ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

মাদকাসক্তি ও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বিশ্বের অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের কোটিপতি অধ্যূসিত সমাজের প্রাচুর্য্যে লালিত যুবকটি থেকে শুরু করে ছাপোষা বাংগালী কৃষকের কিশোর ছেলেটি পর্যন্ত আজ মাদকদ্রব্যের নিরন্তর ঝুঁকিতে কালাতিপাত করছে। প্রতি বছর সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবৈধ মাদক ব্যবসা হয়। এই ব্যবসার ফলে বিশ্বের বৈধ অর্থনীতির ক্ষতি বছরে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অনেক দেশের অথর্নীতির সিংহভাগই ক্ষতিকর মাদকদ্রব্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পাচারের উপর নির্ভরশীল। প্রতিবছর বাংলাদেশে অবৈধ ও নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্যের পিছনে খরচ হয় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।

সারা বিশ্বের প্রায় ২০ কোটি মানুষ নিষিদ্ধ মাদক সেবনের সাথে জাড়িত। বাংলাদেশে এই সংখ্যা প্রায় ৪৬ লক্ষ। নিষিদ্ধ মাদক সেবনকারী, ব্যসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকগণ শুধু মাদক সংক্রান্ত অপরাধই করে না, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদির মতো অপরাধের সাথে জড়িত। দেশে সংঘটিত প্রায় ৭০% অপরাধকর্ম কোন না কোনভাবে মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট।

অবৈধ মাদকের ব্যবহার ও ব্যবসা বাংলাদেশে প্রতি নিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরাধ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০১ সালে সারা দেশে উদ্ধারজনিত কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীন মামলা হয়েছিল ৫,৯৩৬ টি। ২০১১ সালে এসে এই সংখা দাঁড়িয়েছে ৩১,৬৯৬ টি। পুলিশের খাতায় রেজিস্ট্রিকৃত মোট মামলার যা প্রায় ১৮.৬৮%। এর বাইরেও বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডস এমনকি পুলিশ কর্তৃক বড় বড় চালানের মাদক উদ্ধার রয়েছে যেগুলো বিশেষ ক্ষমতা আইন বা শুল্ক আইনের অধীন চোরা চালানের মামলারূপে নথিভূক্ত হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রয়োগের সাথে জড়িত সংস্থাগুলোর দৃশ্যমান প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশে মাদক-সমস্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফত, নিয়মিত পুলিশ, বিশেষভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত র‌্যাব এবং সীমান্ত রক্ষা চোরাচালান প্রতিরোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডর্সের সরব তৎপরতা এক্ষেত্রে তেমন কোন ফল বয়ে আনছে না।

এর প্রধানতম কারণ হল, মাদক-সমস্যার প্রতিকারের ক্ষেত্রে আমাদের তৎপরতাগুলো এখন পর্যন্ত গ্রেফতার-উদ্ধার-মামলা রুজু-তদন্ত-শাস্তিদান এই চক্রের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অবৈধ মাদক উদ্ধার বা মাদক চোরাচালানের বড় বড় লট আটকের জন্য সর্বদা মরিয়া হয়ে থাকে। পুলিশ একই মাদক ব্যবসায়ীকে বারংবার গ্রেফতার করে জেলখানায় পাঠাচ্ছে। তারা যথারীতি জামিন পেয়ে, বিচারে খালাস পেয়ে কিংবা সংক্ষিপ্ত সাজা খেটে পূনরায় বের হয়ে এসে একই ব্যবসায় দ্বিগুণ উৎসাহে আত্মনিয়োগ করছে। এক মাদক ব্যবসায়ী জেলখানায় বন্দি হলে অন্যজন তার শূন্যস্থান পূরণ করছে। কোন চিহ্নিত মাদক আড্ডা পুলিশের কড়া নজরদারি বা ঘনঘন অভিযানের ফলে বন্ধ হলে অন্য স্থানে নতুন করে মাদকের আড্ডা বসছে। মাদকসেবীগণ হাতের কাছে মাদক ক্রয় করতে না পারলে দূরবর্তী আড্ডায় চলে যাচ্ছে। পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধির ফলে মাদকের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু ক্রেতা কমছে না। অর্থাৎ পুলিশ বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা সমস্যার মূলে আঘাত না করে তার ডালপালা ছেঁটে দিতে ব্যস্ত রয়েছেন। কিন্তু, অনুকুল পরিবেশ অক্ষুন্ন থাকায় তাদের ছেঁটে দেওয়া ডালপালা আবার দ্বিগুণ গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মাদক সমস্যা সমাধান করা শুধু প্রচলিত ব্যবস্থায় আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরণের পুলিশি এপ্রোচ। এটা যদি সমস্যা হয়, তাহলে সমস্যা সমাধানের জন্য যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। সনাতনী পুলিশিং ব্যবস্থা দিয়ে মাদক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য আমাদের সমস্যা-সমাধান-মূলক পুলিশিং ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে হবে।

সমস্যা সমাধানের বহুল ব্যবহৃত সারা (SARA) মডেল এখানে প্রয়োগ করতে হবে । এই মডেলের আওতায় প্রথমে কোন সমস্যাকে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সেই সমস্যা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। অতঃপর তার প্রতি যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে সাড়া দিতে হবে। যদি এই সাড়াদান কার্যকরী হয় তাহলে তা চালু রাখতে হবে অন্যথায় সমস্যাটি পূনরায় বিশ্লেষণ করে এর প্রতি সাড়াদানের কৌশল পাল্টাতে হবে।

