ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

জেনারেল ডায়েরি বা জিডি কোন থানার নিজস্ব কার্যক্রমসহ তার অধীক্ষেত্রে সংঘটিত ও পুলিশের নজরে আনিত যাবতীয় ঘটনার একটি সরকারি দলিল। পুলিশ আইনের ৪৪ ধারার বিধান মতে প্রত্যেকটি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি রেজিস্ট্রার রাখা হয় । এ ছাড়াও ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ও ১৫৫ ধারার উদ্দেশ্য পূরণে থানায় জিডি বই সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক । জিডি বই লিখন ও সংরক্ষণ সম্পর্কে পুলিশ প্রবিধানের ৩৭৭ ধারায় বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

জিডি রেজিস্ট্রার সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং থানার অফিসার-ইন-চার্র্জের। তবে ইচ্ছে করলে অফিসার-ইন-চার্জ সাময়িকভাবে এই দায়িত্বের কিছু অংশ অন্য কোন অফিসারের উপর ছেড়ে দিতে পারেন। এই বিধানমতে সাধারণত থানার ডিউটি অফিসার অফিসার-ইন-চার্র্জের পক্ষে এই কাজটি করে থাকেন।

থানা এবং থানার অধঃস্তন ফাঁড়িতে জিডি বহি সংরক্ষণ করা হয়। এর বাইরেও পুলিশের অন্যান্য ইউনিটগুলোতেও জিডির অনুরূপ ব্যবস্থা চালু থাকতে পারে। কিন্তু, পুলিশ আইনে নির্দেশিত জিডির সমান আইনগত মর্যাদা এদের থাকবে না। উদাহরণ স্বরূপ, পুলিশ সুপারের অফিসে কেউ কোন ঘটনার বিবরণ সম্বলিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। এই অভিযোগ পুলিশ সুপার থানায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করতে পারেন। পুলিশ সুপারের অফিস থেকে প্রেরিত অভিযোগ থানার জিডি বইতে অন্তর্ভূক্ত করার পূর্ব পর্যন্ত এই অভিযোগের কোন আইনগত মূল্য থাকবে না।

জনগণের থানায় যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান উপলক্ষ হল সাধারণ ডায়েরি করা। সাধারণত অধর্তব্য অপরাধ ও সাধারণ শ্রেণির তথ্য প্রদান ও তা লিপিবদ্ধ করাকেই সাধারণ মানুষ জিডি বলতে অভ্যস্ত । আর এটাও ঠিক যে থানায় রক্ষিত জিডি বইতে থানা এলাকায় সংঘটিত যে কোন খবরই স্থান পেতে পারে । এটা হতে পারে কোন ব্যক্তির প্রতি মোবাইল ফোনে হুমকীর তথ্য কিংবা কোন ব্যক্তির খুন করার ফলে রুজুকৃত মামলার/এজাহারের সার সংক্ষেপ। বলতে কী থানায় রক্ষিত জিডি বইতে সাধারণ মানুষ কর্তৃক প্রদেয় তথ্যের যতগুলো এন্ট্রি থাকে পুলিশের নিজস্ব উদ্যোগ বা প্রয়োজনে তার চেয়ে অনেক বেশি এন্ট্রি থাকে। জনগণ কর্তৃক কোন তথ্য বা সংবাদকে সরকারি দলিলে সন্নিবেশিত করার সহজতম উপায় হল থানায় জিডি ভূক্ত করা। কেননা, থানার জিডি বইতে যে কোন এন্ট্রি সাক্ষ্য আইনের ৩৫ ধারা মতে ভবিষ্যতে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় । তাই মানুষের কাছে জিডি এন্ট্রি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জিডি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। ফৌজদারি আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অস্বচ্ছ ধারণা থেকে এটা হয়ে থাকে। থানায় এমনও লোক আসে তারা ডাকাতির বা বড় ধরণের চুরির খবরকেও জিডি আকারে দেখতে চান। তবে তার মানে এই নয় যে ডাকাতির ঘটনাকে জিডি বইতে উল্লেখ করা যাবে না। কিন্তু জিডিতে যাই উল্লেখ করা হোক না কেন, অনেকে আমলযোগ্য অপরাধের খবর কেবল জিডি বইতে অন্তর্ভূক্ত করতে চান। এই নিয়ে কোন অনুসন্ধান, তদন্ত বা মামলা রুজু হোক তা তারা চান না। অনেকে আবার জিডির বিষয়টি বেমালুম চেপে রাখতে চান। তারা পুলিশকে কোন প্রকার ব্যবস্থা না নিতে অনুরোধ, উপরোধসহ নানাবিধ বঙ্কিম পথ অবলম্বন করেন। কিন্তু আমলযোগ্য অপরাধের কোন খবর জিডি বইতে অন্তর্ভূক্ত করে থানার অফিসারগণ বসে থাকতে পারেন না। তাদেরকে এর একটা প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে হয় নিয়মিত মামলা রুজু, কিংবা বিষয়টির সত্যাসত্য নির্ধারণ করে পরবর্তী জিডিতে নোট দিতে হবে।

.

