ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ঝালকাঠী জেলা হল বাংলাদেশের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম জেলা। কিন্তু, জনসংখ্যা অনুপাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হয় ঝালকাঠী জেলায়। আমি ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ঝালকাঠী জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করি। আমার যোগদানের মাত্র পনের দিন আগে এখানে প্রলয়ংকরী ঘুর্নিঝড় ‘সিডর’ আঘাত হেনেছিল। এখানে সেই সময় যেমন ভেঙ্গে পড়েছিল গাছপালা, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, তেমনি ভেঙ্গে পড়েছিল সাধারণ যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাও। সরকারি-বেসরকারি, দেশি-বিদেশি প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে এলেও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ-ব্যবস্থা তখনও খুব নাজুক অবস্থায় ছিল।

কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে সেই এলাকায় সাধারণত সম্পত্তির বিরুদ্ধে অপরাধ বেড়ে যায়। গ্রামগুলো অন্ধকারে থাকায় সিঁধেল চুরি, ঘর ভেঙ্গে চুরি ও ডাকাতির মতো সহিংস অপরাধের ঘটনাও রোধ করা যাচ্ছিল না। আমাদের ঘটনা-তাড়িত পুলিশ-ব্যবস্থায় কোন স্থানে অপরাধ বেড়ে গেলেও তা যদি পুলিশের গোচরে আনা না হয়, তাহলে সে সম্পর্কে পুলিশ প্রশাসন কোনভাবেই তৎপর হয় না। বেসরকারিভাবে আমাদের গোচরে চুরি ডাকাতির অনেক খবর এলেও থানায় মামলা রুজুর হার অবশ্য তেমন বৃদ্ধি পেল না। কিন্তু, তাই বলে গ্রামে-গঞ্জে অপরাধ নিবারণের প্রচেষ্টা থেকে তো আমরা বিরত থাকতে পারি না। তাই অপরাধ প্রতিরোধে জনগণকে সম্পৃক্ত করার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হল। শুরু হল হাটে-বাজারে, পাড়ায়-মহল্লায় উদ্বুদ্ধকরণ তথা কমুউনিটি পুলিশিং কর্মকাণ্ড।

এক বিকালে একটি গ্রামে কমিউনিটি পুলিশিং এর একটি উদ্বুদ্ধকরণ সভায় উপস্থিত ছিলাম। মত বিনিময় কালে এলাকার জনগণ তাদের গ্রামে চুরি-ডাকাতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ না থাকার কথাও আমাকে জানালেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই গ্রামে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হওয়ার এক মাত্র কারণ হল, একটি বিদ্যুতের খুঁটি পুনঃস্থাপন করতে না পারা। এলাকার জনগণ জানালেন, খুঁটিটি স্থাপিত হয়েছিল স্থানীয় এক ব্যক্তির আবাদী জমিতে। ১০/১২ বছর আগে যখন তার ক্ষেতের মধ্যে এই খুঁটি স্থাপন করা হয়েছিল তখন তিনি বাধা দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এখন সিডরে যখন খুঁটিটি পড়ে গেছে, তিনি আর তা ওঠাতে দিবেন না। তার এই দাবীর মধ্যে যৌক্তিকতা থাকলেও তা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। কিন্তু, ভদ্রলোক ছিলেন প্রভাবশালী ও একরোখা চরিত্রের। তাই বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারীগণ এই খুঁটি না উঠিয়ে অফিসে চলে এসে বিষয়টি তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শুধু জানিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছিলেন। কিন্তু, পুরো গ্রাম যে অন্ধকারে রয়েছে এবং যার ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারে অভ্যস্ত গ্রামবাসিদের কি অবস্থা হয়েছে তা তারা উপলব্ধি করতে পারেন নি।