মাদক-সমস্যা শুধু পুলিশের সমস্যা নয়।এমনকি এই সমস্যা নির্ভেজাল অপরাধগত সমস্যাও নয়। এটা একটি সামাজিক সমস্যা। কোন সামাজিক সমস্যা শুধু পুলিশকে দিয়ে কেন, কোন একক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশকে এক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে হবে।

মাদক-সমস্যা সমাধানের জন্য মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের গড়-ফাদারগণ, মাদক ব্যবসার স্থানসমূহ, মাদকসেবীগণ, মাদকের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিবর্গ এবং সর্বোপরি তাদের অভিভাকদেরও পরিকল্পনার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের প্রতি জনগণের সচেতনা বৃদ্ধির জন্য প্রচার প্রচারণা যেমন চালাতে হবে, তেমনি অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার ও মাদক উদ্ধারের প্রচেষ্টা শানিত করতে হবে। এক্ষেত্রে পুলিশকে জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থন আদাদের জন্য জনসংযোগ করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পুলিশি অভিযান ও জনপ্রতিরোধের মাধ্যমে অলাভজনক করে তুলতে হবে। পেটের দায়ে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের পূনর্বাসন করা তথা অন্য কোন সম্মানজনক বৈধ পেশায় আত্মনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের সমাজ সেবা অধিদফতর ও অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

মাদকের ঝুঁকিতে থাকা যুবক-যুবতীদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পাড়ায়-মহল্লায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লাব-সমিতি ইত্যাদি স্থানে কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, আলোচনা সভা বিতর্ক প্রতিয়োগিতা ইত্যাদির আয়োজন করা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, মাদকসেবীদের চিকিৎসা ও পূনর্বসানের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক সময় আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মাদক সেবীদের গ্রেফতার করে হাজতে পাঠায়। মাদক সেবীদের হেফাজতে মাদকদ্রব্য পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু, এই ক্ষেত্রে এরা বিক্রেতা নয়, সেবনকারী বা ক্রেতা। তাই, তাদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ বিবেচনা শক্তি প্রয়োগ করা উচিৎ।

মাদকসেবীরা অসুস্থ। তারা অপরাধী নয়, অপরাধের শিকার। তাই, তাদের হাজত খানায় নয়; হাসপাতালে প্রেরণ করা দরকার। তাদের জন্য চাই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। বলাবহুল্য, আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এই বিষয়টি স্বীকার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন ও সরকারি খরচে ক্ষেত্রমতে মাদকসেবীদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও রেখেছে।
আইনের নির্দেশনা অনুসারে সরকার তিনটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র চালু করলেও সেগুলোর অবস্থা বড়ই করুন। ঢাকার তেজগাঁ শিল্প এলাকায় অবসি’ত মাদক নিরাময় কেন্দ্রটি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলেও রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রামে অবসি’ত সরকারি নিরাময়কেন্দ্র সমূহ এক রকম পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

অন্যদিকে আমাদের সামাজিক সংগঠনগুলো মাদক সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়েছে। জানা যায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এখন পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৫৬টি বেসরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু এই সব নিরাময় কেন্দ্রের কার্যক্রম তদারকি করতে তারা অপারগ। এগুলোর মধ্যে অনেকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনসেবার আড়ালে ব্যবসা পরিচালনা করে মাত্র। কিছু কিছু মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র হাতুড়ে কায়দায় চিকিৎসা চালায়। অতি অমানবিক অনেকগুলোর চিকিৎস্যা কৌশল। মাদকাসক্তদের দৈহিক নির্যাতন করে মৃত্যু ঘটানোর নজির পর্যন্ত এরা তৈরি করেছে। অনেক নিরাময় কেন্দ্রের কর্মচারিগণ অবৈধ মাদক আড্ডাগুলো থেকে নিয়মিত চাঁদাও সংগ্রহ করে।

মাদক-সমস্যা মোকাবেলার অন্যতম কৌশল হবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে ঢেলে সাজানো। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অফিসারদের দ্বারা পরিচালিত অভিযান পুলিশের অভিযানের চেয়ে সংগত কারণেই দুর্বল। অভিযান পরিচালনার জন্য মাদকদ্রব অধিদফতরের পর্যাপ্ত জনবল ও অন্যান্য সহায়তা নেই। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রায়শই পুলিশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। এদিকে আর্থিক কারণেই সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে প্রয়োজনীয় জনবল বা সহায়তা দিতে পারছে না। অধিকন’, একটি সামাজিক অপরাধ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নির্মূল করতে গিয়ে তাদের মধ্যেও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে যতটা না আইন প্রয়োগ করা, তার চেয়েও বেশি সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মাদক সমস্যা সমাধানের জন্য উপযোগী করে তোলা উচিৎ।

মাদকদ্রব্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ, পরিবহন ইত্যাদি কাজে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা রয়েছে। এই ভূমিকার সাথে তাদের সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে তারা অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি সামাজিক সংগঠনগুলোর সাথে তাদের কাজ করতে হবে। মাদকাসক্তি একটি অস্বাভাবিক আচরণ। তাই এই আচরণগত সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের শিক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় পুলিশের কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের সাথে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এই কর্মসূচির সমন্বয় করা হলে ভাল ফল পাওয়া যাবে।