ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 


কমিউনিটি পুলিশিং এখনও একটি উদীয়মান ও ক্রমবিকাশশীল পুলিশিং দর্শন। গবেষণা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এই দর্শনের অনুমান ও তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত সমূহ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই কমিউনিটি পুলিশিং কী, তা এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয় নাই। বস্তুত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কর্মসম্পাদনমূলক ( ওয়ার্কিং) সংজ্ঞা ছাড়া কমিউনিটি পুলিশিং এর একটি সর্বজনিন বা আদর্শ তাত্ত্বিক সংজ্ঞার প্রচলন প্রায় অসম্ভব।

কমিউনিটি পুলিশিং অনেকের কাছে একটি স্থিতিস্থাপক ধারণায় পরিণত হয়েছে। পুলিশ ও কমিউনিটি সদস্যরা একে নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। এর ফলে এই নতুন দর্শন পুলিশ ও পুলিশী-সেবাভোগীদের মধ্যে পরষ্পর বিরোধী প্রত্যাশার জন্ম দিচ্ছে। পাশ্চাত্য জগতে কমিউনিটি পুলিশিং ধারণার যথেষ্ঠ কৌতূহলোদ্দীপক বৈচিত্র্য রয়েছে। ও’ কনোর নামে একজন পুলিশ গবেষক আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪০ প্রকারের পুলিশিং স্টাইলকে কমিউনিটি পুলিশিং নামে চালিয়ে দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন । কমিউনিটি পুলিশিং ধারণার বিকৃতির ব্যাপকতা বর্ণনা করতে গিয়ে পুলিশ গবেষক ডেভিড এইচ. বেইলী বলেছিলেন, যা কিছু চক চক করে তাই যেমন সোনা নয়, তেমনি কমিউনিটি পুলিশিং এর নামে পুলিশ বিভাগ বা কমিউনিটিতে যা চর্চা করা হয়, তার সবই কমিউনিটি পুলিশিং নয় ।

বাংলাদেশেও কমিউনিটি পুলিশিং ধারণাটি ইতোমধ্যেই যথেষ্ঠ বিকৃত হয়েছে। কমিউনিটি পুলিশিং এর নামে ইতোমধ্যে দেশের অনেক স্থানে পুলিশ থেকে পৃথক পোষাকধারী বাহিনীও তৈরি হয়েছে। এক শ্রেণির প্রতারক তথাকথিত ‘কমিউনিটি পুলিশ’ নামে বেসরকারি বাহিনী তৈরি করে তাদেরকে পুলিশের rank-badge পরিয়ে দিয়ে অবৈধ ফায়দা লোটায় ব্যস্ত রয়েছে। গত ১১ এপ্রিল, ২০১১ তারিখে এইরূপ একটি বাহিনীর কিছু সদস্য ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানা পুলিশের হাতে ধরাও পড়েছিল । অনেক ক্ষেত্রে বাসাবাড়ির নাইট-গার্ড বা সিকিউরিটি গার্ডদের ‘কমিউনিটি পুলিশ’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে । দায়িত্বশীল পুলিশ অফিসারগণ নিজেদের তাত্ত্বিক দুর্বলতাহেতু এইসব প্রতারণার বিষয়ে অনেক কিছু জেনেও নির্বিকার থাকছেন। ফলশ্রুতিতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ অফিসারদের মধ্যে কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এমতাবস্থায়, কমিউনিটি পুলিশিং কী তা জানার চেয়েও জরুরী হয়ে পড়েছে কমিউনিটি পুলিশিং কী নয়, তা জানা। আলোচ্য প্রবন্ধে তাই কমিউনিটি পুলিশিং এর সংজ্ঞা দেওয়া বা এই দর্শনকে ব্যাখ্যা করা নয়, বরং কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর অসারতা তুলে ধরে কমিউনিটি পুলিশিং কী নয়, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রথমেই আসা যাক, কমিউনিটি পুলিশিং এর সবচেয়ে আলোচিত ও সবচেয়ে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা পৃথক বাহিনী সম্পর্কে। কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন প্রচারকালীন যে প্রশ্নটি প্রায়শই বড় করে সামনে আসে তাহল, কমিউনিটি পুলিশিং কী নতুন কোন পুলিশ বাহিনী গঠন করে? কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যরা কী আসলে পুলিশ বাহিনীর সদস্য যারা জাতীয় পুলিশের বি-টিম হিসেবে কাজ করবে?

এর সোজা উত্তর হল, না। কমিউনিটি পুলিশিং কোন নতুন বাহিনী তৈরির দর্শন নয়। কমিউনিটি পুলিশিং মানে পুলিশের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করাও নয়। অন্য দিকে কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম হল অপরাধ প্রতিরোধ কর্মে পুলিশ ও জনগণের যৌথ অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। ফোরামগুলো কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের একটি অংশ মাত্র যার মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা হয় এবং অপরাধ প্রতিরোধের কাজে জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা হয়। ফোরাম সদস্যরা সাধারণ মানুষ থেকে পৃথক কোন গোষ্ঠী নয় যাদের মাধ্যমে পুলিশ আইন প্রয়োগ করে। এরা অপরাপর সামাজিক সংগঠন যেমন, যুব সমিতি/ ক্লাব, সাংস্কৃতিক ক্লাব ইত্যাদির মতোই এক প্রকার সংগঠন। ফোরাম সদস্যগণ সবাই মিলে কোন বাহিনী নয়। তাই, এই কথা অত্যন্ত পরিষ্কার হওয়া দরকার যে, কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের জন্য কোন নতুন পুলিশ বাহিনী তৈরির প্রশ্ন অবান্তর। ‘কমিউনিটি পুলিশ’ বলতে কোন বাহিনী পুলিশ-পরিভাষায় নেই এবং বাংলাদেশ সরকার ‘কমিউনিটি পুলিশ’ নামে আলাদা কোন বাহিনীও গঠন করছে না।