ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

যখন লিখতে বসেছি, তখন আমার সামনে অন্তত একজন পাঠক রয়েছেন বলে কল্পনা করি। লেখক হিসেবে আমি যদি নিজেকে একজন উৎপাদকের ভূমিকায় কল্পনা করি, তাহলে পাঠক আমার লেখনির একজন গ্রাহক। অধিকন্তু, আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, আমার গ্রাহক বা ভোক্তার কিছু মৌলিক অধিকার রয়েছে। যদি আমার লেখা পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়, পাঠককে মানসম্মত বাঁধাই, প্রচ্ছদ, ডিজাইন ইত্যাদি সম্বলিত একটি সুন্দর বই উপহার দেওয়া আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এমন কি এই লেখা যদি কোন ব্লগ বা ওয়েব সাইটের জন্যও হয়, সে ক্ষেত্রেও পাঠকের পূর্ণ অধিকার রক্ষা করতে হবে।

লেখার প্রাণ হল ভাষা। লেখকের সম্বল হল ভাষার শুদ্ধতা। তাই ভাষার শুদ্ধতা রক্ষিত না হলে লেখার মূল্য সামান্যই থাকে। অনেক স্বনামধন্য লেখক লিখতে গিয়ে ভাষার চেয়ে ভাবের গুরুত্ব বেশি দিয়েছেন বটে। কিন্তু, তাদের লেখার ভাষায় তেমন কোন ব্যাকরণগত ভুল পাই না। কোন কোন লেখক বিশেষ কিছু রচনায় কতিপয় ব্যাকরণগত ভুল করেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু এই ভুল কাঙ্খিত। তাদের পুরো লেখনির মধ্যে যে সুর, তাল, লয় বা মাধুর্য থাকে, সেই ভুলটি এসব কারণে হয়ে যায় মহান। যেমন, রবীন্দ্রনাথের ‘ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে’ গানটির কথাই বলি। এখানে তালা ভাংগার পরিবর্তে ঘরের চাবি ভাংগার কথা বলা হলেও পুরো গানের যে মাধুর্য, তাতে চাবিকে তালা ধরে নিতে পাঠক বা শ্রোতাদের কোন কষ্ট হয় না।

ভুল বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। বানানের ভুল, শব্দ গঠন (যেমন, সন্ধি, সমাস), শব্দের অপরিহার্য ব্যবহার, বাক্য-বিন্যাস তথা ব্যাকরণগত অনেক ভুল হতে পারে। লেখনির মধ্যে ব্যাকরণগত ভুল থাকলে কোন লেখক বিদগ্ধ পাঠকের মন জয় করতে পারেন না। তবে অন্যান্য ভুলকে ছাপিয়ে বানানের ভুলটিই সচেতন পাঠকদের চোখে সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে প্রকট আকারে দেখা দেয়।

আমি এই ব্লগের লেখাগুলির শুদ্ধতার কথা বলছি। আমরা, ব্লগাররা, অনেকেই ণ-ত্ব বিধান ও ষ-ত্ব বিধান মেনে চলি না। কিন্তু এই বিধান আমাদের ভাষার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ন-এর ব্যবহার সঠিক না হলে লেখ্য ভাষা শুধু যে মাধুর্য হারায় তাই নয়, এক্ষেত্রে অর্থের অস্পষ্টতা বা ভ্রান্তিও হতে পারে। যেমন, ‘শাসনকে’ আমি যদি ‘শাষন’ কিংবা ‘শোষণ’কে ‘শোষন’ লিখি তাহলে পাঠকগণ আমার লেখা পড়ার আগ্রহই হারিয়ে ফেলতে পারে। চালের ‘মণের’ সাথে যদি মানুষের ‘মনকে’ গুলিয়ে ফেলি তাহলে ভাষা কী আর ভাষার মধ্যে থাকে?

অনেক সময় যুক্ত-খ টি লিখতেও আমাদের ভুল হয়। এই ভুলও বড় বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। যেমন, একটি ব্লগে একজন লিখেছেন ‘ক্ষেটে খাওয়া মানুষ’ অনেকে বলেন, একই উচ্চারণ সম্বলিত একই ধরণের অক্ষর থাকার কী দরকার? কিন্তু, তারা যখন ‘ক্ষেতে খামারে কাজ করা’, আর ‘খেতে খেতে ক্ষেতে কাজ করার’ মতো শব্দমালা তৈরি করবেন, তখন ঠিকই উপলব্ধি করতে পারবেন যে, শত শত বছর ধরে আমাদের ভাষায় এইসব বর্ণ বিনা উপযোগিতায় টিকে নাই।

কোন লেখক যখন লিখতে বসেন, তখন ভাষার শুদ্ধতা রক্ষার একটা অলিখিত প্রতিশ্রুতি পাঠকদের দিয়েই বসেন। তাই লেখককে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেই হবে। এজন্য লেখককে ব্যাকরণের প্রাথমিক পাঠ অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। লেখককে ‘হাঁস’ জানতে হবে, ‘শজারু’ জানতে হবে এবং একই সাথে ‘হাঁসজারু’ কি করে হয়, তাও জানতে হবে।

পাঠকের সামনে ব্যাকরণগত ত্রুটি, বিশেষ করে, ভুল বানানের লেখা উপস্থিত করা হল পাঠককে প্রতারিত করার নামান্তর। তাই ব্লগার বন্ধুগণ, আসুন, পাঠকদের কাছে বিশ্বস্ত থাকি; ব্লগে লেখার সময় ব্যাকরণ ও বানানের শুদ্ধতা বজায় রাখি।