ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশ হল সরকারি ক্ষমতার সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ। সরকার তার কর্তব্য পালন ও নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীন বাধা দূর করা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য পুলিশের উপর নির্ভর করে। অধিকন্তু, অপরাধ দমন ও সংঘটিত অপরাধের তদন্ত পূর্বক অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নাগরিকদের মনে নিরাপত্তা বোধ তৈরী করা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য। কিন্তু একটি দক্ষ ও জবাবদিহিতা মূলক পুলিশ সার্ভিস গঠন ছাড়া কোন সরকারের পক্ষে এই সব দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।

সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন ও নির্বাচনী বাধ্যবাধকতা পূরণে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহারের সময় সরকারের বিরুদ্ধে প্রায়শই সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। একটি গণতান্ত্রিক দেশের পুলিশ বাহিনী অগণতান্ত্রিক পন্থায় ব্যবহৃত হতে হতে পুলিশ ক্রমশই একটি অগণতান্ত্রিক ও জন-নিপীড়ক বাহিনী হিসেবে জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। পর্যায় ক্রমে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যখন পুলিশ নিজেকে জবাবদিহিতার উর্দ্ধে বলে ভাবতে থাকে। তখন তাদের আচরণে সরকার কিংবা আইন কোন প্রতিষ্ঠানের প্রতি জবাবদিহিতার লক্ষণসমূহ পরিস্ফূটিত হয়; পুলিশের নিয়ন্ত্রণ-শৃঙ্খল ভেঙ্গে পড়ে। অন্য দিকে কোন সরকার জনগণের কাছে অপ্রিয় হয়ে উঠলে সরকারের বিরুদ্ধে জনতার পুঞ্জিভূত ক্ষোভ সর্বপ্রথম গিয়ে পড়ে পুলিশের উপর। পুলিশ তখন নিতান্ত মামুলী দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও জন-রোষে পতিত হয় যার তাৎক্ষণিক ফলাফল হল পুলিশ কর্তৃক নাগরিকদের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক বল প্রয়োগ। বলাবাহুল, সৃষ্টির শুরু থেকেই বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের পুলিশ বিভাগগুলো এই জাতীয় অবস্থার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করছে।

পুলিশ সংস্কারের প্রসঙ্গটি এলেই যে বিষয়টি আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে তা হল পুলিশ বাহিনীর উপর নির্বাহী বিভাগের অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ (Inappropriate interference) দূর করে প্রয়োজনীয় ও কাঙ্খিত রাজনৈতিক নির্দেশনা দেয়ার একটি সুনির্দিষ্ট আইনী ব্যবস্থা তৈরী করা। এই ধারণা থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুলিশ আইনে, এমনকি অনেক দেশের সংবিধানে এমন একটি রাজনীতি-নিরপেক্ষ বা রাজনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ সংগঠন তৈরির কথা বলা হয়েছে যা রাজনৈতিক সরকার ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একটি নিরপেক্ষ নিয়ামক (buffer body) হিসেবে কাজ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই সংগঠনকে বিভিন্ন নামে যেমন, পুলিশ কমিশন, পুলিশ সার্ভিস কমিশন, পুলিশিং বোর্ড, পুলিশ অথারিটি ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়।

