেন পুস্তিকাটি কমিউনিটি পুলিশিং এর অঘোষিত ম্যানুয়েল হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। সমসাময়িককালে রাজশাহী রেঞ্জের মডেলে দেশের অন্যান্য রেঞ্জে/ পুলিশ ইউনিটে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের উদ্যোগ শুরু হয়। ঢাকা মাহনগরীর ৩৩টি থানায় ওপেন হাউজ ডে কর্মসূচির মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম নতুন মাত্রা লাভ করে[7]। তবে, কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন সম্পর্কে পুলিশ অফিসার ও কমিউনিটি সদস্যদের মধ্যে সঠিক ধারণার অভাব, পুলিশ অফিসারদের মধ্যে আশু ফল লাভের জন্য রাতারাতি কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম গঠন, সঠিক সরকারি নির্দেশনা ও কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে জাতীয় কর্মকৌশলের অনুপস্থিতি ইত্যাদি কারণে কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের বাস্তবায়ন সঠিক পথে অগ্রসর হতে পারে নি। সবচেয়ে বড় কথা হল, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কিংবা বিভিন্ন রেঞ্জ অফিস হতে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু নির্দেশনা জারি করা হলেও তখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশ কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনকে বাংলাদেশ পুলিশ তাদের সাংগঠনিক দর্শন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে নি।

কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে এনজিও উদ্যোগঃ এশিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০০৪ সালে বগুড়া, যশোর ও মাদারীপুরে কমিউনিটি পুলিশিং এর একটি পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছিল[8]। এই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম (সিপিএফ/কমিটি) গঠন করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এইসব ফোরামের সদস্য হয়েছিল। তবে এতে পুলিশ বা কমিউনিটি কেউই কোনরূপ স্বত্ব অনুভব করেন নাই এবং নির্দিষ্ট কোন কৌশল ব্যতিরেকেই সংশ্লিষ্ট এনজিও এর সহায়তা তা পরিচালিত হয়েছিল। তদুপরি, সিপিএফ সমূহ কোন আইনগত কাঠামোর অধীনে সরকারি কোন বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের অধীনে নিবন্ধিত হয় নাই[9]। ২০১১ ইউএসএইডের অর্থায়নে এশিয়া ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সাতটি জেলার ১২৪টি উপজেলার ৫১৮টি কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামকে নিয়ে কাজ করার জন্য নিরাপদ নামে একটি কমিউনিটি পুলিশিং কর্মসূচি চালু করেছে। উত্তারঞ্চলের পাঁচটি এনজিও, যথা, রাজশাহীর এসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট, গাইবান্ধার গণউন্নয়ন কেন্দ্র, বগুড়ার লাইট হাউজ, ঠাকুরগাঁ এর মানব কল্যাণ পরিষদ এবং রংপুরের আরডিআরএস এর মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে[10]। স্থানীয় পুলিশ কর্তৃক গঠনকৃত কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামগুলো নিয়ে কাজ করলেও এইসব বেসরকারি কর্মকাণ্ডে পুলিশ বিভাগের আশানুরূপ সম্পৃক্ততা নেই।

পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির সহায়তাঃ ইউএনডিপি এর অর্থায়নে পরিচালিত পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি এর সহায়তায় প্রস্তুতকৃত প্রথম ত্রিবার্ষিক কৌশলপত্রে (২০০৮-২০১০) বাংলাদেশ পুলিশ কমিউনিটি পুলিশিংকে সর্বপ্রথম তাদের সাংগঠনিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করে[11]। একই সময় পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির সহায়তায় তৈরিকৃত কমিউনিটি পুলিশিং এর জাতীয় কর্মকৌশল ও কমিউনিটি পুলিশিং সার্ভিস ম্যানুয়েল প্রকাশ করা হয়। বস্তুত, কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের বাস্তবায়নের সঠিক নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি বর্তমানে পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে।

পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির সহায়তায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে ডিআইজি (ক্রাইম) এর নিয়ন্ত্রণে একটি ক্রাইম প্রিভেনশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এআইজি (ক্রাইম-১) হলেন এই সেন্টারের ফোকাল পয়েন্ট। এছাড়াও ক্রাইম পিভেন্‌শন সেন্টারে একজন সিনিয়র এএসপি/অতিরিক্ত এসপি সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন[12]। বাংলাদেশের মাঠ পর্যায়ের অপরাধ প্রতিরোধ ও কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করা ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশনাসমূহ সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে।

বাংলাদেশ পুলিশ সারা দেশে একই সাথে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের কৌশল গ্রহণ করেছে। এ জন্য সারা দেশে ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রায় ৪০ হাজার কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম বা কমিটি গঠন করা হয়েছে[13]। স্থানীয় সরকারের বিদ্যমান কাঠামোর সাথে সংগতি রেখে জেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠিত কমিটিগুলোই প্রকৃত কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের দায়িত্ব পালন করে তৃণমূল পর্যায়ে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য পুলিশের সাথে জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সারাদেশে একই সাথে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়ন হলেও পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি বাংলাদেশ পুলিশকে সহায়তার ক্ষেত্রে পাইলট প্রকল্পের কৌশল গ্রহণ করেছে। এজন্য তারা প্রথমে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, মেট্রোপলিটন পুলিশ, রেঞ্জ সদর দফতর ও জলা সমূহের ক্রাইম প্রিভেন্‌শন সেন্টার ও কমিউনিটি পুলিশিং সেলগুলোকে কার্যকর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ৩৫ টি মডেল থানাসহ প্রায় ১১২ টি ক্রাইম প্রিভেনশন সেন্টার/ কমিউনিটি পুলিশিং সেলের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাপত্র ও কমপিউটার সামগ্রি সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়াও প্রায় ১৫৩ টি থানা কমিউনিটি পুলিশিং সেলকে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামগুলোকে কার্যকর করার জন্য পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি ২০১১ সাল পর্যন্ত মেট্রোপলিটন ও জেলা পুলিশের ১৪৬ থানার প্রায় ২৭৮ টি ওয়ার্ড/ ইউনিয়নকে মডেল আকারে গ্রহণ করে সেগুলোতে সরাসরি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে বিবেচ্য বিষয়সমূহঃ বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত না হলেও কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ সমূহ পুলিশ ও কমিউনিটি সদস্যদের মানসিকতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা করেছে। দেশের সকল পুলিশ ইউনিটে কমিউনিটি পুলিশিং সেল স্থাপন করা, প্রতি থানায় একজন করে কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার নিয়োগ করা এবং সারাদেশে কোন না কোন প্রকারের অপরাধ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি প্রমাণ করে পুলিশ বিভাগে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। তবে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পর্যবেক্ষণসমূহে জরুরী ভিত্তিতে আমলে আনা দরকার।

প্রথমত, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ নেতৃত্বের বাইরেও দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আন্তরিক হতে হবে। কোন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। অধিকন্তু, সনাতনী ব্যবস্থা থেকে পুলিশকে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থায় উন্নীত করার জন্য পুলিশের সনাতনী আইন ও বিধিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা বা নতুন আইন/বিধি তৈরির দায়িত্ব সরকারের। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত কমিউনিটি পুলিশিংএর জাতীয় কর্মকৌশল ও কমিউনিটি পুলিশিং সার্ভিস ম্যানুয়েল এখন পর্যন্ত সরকার কর্তৃক অনুমোদন করা হয়নি। তাই, সনাতনী পদ্ধতির এডহক ভিত্তিতে কাজ করার ধারাবাহিকতা কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষ্যিত হচ্ছে। একটি অনুমোদিত জাতীয় কর্মকৌশল ও কমিউনিটি পুলিশিং সার্ভিস ম্যানুয়েল ছাড়া মাঠ পর্যায়ের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে নানাবিধ বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি হয়।

দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ নেতৃত্বের ধরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনে উদ্বুদ্ধ পুলিশ কর্মকর্তাদের সহায়তায় যেখানে অতি সহজে কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন বাস্তবায়ন সম্ভব সেখানে নিরুৎসাহিত পুলিশ নেতৃত্বকে দিয়ে এটা বাস্তবায়নে যথেষ্ঠ বিপত্তি ঘটে। বাংলাদেশ পুলিশ সাংগঠনিকভাবে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও মাঠ পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায় না। অনেক পুলিশ অফিসার কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নকে রুটিন কাজের অতিরিক্ত পরিশ্রম বলে এই কাজে অনীহা প্রদর্শন করেন। এমতাবস্থায়, মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বদানকারী পুলিশ অফিসারদের কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনে উদ্বুদ্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, থানা পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের মূল কার্যক্রম পরিচালিত হলেও থানার অফিাসার-ইন-চার্জদের একটি বড় অংশ কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে আন্তরিকতার পরিচয় দিতে পারেন নি। অনেকে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের জন্য কমিউনিটি পুলিশিং অফিসারকেই একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বলে মনে করেন। অনেক স্থানে থানার কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার ছাড়া অন্যান্য পুলিশ অফিসারগণ কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়ন তথা কর্মক্ষেত্রে চর্চার কোনই গরজ বোধ করেন না। তাই, থানার অফিসার-ইন-চার্জগণসহ অন্যান্য পুলিশ অফিসারদের কমিউনিটি পুলিশিং ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

চতুর্থত, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ অফিসারদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের স্বীকৃত মানদণ্ড না থাকায় এটি বাস্তবায়নে আন্তরিক পুলিশ অফিসারদের পুরস্কৃত করা কিংবা এই কাজে উদাসীন পুলিশ অফিসারদের তিরস্কৃত করার কার্যকর উপায় নেই। এমতাবস্থায়, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে পুলিশ অফিসারদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের একটি উপযুক্ত মানদণ্ড নির্ধারণ করা অতীব জরুরী।

উপসংহারঃ কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশ ও জনগণের মধ্যে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য একটি যৌথ অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার দর্শন। অন্যান্য দার্শনিক মতাবদের মতোই এই দর্শন বাস্তবায়নে সর্বজন স্বীকৃত কোন পথ নেই। অন্যদিকে এর বাস্তবায়নের সকল চাবিকাঠি পুলিশের হাতে নেই। পুলিশ আন্তরিক হলেও কমিউনিটি সদস্যদের অনাগ্রহ কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নকে অসম্ভব করে তোলে। এমতাবস্থায়, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে একটি দূরুহ কাজ। তবে, বাংলাদেশে পুলিশ ও কমিউনিটির মধ্যে এ সম্পর্কে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে যা কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে আমাদের প্রত্যাশাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

——————————————————————————–
[1] https://www.ncjrs.gov/criminal_justice2000/vol_3/03g.pdf
[2] এই জন-সম্পৃক্ত পুলিশ অফিসার বর্তমানে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।
[3] ঢাকা মহানগর এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং: সমস্যা ও সম্ভাবনা—নাইম আহমেদ, বিপিএম, ২০০৮
[4] ঐ
[5] ঐ
[6] বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন ও অপারেশন), পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা।
[7] ঢাকা মহানগর এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং: সমস্যা ও সম্ভাবনা—নাইম আহমেদ, বিপিএম, ২০০৮
[8] http://www.asiafoundation.org/resources/pdfs/TAFHANDOUTBGCOPFINAL.pdf
[9] Community Policing Strategy for Bangladesh, Crime Prevention Centre, Police Headquarters, Dhaka /মেয়াদ শেষ হওয়ায় এই প্রকল্প বর্তমানে বন্ধ রয়েছে
[10] http://www.asiafoundation.org/resources/pdfs/TAFHANDOUTBGCOPFINAL.pdf
[11] Strategic Plan 2008-10, Bangladeh Police
[12] Community Policing Service Manual, Crime Prevention Centre, Police Headquarters, Dhaka
[13] Community Policing Strategy for Bangladesh, Crime Prevention Centre, Police Headquarters, Dhaka