আমি বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ঘটনাস্থল থেকেই পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজারকে ফোন করলাম। তিনি বিষয়টি শুনে বললেন, এই সমস্যা তার জানা আছে। কিন্তু, এই মুহূর্তে অন্য দিকে প্রচণ্ড কাজের চাপ থাকায় তিনি এ বিষয়ে আর মনোযোগ দিতে পারেন নি। আমি জিএম সাহেবকে বললাম, আগামী কাল আপনার লোকজন ঐ গ্রামে যাবেন। সাথে আমার লোকজন থাকবে। স্থানীয় পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের ইন-চার্জকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দিলাম। মালিককে ডেকে বোঝান হল যে, তার দাবীর মধ্যে যৌক্তিকতা হলেও ন্যায্যতা নেই। এটা ছিল অনেক বছর আগের ঘটনা। ইতিমধ্যে গ্রামবাসিরা বিদ্যুৎ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। শুধু তার বাধার জন্যই গ্রামে বিদ্যুৎ চালু না হলে পুরো গ্রাম কালক্রমে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। তিনি গ্রামবাসির কাছে অপ্রিয় হবেন। এক সময় গ্রামবাসিরা তার উপর হামলাও করতে পারে। তখন, তাকে থানা পুলিশের কাছেই আসতে হবে। অত কিছু বাদ দিয়ে তিনি যেন তার জমিতে আগের মতো খুঁটিটি ওঠাতে দেন। ভদ্রলোক অবশেষে রাজি হয়েছিলেন। পরদিন দুপুরের আগেই খুঁটি ওঠানো শেষ হয়ে যায়। রাতে গ্রাম আলোকিত হয়। অনেক মানুষ আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানায়।

সনাতনী পুলিশিং ব্যবস্থায় যে বিষয়ের সাথে অপরাধের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই সে বিষয় পুলিশের নয় বলেই ধরে নেওয়া হয়। তাই অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পূনঃপ্রবর্তনের জন্য বিদ্যুতের খুঁটি উত্তোলন করে পুলিশের পেশাগত কোন্ লাভটি হয়েছে? গ্রামে-গঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ কাজে সময় ব্যয় করা কি পুলিশের পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে?

না, এটা পুলিশের পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। পুলিশের আসল কাজ হল জনগণকে অপরাধের হাত থেকে মুক্ত রাখা; তাদের বাসা-বাড়িতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা নয়। কিন্তু, আমি জানি, গ্রামটি অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকলে অপরাধীরা অপরাধকর্মের জন্য বেশি সুযোগ পাবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় অপরাধীরা সহজে অপরাধস্থলের কাছেই আত্মগোপন করতে পারে। গ্রামবাসিরা সন্ধ্যার সাথে সাথেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে ঘুমিয়ে পড়ে। বাজার-ঘাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় এবং রাস্তা-ঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। জনমানবহীন রাস্তা অপরাধীদের নিরাপদ চলাচলে সহায়তা করে।

তাই, গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলে গ্রামে চুরি-ডাকাতির মতো ঘটনা কমে যাবে। এমতাবস্থায়, পুলিশ তার দায়িত্ব না হলেও গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়তা করেছে। পুলিশের এই প্রচেষ্টায় জনগণ বিদ্যুৎ পেয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। তাদের ছেলে-মেয়েরা বিদ্যুতের আলোতে পড়া-শোনা করতে পেরেছে। বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে গ্রামে টেলিভিশন চলেছে। জনসাধারণ বিনোদনের সুযোগ পেয়েছে। এ সবই হল জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের উদাহরণ।

কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হল অপরাধ প্রতিরোধের নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করে কমিউনিটি সদস্যদের অপরাধের শিকার হওয়া থেকে মুক্ত রাখা। এর অবশ্যম্ভাবী উপজাত হল জনগণের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন। নাগরিক সুবিধাসমূহের সহজলভ্যতা নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন পুলিশকে তাই এই সব সুবিধা লাভে নাগরিকদের সহায়তা করার তাগিদ দেয়।