ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ভূমিকাঃ সাধারণ মানুষ পুলিশ সম্পর্কে যে সব নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন তাদের অধিকাংশই সত্য ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। পুলিশকে ঘিরে আদিকাল থেকেই তৈরি হয়েছে নানা ধরণের কল্পকাহিনী ও পূর্ব সংস্কার। পুলিশ সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক ধারণার অসারতা বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৯০ সালের জানুয়ারী মাসে ভারতের নয়া দিল্লি থেকে প্রকাশিত দৈনিক দি স্টেটসম্যান পত্রিকায় এতদ সংক্রান্ত একটি জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে যে জরিপ কৃত ব্যক্তিরা পুলিশকে চরম ঘুষখোর, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও নৈতিকতা বর্জিত বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, জরিপে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনেরও বেশী মানুষ কোন দিন পুলিশকে ঘুষ দেন নি কিংবা তারা কোন অপরাধীকে পুলিশ কর্তৃক মারপিট করতেও দেখেন নি । পুলিশ সম্পর্কে ধারণা বা পূর্বসংস্কার গঠনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত তিনটি কারণ দায়ী বলে গবেষকগণ মনে করেন , যেমন-
1) ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির নির্দিষ্ট চাহিদা বা সমস্যা;
2) ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির পুলিশ অফিসার সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও
3) বিভিন্ন মাধ্যমে উপস্থাপিত বা প্রচারিত পুলিশের সাধারণ ভাবমূর্তি

তরুণ সমাজ পুলিশ সম্পর্কে কিরূপ পরষ্পর বিরোধী ধারণা পোষণ করে তা ভারতের ০৯ টি বৃহৎ শহর/ মেট্রোপলিটনের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২,০৭১ জন ছাত্র-ছাত্রীর উপর পরিচালিত এক গবেষণায় পরিষ্কার হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে এই সব ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শতকরা ৭৫ জনেরই পুলিশ অফিসার ও পুলিশ ব্যবস্থার প্রতি রয়েছে অত্যন্ত নেতিবাচক ধারণা। এদের শতকরা ৬০-৯০ ভাগ পুলিশকে ঘুষখোর বলে মনে করেন। ৩২-৬৫ ভাগ মনে করেন পুলিশ জনগণের প্রতি সংবেদনশীল নয় । অথচ এদের মধ্যে শতকরা ৭২ জন কোন দিন কোন পুলিশ সদস্যদের সংস্পর্শে আসেন নি কিংবা তারা কোন দিন কোন পুলিশ সদস্যের সাথে কোন কথা পর্যন্ত বলে নি ।

পূর্বসংস্কারজাত নেতিবাচক ধারণার ফলে মানুষ পুলিশ থেকে দূরে সরে থাকতে চায়। এর ফলে পুলিশ যেমন তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে না, তেমনি আইনানুসারে সম্পাদিত পুলিশি কর্মকাণ্ডও জনগণের অনুমোদন পায় না। তাই সাধারণ মানুষ ও পুলিশ সংগঠন উভয়েরই স্বার্থে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণ সমাজের এই ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটিয়ে তাদের অন্তরে পুলিশ সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ও সহানুভূতিশীল ধারণার অনুপ্রবেশ ঘটানো দরকার। অনেকে মনে করতে পারেন, পুলিশ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব আইন অনুসারে মানবিকতা দেখিয়ে সুচারু রূপে পালন করলেই মানুষের মন থেকে কথিত ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটবে। এ জন্য পুলিশের সাংগঠনিক পরিবর্তন, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি বা পুলিশের অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই যথেষ্ঠ হবে। কিন্তু, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মানুষের মন থেকে পূর্বপুরুষাগত পূর্বসংস্কার সমূহ কেবল রুটিন কর্মকাণ্ডের পরিশীলতা ও দক্ষতা বিধান করে নিরসন করা সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার ভিন্ন ধরণের প্রচারণা, অনুপ্রেরণা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মসূচির।

