ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বিচার ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হল সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা করা। এই ক্ষেত্রে অপরাধীকে আইনে নির্দেশিত সাজা প্রদান ও নিরপরাধকে খালাস দেওয়াই সার্বজনীন অনুশীলন। যদি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনিত অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা না যায় অর্থাৎ বিচার প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়ে আদালতের মনে এই সন্দেহের উদ্রেক হয় যে অভিযুক্ত অপরাধের সাথে জড়িত নাও থাকতে পারে, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া যায় না। সে অবশ্যই খালাস পাবে। আইন-বিজ্ঞানে এই নীতিই হল, নির্দোষত্বের অনুমান নীতি যাকে ইংরেজীতে বলে Presumption of Innocence. অর্থাৎ চূড়ান্ত বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোন অভিযুক্তকে আদালত নির্দোষ বলে ধরে নিবেন।

খ্রীস্টিয় ষষ্ট শতকে রোমানগণ জাস্টিনিয়ান কোডে নির্দোষত্বের নীতি প্রথম অন্তর্ভূক্ত করে বলে জানা যায়। সেই সময় জাস্টিনিয়ান কোডের নীতিটির লেটিন রূপ ছিল, Ei incumbit probatio qui dicit, non qui negat- এর সাদামাটা অর্থ হল প্রমাণের দায়িত্ব যে দাবী করে তার উপর; যে অস্বীকার করে তার উপর নয়। পরবর্তী সময়ে রোমানদের এই নীতি অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে।

আধুনিক যুগে নির্দোষত্বের অনুমান নীতির প্রথম দালিলিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের প্রক্কালে। বিপ্লবীদের ‘নাগরিক-অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ‘দোষী ঘোষণা না করা পর্যন্ত পত্যেকেরই নির্দোষ হিসেবে গণ্য হওয়ার অধিকার থাকবে’ ।

রুস প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, ব্রাজিল, কলম্বিয়া প্রভৃতি দেশের সংবিধানে ‘নির্দোষত্বের অনুমান নীতি সরাসরি অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। অনেক দেশের বিচার ব্যবস্থায় অনুসৃত আইন, বিধি ইত্যাদিতে এই নীতি অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নির্দোষত্বের অনুমান নীতিকে স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়নি। কিন্তু এর চতুর্থ, ষষ্ট ও চতুর্দশ সংশোধনী থেকে এই নীতি অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে নিসৃত হয়েছে। পরবর্তীতে ১৮৯৫ সালে সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে এই নীতির স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে ।

১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের মানবাধীকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১১(১) অনুচ্ছেদে নির্দোষতার অনুমান নীতির স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দিয়ে গণআদালতের বিচারে আইন অনুসারে দোষী প্রমাণিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে গণ্য হওয়ার অধিকার রয়েছে’ । একই বিধান সংযুক্ত রয়েছে ১৯৬৬ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত দেওয়ানী ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত কভেনেন্টে ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে নির্দোষত্বের অনুমান নীতি সম্পর্কে সরাসরি কোন অনুচ্ছেদ সংযোজিত হয় নাই। তবে আমাদের ফৌজদারি ও দেওয়ানী আদালতের সাক্ষ্য-প্রমাণ উত্থাপন যে আইনের নির্দেশ বলে করা হয়, সেই সাক্ষ্য আইন-১৮৭২ এর সপ্তম অধ্যায়ে অভিযোগ প্রমাণের দায়-দায়িত্বের নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। সাক্ষ্য আইনের ১০১ ধারায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে তার পক্ষে আদালতের রায় কামনা করে, সেই ব্যক্তির উপরই আলোচ্য বিষয় প্রমাণের দায়িত্ব বর্তাবে ।

উদারহণে বলা যায়, রহিম যদি দাবী করে যে করিম তার ছেলেকে খুন করেছে। তাহলে রহিমকেই প্রমাণ করতে হবে যে করিম এই অপরাধটি করেছে। আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় ফৌজদারি অপরাধ মানেই হল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ। তাই ফৌজদারি মামলার বাদী হল স্বয়ং রাষ্ট্র। তাই রাষ্ট্রকেই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনিত অপরাধ প্রমাণ করতে হয়। অবশ্য এইক্ষেত্রে কিছু কিছু ব্যতীক্রমও রয়েছে। যেমন, সাক্ষ্য আইনের ১০৫ ধারার নিয়ম অনুসারে কোন অভিযুক্ত যদি দণ্ডবিধির ৭৬-১০৬ ধারায় বর্ণিত সাধারণ ব্যতীক্রমের কোন ঘটনার অর্থাৎ আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকারের কোন সুবিধা নিতে চায়, তবে অভিযুক্তকেই সেই সুবিধার পক্ষে সাক্ষ্য প্রমাণ উত্থাপন করতে হবে ।

