ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

জেলা পর্যায়ে পুলিশ প্রশাসনের জন্য একটি বিব্রতকর কাজ হল সার্টিফিকেট মামলার গ্রেফতারী পরোয়ানা তামিল করা। এই মামলার আসামীরা কোন চোর-বদমাস নয়; তারা গ্রাম-গঞ্জের খেটে খাওয়া ভূখা-নাঙ্গা কৃষক মাত্র। ব্যাংক থেকে ৫/১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল খোয়ায়ে ঋণ শোধের সামর্থ্য হারিয়েছেন তারা। ঋণের সুদ-আসল আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের নামে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা জেনারেল সার্টিফিকেট অফিসারের কাছে ‘দি পাবলিক ডিমান্ড রিকোভারি এক্ট-১৯১৩’ এর অধীনে মামলা করেছে। গ্রাম বাংলার কৃষকদের কাছে এই মামলা সার্টিফিকেট মামলা নামে বহুল পরিচিত। অপরাধী না হলেও এই মামলায় গ্রেফতারী পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আমাদের কৃষককুলের একটি বড় অংশ দিনে মাঠে কাজ করতে ও রাত্রে ঘুমোতে যায়।

মাগুরা জেলায় সার্টিফিকেট মামলার ওয়ারেন্ট সংখ্যা প্রচুর। জেলা প্রশাসন থেকে এইসব ওয়ারেন্ট তামিল করার জন্য প্রচণ্ড চাপও ছিল। কিন্তু যেখানে চোর-ডাকাতদের বিরুদ্ধে জারি করা ওয়ারেন্ট সমূহ তামিল করতে পুলিশের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, সেখানে কৃষি ঋণের কয়েকটি টাকা পরিশোধ করতে না পারায় নিরপরাধ মানুষগুলোকে গ্রেফতার করতে পুলিশের তেমন উৎসাহ থাকার কথা নয়। পুলিশও তো মানুষ। বলা বাহুল্য, মফসাল এলাকার অধিকাংশ পুলিশ সদস্য কৃষকের সন্তান। তাই কৃষকদের প্রতি তাদের রয়েছে আলাদা দরদ। আমি নিজেও কৃষকের সন্তান। আর আমি জানি, এই দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ীসহ উপর তলার লোকেরা কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে স্বেচ্ছায় খেলাপী সেজে জনগণের সম্পদে পোদ্দারী করছেন। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে সর্বস্ব হারানো কৃষকের মাথায় গ্রেফতারী পরোয়ানা গ্রেফতার হয়ে জেলের ভাত খেতে হয়।

বলা বাহুল্য, অন্যান্য ফৌজদারি মামলার গ্রেফতারী পরোয়ানার মতো সার্টিফিকেট মামলার গ্রেফতারী পরোয়ানা তামিল করলে জেলা পুলিশের গ্রেফতার কর্মে কৃতিত্ব বাড়ে। কিন্তু, এই কৃতিত্ব বড়ই অমানবিক বলে আমার কাছে মনে হয়। তাই, সার্টিফিকেট মামলার গ্রেফতারী পরোয়ানা তামিল নয়, বরং সামর্থবান কৃষকরা যাতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিসে গিয়ে মামলাটি মিটমাট করতে পারে বা ব্যাংকে গিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারে, পুলিশি কার্যক্রম এর মাধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার জন্য আমি থানা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। এ জন্য আমি থানার অফিসারদের পরামর্শ দিয়েছিলাম সার্টিফিকেট মামলার আসামীদের বাসায় রাতে হানা না দিয়ে সকাল দশ/এগারটার দিকে হানা দিতে যাতে পরোয়ানাধারী কৃষকটিকে বাড়িতে পাওয়া না যায় এবং তাকে গ্রেফতার করতে না হয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশ অফিসারগণ তাদের বাড়ির লোকদের ঋণ পরিশোধের তাগিদ দিতে পারে। কিন্তু, এর পরেও অনেক হতভাগা চাষি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে থানা হাজতে আসত। অনেক গ্রেফতারকৃত কৃষকের আত্মীয়-স্বজন ধার-কর্জ করে বা লোটা-কম্বল বিক্রয় করে টাকা জোগাড় করে ঋণ পরিশোধ করে থানা থেকেই ছাড়া পেলেও অধিকাংশ কৃষককে যেতে হয় জেল হাজতে।

মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার নাকোল পুলিশ ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে আমি লক-আপে সার্টিফিকেট মামলার একজন হতভাগ্য আসামীকে আবিষ্কার করলাম। নির্দেশনা থাকার পরেও নিরীহ একজন কৃষককে গ্রেফতারের জন্য ক্যাম্পের ইন-চার্জকে রীতিমত ভর্ৎসনা করলাম। জী স্যার, ইয়েস স্যার, ভুল হয়েছে স্যার ইত্যাদি বলে সে পার পেয়ে গেল।

অতপর শশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ কৃষকের কাছ থেকে আমি জানতে চাইলাম তিনি কত টাকার কৃষি ঋণ নিয়েছিলেন এবং সুদে আসলে তা কত হয়েছে। বৃদ্ধ জানালেন, তিনি ৫০০০/-টাকার ঋণ নিয়েছিলেন। তবে সুদে-আসলে তা কত হয়েছে তিনি তা বলতে পারলেন না।

আমি জানি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সময় কৃষকদের অবশ্যই কিছু না কিছু টাকা ঘুষ আকারে ব্যয় করতে হয়। কিশোর বয়সে আমার কৃষক বাবাকে বলতে শুনেছিলাম, কৃষিঋণ নিতে প্রতি হাজারে তাকে একশত টাকা করে বাড়তি দিতে হয়েছিল। ব্যাংকের কর্মচারি হোক কিংবা কৃষি বিভাগের কর্মচারি হোক অথবা মধ্যসত্বভোগি দালাল হোক, দশ হাজার টাকার ঋণ নিতে তাকে এক জাহার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল। তাই নিতান্ত কৌতুহল বসত গ্রেফতারকৃত কৃষককে জিজ্ঞাসা করলাম:

চাচা, ঋণ নেওয়ার সময় কত টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন ?
বৃদ্ধ কৃষক করুণ কণ্ঠে উত্তর দিলেনঃ
স্যার, ঘুষ দেইনি। তবে ব্যাংকের লোকদের খরচ বাবদ এক হাজার টাকা দিয়েছিলাম।