তরুণদের নিয়ে বিভিন্ন প্রকার কর্মসূচিঃ পুলিশ সম্পর্কে জনগণের কতিপয় ভ্রান্ত ধারণা দূর করা, সমাজে পুলিশের প্রকৃত ভূমিকা তুলে ধরা, পুলিশী দায়িত্বের গুরুত্ব, ঝুঁকি, আইনগত দিক সমূহ জনগণের মাঝে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে সঞ্চারিত করে পুলিশ ও জনগণের মধ্যকার বিরাজমান দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য পৃথিবীর অনেক দেশের পুলিশ বিভাগ সমূহ বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচি পালন করে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে হংকং পুলিশের জুনিয়র পুলিশ কল, লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের, ভলান্টিয়ার পুলিশ ক্যাডেটস , অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের পুলিশ স্কাউট , ভারতের তামিল নাড়ু রাজ্যের ফ্রেন্ডস অব পুলিশ, আমেরিকার যুক্ত রাষ্ট্রের স্কুল রিসোর্স পুলিশ অফিসার ইত্যাদি। ১৯৬০ এর দশকে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গ রাজ্যের স্টকটন পুলিশ বিভাগ যুব সমাজের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা বৃদ্ধির জন্য যে জনপ্রিয় কর্মসূচিটি পরিচালনা করেছিল তার নাম ছিল পুলিশের সাথে শনিবার । বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগ স্টকটন পুলিশের এই কর্মসূচিটি অতি সহজেই গ্রহণ করতে পারে।
.
পুলিশের সাথে একদিন কর্মসূচিটি বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের কাছে অপরিচিত মনে হলেও এই জাতীয় কর্মকাণ্ড একদম বিরল নয়। এই লেখক নিজে ২০০৭ সালে মাগুরা জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশ গ্রহণে এই জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছিলেন। কয়েক জন তরুণ পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টরের প্রত্যক্ষ সহায়তায় (সাব-ইন্সপেক্টর ফিরোজের আগ্রহ ও উৎসাহ এই বিষয়ে উল্লে¬খ করার মতো) লেখকের নেতৃত্বে প্রথমে মাগুরা জেলার শালিখা থানায় এই জাতীয় কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচির শিরোনাম ছিল, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য থানা পরিদর্শন কর্মসূচি। এর শ্লোগান ছিল, পুলিশ দেখে ডরাইনে আর, পালাই নে আর ভয়ে। শ্লোগানটি গ্রহণ করা হয়েছিল প্রখ্যাত ছড়াকার ও কবি সুকুমার রায়ের সাহস নামক ছড়ার প্রথম লাইন থেকে। শ্লোগান থেকে বোঝা যায়, এই কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের থানা পরিদর্শনের মাধ্যমে থানার পুলিশ অফিসারদের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার সাহায্যে পুলিশ সম্পর্কে অহেতুক ভীতি দূর করা।

এই কর্মসূচির আওতায় থানার পার্শ্ববর্তী দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের থানায় এনে প্রায় তিন ঘন্টার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে ছিল শিক্ষার্থীদের পুলিশ কর্তৃক ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সাজ-সরঞ্জাম প্রদর্শন, থানার ফৌজদারি ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দান, থানার বিভিন্ন সেরেস্তা, মালখানা, হাজতখানা, ব্যারাক ভবন পরিদর্শন, প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়ে সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা, পুলিশ কুইজ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। শালিখা থানায় আয়োজিত এই কর্মসূচি পত্র-পত্রিকায় প্রচারিত হলে তা জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার জনাব মোহাম্মদ মুসলিম সহ অন্যান্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এই কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে মাগুরা জেলার প্রায় সব কয়টি থানায় বাস্তবায়িত হয়। বলা বাহুল্য, এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পুলিশের সাথে রাখা হয় এবং এতে পুলিশের কর্মকাণ্ডের সামান্য অংশই শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়। অন্য দিকে শিক্ষার্থীগণ প্রাথমিক স্তরের হওয়ায় তাদেরকে এর বেশী ধারণা দান সম্ভবও ছিল না।
.
Thana Vvisiting by students09.04.07 (1)
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পরিচালিত উপরিউক্ত কর্মসূচিকে পুলিশের সাথে একদিন নাম দেয়া অধিকতর যুক্তি সংগত বলে আমি মনে করি। তবে এই কর্মসূচি প্রাথমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পরিচালিত হলে অপেক্ষাকৃত বেশী ফল পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস। মাগুরা জেলায় আমার কর্মসূচিতে ছাত্র-ছাত্রীদের অংশ গ্রহণ ও কর্মকাণ্ড কেবল থানার মধ্যেই সীমিত ছিল। কিন্তু পুলিশের সাথে এক দিন কর্মসূচিটি পুলিশ সুপারের কার্যালয় তথা জেলা পুলিশসহ পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। নিম্নে এই কর্মসূচির বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা হল।

কর্মসূচির নামঃ পুলিশের সাথে এক দিন
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ তরুণ সমাজের মধ্যে পুলিশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা
অংশগ্রহণকারীঃ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীগণ
বাস্তবায়নকারীঃ থানা পুলিশ, ইউনিয়ন/থানা কমিনিটি পুলিশিং সমন্বয় কমিটি।