সমপ্রতি বাংলাদেশে পুলিশ সংস্কার নিয়ে নানা মুখী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি (পিআরপি) এর সহযোগিতায় ১৫ সদস্যের একটি ড্রাফটিং কমিটি ২০০৭ সালে একটি খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেন। খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭ এর চতুর্থ পরিচ্ছদে (ধারা-৩৭ হতে ৪৮) একটি জাতীয় পুলিশ কমিশন গঠন, তার দায়িত্ব ও কার্যাবলীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশ কমিশনের মতোই এই পুলিশ কমিশনের রূপরেখা। সরকার ও পুলিশ বাহিনীর মাঝে একটি বাফার বডি হিসেবে কাজ করার মতো প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও দায়িত্ব এই কমিশনের হাতে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কিন্তু, প্রস্তাবিত এই পুলিশ কমিশন নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে কিছু কিছু ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় এ সম্পর্কে কিছু কিছু মতামতও প্রকাশিত হয়েছে। তবে পুলিশিং বিশ্বে একটি অনুসরণীয় আইনী ব্যবস্থা হলেও আমাদের দেশে পুলিশ কমিশন/ পুলিশ অথরিটি একটি নতুন ধারণা। তাই এ সম্পর্কে নানা প্রকার মতামত থাকাই স্বাভাবিক। তবে এ সম্পর্কে পূর্বসংস্কারজাত স্থূল ধারণা পুলিশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আমার এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হল প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন সম্পর্কে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ধারণাগুলো বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা তুলে ধরা। এ লক্ষ্যে আমরা প্রথমেই বিশ্বের কয়েকটি দেশের পুলিশ কমিশনের গঠন, কার্যাবলী, আইনী ক্ষমতা ইত্যাদি পর্যালোচনা করব।

পুলিশ কমিশন, শ্রীলংকাঃ শ্রীলংকার সংবিধানের ১৮এ পরিচ্ছেদের ক্ষমতা বলে শ্রীলংকান পুলিশ কমিশন গঠিত হয়েছে। এক জন সভাপতিসহ এই কমিশনের সদস্য সংখ্যা ০৭ জন। সংবিধানের ৪১এ অনুচ্ছেদের নিয়মানুসারে গঠিত সাংবিধানিক পরিষদের সুপারিশ অনুসারে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি কমিশনের সদস্য ও সভাপতিকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। সরকারী কর্মকর্তা বা আইন/বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কমিশনের সদস্য নিয়োগ করা গেলেও তারা পরবর্তীতে সাধারণভাবে তার পূর্বের পদে ফিরে যেতে পারেন না। সদস্যদের কার্যকাল হবে তিন বছর এবং কোন সদস্য দুই মেয়াদের বেশী সদস্য হিসেবে নিয়োগের যোগ্য হন না। সদস্যদের বেতন ভাতাদি সংসদ কর্তৃক নির্ধারিত হয় এবং তা কনসোলিডেট ফান্ড হতে পরিশোধ করা হয়। কমিশন তাদের কাজে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেন। কমিশনের কাজে বেআইনী হস্তক্ষেপ, প্রভাব বিস্তার বা তদবীর ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। কমিশন তার কৃত কর্মের জন্য পার্লামেন্টের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। এক মাত্র পুলিশ প্রধান(আইজিপি) ছাড়া পুলিশ বিভাগের সকল পদে নিয়োগ, বদলী, পদোন্নতি, পদচূ্যতি এবং শৃঙ্খলা জনিত সকল কর্মকাণ্ড পুলিশ কমিশনের এখতিয়াভূক্ত। তবে এই সব দায়িত্ব কমিশন পুলিশ প্রধানকে বা পুলিশ প্রধানের সাথে আলোচনা ক্রমে কোন নির্দিষ্ট পদমর্যাদার পুলিশ অফিসারদের উপর অর্পণ করতে পারবে। কমিশন পুলিশ বিভাগের কর্তব্য পালন, উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির জন্য বিধিমালা তৈরী এবং পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করে তা তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে।

পুলিশ সার্ভিস কমিশন, নাইজেরিয়াঃ এক জন চেয়ারম্যান সহ ০৭ জন সদস্য নিয়ে নাইজেরিয়ার পুলিশ সার্ভিস কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের সদস্যরা হলেন সুপ্রিম কোর্ট বা আপীল কোর্টের এক জন অবসর প্রাপ্ত বিচারপতি, পুলিশ কমিশনার পদের চেয়ে নীচে নয়, এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার, এক জন নারী প্রতিনিধি, এক জন সাংবাদিক প্রতিনিধি, এক জন বেসরকারী মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একজন প্রতিনিধি এবং কমিশনের সচিব। কমিশনের সদস্যগণ অবশ্যই সমাজের প্রমাণিত সচ্চরিত্রের অধিকারী হবেন। কমিশনের সচিব নাইজেরিয়ান ফেডারেল সিভিল সার্ভিস থেকে আগত একজন স্থায়ী সচিব । এই কমিশন নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক ক্ষমতা ও কার্যপালনে স্বাধীন থাকবে। পুলিশ প্রধান ছাড়া পুলিশ বাহিনীর অন্যান্য পদের অফিসারদের নিয়োগ, বদলী, পদোন্নতি, পদচূ্যতি ও শৃঙ্খলা জনিত যাবতীয় বিষয় পুলিশ সার্ভিস কমিশন নিয়ন্ত্রণ করে। কমিশন প্রয়োজনে তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কোন বিষয় নাইজেরিয়ান পুলিশ সার্ভিসের কোন কর্মকর্তা বা কমিটির উপর অর্পণ করতে পারেন।

