ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আমি র‌্যাব থেকে বদলি হই। এই সময় আমার ছেলেটির বয়স ছিল মাত্র সাড়ে ৪ বছর। রাজশাহী আরআরএফ-এ যোগদান করে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে আমি ঢাকায় এসেছি পরিবার স্থানান্তর করতে। আমার বাসা ছিল উত্তরার ৮ নং সেক্টরে উত্তরা থানা কোয়ার্টারে । আমার গিন্নি বাসার জিনিসপত্র গোছগাছে ব্যস্ত। আমি ডিএমপিতে কর্মরত বন্ধুদের সাথে দেখা করতে সকালেই বের হয়ে যাই।

সকাল থেকেই আমার ছেলেটার গা টা গরম ছিল। বাসার জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত থাকায় আমার স্ত্রী তার দিকে তেমন খেয়াল রাখতে পারে নাই। কখন যে বাচ্চার জ্বর অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে তা তার মা জানতেই পারেনি। এক সময় প্রচণ্ড জ্বরে শিশুটি বেহুশ হযে যায় এবং তার মুখ দিয়ে ফেনা পড়তে শুরু করে।

অফিস চলাকালীন উত্তরার সরকারি বাসায় কোন পুরুষ মানুষ নাই বললেই চলে। আমার সহকর্মীদের সহধর্মীনীরা মিলে আমার ছেলেকে নিয়ে উত্তরার আইসি ক্লিনিকে যায়। ক্লিনিক থেকে ডাক্তারগণ আমার ছেলেকে ঢাকার শিশু হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। আমি তখন নিউ মার্কেট এলাকায় ছিলাম। খবর পেয়ে শিশু হাসপাতালে ছুটে আসি। আমার বাচ্চাটির গায়ের জ্বর তখন কিছুটা কমেছে।

জরুরি বিভাগ থেকে তাকে ভর্তির জন্য বলা হল। আমি কাউন্টারে দাঁড়ালাম। রেজিস্ট্রারে নাম-ধাম লেখাও হল। এর পর আমাকে আট হাজার টাকা জমা দেওয়ার জন্য বলা হল। হাসপাতালে ভর্তির প্রাক্কালে যে ভর্তি ফি পরিশোধ করতে হয় তা আমার জানা ছিল না। জরুরি প্রয়োজন। তর্ক করার সময় ও মানসিকতা কোনটাই নাই। তাই টাকার সন্ধান শুরু করলাম। আমার কাছে ছিল মাত্র পাঁচশত টাকা। তাও আবার এই টাকা বাচ্চার অসুখের কথা শুনে এক সহকর্মীর কাছে থেকে ধার করেছিলাম।

আমার প্রতিবেশী সহকর্মীদের সহধর্মীনীগণও প্রস’ত ছিলেন না। আমার স্ত্রীর কাছেও তেমন টাকা ছিল না। আমরা আমাদের সব টাকা একত্র করে দেখলাম, তা ভর্তির জন্য দাবীকৃত অগ্রিম টাকার অংকের সমান নয়। আমি কাউন্টারের লোকজনের কাছে অনুরোধ করলাম বাচ্চাকে আপাতত কিছু টাকা বাকী রেখে ভর্তি করতে। প্রতিশ্রুতি দিলাম, ভর্তি করার পরেই বাকী টাকা দিব । কিন্তু, তারা সম্পূর্ণ টাকা হাতে না পেয়ে আমার বাচ্চাকে ভর্তি করলেন না।

আমি বললাম, আমি একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা। আমি তো সরকারি নিয়ম অনুসারে অনেক কিছু বিনামূল্যে বা ছাড়-দেয়া হারে পেতে পারি। কিন্তু, কোন কিছুই তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে সাহায্য করল না । আমি ঢাকার শিশু হাসপাতালে আমার বাচ্চাকে আর ভর্তি করাতে পারলাম না।

কী আর করি! অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে গেলাম ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে। কিন্তু, সেখানে গিয়েও অবাক হলাম। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল, শুধু পুলিশের জন্য, তাদের সন্তানদের জন্য নয়। (অবশ্য এই অবস্থা এখন আর নাই)। এখানে পুলিশের সন্তানদের শুধু আউট-ডোর চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাদের ভর্তি করার কোন বিধান নাই। ডাক্তারগণ আমার ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করলেন না। বললেন, এখানে একটি পর্যবেক্ষণ কক্ষ আছে। এখানে রেখে দেখি, কিছু করা যায় কি না।। তবে, এটা ছিল অতিরিক্ত জ্বরে বিকার মাত্র। জ্বর কমে গিয়েছে। বাচ্চার নাকে মুখে নেবুলাইজেশন দিলেই ভাল হবে। বিকেল নাগাধ আমি বাসায় ফিরলাম।

এই হল আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার মান, হাসপাতালে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারি ও ডাক্তার-নার্সদের আচরণ। আমি বাংলাদেশ সরকারের একজন প্রথম শ্রেণির অফিসার হয়েও নগদ টাকা না থাকায় আমার গুরুতর অসুস্থ বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে পারি নাই। তা হলে, এই সব হাসপাতাল থেকে কারা চিকিৎসা পায় ও কিভাবে পায়? লিংক দেখুন