কর্মপদ্ধতিঃ এই কর্মসূচি শুরু হবে থানা থেকে। এ জন্য থানার অফিসার-ইন-চার্জ থানার কমিউনিটি পুলিশিং অফিসারের মাধ্যমে কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণের জন্য তরুণদের বাছাই করবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও তরুণদের এই কর্মসূচিতে যুক্ত করা যেতে পারে। তবে আপাতত উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। অংশগ্রহণকারী সংগ্রহের জন্য থানা এলাকায় অবস্থিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রধানদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের এই সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয় নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংশ্লি¬ষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে মত বিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। এই অনুষ্ঠানে শিসক কর্মসূচির পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে পুলিশের সাথে একদিন কর্মসূচির ধারণা দেয়া ও সম্ভব হলে তাৎক্ষণিকভাবে এর জন্য অংশ গ্রহণকারীদের তালিকা তৈরী করা। অংশগ্রহণকারীদের মোট সংখ্যা ৩০ এর বেশী হওয়া উচিত নয়। তালিকায় কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবককেও অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। এই সব অভিভাবক ও শিক্ষক পরবর্তীতে অন্যান্য অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচি সম্পর্কে সচেতন করতে পারবেন।

অংশগ্রহণকারীদের তালিকা তৈরী সম্পন্ন হলে নির্ধারিত দিনে অংশগ্রহণকারীদের সকাল ০৯ ঘটিকায় থানায় উপস্থিত হওয়ার জন্য বলা হবে। পুলিশের সাথে একদিন কর্মসূচির তারিখ পারতপক্ষে শনিবার বা অন্য কোন সরকারী ছুটির দিনে করা যেতে পারে। অংশগ্রহণকারীদের তাদের স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পুলিশের যানবাহন যোগে সংগ্রহ করে থানায় আনা যেতে পারে।

থানার গোল ঘরে বা সুবিধাজনক কোন স্থানে অংশগ্রহণকারীদের একত্রিত করে কর্মসূচি শুরু করা যেতে পারে। সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার বা তদোর্ধ্ব পুলিশ কর্মকর্তাগণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যথা সম্ভব প্রচারণামূলক ব্যানার, ফেস্টুন ইত্যাদি সংযুক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় ও জাতীয় প্রচার মাধ্যম সমূহের প্রতিনিধি/ সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ করা যেতে পারে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান যতদূর সম্ভব সংক্ষিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমন্ত্রিত অতিথিদের এই দিন বক্তৃতাদানের পরিবর্তে তরুণ অংশগ্রহণকারীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণই মোক্ষম হওয়া উচিত।

থানার অফিসার-ইন-চাজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য পেশ করবেন। অবশ্য পরবর্তীতে তিনি অথবা কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার (সিপিও) তার থানার গঠন, জনবল ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা পেশ করতে পারেন।

অতঃপর সমাজে পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে প্রশিক্ষণার্থীদের সংক্ষিপ্ত ধারণা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের অপরিহার্যতা, তাদের কাজের পরিধি, দায়িত্ব পালনে সম্পদ, সুযোগ ও আইনগত সীমাবদ্ধতা, জনগণের সাথে পুলিশের সম্পর্কের প্রকৃতি, জনগণ কর্তৃক পুলিশকে সাহায্য করা এবং পুলিশের কাজে সাধারণ জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে।

একটি সংক্ষিপ্ত চা-বিরতির পর অংশগ্রহণকারীদের থানার বিভিন্ন স্থাপনা যেমন, মালখানা, অস্ত্রাগার, হাজতখানা, ব্যারাক, বিভিন্ন সেরেস্তা সরেজমিনে ঘুরে ঘুরে দেখানো যেতে পারে। এই পর্বে তাদের পুলিশ কর্তৃক ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকার সরঞ্জামাদি, যেমন, হাতকড়া, দাঙ্গা দমনে ব্যবহৃত পোশাক-পরিচ্ছদ, বেতার যন্ত্রাদি, কম্পিউটার সামগ্রি ইত্যাদি প্রদর্শন করা যেতে পারে। থানার অফিসার-ইন-চার্জ ডিউটি অফিসারের সহায়তায় থানায় আগত সেবা প্রার্থীদের সেবা দান প্রক্রিয়া সম্পর্কে এই পর্যায়ে ধারণা দিতে পারেন। সেবা প্রার্থীদের অংশগ্রহণকারীগণ প্রশ্ন করে তার সমস্যাটি জেনে নিতে পারেন। এই সেবা প্রার্থীকে কি জাতীয় সেবা দেয়া হচ্ছে বা তিনি কি ধরণের সেবা পেতে পারেন বা তিনি আদৌ সেবা পেতে পারেন কি না তা অংশগ্রহণকারীদের বুঝিয়ে বলা যেতে পারে।

