ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ভূমিকাঃ জাতিসংঘ শিশু তহবিলের তথ্যানুসারে বাংলাদেশের প্রায় ৬৬% মেয়েকে ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ের পিড়ীতে বসতে হয়[1]। সামগ্রিকভাবে বাল্য বিবাহ একটি সামাজিক সমস্যা। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে এটি একটি ফৌজদারি অপরাধও বটে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক বা বালিকারা এই অপরাধের শিকার/ ভিকটিম । কিন্তু তারা এর কোন প্রকার প্রতিবাদ করার সাহস পায় না কিংবা নালিশ করার মতো অবস্থায় থাকে না। এই অপরাধের সাথে জড়িত থাকেন কনে ও বরের অভিভাবকগণ। কিন্তু, উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই অপরাধ সংঘটিত হয় বলে এই অপরাধ হয়ে পড়ে অভিযোগহীন। বাল্য বিবাহ সমাজে একটি বড় উদ্বেগের কারণ। নারী ও শিশু নির্যাতন ( নিরোধ) আইনের অধীন বহু সংখ্যক মামলার মূল কারণ এই বাল্য বিবাহ। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুসারে গত ২০১১ সালে সারা দেশে পুলিশের খাতায় ১,৬৯,৬৬৭ টি মামলা রুজু হয়েছিল যাদের মধ্যে ১৯,৬৮৩ টি ছিল নারী ও শিশু নির্যাতন । এই হিসেবে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা মোট মামলার প্রায় ১১.৬ শতাংশ[2]। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অধীন এই সব অপরাধের একটি বড় অংশ বাল্য বিবাহের সাধারণ পরিণতি।

বাল্য বিবাহ অপরাধ সংগঠনকারী ব্যক্তিগণঃ বিবাহকারী ব্যক্তি যার বয়স পুরুষ হলে ২১ বছরের উপরে এবং মহিলা হলে ১৮ বছরের উপরে; নাবালকের পিতা-মাতা ও অভিভাবক, বিবাহ পরিচালনাকারী, নিবন্ধনকারী কাজীগণ কিংবা তার সহযোগিগণ।

অপরাধের শিকারঃ নাবালক/ নাবালিকাগণ। মেয়ে হলে বয়স ১৮ বছরের নীচে এবং পুরুষ হলে ২১ বছরের নীচে।

আইনগত দিকঃ বাল্য বিবাহ নিরোধ আাইন,১৯২৯ অনুসারে ২১ বছর বয়সের পূর্বে কোন পুরুষ ও ১৮ বছর বয়সের পূর্বে কোন নারী বিবাহ বন্ধনে/ চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে না। তবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধকারী যে কারো বয়স যদি এই সীমা (পুরুষ-২১, মহিলা-১৮) অতিক্রম করে তবে যার বয়স বেশী সে হবে অন্যতম অপরাধী এবং তাকে এক মাস পর্যন্ত বিনা শ্রম কারাদণ্ড বা এক হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়বিধ শাস্তি দেয়া যেতে পারে[3] । বাল্য বিবাহ পরিচালনা, অনুষ্ঠান বা নির্দেশ দাতারও উল্লেখিত পরিমাণ শাস্তি হবে। নাবালকের পিতা-মাতা, অভিভাবক যদি বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে ব্যর্থ হন হবে তাদেরও একই পরিমাণ শাস্তি হবে। তবে কোন মহিলাকে এই আইনের আওতায় কারাদণ্ড দেয়া যাবে না।

অভিযোগ দায়ের ও বিচারঃ এই আইনের অধীনে অপরাধ আমলে নেয়ার ও তা অনুসন্ধানের ক্ষমতা কেবল প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের রয়েছে। আদালত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভা বা মিউনিসিপ্যালিটি/ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বা ক্ষেত্র মতে সরকার কর্তৃক নিধারিত ব্যক্তির ( যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন নেই) আনিত অভিযোগ ছাড়া অপরাধ আমলে নিবেন না। অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রগণ ছাড়া এই মামলার কেউ বাদি হতে পারবেন না। অধিকন্তু, অপরাধ সংগঠনের এক বছর পার হলে এই অপরাধ তামাদি হয়ে যাবে।

এই আইনের বলে আদালত বাল্য বিবাহ আয়োজনের প্রাক্কালে এই কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করতে পারেন এবং নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গকারীদের তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা এক হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয়বিধ শাস্তি দিতে পারবে।

বাল্য বিবাহ রোধে পুলিশের আইনগত দায়িত্বঃ প্রচলিত কোন আইনে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে পুলিশকে সরাসরি কোন দায়িত্ব অর্পন করা হয় নাই। নাবালকের অভিভাবক ও পিতা-মাতারা নিজেরাও অপরাধের সহযোগী বা সংগঠনকারী হওয়ায় তাদেরও প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরাই মূলত এই অপরাধ প্রতিরোধের ও প্রসিকিউশনের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করবেন। অধিকন্তু, এই সব অপরাধ অধর্তব্য হওয়ায় এ সম্পর্কে থানায় মামলা রুজু কিংবা থানা-পুলিশ কর্তৃক অপরাধ তদন্তেরও কোন ব্যবস্থা নেই।

