ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে কাজ করা এবং এ সম্পর্কে লেখালেখি করার সূত্র ধরে আমাকে অনেকে জিজ্ঞাসা করেছেন, বিট পুলিশিং আর কমিউনিটি পুলিশিং কি আলাদা? বাংলাদেশ পুলিশ আর ডিএমপি কি আলাদা আলাদা পুলিশিং দর্শন গ্রহণ করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে আমাদের কমিউনিটি পুলিশিং ও বীট পুলিশিং উভয় ধারণার সাথে পরিচিত হওয়া দরকার।

কমিউনিটি পুলিশিং কী?
কমিউনিটি পুলিশিং হল একটি নতুন পুলিশিং দর্শন যেখানে পুলিশ জনগণ তথা সমাজের স্বার্থসংশ্লিস্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সমাজে উদ্ভূত অপরাধ সমূহের অন্তর্নিহিত কারণসমূহ অনুসন্ধান করে সেসব দূর করার চেষ্টা করে। কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনে পুলিশ তাদেরকে কমিউনিটির অংশ হিসেবে মনে করে। এখানে পুলিশ নেতৃত্ব মনে করে পুলিশকে ঘটনাতাড়িত হয়ে সমস্যার লক্ষণসমূহ দূর করা নয় বরং স্বপ্রণোদিত হয়ে সমস্যাটিকেই সমূলে উৎপাটন করতে হবে। আর এক্ষেত্রে পুলিশ এককভাবে কমিউনিটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোন সাফল্য বয়ে আনতে পারবে না। সফল হতে হলে তাদের কমিউনিটির সাথে যৌথভাবেই কাজ করতে হবে।

বীট কী?
বীট হল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা । শহরাঞ্চলের পুলিশ অধীক্ষেত্রকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করা হলে প্রত্যেক অংশকে এক একটি বীট বলা হবে।আমাদের দেশের প্রত্যেকটি শহরাঞ্চলকে পুলিশিং শুরুর আদিকাল থেকেই কয়েকটি বীটে ভাগ করা হয়েছে। থানায় কোন মামলা রুজু হলে তার ঘটনাস্থল নির্দেশ করতে এজাহারে গ্রামাঞ্চলের জন্য জে.এল (জুরিসডিকশন লিস্ট) নম্বর এবং শহরাঞ্চলের জন্য বীট নম্বর লেখা হয়। তাই বীট শব্দটি পুলিশ অফিসারদের কাছে নতুন কোন বিষয় নয়।

সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তার অধীক্ষেত্রকে প্রায় ৪৮০ টি বীটে ভাগ করেছে। পূর্বেই জেনেছি, এই বীট বিভাজন সম্পূর্ণ নতুন কোন পদ্ধতি বা ধারণা নয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন প্রতিষ্ঠার লগ্নেই তৎকালীন অধীক্ষেত্রকে বীটে ভাগ করা হয়েছিল। বর্তমানে তা সম্প্রসারণ করা হয়েছে মাত্র।

বীট পুলিশিং কী?
বীট পুলিশিং হল কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক বা বিশেষ পুলিশ সদস্যদের স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করা। আমাদের শহর এলাকাগুলোকে কয়েকটি বীটে ভাগ করে প্রত্যেকটি বীটের দায়িত্ব ঐ স্থানে অবস্থিত পুলিশ ফাঁড়ির উপর ন্যাস্ত করা হয়। এই ধারণাটি এসেছে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের কার্যপদ্ধতি থেকে। জাপানের কোবান পদ্ধতিতেও প্রতিটি কোবান বা পুলিশ বক্সের অধীন একটি নির্দিষ্ট এলাকা রয়েছে। এই সব এলাকায় কিছু পুলিশ অফিসার ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে নিজস্ব বিবেচনা শক্তি প্রয়োগ করে সেই এলাকায় পুলিশিং করে থাকেন। এক্ষেত্রে তিনি তার নির্ধারিত এলাকায় অপরাধ সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এলাকাবাসীর নিকট গৃহ-ডাক্তারের মতোই কাজ করেন।

