ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

উত্তরাঞ্চলের একটি বিভাগীয় জেলায় কর্মরত আমার সহকর্মী কথা প্রসঙ্গে জানালেন, তার এলাকায় নারী নির্যাতনের মামলা রুজুর হার বাংলাদেশের যে কোন জেলার চেয়ে বেশি। কিন্তু মরার উপর খড়ার ঘায়ের মতো এই হার ইদানীং অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। এই হার কিভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে তিনি আমার পরামর্শ প্রার্থনা করলেন। উল্লেখ্য, আমার পৈত্রিক নিবাস আলোচিত জেলাতেই। বর্তমান পদে আসার পূর্বে তিনটি জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কাজ করেছি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে আমাকে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অধীন প্রায় সকল মামলার তদন্তকাজ তদারকি করতে হত। তাই এ বিষয়ে আমার নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা ও বিশ্লেষণ রয়েছে।

প্রথমেই বিবেচনা করতে হবে নারী নির্যাতন আমাদের দেশে সর্বাংশেই একটি ফৌজদারি সমস্যা, না এর সামাজিক দিক রয়েছে। আমি মনে করি, এটা যতটা না ফৌজদারি অপরাধ, তার চেয়েও বেশি সামাজিক সমস্যা বা অসদাচরণ। সামাজিক সমস্যার সমাধানে সব দায়দায়িত্ব পুলিশের উপর ছেড়ে দিলে তার সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু, আজ পর্যন্ত এই বিষয়টিসহ অন্যান্য সামাজিক বিষয় পুলিশের উপর চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

তবে সামাজিক সমস্যার সমাধানে পুলিশের কি কোন ভূমিকা নেই? অবশ্যই আছে। যে সব সমস্যা প্রকারান্তরে পুলিশের সমস্যায় পরিণত হয়, সেইসব সমস্যার সমাধানের জন্য পুলিশকে স্বপ্রোণোদিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অপরাধের তদন্ত করা হল ঘটনা-তাড়িত কার্যধারা। কোন ভাবে পুলিশের গোচরে কোন অপরাধের ঘটনা এলে অর্থাৎ মামলা রুজু হলে পুলিশ তার তদন্ত করতে উদ্যোগী হয়। তদন্ত করে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা রাষ্ট্রের কর্তব্য। ফৌজদারি অপরাধ কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত হলেও তা আসলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তাদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মাললার তদন্ত, অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তিদান এই প্রতিশ্রুতিরই অংশ। কিন্তু, কোন নাগরিক ফৌজদারি বা অবৈধ ক্ষতির সম্মুখিন হওয়ার আগেই রাষ্ট্রের উচিৎ তাকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা। আর এই ধারণার ফলিতরূপ হল অপরাধ প্রতিরোধ করা।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে থানা পুলিশের কার্যকর কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না। মহাসড়কে সারারাত্র পাহারা দিয়ে সড়ক ডাকাতি রোধ করা হয়, কোন স্থানে মারামারি বা দাঙ্গার খবর পেলে পুলিশ সেখানে দ্রুত দাঙ্গাদমনে পারঙ্গম পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করে। কিন্তু, কোন বাসায় বা বাড়িতে নারী নির্যাতনের খবর পেলে পুলিশকে মামলার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন কাজ করতে দেখি না। অর্থাৎ নারী নির্যাতন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে থানা পুলিশের স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেওয়ার রেওয়াজ নেই।

অবশ্য এই ক্ষেত্রে স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেওয়ার অনেক ঝক্কি-ঝামেলাও রয়েছে। নারী নির্যাতনের অপরাধগুলো সাধারণত সংঘটিত হয় মানুষের বাসাবাড়িতে; গৃহের অভ্যন্তরে। কোন ব্যক্তি তাই এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ প্রার্থনা না করলে পুলিশের উপস্থিতি অনাকাঙ্খিত মনে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কোন বাড়িতে অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য পুলিশে বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হতে পারে। অপরাধ প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পুলিশকেই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

আর একটি কথা এখানে বলা প্রাসঙ্গিক হবে। অপরাধ প্রতিরোধ আর মামলা প্রতিরোধ বা মামলার সংখ্যা হ্রাস করা এক জিনিস নয়। কোন কমিউনিটিতে অপরাধের সংখ্যা বেশি হলেও সেই কমিউনিটিতে থানা পুলিশের খাতায় মামলার সংখ্যা কম হতে পারে। আবার অপরাধের মাত্রা কম থাকলেও থানায় মামলার সংখ্যা বেশি হতে পারে। কিন্তু, আজ পর্যন্ত অপরাধের সংখ্যা আর মামলার সংখ্যার মধ্যে আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা পার্থক্য করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি।