কমিউনিটি পুলিশিং ও বাল্য বিবাহঃ কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনে পুলিশ জনগণের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অপরাধ সমূহের কারণ নির্ণয় করে সে সব দূর করার চেষ্টা করে। কোন অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ যেমন মামলা গ্রহণ, তদন্ত, আসামী গ্রেফতার পূর্বক আদালতে প্রেরণ, পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশ অনুসারে সমন জারী, ওয়ারেন্ট তামিল তথা মামলার রায় কার্যকর করে, তেমনি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে সেই অপরাধ প্রতিরোধ করা হল পুলিশের নিয়মিত দায়িত্ব। যেহেতু বাল্য বিবাহ নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে নিয়মিত মামলার একটি বড় কারণ, তাই পুলিশ বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে কমিউনিটির উদ্যোগের সাথে অবশ্যই যোগ দিবে। পুলিশ জানে, আজকে যে বালিকার বিয়ে হচ্ছে সে আগামীকাল স্বামী পরিত্যাক্তা হতে পারে, পারিবারিক কলহে সে আত্মহত্যা করতে পারে কিংবা যৌতুকের দায়ে তাকে নির্যাতন বা হত্যা পর্যন্ত করা হতে পারে। বাল্য বিবাহ পুলিশের সমস্যা নয় বটে, কিন্তু,বাল্য বিবাহের উপজাত হিসেবে যা তৈরি হয়ে তা পুরোমাত্রায় পুলিশের এখতিয়ারভূক্ত। এমতাবস্থায়, পুলিশ কর্তৃপক্ষ বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করবে। তবে, আমাদের দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহ কাঙ্খিত মাত্রায় কার্যকরী ও উদ্যোগী নয়। তাই, এই ব্যাপারে পুলিশকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে পুলিশের সম্ভাব্য কর্মপদ্ধতিঃ বাল্য বিবাহের কারণগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অসচেনতা, সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদিই প্রধান। এই সব কারণের বেশির ভাগই পুলিশ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত নয় বলে পুলিশের পক্ষে এই সব কারণ দূর করা সম্ভব নয়। তাই, কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকে কার্যকর করার মাধ্যমে পুলিশ কর্তৃপক্ষ কতিপয় বিষয় আশু সমাধান করতে পারে। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, যেমন- ছোট ছোট সভা, রেলি, বিলবোর্ড স্থাপন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রতিরোধমূলক মনোভাব তৈরি করা যেতে পারে।

নাবালকের পিতা-মাতা, বিশেষ করে মেয়ের অভিভাবকগণ, বর্তমানে রেজিস্ট্রি করা ছাড়া বিয়ে দিতে রাজি হয় না। তাই, বিবাহ রেজিস্ট্রারদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এই সমস্যার আপাতত অনেকটা সুরাহা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সহায়তায় স্থানীয় কাজীদের নিয়ে মিটিং করতে পারে। মিটিং এ সকল কাজী প্রতিশ্রুতি দিবেন যে তারা পাত্র-পাত্রীদের সরকারিভাবে স্বীকৃত বয়স প্রমাণের সনদ ছাড়া কোন বিবাহ রেজিস্ট্রি করবেন না। এ ক্ষেত্রে তারা বালিকার স্কুল কর্তৃপক্ষের পঞ্চম, অষ্টম শ্রেণী পাশ এবং সম্ভব হলে এসএসসি পরীক্ষার সনদপত্রের উপর নির্ভর করবেন। ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক প্রদেয় জন্ম সনদপত্র কিংবা নোটারী পাবলিকের এফিডেভিট পত্রকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদের সাথে মিলিয়ে না দেখা পর্যন্ত তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন না।

এর পরও কোন কাজী বাল্য বিবাহ রেজিস্ট্রি করলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে তা থানায় রক্ষিত সাধারণ ডায়েরী বহিতে লিপিবদ্ধ করে তার কপি বিবাহ রেজিস্ট্রারের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো যেতে পারে। কোন কাজী প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে তার অধীনে সকল সাব-কাজীর কার্যক্রম বন্ধ করা যেতে পারে। কারণ, বিবাহ রেজিস্ট্রারদের নিবন্ধন আইন অনুসারে কোন কাজী তার অধীনে কোন সাব কাজী রাখতে পারেন না কিংবা বিবাহ রেজিস্ট্রারগুলো অন্য কোন ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করতে পারেন না।

তবে সবচেয়ে ভাল হবে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বা পৌরসভা মেয়রের মাধ্যমে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ আইনে এলাকায় অন্তত একটি নিয়মিত মামলা চালু করা। এর ফলে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই ভবিষ্যতে আর এই জাতীয় কাজ করবে না।

উঠতি বয়সের মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেয়ার অন্যতম কারণ হল তার নিরাপত্তার অভাব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগামী কিশোরী মেয়েরা প্রায়শই যৌন হয়রানির শিকার হন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বখাটেরা তাদের উত্তক্ত করে। পুলিশ কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যদের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বখাটেদের তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

উপসংহারঃ বাল্য বিবাহ পরিচালনা, সহযোগিতা ও বাল্য বিবহ প্রতিরোধে নাবালকের অভিভাবকদের যথাযথ প্রচেষ্টা গ্রহণ না করার ফলে উদ্ভূত অধর্তব্য অপরাধ পরবর্তীতে গুরুতর অর্ধব্য ও জঘন্য অপরাধের সৃষ্টি করে। তাই, পুলিশ কর্তৃপক্ষকে এই ব্যাপারে উদাসীন থাকলে চলবে না। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের মাধ্যমে কেবল বিরোধ মীমাংসা নয়; বরং বিরোধ সৃষ্টির প্রক্রিয়াগুলো বন্ধ করার বিষয়টিই মূখ্য হওয়া উচিৎ। এই ব্যাপারে থানার অফিসার-ইন-চার্জদের সামান্য উদ্যোগ একটি বড় ধরণের সামাজিক সমস্যা নিরসন করতে পারে।
——————————————————————————–
[1]http://www.unicef.org/protection/Progress_for_Children-No.9_EN_081710.pdf http://www.dailykalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=Software&pub_no=815&cat_id=1&menu_id=13&news_type_id=1&index=6
[2] http://www.police.gov.bd/index5.php?category=48
[3] http://bdlaws.minlaw.gov.bd/sections_detail.php?id=149&sections_id=4952