ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

২০০৬ সাল। ডিসেম্বরের কোন এক বিকালে আপাতত লক্ষ্যহীন ভাবে একটা সরু রাস্তা দিয়ে কোন রকমে গাড়ি চালাতে বললাম ড্রাইভারকে। প্রায় আধাঘন্টা পর এক তিন-রাস্তার মোড়ে থামলাম। রাস্তার মোড়ে কয়েকটি মুদির দোকানও রয়েছে। স্থানটি মাগুরা জেলার সদর থানায় হলেও ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার সীমানায়। গ্রামে একটি মোটরগাড়ি দেখলে এমনিতেই বাচ্চকাচ্চরা ভীড় করে। পুলিশের গাড়ি দেখে কয়েক জন দোকানদার কাছে এলেন। গ্রামবাসীদের কুশল জিজ্ঞাসা করলাম। এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক কোন বিশেষ সমস্যা আছে কি না, জানতে চাইলাম। রেঞ্জ ডিআইজি জনাব মেজবাহুন্নবীর নিরব নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন ছিলাম। যেখানেই যাই নির্যাতিতা নারীদের সম্পর্কে জানতে চাই। খোঁজ নেই, এলাকায় নারী নির্যাতন বিষয়ক কোন ঘটনা ঘটেছে কি না। কিংবা এই সম্পর্কে কারো কোন অভিযোগ আছে কি না।

এক দোকানদার জানালেন, গ্রামের এক দরিদ্র মেয়েকে তার স্বামী অমানষিক নির্যাতন করে। মেয়েটিকে তার স্বামী মারপিট করে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন বাপের বাড়ি থেকে নিচ্ছে না। গ্রামের মানুষ অনেক দেন দরবার করেছেন। কিন্তু কোন সমাধান হয়নি। বেচারীর পিতা-মাতা তাকে নিয়ে বড় বিপদে আছে। আমি মেয়েটির পরিবারকে ডেকে পাঠালাম। তাদের কাছ থেকে তাদের কষ্টের কথা শুনলাম। তার জামাইও গরীব। তবে গরিব হলেই যে বউকে মারতে হবে এবং ঘাড় ধরে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে, এটা তো হতে পারে না।

ছেলে পক্ষের কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না। মেয়ের জামাই পুলিশের গাড়ি দেখেই দূরে সরে গিয়েছিল। আর তার পিতা-মাতার যখন ডাক পড়ল, তখন তারা কয়েকটি পগার পার হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। আমি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্যকে পরদিন আমার অফিসে ছেলে ও তার বাপ-মাকে হাজির করতে বললাম।

পরদিন ছেলের বৃদ্ধ বাবা-মা, বেচারীগণ বড়ই নিরীহ ও দরিদ্র, পুলিশের ভয়ে হোক আর ওয়ার্ড মেম্বারের চাপেই হোক, আমার অফিসে এসে হাজির। আমি তাদের বউকে বাড়িতে না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলাম। তারা সব দোষ ছেলের উপর চাপিয়ে দিলেন । আমি তাদের উপর প্রয়োজন মাফিক গানবোর্ট ডিপ্লোম্যসি খাটালাম। তারা তাদের বউকে বাড়িতে নিতে রাজি হয়ে আমার কাছ থেকে বিদায় নিলেন।

কয়েকদিন পর আমার অফিসে মেয়েটি ও তার মা এসে হাজির হল। শ্রদ্ধাবনত ঢঙ্গে ইনিয়ে বিনিয়ে আমাকে নানা কথায় কৃতজ্ঞতা জানাল। মেয়ের মায়ের কান্না থামে না। তার মেয়ের সংসার জোড়া দেয়ার জন্য আমাকে মা ও মেয়ে দুজনে মিলে জান্নাতুল ফিরদাউসটি মোটামুটি রেজিস্ট্রি করে দিল, আর কি!

মেয়ের মা এক সময় দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে আমার চেয়ার দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন। আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করতে চান। এক সময় হাত ধরে আমার হাতে ৫০ টাকার একটি নোট গুঁজে দেন।

আরে করেন কি ! করেন কি!! আমি অপ্রস্তুত হয়ে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করি।

মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাবা অনেক জনের কাছে বিচার দিয়েছি, আমার মেয়েকে তার স্বামীর সংসারে কেউ যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে নাই। আপনি নিজ উদ্যোগে খোঁজ নিয়ে আমার মেয়েকে তার শ্বশুরবাড়িতে সংসার করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাই, চা-বিস্কুট খাওয়ার জন্য আপনাকে এই পঞ্চাশটি টাকা দিলাম।

মহিলার কৃতজ্ঞতায় আমি মুগ্ধ হলাম। কিন্তু একজন হত দরিদ্র লোকের কাছ থেকে এভাবে উপঢৌকন নেওয়াটা আমার জন্য বড়ই বিব্রতকর ছিল। আমার মনে হচ্ছিল, বৃদ্ধ মহিলাকে হয়তো কেউ নির্দেশনা দিয়েছে। এই অফিসার তোমার এত বড় কাজ করে দিলেন, তুমি তাকে কিছু দিবা না? এই জাতীয় কোন মন্তব্যের প্রেক্ষিতেও সহজ সরল মানুষরা এই জাতীয় কাজ করতে পারে।

আমি মহিলাকে বললাম, এই টাকা আপনার অত্যন্ত কষ্টের রোজগার। আপনি কিভাবে এই টাকা রোজগার করেছেন? মহিলা বললেন, গতকাল তারা মা ও মেয়ে মিলে এক দুপুর এক গৃহস্থের পুকুরে জাগ দেয়া পাট ছুলেছেন। এটা ছিল সেই পাট ছোলার মজুরী। আমাকে কিছু টাকা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ দিবেন বলেই তারা পাট ছুলে এই টাকা রোজগার করেছে।

আমিও মহিলাকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। বললাম, মনে করেন আপনার উপহার আমি গ্রহণ করেছি। এবার আপনাকে তা আবার আমি দান করলাম। মা ও মেয়ে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা কৃতজ্ঞ মানুষের মতো আমার দিকে তাকাল এবং চোখ মুছতে মুছতে আমার অফিস থেকে বের হয়ে গেল।

পুলিশের চাকরিতে এ পর্যন্ত অনেক মানুষের অনেক উপকার করেছি। কিন্তু এই মা ও মেয়ের মতো অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা কেউ কখনো দেখায় নি। আমার মনে হয়, অন্তত এক মা ও তার মেয়েকে আমি খুশি করতে পেরেছি। হত দরিদ্র এই মায়ের কৃতজ্ঞতা আমার চাকরি জীবনের এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ কর্মসন্তুষ্টি।