জন নিরাপত্তা কমিশন, পাকিস্তানঃ পাকিস্তানের পুলিশ- ব্যবস্থা মূলতঃ প্রাদেশিক। তবে সেখানে ফেডারেল তদন্ত বু্যরো, রেলওয়ে, হাইওয়ে ও সীমান্ত রক্ষার কাজে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনী সমূহ সারা দেশে কাজ করে। এমতাবস্থায়, পাকিস্তানে ফেডারেল পুলিশ এজেন্সি গুলোর তদারকী করা ও প্রাদেশিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতীয় , প্রাদেশিক ও জেলা পর্যায়ে আলাদা আলাদা পুলিশ কমিশন রয়েছে। ২০০২ সালের পুলিশ অর্ডার অনুসারে পাকিস্তানের পুলিশ কমিশনগুলোকে জন নিরাপত্তা কমিশন বলা হয়।

পাকিস্তান পুলিশ অর্ডারের ৭৩ নং থেকে ৮৪ ধারার ক্ষমতা বলে পাকিস্তানের ফেডারেল পর্যায়ে ‘জাতীয় পুলিশ কমিশন’ গঠিত হয়েছে। পদাধিকার বলে ফেডারেল সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে সভাপতি করে এই কমিশন অন্য ১২ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়। কমিশনের ০৬ জন সদস্যকে জাতীয় পরিষদের স্পিকার পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনয়ন দেন। এদের ০৩ জন সরকারী দলের ও ০৩ জন সম্মিলিত বিরোধী দলগুলোর। সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতার সাথে আলোচনা ক্রমে সংসদ সদস্যদের নাম প্রস্তাব করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। প্রত্যেক প্রদেশ থেকে কমপক্ষে একজন করে সদস্য হতে হবে এবং এদের মধ্যে অন্ততঃ দুই জন মহিলা হতে হবে। জাতীয় জন নিরাপত্তা কমিশনের বাকী ০৬ জন সদস্য (কম পক্ষে এক জন মহিলা) হবেন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যারা সমাজ সেবা, প্রশাসন, আইন, শিক্ষা বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অভিজ্ঞ এবং নিখুঁত ও অনুসরণীয় চরিত্রের অধিকারী। একই ভাবে পাকিস্তানের প্রাদেশিক ও জেলা নিরাপত্তা কমিশন রয়েছে। পাকিস্তানের জন নিরাপত্তা কমিশন সমূহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ ইউনিটের বার্ষিক পুলিশিং পরিকল্পণা অনুমোদন, পুলিশের কার্যাবলী মূল্যায়ন, প্রতিবেদন তৈরী, পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত করা বা করানো, পুলিশের উন্নয়ন, পুলিশ-পাবলিক সম্পর্ক উন্নয়ন ইত্যাদি কর্ম সম্পাদন করে।

