ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

যখন কোন সার্কেল এএসপি/এসি অতিমাত্রায় গণসংযোগ করেন তখন তার অফিসে ভূক্তভোগীদের আনাগোনা তো বাড়বেই। থানা পুলিশের বিরুদ্ধে নিত্যদিনের যে অভিযোগগুলো আসে সেগুলোর প্রাথমিক আপিল হয় এই সার্কেল বা জোন অফিসেই। আমি তখন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের এসি (খালিশপুর) জোনের দায়িত্ব পালন করছিলাম।

একদিন দুপুরবেলা দুইটি ফুটফুটে মেয়ে শিশু নিয়ে ২৩/২৪ বছর বয়সী দীঘল দেহী ফর্সা এক মহিলা আমার অফিসে সাক্ষাৎ প্রার্থী হল। তার নাম আদুরি বেগম। আদুরির শ্বশুর-শ্বাশুড়ী ও স্বামীর ভাইরা তাকে স্বামীসহ বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। সে দুইটি বাচ্চা নিয়ে এখন গৃহহীন। তার স্বামীটি স্বভাবে বাউন্ডুলে। পিতার সংসার থেকে তার নিজস্ব পাওনাটুকু সে আদায় করতে অক্ষম।

কথা বলার এক ফাঁকে আদুরির ফুটে ফুটে চেহারার বড় বাচ্চাটি আস্তে আস্তে আমার চেয়ার কাছে চলে এল। আমি বাচ্চাটিকে আদর না করে থাকতে পারলাম না। দেহরক্ষী কনস্টেবল মিজানকে ডেকে বাচ্চাগুলোর জন্য কিছু চকোলেট আনতে বললাম।

আদুরি বেগম তার শ্বশুর-শাশুড়ি ও ভাসুরের নামে যৌতুকের জন্য নির্যাতনের মামলা করতে চায়। কিন্তু সমস্যা হল, স্বামীকে না জড়িয়ে কেবল তার আত্মীয় স্বজনদের নামে কিভাবে যৌতুকের মামলা করা যায়? অধিকন্তু, তার সমস্যাটি যৌতুকের নয়। তার শ্বশুরপক্ষ তার স্বামীকে ন্যায্য পাওনা দিচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে পুলিশের করণীয় সামান্যই। তবে আদুরির কথা হল, অন্তত পুলিশ তার ভাসুরকে গ্রেফতার করুক। কিন্তু, এতেও আইনী জটিলতা আছে। কোন লোকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারযোগ্য কোন অভিযোগ না থাকলে তাকে পুলিশ গ্রেফতারই বা করবে কিভাবে? আর কাউকে গ্রেফতার করলেই কি হাজতে চালান দেওয়া যায় ? আদুরি তার হাতে ও শরীরের কিছু পুরাতন ক্ষতের দাগ দেখিয়ে বলল, পূর্বে অভিযুক্তগণ তাকে মেরেছিল। কিন্তু কোন সময় কোন তারিখে তাকে মারা হয়েছিল তারও বিশ্বাসযোগ্য কোন বিবরণ তার কাছে নেই। আমি আদুরিকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, এরপর যদি কোন মারামারির ঘটনা ঘটে তা হলে দেখা যাবে। এই সাথে তাকে এও বললাম যে সাধারণ মারপিটের কারণে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুলিশ শক্ত অবস্থান নিতে পারে না। যদি মারের চিহ্নটা গুরুতর জখমের পর্যায়ে পড়ে তা হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য ধারায় মামলা নেওয়া যায়।

যে কথা সেই কাজ। পরের দিন আদুরি খালিসপুর করবস্থান মোড়ে তার ভাসুরের ‘ভাংড়ীর’ দোকানে গিয়ে গায়ে পড়ে একটা ঝামেলা বাঁধিয়ে দিল। মেয়ে মানুষের গায়ে পুরুষ মানুষ সহজে হাত তোলে না। কিন্তু, আদুরি একটি মামলা করার জন্য এতটাই মরিয়া হয়েছিল যে, একটি ইঁটের টুকরা দিয়ে সে নিজেই তার কপালে ঘা মেরে কিছুটা রক্তপাত ঘটাল। পুলিশকে খবর দেয়া হল। কিন্তু আদুরির ভাসুর দেবতা ততোক্ষণে পগার পার হয়ে গেছে।

এরপর আদুরি গেল হাসপাতালে ভর্তি হতে। কিন্তু, ডাক্তারগণ তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই ছেড়ে দিল। কিন্তু, একটা শক্ত মামলা হওয়ার জন্য আদুরিকে অন্তত কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হত। খালিশপুর থানার পুলিশ অফিসারগণ বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালাল। তারা সঠিকভাবেই আদুরির দোষ খুঁজে বের করলেন। প্রত্যক্ষদর্শীগণ সাক্ষ্য দিলেন, আদুরি নিজেই নিজের মাথায় ইঁটের বাড়ি দিয়ে রক্তপাত ঘটিয়েছিল। তাই ভাসুর-শ্বশুরের বিরুদ্ধে আদুরি বেগমের কাঙ্খিত মামলাটি থানায় রেকর্ড করা হল না। এর মাঝে বেশ কিছুদিন আদুরিও আমার অফিসে এলো না।

