ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশ বলতে মানুষ থানাকেই বোঝে। অপরাধ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ, অনুসন্ধান এবং অন্যান্য পুলিশ-সেবার মূখ্য কেন্দ্র হল থানা। থানার অফিসার-ইন-চার্জ হলেন থানার প্রশাসক, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ পরিকল্পণার মূখ্য সমন্বয়ক এবং সর্বোপরি পুলিশি সেবার উত্তম আদর্শ।

কিন্তু, দুর্ভাগ্য আমাদের! থানার অফিসার-ইন-চার্জ এর পদে আমরা অনেক অসংবেদনশীল, ভোতা অনুভুতির কিছু ইন্সপেক্টরকে বসিয়েছি।

পেশাগত কারণে একটি মডেল থানার অফিসার-ইন-চার্জকে আজ সারাদিন প্রায় অর্ধ ডজন বার ফোন করেছি। না, না, তার ব্যক্তিগত নম্বরে নয়। সরকারি নম্বরে কিন্তু, তার সাথে কথা বলতে পারি নি। ফোন বাজে; রিং হয় কিন্তু সাহেব ফোন ধরেন না। কয়েকবার কেটে দিলেন। একবার রিসিভ করে কিছুক্ষণ রেখে দিয়ে আবার কেটে দিলেন।

আমার মোবাইল ফোন নম্বরটি যদি এই অফিসার-ইন-চার্জের মোবাইলে সেইভ করা থাকে এবং তিনি আমাকে শনাক্ত করতে পেরে আমাকে পাত্তা না দেন, আমার কোন দুঃখ নেই। কারণ, একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের কাছে অপ্রিয় হতে পারেন।

আমিও অপ্রিয় হতে পারি আলোচিত এই পুলিশ অফিসারের কাছে। কারণ, কমিউনিটি পুলিশিং এর একজন মিশনারী হিসেবে আমি পুলিশ অফিসারদের জনগণের সাথে অংশীদারিত্ব তৈরির পরামর্শ দেই। জনগণের শক্তির উপর তাদের ভরসা করতে বলি। আমি অপরাধ প্রতিরোধে জনগণের ক্ষমতায়নের কথা বলি।

আমি পুলিশ অফিসারদের বলি, জনগণের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত কর। জনগণকে জানিয়ে দাও, পুলিশের ক্ষমতা কতটুকু। পুলিশের সম্পদ কতটুকু। জনগণকে জানিয়ে দাও, পুলিশ কি করতে পারে আর কি করতে পারে না। আমি পুলিশ অফিসারদের বলি জনগণের কাছে কৈফিয়ত দাও, তাদের কাছে জবাবদিহি কর। কারণ, পুলিশের শক্তি জনগণের কাছ থেকেই আসে।

জনগণ পুলিশকে সংসদের মাধ্যমে তৈরি করে আইন দিয়েছে। এই সব আইনে পুলিশকে জনগণের স্বাধীনতা সীমীতকরণের অধিকার দিয়েছে। আইন পুলিশকে জনগণের অন্দর মহলে অযাচিতভাবে প্রবেশের ক্ষমতা দিয়েছে। আইন পুলিশের হাতে লাইসেন্সবিহীন অস্ত্র তুলে দিয়েছে।

পুলিশ দেশের নাগরিকদের জানমাল রক্ষার খাতিরে খোদ নাগরিকদের উপর বল প্রয়োগ করতে পারে। এই বল লাঠি চার্জ, ব্যাটন চার্জ, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এমনকি গুলি করে জীবনহানী পর্যন্ত হতে পারে।

এর বাইরেও জনগণ পুলিশের হাতে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা মারাত্মক একটি অস্ত্র তুলে দিয়েছে। এই অস্ত্র আগ্নেয়াস্ত্র নয়, রামদা, তরবারি, কাস্তে বা ছুরিও নয়।

দেশের নাগরিকগণ দেশের প্রতিরক্ষার জন্য কোন কোন শ্রেণির সরকারি কর্মচারিদের হাতে পিস্তল থেকে শুরু করে জঙ্গি বিমান পর্যন্ত দিয়েছেন। কিন্তু, পুলিশ ভিন্ন অন্য কোন সরকারি কর্মচারির হাতে সেই মারনাস্ত্রটি তুলে দেন নাই।

এই অস্ত্রটি হল বিনাপরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা। ট্যাঙ্ক, বিমান বা এটম বোমার চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র হল বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা। জনগণ পুলিশকে এটাও দিয়েছেন।

তাই আমি বলি এই জনগণের কাছে পুলিশকে জবাবদিহি করতে হবে। এমতাবস্থায়, আমি শুধু আলোচিত অফিসার-ইন-চার্জের কাছেই নয়, হাজার হাজার পুলিশ অফিসারের কাঝে অপ্রিয় হতে পারি। তাই অনেক পুলিশ অফিসার আমার ফোন পেয়ে বিরক্ত হতে পারেন এবং এক্ষেত্রে আলোচিত অফিসার-ইন-চার্জ ব্যতিক্রম নাও হাতে পারেন।

কিন্তু, আমার ফোন নম্বরটি সেই মডেল থানার অফিসার-ইন-চার্জের সরকারি ফোনে সেইভ করা না থাকলে আমি একজন সাধারণ মানুষ। কোন সাধারণ মানুষ যখন কোন সরকারি কর্মচারিকে তার সরকারি ফোনে বার বার ফোন করার চেষ্টা করেন, তখন সেই সরকারি কর্মচারির ভেবে নেওয়া উচিত সেই সাধারণ মানুষ বড় প্রয়োজনে তার কাছে ফোন করার চেষ্টা করছেন। যদি কেউ ডাক্তারের কাছে ফোন করেন,তো, তিনি হয়তো বড় স্বাস্থগত সমস্যায় পড়েছেন। আর তিনি যদি কোন পুলিশ অফিসারের কাছে ফোন করেন, তো, বুঝতে হবে তিনি শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, ইজ্জত এমনকী জীবনের ঝুঁকিতে পড়েছেন।

কোন সাধারণ মানুষ একবার ফোন করে খান্ত দিলে বুঝা যেত এটা মিস কল। কিন্তু, মানুষ যখন বারবার ফোন করে তখন বুঝতে হবে তিনি সংগত কারণেই ফোন করছেন।

কিন্তু, আমাদের মডেল থানার অফিসার-ইন-চার্জ সাহেব এই টুকু বুঝতে অক্ষম। একজন রিকসাওয়ালার ফোনেও যদি আমি তিন চার বার ফোন দিতাম, সেই রিকসাওয়ালা যদি ফোনের কাছে না থাকতেন, পরবর্তীতে, আমার বিশ্বাস, তিনি আমাকে রিং ব্যাক করতেন। ন্যূনতপক্ষে একটা ফিরতি মিসকল মারতেন।

কিন্তু, আমাদের আলোচিত অফিসার-ইন-চার্জ এতটাই অনুভূতিশূন্য তিনি আমার ফোনটি রিসিভই করলেন না। একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে নয়, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে কষ্ট হয়, এমন পুলিশ অফিসারদের আমরা জনগণের কাছে পাঠিয়েছি সেবাদানের জন্য ।