এরপর প্রশিক্ষণার্থীদের দুই ভাগে ভাগ করে একটি সংক্ষিপ্ত বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। বিতর্কের বিষয় বস্তু অবশ্যই পুলিশ-পাবলিক সম্পর্কের উপর হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে কেউ বিতর্ক অনুষ্ঠানের সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। অন্যান্য অতিথিগণ বিচারকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। অবশ্য বিতর্ক অনুষ্ঠান সম্ভব না হলে পুলিশ কুইজ, অপরাধ বিরোধী কবিতা রচনা ইত্যাদি বিষয়ও অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে।

বিতর্ক অনুষ্ঠান ছাড়াও প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে পুলিশ অফিসারদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নোত্তরের আয়োজনে চলতে পারে। এই অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থীগণ পুলিশকে অভিযুক্ত করে যে কোন প্রশ্ন করতে পারেন বা পুলিশ সম্পর্কে তাদের মনোভাব ব্যক্ত করতে পারেন। উপস্থিত সিনিয়র পুলিশ অফিসারগণ প্রশিক্ষণার্থীদের উন্মুক্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করবেন।

এর পর প্রশিক্ষণার্থীদের ট্রাফিক পুলিশিং সম্পর্কে সম্মক ধারণা দেয়ার জন্য ট্রাফিক পুলিশের সহায়তায় থানার নিকটবর্তী একটি স্থানে যানবাহন চেকিং ও প্রসিকিউশন দানের আয়োজন করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণার্থীগণ নিজেরা গাড়ি চেকিং কাজে অংশ নিবেন এবং গাড়িতে বা চালকের কাছে যে সব রেকর্ডপত্র সার্বক্ষণিক রাখা বাধ্যতামূলক সেসব সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করবেন। একটি গাড়ি চেক করার সময় গাড়ির বা এর সাথে সংশ্লি¬ষ্ট ডকুমেন্টের ত্রুটি সমূহ সম্পর্কে প্রশিক্ষণার্থীদের অবহিত করবেন।

অতঃপর প্রশিক্ষণার্থীদের জেলা পুলিশ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দানের জন্য পুলিশ সুপারের অফিসে নেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের পিকআপ ভ্যানের পাশা-পাশি ভাড়া করা বাস বা মাইক্রোবাস ব্যবহার করা যেতে পারে। পুলিশ সুপারের অফিসে অংশগ্রণকারীদের বহনকারী বাস সমূহ পুলিশ-পাবলিক সস্পর্কের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন শ্লোগান সম্বলিত ব্যানার দিয়ে সাজানো যেতে পারে। বাসের সামনে পুলিশের সাথে একদিন শব্দমালা বড় আকারের ব্যানারে লিখা যেতে পারে। অংশগ্রহণকারীদের বাসগুলো শহরের বিভিন্ন স্থানে টহল দিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রচারণা কাজ চালাতে পারে।

পুলিশ সুপার তার সম্মেলন কক্ষে অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানাবেন। জেলা পুলিশের গঠন, জনবল ও কার্যাবলী সম্পর্কে পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বা এএসপি (সদর) একটি সংক্ষিপ্ত পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা দিতে পারেন। একটি সংক্ষিপ্ত চা-চক্রের মাধ্যমে পুলিশ সুপারের সাথে তরুণদের সাক্ষাৎ পর্বটি সম্পন্ন হতে পারে। অতঃপর পুলিশ অফিসের বিভিন্ন সেরেস্তা প্রশিক্ষণার্থীদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো যেতে পারে।

যে সব জেলায় পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র/ একাডেমী রয়েছে সেই সব জেলায় অংশকারীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শন করানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র/ একাডেমির প্রধানের সাথে পূর্ব থেকেই অনুমতি ও সাক্ষাতের সময়সূচী গ্রহণ করতে হবে।

অংশগ্রহণকারীদের দুপুরের খাবারের পর্বটি পুলিশ লাইন্সের ডাইনিং হলে সম্পন্ন করা যেতে পারে। এখানে পুলিশ লাইন্সের আরআই প্রশিক্ষণার্থীদের স্বাগত জানাবেন। দুপুরের খাবারের পূর্বে বা পরে পুলিশ লাইন্সের বিভিন্ন স্থাপনা প্রশিক্ষণার্থীদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো যেতে পারে।