থানায় যখন নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন থানা পুলিশের টনক নড়ে। উপরওয়ালাদের চাপ বাড়ে। এই মাসে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে, তার পরের মাসে বিভিন্ন কৌশলে মামলার সংখ্যা কমানোর চেষ্টা চলে। এই চেষ্টা করা হয় সনাতনী পদ্ধতিতে। তাই, চলে মামলা গ্রহণে অস্বীকৃতি কিংবা সঠিক ধারায় মামলা রুজু না করে পুলিশের সুবিধামত অন্যকোন ধারায় রুজু করা। যেমন, ডাকাতির মামলাকে দস্যুতার মামলায় রুজু করা হতে পারে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অধীন মামলাকে দণ্ড বিধির আওতায় রুজু করা হতে পারে। এতে মোট অপরাধ সংখ্যার হ্রাস না ঘটলেও বিশেষ কিছু শ্রেণির মামলার সংখ্যা কম দেখিয়ে উপরওয়ালাদের তাৎক্ষণিক চাপ সামাল দেওয়া যায় কিংবা তাদের বোকা বানান যায়।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের মামলাগুলোর ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা হল, প্রকৃত কারণে কোন ভূক্তভোগী যখন থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করতে ব্যর্থ হয়, তখন তিনি চলে যান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। আদালত সেই মামলা গ্রহণ করে সাধারণত তদন্তের জন্য থানায় পাঠিয়ে দেন। এই কাজে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারী মাসে কেউ ট্রাইব্যুনালে মামলা করলে সেই মামলা থানায় গিয়ে রেকর্ড হতে পারে মার্চ বা এপ্রিল মাসে। তাই পুলিশ জানুয়ারী মাসে মামলা কমানো জন্য সনাতনী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ফেব্রুয়ারী মাসের পরিসংখ্যানে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা কমে আসবে। কিন্তু তার পরের মাসেই আদালত থেকে আসা মামলা রুজু করতে গিয়ে থানা পুলিশের খাতায় মামলার সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং তার হার অস্বাভাকিব হতে বাধ্য। অর্থাৎ মামলা কমানোর সনাতনী ব্যবস্থা গ্রহণ করে এক বা দুই মাস অপরাধ পরিসংখ্যান নিজেদের মতো করে তৈরি করা সম্ভব হলেও এই অবস্থা স্থায়ী হতে পারে না। অধিকন্তু, অপরাধের সংখ্যা কমানোর চেষ্টা না করে শুধু মামলার সংখ্যা কমানোর প্রচেষ্টা সফল হতে পারে না।

এক শ্রেণির আইনজীবী ও তাদের সহকারীগণ (মোহরার) নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলা সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখে। এমনও শোনা যায় এইসব আইনজীবী গ্রামে-গঞ্জে দালাল রাখেন যারা পরিসি’তি উদ্ভব হওয়ার সাথে সাথে ক্ষুব্ধ পক্ষকে আদালতে নিয়ে আসেন। অনেকে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল থেকে শুরু করে থানার অফিসারদের দিয়ে আসামী গ্রেফতার করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিরই ইজারা নিয়ে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ করেন। যে বিষয় বা বিরোধটি স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করা যেত কিংবা যে ঘটনাটি পুলিশের গোচরে আসলে পুলিশ অফিসারের মধ্যস্ততার মাধ্যমেই শেষ হয়ে যেত, এই জাতীয় উকিল-মোহরার হাতে পড়ে তা নিয়মিত মামলা পর্যন্ত গড়ায়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। কারণ, এই সমস্যার শিখড় এত গভীরে যে থানা পুলিশের পক্ষে তা উৎপাটন করা সম্ভব নয়। তাই পুলিশকে কমিউনিটি পুলিশিং ভাবধারা নিয়ে কাজ কতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং হল সমস্যা সমাধানমূলক পুলিশিং ব্যবস্থা। কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনে সমস্যা-কেন্দ্রিক কিছু কৌশল অবলম্বণ করা যায়। এই কৌশলে পুলিশকে সমস্যাগুলো সমাধানে চিহ্নিত করণ, বিশ্লেষণ, সাড়াদান ও মূল্যায়ন চক্রের আশ্রয় নেওয়া হয়। নারী নির্যাতন আইনের মামলাগুলো কমানোর জন্য স্থানীয় পুলিশ এই পদ্ধতিটি গ্রহণ করতে পারে।