জাতীয় জন নিরাপত্তা কমিশন, জাপানঃ জাপানের জন নিরাপত্তা কমিশন হল মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের একটি কমিশন যা প্রতি-মন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন একজন চেয়ারম্যান ও নিরপেক্ষ পাঁচ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হয়। জাপানের প্রধান মন্ত্রী ডায়েটের(সংসদ) উভয় পরিষদের সম্মতিক্রমে জাপানের স্বনামধন্য নাগরিকদের মধ্য থেকে নিরপেক্ষ সদস্যদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এই কমিশন জাপানের জাতীয় পুলিশ বাহিনীর তত্ত্বাবধান ও কার্যাবলী মূল্যায়ন করে । কমিশননের প্রধানতম উদ্দেশ্য হল, পুলিশ বাহিনীকে অনাকাঙ্খিত রাজনৈতিক হস্থক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা এবং পুলিশকে গণতান্ত্রিক ভাবধারায় পরিচালিত করা। জাপানের জাতীয় পুলিশ বাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলী, পদোন্নতী ও শৃঙ্খলা বিষয়ক কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষমতাও এই কমিশনের উপর ন্যস্ত। এই কমিশন মন্ত্রী পরিষদ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র। কিন্তু মন্ত্রী পরিষদের সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মাধ্যমে সমন্বয় কার্য সম্পাদন করে। জাপানের জাতীয় জন নিরাপত্তা কমিশন এতটাই স্বাধীন যে খোদ প্রধান মন্ত্রীও একে কোন নির্দেশ দিতে পারেন না।

পুলিশ কর্তৃপক্ষ, যুক্ত রাজ্যঃ সর্বমোট ৪৩ টি পৃথক পৃথক পুলিশ বাহিনী নিয়ে যুক্ত রাজ্যের বিকেন্দ্রিকৃত পুলিশ-ব্যবস্থা গঠিত। প্রত্যেকটি পুলিশ বাহিনীকে তদারকী করার জন্য সরকার ও পুলিশ বাহিনীর বাইরে ‘পুলিশ কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি মোটামুটি স্বাধীন সংস্থা রয়েছে। পুলিশ বাহিনীর দৈনন্দিন অপারেশনাল দায়িত্ব পুলিশ প্রধান(চিফ কনস্টেবল) এর উপর ন্যস্ত থাকে। কিন্তু পুলিশ বাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধান, পুলিশের বাজেট ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পুলিশিং পেশার মূল্যায়নের মানদণ্ড নির্ধারণ ইত্যাদি কাজ পুলিশ কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত । এক জন চেয়ারম্যানসহ পুলিশ কর্তৃপক্ষের সদস্য সংখ্যা সাধারণতঃ ১৭ জন যাদের মধ্যে ০৯ জন স্থানীয় কাউন্সিলর, ০৩ স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট ও ০৫ জন নিরপেক্ষ সদস্য থাকেন। পুলিশ কর্তৃপক্ষের সদস্যগণ সরকার কিংবা পুলিশ বাহিনীর সদস্য তথা পুলিশ বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত নন। যুক্তরাজ্যের পুলিশ বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদের কাছে এবং পুলিশ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। আইন অনুসারে সরকার পুলিশ বাহিনীর জন্য দীর্ঘ মেয়াদী, পুলিশ কর্তৃপক্ষ মধ্য মেয়াদী ও পুলিশ প্রধান স্বল্প মেয়াদী অপারেশনাল পরিকল্পণা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন। বৃটেনের পুলিশ কর্তৃপক্ষ সরকার ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একটি নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে কাজ করে। এর ফলে সরকার যেমন পুলিশের দৈনন্দিন অপরারেশনাল কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে পারে না, তেমনি পুলিশও তাদের আইনী ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে না। পুলিশ কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হল পুলিশ প্রধান/চিফ কনস্টেবলকে নিয়োগ দেয়া ও তাকে অভিযোগের ভিত্তিতে অপসারণের সুপারিশ করা। লন্ডনের বাইরের পুলিশ কর্তৃপক্ষ সমূহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর অনুমোদন ক্রমে স্বীয় পুলিশ বাহিনীর চিফ কনস্টেবলকে নিয়োগ দিয়ে থাকে।

