ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

১০ মে ২০০৯ সাল। নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী থানার বাট্রা গ্রামের লোকজন খালের পাড়ে একটি খণ্ডিত মনুষ্য কঙ্কাল আবিষ্কার করে। এখানে ছিল দুই হাতের দুইটি বড় হাড়, কয়েকটি পাজরের হাড় ও কয়েকটি দাঁতসহ একটি চোয়াল। কঙ্কালের পাশে পাওয়া গেল রক্তমাখা একটি লুঙ্গি, একটি সাদা সার্ট এবং একটি সিমেন্টের কাগুজে ব্যাগ। ঘটনাস্থলের পরিবেশ সাক্ষ্য দিচ্ছিল, এই আদম সন্তানটিকে অনেক আগে অন্য কোথাও হত্যা করে লাশটি গোপন করা হয়েছিল। সেখানেই তার রক্ত মাংস পচে গেছে। অতপর লাশটিকে সম্পূর্ণ গোপন করতে প্রথম স্থান থেকে তার দেহাবশেষ বাট্রাগ্রামে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

অজ্ঞাত পরিচয় কোন ব্যক্তিকে চেনার চেষ্টা সাধারণ মানুষ স্বভাবতই করে থাকেন। পুলিশ বরাতের বাইরেও বিভিন্ন মাধ্যমে অজ্ঞাত লাশ প্রাপ্তির খবর চারিদিকে চাউর হয়ে যায়। ভিকটিমের স্বজনরা সাধারণত কয়েক ঘন্টার মধ্যেই লাশের উপর হুমড়ি খেয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে। কিন্তু এই দেহাবশেষটুকু কোন্ মায়ের কোন্ সন্তানের, তার হদিস কোনভাবেই পাওয়া গেল না। বলাবাহুল্য, নোয়াখালী জেলায় যোগদানে পর থেকে আমাকে যে কয়টি মামলা নিয়ে বড়ই নাকাল হতে হয়েছিল, এই মনুষ্য কঙ্কাল প্রাপ্তির প্রেক্ষিতে যে হত্যা মামলাটি রুজু হয়েছিল সেটিই ছিল অগ্রগণ্য।

মামলাটি তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশের দায়িত্ব ছিল, এই হাড়গোড়গুলো মানুষের, না কোন জীবজন্তুর তা নিশ্চিত হওয়া। এই জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা রাসায়নিক পরীৰার জন্য কিছু হাড়গোড় মাইজদি জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করেছিল। উলেস্নখ্য, রাসায়নিক পরীক্ষায় এই হাড়গোড়গুলো যে মানুষের তা প্রমাণিত হলেও সেগুলো কোন্ মানুষের তা উদ্ঘাটন করা সম্ভব হল না। আর যেহেতু হাড়গোড়গুলো অন্য কোন স্থান থেকে নিয়ে এসে খালের পাড়ে রাখা হয়েছিল, তাই মৃতের পরিচয় উদ্ঘাটনের জন্য পুলিশ তেমন কোন বাড়তি ক্লু খুঁজে পেল না। এদিকে মামলাটি তদন্তের অগ্রগতি না থাকায় জেলা পুলিশের উপর ঊধর্বতন কর্তৃপক্ষের ছিল প্রচণ্ড চাপ।