পুলিশের সাথে একদিন কর্মসূচি সমাপ্ত হবে সংশ্লিষ্ট থানার গোল ঘরে এসে একটি পর্যালোচনামূলক পর্বের (ডিব্রিফিং) মাধ্যমে। এই পর্বে প্রশিক্ষণার্থীদের পক্ষ থেকে কর্মসূচির উপর মূল্যায়ন ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হবে। থানার অফিসার-ইন-চার্জ সম্ভব হলে প্রশিক্ষণার্থীদের একটি করে সার্টিফিকেট বা ক্রেস্ট উপহার দিতে পারেন।

অর্থায়নঃ পুলিশের সাথে একদিন কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বেসরকারী উৎস (আউট সোর্সিং) থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে থানা এলাকায় অবস্থিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সমূহ, ব্যবসায়িক সমিতি কিংবা কমিউনিটি পুলিশিং বিভিন্ন কমিটি/ফোরামের সদস্যগণ ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে অনুদান দিতে পারেন। থানা এলাকায় পরিবহণ সমিতি সমূহ বিনা ভাড়ায় বাস/মাইক্রোবাস সরবরাহ করতে পারেন। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ সুপার তার সরকারি/বেসরকারি তহবিল বা সোর্স মানি থেকে থানা পুলিশকে সহায়তা করতে পারে। অন্যান্য সেবাভোগীদের সহায়তায় ত্রিশ জন অংশগ্রহণকারীর একটি অনুষ্ঠান সর্ব নিম্ন ৫,০০০/-(পাঁচ হাজার) টাকায় সম্পন্ন করা সম্ভব ।

ফলাফলঃ পুলিশের সাথে একদিন কর্মসূচি শিক্ষার্থী সম্পৃক্তকরণ কর্মসূচি ( শিসক) এরই একটি অংশ মাত্র। পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের পূর্ব সংস্কারজাত অমূলক ধারণাগুলো সুধরিয়ে পুলিশ সম্পর্কে একটি বাস্তব সম্মত সঠিক ধারণার জন্ম দেয়া শিসক কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী তরুণ-তরুণীগণ মাত্র কয়েকটি ঘন্টা পুলিশের সাথে কাটিয়ে পুলিশের জীবন-যাপন, কর্মপদ্ধতি, দায়িত্ব পালনে পুলিশের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানতে পারবেন। একই সাথে তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবেন। পুলিশ সম্পর্কে পত্র-পত্রিকাসহ অন্যান্য প্রচার মাধ্যম ও জন শ্রুতির মাধ্যমে যেসব নেতিবাচক ধারণা ইতিমধ্যেই তাদের অন্তরে দানা বেঁধেছে পুলিশের সাথে এক দিন থেকে তারা সেসব থেকে মুক্ত হতে পারবেন এবং ভবিষ্যতে পুলিশ সম্পর্কে সহজে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করবেন না। অংশগ্রহণকারীগণ পরবর্তীতে তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সহপাঠী, খেলার সাথী ও বন্ধু-বান্ধবদের বর্ণনা দিবেন ও পুলিশ সম্পর্কে সমবয়সী এমনকি শিক্ষক ও অভিভাবকদের পূর্বসংস্কার নিরসনে এ্যাডভোকেটের ভূমিকা পালন করবেন।

বাংলাদেশের সকল থানায় প্রতি মাসে অন্তত একটি করে পুলিশের সাথে এক দিন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হলে প্রতি বছর সারা দেশে প্রায় দেড় লক্ষ তরুণ-তরুণী নিবিড়ভাবে পুলিশের সংস্পর্শে আসবে। এই কর্মসূচি ৫ বছর ধরে পরিচালনা করা গেলে দেশের প্রায় সাড়ে সাত লাখ তরুণ-তরুণীর পুলিশ সম্পর্কে পূর্বসংস্কার দূর করে পুলিশের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলা যাবে। অধিকন্তু, এই সব তরুণ-তরুণীদের বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী ও খেলার সাথীগণসহ যুব সমাজের একটি বিপুল অংশের পুলিশের প্রতি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরী হবে। অর্থাৎ এই কর্মসূচি পাঁচ বছর পরে বাংলাদেশ পুলিশকে একটি সহানুভূতিশীল তরুণ সমাজ উপহার দিতে পারবে যারা আইন প্রয়োগ ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশের চলমান কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের মাধ্যমে পুলিশের কাজে জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা ও সমস্যা সমাধানের মিশনে পুলিশের সাথে এক দিন কর্মসূচিটির বাস্তবায়ন তাই যতদূর সম্ভব দ্রুত শুরু করা দরকার।
.