পুলিশিং বোর্ড, কানাডাঃ কানাডার পুলিশ প্রশাসন যুক্ত রাষ্ট্রের মতো বিকেন্দ্রিকৃত। এখানে শহর, মিউনিসিপ্যাল, প্রাদেশিক ও ফেডারেল পুলিশ বাহিনী মিলে প্রায় ৫৭১ টি পুলিশ সংস্থা রয়েছে। ফেডারেল পুলিশ ছাড়া অন্যান্য পুলিশ বাহিনী গুলোর তত্ত্বাবধান বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিবারণের জন্য পুলিশিং বোর্ড বয়েছে। এই সব বোর্ডের সদস্য হিসেবে পুলিশ বাহিনীর সদস্য নেই। উদাহরণ স্বরূপ, কানাডার ভ্যানকুভার পুলিশিং বোর্ডের কথা বলা যেতে পারে। ব্রিটিশ কলম্বিয়ান পুলিশ আইন অনুসারে ভ্যানকুভারের মেয়রের সভাপতিত্বে সর্বোচ্চ ০৭ জন সদস্য নিয়ে এই বোর্ড গঠিত হয়। সদস্যদের মধ্যে এক জন সদস্যকে নগর কাউন্সিল নিয়োগ দিয়ে থাকেন। বাকী সদস্যরা ভ্যানকুভার নগরীর স্থানীয় অরাজনৈতিক অধিবাসী। বর্তমান বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে দুই জন আইনজীবী, দুই জন ব্যবসায়ী নেতা, এক জন সমাজ সেবক ও এক জন বেসরকারী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি রয়েছেন। পুলিশিং বোর্ডের সদস্যগণ সবাই অবৈতনিক ও খণ্ডকালীন কর্মকর্তা। তাদের দৈনিক ভাতা ও যাতায়াত ভাতা দেয়া হয়।

পুলিশিং বোর্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ডঃ ১৯ জন সদস্য নিয়ে এই পুলিশিং বোর্ড গঠিত হয় যার মধ্যে ১০ জন সংসদ সদস্য। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো থেকে বিশেষ আনুপাতিক হারে এদের নিয়োগ দেয়া হয়। বাকী ০৯ জন নিরপেক্ষ সদস্য সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ করা হয়। নিরপেক্ষ সদস্যরা সরকারী কর্মচারী, পুলিশ অফিসার, জাতীয় বা স্থানীয় পরিষদের সদস্য হতে পারবে না। বোর্ডের সদস্যদের নিয়োগ ও অপসারণের দায়িত্ব সেক্রেটারী অব স্টেটস এর উপর ন্যস্ত। তবে এই ক্ষেত্রে তাকে উত্তর আয়ার ল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার, ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার, জেলা কাউন্সিল ও অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা করতে হয়। পুলিশিং বোর্ডের কাজ হল, পুলিশ বাহিনীর উপর ক্ষমতাসীন সরকারের এক তরফা অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করে তাদের কর্মক্ষম ও কৃত কর্মের জন্য জবাবদিহি করা। পুলিশিং বোর্ড উত্তর আয়ারল্যন্ড পুলিশের জন্য মধ্যম মেয়াদী পরিকল্পণা তৈরী করে, পুলিশের জন্য স্থিরকৃত মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করে, পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সাধারণ মানের অভিযোগ সমূহের বিভাগীয় তদন্ত তদারকী করে, পুলিশ কতর্ৃক মানবাধিকার লঙ্ঘণের ঘটনা তদারকী করে। বস্তুতঃ আয়ারল্যান্ডের পুলিশ প্রধান তার অধীনন্ত পুলিশ সদস্যদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশিং বোর্ডের মাধ্যমে সরকার ছাড়াও সাধারণ জনগণের কাছে জবাবদিহি করে।

