ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আগের টিএন্ডটি এখন হয়েছে বিটিসিএল। কোন এক সময় বাংলাদেশে টিএন্ডটি ছাড়া অন্যকোন ফোন কোম্পানী ছিল না। এই টিএন্ডটির ল্যান্ড ফোনের লাইন পেতে বছরের পর বছর নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হত। বাবায় দরখাস্ত করে দেন দরবার আর উৎকোচ দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যখন মারা যেত, তখন ছেলের বাসায় হয়তো ফোনের সংযোগ আসত। কিন্তু, ১৯৯০ সালের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে থাকে। সেলফোন কোম্পানী গুলো অতিদ্রুত ল্যান্ডফোনের স্থান দখল করে নেয়। টিএন্ডটি অফিসের দিকে মানুষ আর যেতে চায় না। ক্রমাগত নিম্নগামী সেবা ও দুর্নীতির জন্য টিএন্ডটির অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে যেতে থাকে। সরকার পরে এটাকে একটা লিমিটেড কোম্পানীতে পরিবর্তন করে। নাম হয় বিটিসিএল।

আমার এক বন্ধু বিটিসিএল এর বিভাগীয় প্রকৌশলী। মগবাজারের একটি বিটিসিএল অফিসে সে কর্মরত । এটাকে জনগণ এখনও টিএনটি অফিস বলেই জানে।

কমিউনিটি পুলিশিং এর উপর নির্মিত প্রশিক্ষণ ভিডিওটির সম্পাদনা কাজে সহায়তার জন্য গেলাম মগবাজারে একটি স্টুডিওতে। কিন্তু একটু আগেভাগেই এসে পড়েছিলাম। আমাদের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাছরাঙ্গা প্রোডাকশনের প্রতিনিধি সারোয়ার ভাই ইস্কাটন রোডে ট্রাফিকজামে পড়েছেন। তার আসতে আরো আধা ঘন্টা দেরি হবে। কী আর করি। বিশাল সেন্টারের সামনে অযথা দাঁড়িয়ে না থেকে বন্ধুর সাথে টিএনটি অফিসে এক কাপ চা খেয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। তার সাথে ফোনে কথা হল।

কিন্তু, গেইটে ধরে বসল সিকিউরিটি। এখানে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করে ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে। অভ্যর্থনা ডেক্সে বসা লোকদের জানানো হল। আমি বন্ধুর নাম বললাম। অভ্যর্থনার ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আপনার বন্ধুর বাড়ি কোথায়? আমি এমন প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিলাম না। কোন সরকারি অফিসে যদি কোন কর্মকর্তার সাথে দেখা করতে যাই, তাহলে তার বাড়ি কোথায় তা জানা তো জরুরি নয়। আমি বললাম, এটা আবার কোন ধরণের প্রশ্ন হল। আপনি তাকে জানান যে তার সাথে দেখা করার জন্য আমি এসেছি। তিনি বললেন, আপনি তাকে ফোন দেন। আমি বললাম, বারে, আপনার সামনে একটি ফোন সেট/ইন্টারকম থাকতে আমাকে ফোন করতে বললেন কেন? আমি তো তাকে ফোন দিয়েই এসেছি। আপনি নিজে জেনে নেন, তিনি আমাদের ডেকেছেন কিনা কিংবা আমরা ভিতরে যাব কি না।

ভদ্রলোক বললেন, আমি ফোন করব না। আপনাকেই ফোন করতে হবে। আমি বললাম, আমি যে অফিসে চাকরি করি সেখানে কেউ আমার সাথে দেখা করতে এলে আমার লোকজন এই ক্ষেত্রে আমাকে নিজেরাই ফোন করে জেনে নিতেন। আপনাদের এখানে দেখছি উল্টো নিয়ম। আমি বন্ধুকে ফোন দিলাম। আমার মোবাইল সেটটি নিয়ে আমার করা কলে অভ্যর্থনার সরকারি কর্মচারি বন্ধুর সাথে কথা বললেন। আমার বন্ধু একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ক্যাডার পদে চার চাকরিকাল ১৪ বছর পার হয়েছে। কিন্তু, এই অভ্যর্থনার নিম্নতম কর্মচারি ফোনে তাকে স্যার, পর্যন্ত সম্বোধন করলেন না।

যাহোক, আমাকে একটি স্লিপ দেওয়া হল। আমি সিকিউরিটিদের অতিক্রম করলাম। মজার বিষয় হল, আমাকে তারা এত নাস্তানাবুদ করলেও আমার ব্যাগটি চেক করার কোন জরুরৎ মনে করলেন না। আমি বন্ধুর অফিসে গেলাম। তাকে বললাম, তোমার অভ্যর্থনার লোকজন তো আমাকে দারুণ একটা অভ্যর্থনা দিল। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তাকে বললাম, তোমার বন্ধুকে ওরা যদি এই ধরণের অভ্যর্থনা দেয় তো গ্রাহক বা ভুক্তভোগীদের সাথে ওরা কিরূপ আচরণ করে। আমার বন্ধু বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে বলল, দোস্ত, এরা হল সিবিএর নেতা। আমরা যাদের স্যার সম্বোধন করি, ওরা তাদের ভাই বলেন। আর গ্রাহক সেবার কথা বলছ, ওটা ওদের না করলেও চলে। আর এ জন্যই তো বিটিসিএল। সরকারি প্রতিষ্ঠানে আর গ্রাহকসেবার কথা বলছ! সেবাদানের জন্য কি কেউ সরকারি চাকরি করে? আর অফিস ব্যবস্থাপনা! সেও তো তাদের মর্জি। সিবিএ নেতাদের বুদ্ধি আর পরিকল্পনাই বলেই তো সরকারি অফিস চলে। আমাদের মতো প্রকৌশলী আর বিশেষজ্ঞদের পড়াশোনা আর অভিজ্ঞার এখানে মূল্য নেই।

আমি মনে মনে এই ভেবে শান্তনা পেলাম যে, আমার পুলিশ সদস্যরা আমাদের দর্শনার্থী বা সেবাপ্রার্থীদের অন্তত এর চেয়ে খারাপ ব্যবহার করে না। তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এর চেয়ে অনেক বেশি সম্মান করে।