পক্ষকাল পরে আমাদের দুই সহকর্মীর অন্যত্র বদলী উপলক্ষে একটি বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। সন্ধ্যায় এঁদের আনুষ্ঠানিক বিদায় দেওয়া হবে। তাই মাঠ থেকে সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের একটি স্থানীয় হোটেলে উপস্থিত হতে বলা হল। উল্লেখ্য, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য বোমা হামলা ঠেকানো ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সূর্য ডোবার সাথে সাথেই সন্ত্রাসীগণ কোথাও না কোথাও বোমা/ ককটেল ফাটানোর আয়োজন করত। পুলিশ মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে, চেকপোস্ট বসিয়ে ও মোবাইল টহলের মাধ্যমে এদের প্রতিহত করার চেষ্টা করত। এই কাজের সঠিক তদারকি করার জন্য সিনিয়র অফিসারদের, বিশেষ করে জোনাল এসিদের সন্ধ্যারাতে মাঠে থাকতে হত।

বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য আমি খুলনা মেট্রোপলিটনের উত্তর প্রান্তের পথের বাজার থেকে খুলনা শহরের দিকে রওয়ানা দিলাম। আমার একটু দেরিই হয়েছিল। তাই ড্রাইভার কনস্টেবল আলীমকে দ্রুতগতিতেই গাড়ি চালাচ্ছিল। আমার গাড়ি শিরোমণি বাজারের কাছে এলে মোবাইল ফোনে খবর পেলাম, শিরোমণির একটি পাটকলের পিছনে এক বস্তিতে এক মহিলার তার ঘরে গাঁজা ও হিরোইনের প্যাকেট তৈরি করছে। এক্ষুণি অভিযান চালালে মাদকের একটা বড় চালান উদ্ধার করা যেতে পারে।

মাদকের ব্যাপারে আমি ছিলাম একেবারেই অসহিঞ্চু। তাই, খানজাহান আলী থানার টহল গাড়িটি আমার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার আদেশ দিয়েই আমি মাদক উদ্ধারে আমার দুই দেহরক্ষী ও এক ড্রাইভারকে নিয়ে ঘটনাস’লের দিকে তৎক্ষণাৎ রওয়ানা দিলাম। বর্ষা কাল। টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। কিছু দূরে গিয়ে দেখলাম রাস্তা অত্যন্ত কর্দমাক্ত। গাড়ি চলাচলের অনুপযুক্ত। তাই গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দিলাম। কাদার জন্য আমাদের জুতো/বুট খুলে হাতে নিতে হল।

প্রায় ১৫/২০ মিনিট কাদা মাড়ানোর পর আমরা একটি কুড়ে ঘরের সামনে উপস্থিত হলাম। ঘরে কেরোসিনের কুপি জ্বলছে। কোন সাড়া-শব্দ নেই। ধরে নিলাম, এখানেই মাদকের চালানটি রয়েছে। একজন কনস্টেবলকে ঘরের পিছনে পাঠালাম। আমার সাথে একজনকে নিয়ে কুড়ে ঘরের দরোজায় দাঁড়ালাম। আমার দেহরক্ষী সজোরে ধাক্কা মেরে ঘরের বেড়ার দরোজা খুলল। কুপির আলোতে আমি দেখতে পেলাম এক মা তার দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে চাটাইয়ের উপর শুয়ে আছেন। আমাদের দেখেই মাহিলা প্রশ্ন করলেন,

: স্যার, আপনি, এখানে?

মহিলাটি ছিল সেই আদুরি বেগম। আমার বুঝতে বাকি থাকল না আদুরিকে হয়রানি করার জন্য তার ভাশুরই আমাদের ফোন করেছিল।

একটি হয়রানির মাদক-অভিযান শেষ করে আমি যখন শহরে ফিরলাম, তখন আমাদের সহকর্মীদের বিদায় অনুষ্ঠানটি প্রায় শেষ। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করলেন। যাহোক, সহকর্মীদের বিদায় দেওয়া হল। আমি বাসায় ফিরলাম। কিন্তু, অবৈধ মাদকদ্রব্যের বড় চালান আটকের উদ্দেশ্যে নগণ্য এক আদুরি বেগমের কুড়ে ঘরে অহেতুক হানা দেওয়ার দৃশ্যটি আমার চোখে ভাসতেই থাকল। মনে মনে ভাবলাম, আদুরি বেগমের সাথে তার ভাসুরের বৈরিতা কখনোই শেষ হবে না। আজ আমাকে দিয়ে আদুরিকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হয়েছিল। ঘটনার আদ্যোপান্ত আমার জানা ছিল বলেই আদুরি গ্রেফতার হয় নাই। কিন্তু এমন একদিন আসবে যেদিন আদুরির ঘরে মাদক পাওয়া যাবে । সে গ্রেফতার হয়ে হাজতে যাবে। সেই সঙ্গে হাজতে যাবে তার ফুটফুটে মেয়ে শিশু দুটিও।