পুলিশ কমিশন, ভারতঃ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক গঠিত পুলিশ কমিশনের প্রতিবেদনে পুলিশকে জনমুখী করা, পেশাগত দায়িত্ব্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা ও পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রকার আইনী রক্ষা কবজ তৈরীর সুপারিস করা হয়। এসব সুপারিসের মধ্যে পুলিশ কমিশন তৈরীর সুপারিস ছিল অন্যতম। কিন্তু ১৯৮১ সালে প্রকাশত এই পুলিশ কমিশনের সুপারিস সমূহ দীর্ঘ দিন বাস্তবায়িত না হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রকাশ সিং নামে একজন অবসর প্রাপ্ত আইপিএস অফিসার সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন( রিট পিটিশন (সিভিল) নং-৩১০/১৯৯৬ প্রকাশ সিং গং বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া ও অন্যরা) । মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ২২-০৯-২০০৬ তারিখের রায়ে ভারত সরকারকে পুলিশ কমিশনের সুপারিসসমূহ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের প্রেক্ষিতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য তাদের পুলিশ বিভাগ সমূহ নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কারের জন্য নতুন পুলিশ আইন তৈরী করে সেখানে পুলিশ কমিশন গঠনের বিধান অন্তর্ভূক্ত করে। অনেক রাজ্য পুরাতন আইনের সংস্কার করে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়। কোন কোন রাজ্য নির্বাহী আদেশে পুলিশের কিছু কিছু বিষয় সংস্কার করে সুপ্রিম কোর্টকে সন্তুষ্ট করার প্রয়াস পায়। ভারতের কেরালা, মহারাষ্ট্র সহ বেশ কয়েকটি রাজ্য ইতোমধ্যে রাজ্য ও জেলা পর্যায়ে পুলিশ কমিশন গঠন করেছে। এই সব কমিশনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আমলা, স্বনামধন্য নাগরিক, মানবাধিকার ও সমাজকর্মী, সাংবাদিক এবং নির্বাচিত ও অনির্বাচিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। অচিরেই ভারতের সকল রাজ্যে পুলিশ / জননিরাত্তা কমিশন গঠিত হবে বলে আশা করা যায়। কারণ, এটা তাদের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা।

প্রস্তাবিত জাতীয় পুলিশ কমিশন, বাংলাদেশঃ খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭ এর চতুর্থ অধায়ে প্রস্তাবিত জাতীয় পুলিশ কমিশনের সংগঠন, গঠন প্রক্রিয়া, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও অন্যান্য কার্যাবলী বর্ণনা করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রীকে (পদাধিকার বলে) সভাপতি করে গঠিত ১১ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় পুলিশ কমিশনে ০৪ জন সংসদ সদস্য, স্বারাষ্ট্র সচিব, পুলিশ প্রধান ও ০৪ জন নিরপেক্ষ সদস্য থাকবেন। সংসদ সদস্যদের ০২ জন সরকারী দল হতে ও ০২ জন বিরোধী দল হতে সংসদ নেতা ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার সাথে আলোচনা পূর্বক সংসদের স্পীকার মনোনয়ন দিবেন। নিরপেক্ষ সদস্যদের মধ্যে কমপক্ষে এক জন মহিলা হবেন।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও মহা-হিসাব রক্ষক ও নিয়ন্ত্রককে নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচনী কমিটি নির্ধারিত যোগ্যতা সম্পন্ন ০৬ জন ব্যক্তিকে নিরপেক্ষ সদস্য নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতিকে সুপারিস করবেন । এই ০৬ জনের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি যে কোন ০৪ জনকে নিয়োগ দিবেন। নিরপেক্ষ সদস্যরা কেবল এক মেয়াদের শর্তে ০৪ বছরের জন্য নিয়োগ লাভ করবেন। তাদের সম্মানী ও যাতায়াত ভাতা দেয়া হবে। অধ্যাদেশে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট কারণে কোন নিরপেক্ষ সদস্যকে কমিশনের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতির ভিত্তিতে অপসারণ করা যাবে।

কমিশনের সিদ্ধান্ত সমূহ সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে গৃহীত হবে। কমিশনের সভাপতির কোন ভোটাধিকার থাকবে না। তবে প্রস্তাব গ্রহণে পক্ষে বিপক্ষে সমান সংখ্যক ভোট পড়লে তিনি সিদ্ধান্ত মূলক ভোট দিতে পারবেন।

প্রস্তাবিত জাতীয় পুলিশ কমিশনের কার্যাবলী হবে;