কোন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেলে পুলিশ সাধারণত তার পরিচয় উদ্ঘাটনের জন্য সকল থানায় বেতারবার্তা প্রেরণ করে। এই বার্তার ভিত্তিতে দেশের সকল থানা তাদের সাপ্তাহিক চৌকিদারি প্যারেডে চৌকিদার ও মহল্লাদারদের মধ্যে এই সংবাদ ছড়িয়ে দেন। সিআইডির ক্রিমিনাল গেজেটে অজ্ঞাত লাশের ছবি প্রকাশিত হয়। তাছাড়া পত্রপত্রিকায় ছবি প্রকাশ করেও এই কাজ সম্পন্ন করা যায়। এসবের বাইরে তদন্তকারী কর্মকর্তা তার নিজ এবং পার্শ্ববর্তী থানায় কোন ব্যক্তি হারানো গেছে কিনা এবং হারানো গেলে সে সম্পর্কে কোন জিডি বা মামলাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসন্ধান করেন। এক্ষেত্রে চৌকিদার-মহল্লাদারের মাধ্যমে খবর সংগ্রহের পাশাপাশি থানায় ব্যক্তি নিঁখোজ সংক্রান্ত জিডি এবং নিয়মিত মামলা গুলো তন্ন তন্ন করে পর্যালোচনা করা হয়। সোনাইমুড়ী থানায় সমসাময়িক কালে ব্যক্তি নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি বা মামলা আছে কি না সে সম্পর্কে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অনুসন্ধানের জন্য নির্দেশ দিলাম। কিন্তু, তিনি এ সম্পর্কে কিছুই উদ্ঘাটন করতে পারলেন না। তাই মামলাটির তদন্তের আর অগ্রগতি হল না।

কঙ্কালের মামলাটি নিয়ে নাকাল হওয়ার এক পর্যায়ে একই বছর আগস্টের এক বিকালে সোনাইমুড়ী থানা পরিদর্শনে গেলেন সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার জনাব মাহাবুবুর রহমান। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় এলে ভূক্তভোগিরা তাদের সাথে সাক্ষাত করে নানা ধরণের অনুযোগ করে থাকেন। এমনি একজন ভূক্তভোগি বৃদ্ধ মফিজউল্লা সার্কেল এএসপির সাথে দেখা করলেন। অনুনয় করে মফিজউল্লা এএসপিকে বললেন, স্যার, আমার জুয়ান ছেলেটি হারিয়ে গেল, থানায় জানালাম কিন্তু, আজ চার/পাঁচ মাস হল থানা পুলিশ আমার ছেলেটি সম্পর্কে কোন সংবাদই সংগ্রহ করল না। লাশ না হয়, না-ই পেলাম, যদি জানতাম সে মারা গেছে তবু্ও মনকে বুঝাতে পারতাম।

সার্কেল এএসপি জানতে চাইলেন, থানায় কি কোন জিডি করেছিলেন? মফিজুল্লা হাঁ সূচক উত্তর দিয়ে এএসপিকে একটি জিডি দরখাস্তের কপি দেখালেন। এএসপি দেখলেন, ২৫ জানুয়ারী/০৯ তারিখে এই জিডি এন্ট্রি করা হয়েছে। ভিতরের ভাষা পড়ে জানা গেল বৃদ্ধের ছেলে শহীদুল্লা ২৩ জানুয়ারী /০৯ তারিখ সোনাইমুড়ী বাজার থেকে নিখোঁজ হয়েছে।

তদন্তকারী কর্তকর্তারা এতদিন যা করতে পারে নি, সন্তান হারা বৃদ্ধ মফিজুল্লা পুলিশের জন্য তাই করলেন। সার্কেল এএসপি সংশিস্নষ্ট জিডির নথিটি থানার রেকর্ডপত্র থেকে বের করলেন। দেখলেন, পাঁচ মাস আগে নিঁখোজ শহীদুল্লার মোবাইল নম্বরটির একটি কলসিট সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু এই কলসিট বিশ্লেষণ করে যে নিখোঁজ ব্যক্তির কিছুটা হলেও খোঁজ পাওয়া যেত তদন্তকারী কর্মকর্তা তা খেয়ালই করে না নি। আর জিডি তদন্তের ব্যাপারে পুলিশের ঊধর্বতন কর্মকর্তাদের আশানুরূপ তদারকী না থাকায় শহীদুল্লা নিখোঁজ ঘটনার অনুসন্ধান এই পর্যায়েই ছেদ পড়েছিল। শহীদুল্লা নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা কালক্রমে অন্যকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জিডির ফাইলে ধূলা জমতে থাকে।