উদাহরণ স্বরূপ, রহিমের বিরুদ্ধে একজনকে খুন করার অভিযোগে বিচার চলছে। সরকার পক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ উত্থাপন করেছেন যে এই খুনটি রহিম ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে করেছে। কিন্তু, অভিযুক্ত রহিম দাবী করছে যে নিহত ব্যক্তিই মূলত রহিমকে মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করেছিল। রহিম শ্রেফ আত্মরক্ষার জন্যই বল প্রয়োগ করেছিল। এক্ষেত্রে রহিমকেই তার দাবীর সপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ উত্থাপন করতে হবে যে সে আসলে আত্মরক্ষার জন্যই নিহত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটিয়েছিল।

উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দিয়ে উপযুক্ত আদালতে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে গণ্য করার নীতি সার্বজনীন ও সর্বকালীন। আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তি, কনভেনশন, ঘোষণাপত্র এবং রাষ্ট্রীয় আইন, বিধি ও পদ্ধতিতে এই নীতির বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যায়। পৃথিবীর কোন রাষ্ট্র বা জাতির বিচার ব্যবস্থাতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তার নিজের নির্দোষত্ব প্রমাণ করতে হয় না। এমনকি কোন অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্তের নীরব থাকার অধিকার রয়েছে ।

অর্থাৎ কোন স্বাধীন দেশের বিচার ব্যবস্থা কোন মানুষকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় না। বরং রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হল তার নাগরিকদের সুবিচার বা ন্যায় বিচার প্রদান করা। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কাউকে যদি রাষ্ট্র ন্যায় বিচার দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের প্রত্যাশা থাকে তাকে যেন অন্যায় বিচারের সম্মুখীন করা না হয়। আইন ভঙ্গকারী বা অপরাধ সংঘটনকারী সকল ব্যক্তিকে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে সকল ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয় না। কিন্তু, তাই বলে রাষ্ট্র তার কোন নির্দোষ নাগরিককে শাস্তি দিতে পারে না। এমতাবস্থায়, দশজন অপরাধী ছাড়া পেলেও যেন একজন নিরাপরাধ ব্যক্তিও সাজা না পায়, সেটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব।

আমাদের দেশের অনেক মানুষ আমাদের বিচার ব্যবস্থায় নির্দোষত্বের নীতির সমালোচনা করেন। বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার জন্য চিহ্নিত অপরাধী বা অভিযুক্তদের খালাস পাওয়ার বিষয়ে বিষোদ্গার করে বিচার বহির্ভূত কর্মকাণ্ড যেমন, গণপিটুনি ইত্যাদিকে সমর্থন করেন। কিন্তু, বিচার ব্যবস্থার এই মৌলনীতিকে অস্বীকার করলে একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে স্থান পাওয়া যাবে না।

যদি অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হয় যে সে নির্দোষ, তাহলে অন্যান্য দালিলিক প্রমাণসহ আদালতে সাক্ষ্যি হাজির করার দায়িত্বও তার উপর বর্তাবে। যেখানে রাষ্ট্র তার সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করেও আদালতে সময়মতো সব সাক্ষ্যিকে হাজির করতে ব্যর্থ হয়, সেখানে কোন বেসরকারি ব্যক্তির উপর এই দায়-দায়িত্ব অর্পণ করলে পুরো বিচার ব্যবস্থাই ভেঙ্গে পড়বে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ দূর করলে জনতার চোখে চিহ্নিত অপরাধীদের শাস্তিপ্রদান, তথা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে আমরা নির্দোষত্বের নীতি থেকে কখনো সরে আসতে পারি না এবং একটি মর্যাদাশীল জাতির পক্ষে তা উচিতও নয়।

রচনাসূত্র :
http://en.wikipedia.org/wiki/Presumption_of_innocence ; at 22:00 on 31 Marchc2012
http://encylcopedia2.thefreedectionary.com/Assumption+of+innocence; at 22:00 on 31 Marchc2012
http://openjurist.org/156/us/432; at 22:00 on 31 Marchc2012
http://www.un.org/en/documents/udhr/index.shtml#a11; at 22:00 on 31 Marchc2012
http://www2.ohchr.org/english/law/ccpr.htm; at 22:00 on 31 Marchc2012
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/sections_detail.php?id=24&sections_id=5120; at 22:00 on 31 Marchc2012
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/sections_detail.php?id=24&sections_id=5124; at 22:00 on 31 Marchc2012
http://www.infoplease.com/us/supreme-court/cases/ar23.html; at 22:00 on 31 Marchc2012