কোবান, বিট বা কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার এলাকার মানুষের কাছে তাদের নিজেদের পুলিশ অফিসার বলেই প্রতীয়মান হবে। তিনি এলাকাবাসীদের সাথে স্থানীয় সুখ-দুঃখের অংশীদার হবেন। তিনি এলাকায় কেবল আইন প্রয়োগ বা শৃঙ্খলা রক্ষা নয়, এলাকার সকল সমস্যা সমাধানের নিয়ামক শক্তি বা প্রভাবক হিসেবে কাজ করবেন। দেওয়ানী, ফৌজদারি, সামাজিক, পারিবারিক এমনকি রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রেও একজন কমিউনিটি/ বীট পুলিশিং অফিসারকে এগিয়ে আসতে হবে।

কমিউনিটি পুলিশিং ও বীট পুলিশিং কী আলাদা দর্শন?
কমিউনিটি পুলিশিং এর ৯-পি সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কমিউনিটি পুলিশিং হল একটি সার্বক্ষণিক ব্যক্তি-উপস্থিতিমূলক (personalized) পুলিশিং (policing,) দর্শন (philosophy) যেখানে একজন সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার বিকেন্দ্রীভূত বরাদ্ধকৃত এলাকা (place,) স্থায়ীভাবে (permanet) টহলরত (patraol) থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে স্বপ্রণোদিত(proactive) অংশীদারিত্বের (partnership) ভিত্তিতে অপরাধ-সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে (problem-solving) সচেষ্ট থাকেন। সংজ্ঞাটি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় বীট পুলিশিং আসলে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থায় উত্তীর্ণ হওয়ার একটি উপায় বা কৌশলমাত্র। অর্থাৎ বীট পুলিশিং আর কমিউনিটি পুলিশিং পরষ্পর থেকে ভিন্ন কোন পুলিশিং দর্শন নয়।

তবে বীট পুলিশিং নিয়ে পুলিশ অফিসারদের মধ্যে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। যেহেতু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বীট পুলিশিং বাস্তবায়ন শুরু করেছে,তাই এই সংস্থার অফিসার ও তাদের অধীক্ষেত্রের জনগণের মধ্যেই এই নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা ভুল বোঝাবুঝির মাত্রা অনেকাংশেই বেশি।

আমি ডিএমপির অপরাধ বিভাগের অনেক পুলিশ অফিসারকে বলতে শুনেছি, ‘ কমিউনিটি পুলিশিং এদেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। মানুষ পুলিশকে সহায়তা করে না। তারা সবসময় নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাই আমরা এখন বীট পুলিশিং করছি।‘ আমি যখন তার কাছ থেকে জানতে চাইলাম কমিউনিটি পুলিশিং কী, আর বীট পুলিশিং কী। অধিকন্তু, কমিউনিটি পুলিশিং এর সাথে বীট পুলিশিং এর মধ্যে পার্থক্য কী?

কিন্তু, দুঃখের বিষয় হল, সেই পুলিশ অফিসার কমিউনিটি পুলিশিং বা বীট পুলিশিং কোনটা সম্পর্কেই সঠিক ধারণা রাখেন না। যেখানে পুলিশের সিনিয়র অফিসারদের মধ্যেই এই সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই, সেখানে মাঠ পর্যায়ের অফিসারদের এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির বিস্তর সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের ত্রিবার্ষিক কৌশলপত্রের আলোকে কমিউনিটি পুলিশিং হল বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক অঙ্গীকার। তাই এই ক্ষেত্রে কোন পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মনোভাবের চেয়ে সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গীই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। বীট পুলিশিং যে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কৌশল তা পুলিশ সদস্য ও কমিউনিটি সদস্যদের খোলামেলা ভাবে জানানো উচিৎ। কমিউনিটি পুলিশিং ধারণাটি বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই ভীষণভাবে দূষিত হয়েছে। তাই আমাদের উচিত হবে এটাকে আর বেশী দূষিত না করে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে তুলে ধরা।