বলা হয়ে থাকে, সকল ঘটনাই তদন্তযোগ্য এবং সকল মৃত্যুর রহস্যই কোন না কোন ভাবে উদ্ঘাটিত হয়ে থাকে। আমি বিষয়টি জানতে পেরেই এ হারানো শীদুল্লার সাথে হারানো ঘটনার পাঁচমাস পরে কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনাটির একটি যোগসূত্র অনুমান করলাম। কিন্তু এই হাড়গোড়ই যে নিখোঁজ শহীদুল্লার ছিল তা প্রমাণ করব কিভাবে? কাঙ্কালের সাথে প্রাপ্ত কাপড়-চোপড় শহীদুল্লার পরিবারকে দেখানো হল। শহীদুল্লার পিতা-মাতা-স্ত্রী কিংবা আত্মীয় স্বজনদের কেউ হাড়গোড়ের সাথে প্রাপ্ত আলামতগুলো শনাক্ত করতে পারল না।

তদন্তকারী কর্মকর্তা হয়তো এই পর্যন্ত এসেই তার তদন্তে ইতি টানতেন। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে তদন্ত জগতে বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির কিঞ্চিৎ ধারণা আছে বলেই আমি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে এখানে থামার অনুমতি দেই নাই। প্রাপ্ত হাড়গোড়ের সাথে প্রায় পাঁচ মাস আগে নিখোঁজ হওয়া শহীদুল্লার পরিচয়ের শেষ সূত্রটুকু ব্যাবহারের জন্য আমি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে হাড়গোড়গুলোর ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দিলাম। নিখোঁজ শহীদুল্লার বাবা মফিজুল্লা ডিএনএ পরীক্ষায় সহযোগিতা করতে রাজি হয় নাই। কিন্তু পুলিশের পীড়াপীড়িতে তিনি রাজি হলেন।

ইতোপূর্বে মাইজদী জেনারেল হাসপাতালে সংরক্ষিত কঙ্কালের নমুনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ”ন্যাশনাল ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রফাইলিং ল্যাবরেটরীতে” পাঠিয়ে দেওয়া হল। নির্ধারিত দিনে পুত্রহারা পিতা মফিজুল্লাকে পরীক্ষাগারে নেওয়া হল। বিশেষজ্ঞরা মফিজুল্লার রক্তের নমুনা সংগ্রহ করলেন।

এরপর অপেক্ষার পালা। কয়েক সপ্তাহ পরে পুলিশের কাছে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল আসল। বিশেষজ্ঞরা লিখলেন, প্রাপ্ত কঙ্কালের নমুনার (দাঁত) জেনেটিক বৈশিষ্ট্যসমূহ মফিজুল্লার রক্তের জেনেটি বৈশিষ্ট্যের সাথে এমনভাবে মিলে গেছে, যা কেবল একজন সন্তানই তার জৈবিক পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে পারে। অর্থাৎ পুলিশ শেষ পর্যন্ত প্রাপ্ত হাড়গোড়ের পরিচয় উদ্ঘাটনে সমর্থ হল। পুত্রহারা পিতা মফিজুল্লা জানলেন, তার পুত্র শহীদুল্লা আর বেঁচে নেই। বাংলাদেশের ফৌজদারি মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্ট চালু হবার পর থেকে নোয়াখালী জেলা পুলিশের এটাই ছিল সর্বপ্রথম পরীক্ষা।

বলা বাহুল্য, আমরা তদন্তের মাধ্যমে কেবল কঙ্কালের পরিচয় উদ্ঘাটনে সক্ষম হয়েছিলাম। কিন্তু নিখোঁজ শহীদুল্লার অপহরণ ও হত্যাকারিদের নানা প্রতিকূলতার মাঝে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারি নাই। তবে তাদের শনাক্ত করা অসম্ভব কিছুই ছিল না।

বিঃদ্রঃ এ বিষয়ে আমার লিখিত একটি ইংরেজী প্রবন্ধ চাইলে পড়তে পারেন (লিংক)