ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাঘে ছুলে আঠার ঘা আর পুলিশে ছুলে ছত্রিশ ঘা— প্রবাদটি কে না জানে? এই উপমহাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত পুলিশের হাতের ছোঁয়া যে সংক্রামক তা সর্বজন স্বীকৃত। বলাই বাহুল্য, এই প্রবাদটির উৎপত্তি শদুয়েক বছর আগে বৃটিশ বাংলায়। তবে ধীরে ধীরে এর প্রয়োগ পরিবর্তিত হয়েছে এবং পরিণাম শানিত হয়েছে।

পুলিশের খাতায় একবার নাম উঠলে যে তা আর কর্তন করা যায় না এটা, মনে হয়, অনেকে জানেন না। তাই ছত্রিশ ঘায়ের ফজিলত খুব অল্প লোকেই ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারেন।

পুলিশের খাতাপত্র অত্যন্ত শক্ত। একটি থানায় কত প্রকারের যে রেজিষ্ট্রার আছে তা সাধারণ মানুষ জানে না। মানুষ কেবল জিডি বা সাধারণ ডায়েরির নামটি ভালভাবে জানেন। থানা হল পুলিশী কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র বিন্দু। অপরাধ কর্ম, অপরাধীদের নাম, পরিচয়, তাদের অপরাধের ফিরিস্তি, অপরাধীদের সহযোগী, তাদের চলাচল বা কর্মস্থল ইত্যাদি হাজার প্রকারের তথ্য থানায় রক্ষিত থাকে। থানা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উপর নির্ভর করে সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার ও পুলিশ সুপারের অফিসসহ ধাপে ধাপে এইসব তথ্য পুলিশ সদর দফতর ও সিআইডি-তে গিয়ে জমা হয়। তাই কোন ব্যক্তি একবার মামলায় জড়িয়ে পড়লে তার নামটি পুলিশের সকল স্থানে রক্ষিত পরিসংখ্যানে গ্রন্থিত হয়।

সম্পত্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, যথা– চুরি, সিঁধেল চুরি, ডাকাতি, দস্যুতা ইত্যাদির ক্ষেত্রে পুলিশের জবাবদিহিতা অনেক বেশি। কোন থানা এলাকায় এক মাসে চারটি খুন হলেও অফিসার-ইন-চার্জ সাহেবের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া নাও হতে পারে ; কিন্তু তার এলাকায় এক মাসে দুইটি মাত্র ডাকাতির ঘটনা ঘটলে তার টনক নড়ে। পুলিশ সুপার তো বটেই, এমনকি, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ডাকাতির ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া হয়। তাই সম্পত্তির বিরুদ্ধে কৃত অপরাধীদের সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যাবলী থানায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংরক্ষণ করা হয়।

পৃথিবীর সকল দেশের পুলিশ সম্পত্তির বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও তদন্তের ক্ষেত্রে মোটামুটি একই রকম ব্যবস্থা বা পদ্ধতি অবলম্বন করে। এই সব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে অপরাধ স্থলের আশে পাশে (বিশেষতঃ ঘটনা স্থলের পাঁচ মাইলের মধ্যে) ইতোপূর্বে সংগঠিত একই প্রকারের অন্যান্য অপরাধ ও সেই সব অপরাধে সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের সম্পর্কে ব্যাপক খোঁজ খবর নেয়া। যেহেতু চোর, ডাকাত, দস্যু, প্রতারক ইত্যাদি ব্যক্তির তালিকা পুলিশ সংরক্ষণ করে এবং এই সব শ্রেণির অপরাধী অপরাধকে তাদের পেশা হিসেবে গ্রহণ করে, তাই পুলিশের প্রথম নিশানা হল পূর্ববর্তী ডাকাতি, চুরি বা দস্যুতার মামলার এজাহার নামীয়, সন্দিগ্ধ বা সাজাপ্রাপ্ত আসামীগণ।