যাহোক, বিভিন্ন কারণে থানায় জিডি নিয়ে নানা প্রকারের অনাকাঙ্খিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ জোর করে বা প্রতারণা করে মিথ্যা বিষয়কে থানায় জিডি আকারে অন্তর্ভূক্ত করে সংকীর্ণ স্বার্থ হাসিল করতে চায়। ঘর পোড়া, গুদাম পোড়া, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বড় ধরণে অগ্নিকাণ্ড বা অন্যকোন প্রকার ক্ষতির ক্ষেত্রে অনেক সময় বীমা কোম্পানীগুলোকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য অনেকে শুধু জিডি করতে চান। কোন মামলা করতে বা অনুসন্ধান করতে চান না। কারণ, এতে তারা বীমা কোম্পানীগুলো থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ফায়দা লুটতে চান। অন্যদিকে, অনেকেই তাদের পরীক্ষা পাশের সনদ হারিয়ে গেছে বলেও জিডি করতে চান। কিন্তু, এই সব সাধারণ শ্রেণির তথ্যের জিডিও থানার অফিসারগণ গ্রহণ করতে চান না বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে নানা অজুহাতে উৎকোচ দাবীর বিষয়টি অস্বীকার করার জো নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের ২০০২ সালের একটি গৃহ-জরিপের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে নাগরিকদের গড়ে প্রতিটি জিডি এন্ট্রির জন্য ৪৫৮ টাকা ঘুষ দিতে হয় । অনেক সময় ভূক্তভোগীরা অর্থ খরচ করেও থানায় জিডি এন্ট্রি করতে ব্যর্থ হন।

পুলিশি সেবার অনেকাংশ বেসরকারীকরণ বা অন্যকোন সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব। যেমন, মোটর যানের রেজিস্ট্রেশন, পাসপোর্ট প্রদান ইত্যাদি কাজ থেকে পুলিশকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি সিকিউরিটি গার্ড দিয়ে বাসাবাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, মানি এস্কর্ট ইত্যাদি কাজও করানো হচ্ছে। কিন্তু, জিডি এন্ট্রি বা মামলা রুজুর মতো বিষয়গুলো কোনভাবেই পুলিশ থেকে পৃথক করা বা অন্যকোন সংস্থার উপর ছেড়ে দেওয়ার জো নাই। এক্ষেত্রে পুলিশ সম্পূর্ণ একচেটিয়া কর্তৃত্ব ভোগ ও দায়-দায়িত্ব বহন করে। তাই থানা পুলিশের কাছে এই বিষয়ে সঠিক সেবা না পেলে মানুষের কাছে আর বিকল্প থাকে না। এমতাবস্থায়, থানায় জিডি বা মামলা রুজুর বিষয়টি সহজীকরণ করা বাঞ্ছনীয়।

সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তার অধীনস্ত ৪১ টি থানার জিডি কার্যক্রম ডিএমপি সদর দফতরেও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে । এই ব্যবস্থা চালু হলে থানার পাশাপাশি ডিএমপি সদর দফতরেও জিডি অন্তর্ভূক্তির আবেদন করা যাবে। এ জন্য সদর দফতরে ডিএমপির ৮ টি অপরাধ বিভাগের জন্য ৮ টি জিডি বুথ থাকবে। একজন করে সাবইন্সপেক্টর প্রতিটি বুথের দায়িত্বে থাকবেন। কোন ভূক্তভোগী জিডি করতে এলে তার অভিযোগ গ্রহণ করে তা কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় প্রেরণ করা হবে। ডিএমপি সদর দফতর থেকে এই জিডির অনুসন্ধান বা এর উপর গৃহীত ব্যবস্থা তদারকি বা পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে জানা গেছে।

ডিএমপি কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগটি সাধারণ দৃষ্টিতে ভাল বলেই সাধারণ মানুষ মনে করবে। এই ব্যবস্থার ফলে এখন থেকে নগরবাসীদের জিডি এন্ট্রির জন্য শুধুই থানার উপর নির্ভর করতে হবে না। তারা থানার বাইরেও অন্য কোন স্থান থেকে তাদের অভিযোগ বা প্রয়োজনীয় তথ্যটি থানায় রক্ষিত জিডি বইতে অন্তর্ভূক্ত করার সুযোগ পাবেন। তবে এই ব্যবস্থাটি আপাত দৃষ্টিতে যত সুবিধাজনকই মনে হোক এর একটি ভিন্ন মাত্রা রয়েছে।

প্রথমত, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিএমপি কর্তৃপক্ষ কতিপয় ত্রুটির কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। ডিএমপি কমিশনারের ভাষায়, ‘অনেক সময় থানায় জিডি করতে গেলে নানা ধরণের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। কখনো কখনো পুলিশের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ আসে। এসব বন্ধ করতে শিগগিরই ডিএমপির সদর দপ্তরে জিডি গ্রহণে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হচ্ছে’ । অর্থাৎ থানার অফিসারদের হয়রানি ও ঘুষ চাওয়ার প্রবণতাকে মোকাবেলা করে জনগণকে দ্রুত ও কাঙ্খিত সেবা দেওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা।