(১) অধ্যাদেশের বিধান সাপেক্ষে কর্তব্য সম্পাদনের মাধ্যমে পুলিশ সার্ভিসের কাজকর্মের তত্ত্বাবধান এবং পুলিশি ব্যবস্থায় জনগণের অংশ গ্রহণে সহায়তা দেয়া;
(২) পুলিশ প্রধান হিসাবে নিয়োগের জন্য অতিঃ আইজিপির নিম্ন পদস্থ নহে এমন তিন জন পুলিশ কর্মকর্তার একটি প্যানেল সরকারের নিকট উপস্থান করা;
(৩) পুলিশ প্রধান ও ইউনিট প্রধান হিসেবে কর্মরত পুলিশ অফিসারদের দুই বৎসরের স্বাভাবিক মেয়াদ পূর্ণ হবার পূর্বে বদলীর জন্য (কারণ উল্লেখ পূর্বক ) সুপারিশ করা;

(৪) বিভিন্ন পুলিশ ইউনিট কর্তৃক প্রণীত পরিকল্পণা সমূহের বাস্তবায়ন তদারকী করা;

(৫) পুলিশ ইউনিট সমূহ থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন সমূহ বার্ষিক ভিত্তিতে প্রকাশ করা;
(৬) কমিশনের বাৎসরিক কর্মকাণ্ড, ইউনিট সমূহের কর্মকাণ্ড, দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইত্যাদি তথ্য সম্বলিত একটি বার্ষিক প্রতিবেদন সরকার ও সংসদের নিকট পেশ করা;

(৭) পুলিশ, ফৌজদারী মামলা রুজুকরণ, কারাগার এবং প্রবেশন বিষয়ক আইন ও কার্যবিধির, আধুনিকায়ন ও সংস্কারের জন্য সুপারিশ করা;
(৮) পুলিশ নীতি নির্ধারণী গ্রুপের প্রস্তাব সমূহ বিবেচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশসহ পেশ করা।

খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭ এ বর্ণিত জাতীয় পুলিশ কমিশন এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের পুলিশ কমিশন/বোর্ড সমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় পুলিশ কমিশন ও বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃত্বের মধ্যে একটি সন্তোষ জনক ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। আফ্রিকান দেশ নাইজেরিয়া, সার্ক দেশ শ্রীলংকা, শিল্পোন্নত দেশ জাপান সহ পৃথিবীর অনেক দেশের পুলিশ কমিশন একমাত্র পুলিশ প্রধান ছাড়া পুলিশের সকল সদস্যের নিয়োগ, বদলী, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা-শাস্তি ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পুলিশ আইনে পুলিশ সুপার থেকে উপরের পদে পদায়ন ও নিয়োগের দায়িত্ব সরকারের হাতে রাখা হয়েছে। তবে সরকারের সম্ভাব্য অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে সীমীত করার জন্য পুলিশ সুপার থেকে ডিআইজি পর্যন্ত পদে নিয়োগের জন্য পুলিশ প্রধানের সুপারিশ এবং অতিরিক্ত মহা-পুলিশ পরিদর্শকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় পুলিশ কমিশনের সুপারিশ ও পুলিশ প্রধানের সাথে সরকারের আলোচনা করার কথা বলা হয়েছে।

পুলিশ প্রধানদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষেত্রেও অন্যান্য দেশের পুলিশ কমিশন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও ফৌজদারী বিচার ব্যবস্থায় পুলিশ প্রধানের অপরিহার্য ভূমিকার জন্যই তার পদটিকে কাঙ্খিত মাত্রায় আইনী রক্ষা কবজ দেয়া হয়। পুলিশ কমিশন হল এই আইনী রক্ষা কবজের একটি অংশ মাত্র। তাই পুলিশ প্রধানকে অপসারণের ক্ষেত্রে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়া দরকার। পুলিশ কমিশনের সুপারিস পুলিশ প্রধানকে সেই রক্ষা কবজ দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় পুলিশ কমিশন ব্যতীক্রম কিছু নয়।

উপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭ এ প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন একটি বাস্তব সম্মত আধুনিক ব্যবস্থা। এই পুলিশ কমিশন পুলিশ বাহিনীকে বাড়তি কোন ক্ষমতা যেমন অর্পণ করে না, তেমনি সরকারের নির্বাহী ক্ষমতাও হ্রাস করে না। অন্যান্য দেশের পুলিশ কমিশনের হাতে যেমন একমাত্র পুলিশ প্রধান নিয়োগ ও অপসারণ ছাড়া অন্যান্য পদের নিয়োগ, বদলী, পদোন্নতি ইত্যাদি পুলিশ কমিশনের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় পুলিশ কমিশনে তদরূপ করা হয় নি। এ ক্ষেত্রে সরকারকে কেবল পুলিশ প্রধান বা পুলিশ কমিশনের সুপারিশ বা পরমর্শ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। প্রাসঙ্গিক কারণে পুলিশ কর্মকর্তাদের অকাল বদলী করার প্রয়োজন হলে তা যদি পুলিশ কমিশনের সুপারিশের মাধ্যমে হয়, সে ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্য ও সাধারণ জনগণের কাছে সরকারের কাজের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। তাই পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে অধিকতর স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে পারবে। অন্য দিকে সরকারী-বেসরকারী-পেশাজীবী ও অরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের আইনী নজরে থাকার ফলে পুলিশ বাহিনীও তাদের দায়িত্ব পালনে দক্ষ, পক্ষপাত শূন্য ও কার্যকর হবে। পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠার ফলে পুলিশ অফিসারগণ কেবল সরকারের কাছে নয়, বরং সরকারের বাইরেও সাধারণ জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে। পুলিশ কমিশনের মাধ্যমে সরকারের বাইরে থাকা সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা পুলিশকে সঠিক পথে পরিচালনায় সরাসরি অংশ গ্রহণ করতে পারবে। অন্যদিকে পুলিশ কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনের (যা সংসদে পেশ করা হবে) মাধ্যমে সংসদ সদস্যগণ পুলিশের কার্যাবলী মূল্যায়নের সুযোগ পাবে। সব চেয়ে বড় কথা হল, পুলিশ কমিশনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণও পুলিশের কাজ তদারকী, পুলিশকে পরামর্শ ও নির্দেশনা দিতে পারবে।

খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭ এর মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত ও বিচারের ভার পুলিশ ভিন্ন অন্যান্য বিশেষায়িত কর্তৃপক্ষের উপর অর্পণ করা হয়েছে। তাই এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে বাংলাদেশ পুলিশ স্বাধীনও হবে না, তাদের হাতে বাড়তি কোন ক্ষমতাও দেয়া হবে না; বরং এর ফলে পুলিশের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে পুলিশ কেবল একটি মাত্র গোষ্ঠির কাছে নয়; তারা সমগ্র জাতীর প্রত্যেকটি নাগরিকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।

সর্বশেষ কথা হল, আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা পুলিশের সংস্কার চাই কি না। যদি সংস্কার চাই তা হলে কি ধরণের সংস্কার চাই তা অবশ্যই পরিষ্কার করতে হবে। পুলিশকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা কি দুই শত বছরের পুরনো ঔপনিবেশিক ভাবধারাকে প্রশ্রয় দিব, না কি আধুনিক বিশ্বের মানবিক ভাবধারা গুলোকে লালন করব। পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে আমাদের এও মনে রাখতে হবে যে কেবল একটি নতুন আইন তৈরী করলে বা পুরাতন আইনের কতিপয় ধারায় পরিবর্তন আনলে পুলিশের সংস্কার হয় না। এ জন্য আমাদের পুরো পুলিশ-ব্যবস্থা তো বটেই সমগ্র ফৌজদাদি বিচার-ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে; পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে।
রচনা সূত্র:
1.www.npc.gov.lk
2.www.nigeria-law.org
3. http://www.nrb.gov.pk/about_nrb/index.html)
4.(http://en.wikipedia.org/wiki/National_Public_Safety_Commission_ (Japan)
5.http://www.globalsecurity.org/intell/world/japan/npsc.htm)
6. www.opsi.gov.uk; http://www.apa.police.uk/
7. www.vancouvar.ca.policeboard.com
8. (www.nipolicingboard.org.uk)