ডাকাত বলে যার পরিচয় আছে কিংবা কোন কারণে যিনি একবার ডাকাতির মামলায় আসামী হিসেবে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন তার বসবাস স্থানের পাঁচ মাইলের মধ্যে কোন চুরি বা ডাকাতি সংঘটিত হলে পুলিশ প্রথম তাকেই সন্দেহ করবে, তার বাসায় হানা দিবে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করবে।

এখন, কেউ যদি শত্রুতা করে কোন ব্যক্তিকে ডাকাতির মামলায় এজাহার নামীয় আসামী করে কিংবা প্রতিশোধ নেবার কৌশল হিসেবে ডাকাতির মামলায় একবার তাকে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করাতে পারে, তবে তার শত্রু বেচারা পরবর্তী জীবনটুকু মোটামুটি ইহলোকের নরকে কাটাতে বাধ্য হবেন। সম্পত্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারকৃত বা সন্দিগ্ধ ব্যক্তি শত চেষ্টা করেও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন না। চাকুরীর ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফেকেশন, বিদেশে যাবার কালে পাসপোর্ট প্রাপ্তি, বিদেশে কোন ক্রমে যেতে পারলেও পরবর্তী সময়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট প্রাপ্তি বা অন্য কোন কারণে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যক্তিকে দারুণ সমস্যায় পড়তে হবে।

পুলিশ অফিসারদের কর্মস্থলের স্থায়ীত্ব না থাকায় এলাকার কোন লোকটি চোর এবং কোন লোকটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে তার প্রতিপক্ষ চুরির মামলায় ফাঁসিয়ে পুলিশের খাতায় নাম ঢুকিয়েছে, তার বাছ-বিচার করা সময়ের প্রশ্ন হয়ে উঠে। তাই বর্তমানের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিস্থিতির শিকার কোন তালিকাভূক্ত ডাকাতকে সহানুভূতির চোখে দেখলেও নতুন পুলিশ অফিসার তাকে খাতির করবেন না। এই নিরীহ ব্যক্তিটির বসবাস স্থলের আশে পাশে ডাকাতির ঘটনা ঘটলেই তাকে পালিয়ে বেড়াতে হবে কিংবা শ্রীঘরে যেতে হবে।

পুলিশের খাতায় একবার নাম উঠলে একজন সাধারণ মানুষের কি দুরবস্থা হয় তার জীবন্ত বর্ণনা পাবেন ভিক্টোর হুগোর লেখা ‘লা মিজারেবল’ উপন্যাসটিতে। উপন্যাসের নায়ক বেচারা জ্যাঁ ভ্যাল জ্যাঁ তার বোনের বাচ্চাদের মুখের অন্ন যোগাতে এক খণ্ড রুটি চুরি করে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে সারা জীবন কিভাবে ফেরারী হয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন তার বর্ণনা পড়লে চোখে পানি আসে।

এক শ্রেণির মানুষ তাদের ব্যক্তিগত শত্রু বা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা ডাকাতির মামলা করতে অভ্যস্ত। অনেক গ্রামের বাসা-বাড়ির নিরাপত্তার দিকে তাকালে কোন অপরাধটা চুরি, আর কোন অপরাধটা ডাকাতি তা বোঝা মুশকিল। প্রায়শই অপরাধীরা সিঁদ কেটে ঘরে ঢোকে। কিন্তু পরবর্তীতে শক্তি প্রয়োগ করে মালা-মাল লুট করে। কিন্তু বাদি যখন মামলা দিতে থানায় যান, তখন তিনি তার পাশের বাড়ির বাসিন্দা, জমাজমি নিয়ে যাদের সাথে দ্বনদ্ধ আছে, এমন কি হাঁসের বাচ্চা নিয়ে বউয়ে ঝিয়ে চুলাচুলি হয়েছিল–এমন ঘটনার প্রতিপক্ষদের এজাহার নামীয় আসামী করে। তাদের ধারণা, ডাকাতরা তাদের উপকারই করেছে। কিছু সোনা-দানা গচ্ছা গেছে তো কি ? আমার প্রতিপক্ষ তো ঘায়েল হয়েছে।

ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে, এমনকি বাবা তার ছেলের বিরুদ্ধে, জামাই তার শ্বশুরের বিরুদ্ধে, শিক্ষক তার ছাত্রের বিরুদ্ধেও উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নাম ধরে ডাকাতির মামলা সাজায়। বেচারা পুলিশ না পারে আসল ডাকাতদের খুঁজে বের করতে, না পারে এজাহার নামীয় আসামীদের ভাল মানুষ বলে অভিযোগ থেকে রেহাই দিতে। তাই, নিরীহ এইসব প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রায়শই একটা অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। তারা অপরাধ না করেও হাজত খাটে, অনেকের সাজা হয় এবং বেশির ভাগই বিচারে খালাশ পায়। কিন্তু এর মাঝে তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায় অনেক গুলো বছর।

অন্যদিকে হয়রানির শিকার এই প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করে থাকেন, কখন তার প্রতিপক্ষের উপর প্রতিশোধ নেয়া যায় এবং যদি কোনক্রমে তার বাসায় ডাকাতি সংঘটিত হয়, তাহলে তার প্রতিপক্ষও ঠিক তার মতই আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে জীবন নষ্ট করে। এইভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বা সুুযোগ মত ডাকাতির মামলা দিয়ে তারা উভয়ই ডাকাত বলে পুলিশের খাতায় পাকাপোক্তভাবে নাম রেজিষ্ট্রি করেন।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে মিথ্যা মামলার ক্ষেত্রে বাদীর শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও তা সময় সাপেক্ষ। অন্যদিকে উপরিউল্লেখিত ঘটনার মামলাগুলোকে মিথ্যেও বলার উপায় নাই। কেউ যদি দাবী করে তার বাসায় ডাকাতি হয়েছে এবং তার বউ-বাচ্চা সবাই মিলে অপরাধীদের প্রতিপক্ষের কেউ বলে দাবী করে, সে ক্ষেত্রে এই মামলাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা প্রায় সম্ভব হযে ওঠে না।

আমার অভিজ্ঞতায় পুলিশের পরশের ছত্রিশ ঘা তাই যতটা না পুলিশের তৈরি তার চেয়েও বেশি সাধারণ মানুষের তৈরি। অন্ততপক্ষে এই নিষ্ঠুর প্রক্রিয়াটির সূত্রপাত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক শ্রেণির প্রতিশোধপরায়ণ স্বার্থান্ধ নাগরিকের হাতে। এক্ষেত্রে পুলিশ প্রায়শই জনগণের মূর্খতা ও স্বার্থান্ধতার সদ্ব্যবহার করে অবৈধভাবে লাভবান হয়। অপরপক্ষে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও নেতৃত্বের দেউলিয়াপনাও এর জন্য কম দায়ি নয়। রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে গণগ্রেফতারের খবর প্রায়ই পত্রিকার শিরোনাম হয়। কিন্তু, গ্রেফতার, তা ছিঁচকে চুরির ঘটনায় হোক বা রাজনৈতিক কারণেই হোক, নাগরিকদের পুলিশের খাতায় নাম রেজিস্ট্রির একটি বড় সুযোগ করে দেয়।

মানুষকে ছত্রিশ ঘায়ের কবল থেকে রক্ষা করতে হলে পুলিশকে তাদের বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে পেশাগত দক্ষতার নিরীখে সম্পত্তির বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ সমূহ উদঘাটন ও প্রতিরোধ করতে হবে। যদি সমাজে সততা, ন্যায় পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করা না যায় ; জ্ঞাতিতে-গোষ্ঠীতে, দলে দলে রেসা-রেসির বিষয়গুলো সামাজিক সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করা না হয় এবং সর্বোপরি পুলিশের কাজে অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা না যায়,তাহলে নাগরিক-শরীর থেকে পুলিশের ছত্রিশ ঘা কখনই শুকাবে না।