দ্বিতীয়ত, থানা পুলিশি সেবাদান প্রক্রিয়ার তৃণমূল পর্যায়ের মূখ্য প্রতিষ্ঠান। থানা-পুলিশের কার্যক্রমের উপরই গোটা পুলিশ প্রশাসনের মূল্যায়িত হয়। জনগণের দোরগোড়ায় পুলিশি সেবা পৌঁছে দিতে হলে থানাকেই শক্তিশালী করতে হবে। থানাকে করতে হবে জনবান্ধব, পেশাদার, প্রশিক্ষত ও দুর্নীতিমুক্ত। কিন্তু এখন পর্যন্ত জনগণের অভিজ্ঞতা হল, থানা-পুলিশ জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। থানায় গিয়ে সেবাপ্রার্থীরা কাঙ্খিত সেবা তো দূরের কথা ভদ্র আচরণ টুকুও পান না। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তা হলে কি থানার সেবাদান প্রক্রিয়াকে উন্নত করার পরিবর্তে থানার সেবার বিকল্প কিছু প্রচলনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন?

তৃতীয়ত, যেহেতু থানার বাইরে জিডি রাখার আইনী বৈধতা নেই, তাই পুলিশ অফিস বা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দফতরে জিডি এন্ট্রির বিষয়টির যৌক্তিকতা প্রশ্ন সাপেক্ষ। যে কাজ পুলিশের যে শ্রেণির কর্মকর্তা বা সে ইউনিটে সম্পন্ন করার আইনী বা নির্বাহী তাগিদ রয়েছে, সেইসব কাজ সেই নির্ধারিত ইউনিটেই সম্পন্ন করতে হবে। এজন্য উপরওয়ালাদের যেমন নজরদারী বা তদারকি বাড়াতে হবে, তেমনি দায়িত্ব পালনে অনীহ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। থানার বাইরে জিডি গ্রহণের বিকল্প ব্যবস্থা ইঙ্গিত করে যে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মনে করেন, থানার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা সফল হবে না।

চতুর্থত, থানার কার্যক্রম তদারকির জন্য মাঠ পর্যায়ে মেট্রোপলিটন পুলিশ অধীক্ষেত্রে জোনাল সহকারী কমিশনার, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, উপ-কমিশনার এবং ক্ষেত্রমতে যুগ্ম কমিশনারগণ রয়েছেন। অন্যদিতে জেলা পর্যায়ে রয়েছেন সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার, অতিক্তি পুলিশ সুপার এবং পুলিশ সুপারগণ। থানায় ডিজি অন্তর্ভূক্তির ক্ষেত্রে যদি হয়রানি, দুর্নীতি বা গড়িমসির ঘটনা ঘটে, তবে তা মাঠ পর্যায়ের এইসব অফিসারদের তদারকির অভাব বা অপ্রতুলতার কারণেই হয়ে থাকবে। এক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থায় নির্ধারিত তদারককারি অফিসারদের বাইরে মেট্রো সদর দফতরে জিডি গ্রহণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং সেইসব জিডির কার্যক্রম তদারকির জন্য অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজন হবে যা শুধু জনবলের সংকটই তৈরি করবে না বরং থানার কাজের তদারকির ক্ষেত্রে দ্বিত্বতার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এটা একদিকে জনবলের অপরচয় বৃদ্ধি করবে এবং অন্যদিকে বিদ্যমান তদারকি ব্যবস্থার মধ্যে কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে।

পঞ্চমত, পুলিশি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার শ্লোগানের সাথে এই ব্যবস্থা সাংঘর্ষিক হবে। পুলিশি সেবা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য থানার কার্যক্রমের কোন অংশ থানার উপরে নিয়ে যাওয়া নয়; বরং থানার নিম্ন পর্যায় যেমন, পুলিশ ফাঁড়ি, ক্যাম্প বা তদন্তকেন্দ্রে হস্তান্তর করাই যুক্তিসংগত। থানায় প্রাপ্য সেবার জন্য মানুষকে যদি থানার উপরের অফিসে বা কেন্দ্রে যেতে হয়, সেটা হবে গরিবদের হাইকোর্ট দেখানোর নামান্তর।

পরিশেষে বলব, থানা আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একটি বিকল্পহীন সেবাদানকেন্দ্র। একই সাথে এটি ফৌজদারি আইন প্রয়োগের প্রাথমিক হাতিয়ারও বটে। বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে থানার উপরের স্তরে যত অফিসই রয়েছে তার প্রায় সবগুলোই, বলতে গেলে, থানার কার্যক্রম তদারকি করা বা থানার কাজ সহজতর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানের জন্যই। থানা অকার্যকর হলে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়বে। এমতাবস্থায়, থানাকে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবাদানে সক্ষম করে তুলতে হবে। থানাকে করতে হবে সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত। একই সাথে থানায় প্রাপ্র সেবা সমূহ থানা থেকে নিম্ন পর্যায়ে যেমন, পুলিশ ফাঁড়ি বা তদন্তকেন্দ্রেও বিস্তৃত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।