ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাংলাদেশের বেসামরিক সার্ভিসের মধ্যে পুলিশ বিভাগে পদোন্নতির সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এখানে কনস্টেবল পদে যোগ দিয়ে ছয়/সাত বছরের মধ্যেই এএসআই হওয়া যায়। প্রতি বছর হাজার হাজার পুলিশ কর্মচারী বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পদোন্নতি পাচ্ছে। কিন্তু, এই পদোন্নতিকে ঘিরে চলে নানা প্রকারের অসম সমীকরণ। অধিকাংশ পদোন্নতি প্রত্যাশী মেধার পরিচয় দিয়ে পদোন্নতি নিশ্চিত করতে চাইলেও অনেকে চোরাই পথে হেঁটে হেঁটে স্বল্প মেধায় অর্থ খরচ করে স্বল্প সময়ে পদোন্নতি নিশ্চিত করতে চান। অন্যদিকে, পদোন্নতি প্রদানের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব যাদের হাতে তারাও পদোন্নতি প্রার্থীদের নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে নিরবে কয়েক পয়সা কামিয়ে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে বিভাগীয় চ্যানেলের অপ্রতুলতা হেতু অনেক পদোন্নতি প্রত্যাশী পুলিশ সদস্য বহির্বিভাগীয় তদবির বা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে শুরু করেছে।

বলা বহুল্য, পদোন্নতির ক্ষেত্রে বাঁকা পথে চলার প্রচেষ্টা ও সেই প্রচেষ্টাকে পুঁজি করে দুর্নীতির ঘটনাবলী শুধু বাংলাদেশই লক্ষ্য করা যায় না। এই উপসর্গ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। ১৯৬০ দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি পুলিশে পদোন্নতির ক্ষেত্রে দুর্নীতির ঘটনা ছিল প্রচার মাধ্যমের নিত্যদিনের খোরাক। এমনও বর্ণনা পাওয়া যায় যে সেই সময় নিউইয়র্ক সিটি পুলিশের কোন্‌ পদের প্রমোশনের জন্য কত টাকার উৎকোচ দিতে হবে, তার একটি লিখিত তালিকা পর্যন্ত পদোন্নতি প্রত্যাশীদের হাতে হাতে থাকত । নিউইর্য়ক সিটি পুলিশের একজন ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতির জন্য ১৯৭০ এর দশকেও ১২-১৫ হাজার ডলার ঘুষ গুণতে হত। কিন্তু, মজার বিষয় হল, সেই সময় নিউইয়র্ক সিটি পুলিশের একজন ক্যাপ্টেনের বাৎসরিক বেতন ছিল মাত্র ৩ হাজার ডলার ।

যাহোক, কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ক কর্মশালা পরিচালনার জন্য আমি গত ২১-২৬ মে/২০১২ খুলনা রেঞ্জের কয়েকটি জেলা পরিদর্শন করি। এই সময় কোন এক জেলার জনৈক কনস্টেবল সালেক মিয়ার (আসল নাম নয়) মুখ থেকে তার পদোন্নতি বিড়ম্বনার এক করুণ কাহিনী শুনলাম।

সালেকের চাকুরির বয়স মাত্র সাড়ে ছয় বছর। কিন্তু, এই বয়সেই সে পদোন্নতির জন্য প্রায় পাগল হয়ে উঠেছে। শুধু সেই নয়, তার অনেক সহকর্মী জানতে পেরেছে সংশ্লিষ্ট জেলায় বসবাসকারী সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ জনৈক রাজনীতিবিদের কাছে তদবির করলে পদোন্নতি পরীক্ষার মেধা তালিকায় তার নাম দুই বা তিন নাম্বারে রাখা যাবে। এর ফলে সে চলতি বছরেই পদোন্নতি পাবে।

সেই রাজনীতিবিদের এক জ্ঞাতি ভাইয়ের কাছে এই জন্য সালেক মিয়া তিন লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করে। এত দিনের চাকরিতে জমানো টাকার বাইরেও সালেক তার পৈত্রিক জমি বিক্রি করে অতি কষ্টে তিন লাখ টাকা সংগ্রহ করে। কিন্তু, পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেল, মেধা তালিকায় সালেকের স্থান হয়েছে ২০ নাম্বারে|

সংশ্লিষ্ট জেলায় বড় জোর তিনজন কনস্টেবলের পদোন্নতি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই বছরে তার প্রমোশন হওয়া অসম্ভব। আর এই বছরের ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে আবার নতুন তালিকা তৈরি হবে যে তালিকায় পূনরায় পরীক্ষা দিয়ে স্থান করে নিতে হবে। এমতাবস্থায়, সালেকের তিনলাখ টাকা কোন কাজই দিল না।

এই প্রসঙ্গে পুলিশের বিভাগীয় পদোন্নতির পদ্ধতিটি সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা উচিৎ বলে মনে করি। পুলিশ কনস্টেবলদের চাকরির বয়স ৬ বছর পূর্ণ হলে তারা এএসআই পদের জন্য পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে। প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এই পদোন্নতি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কনস্টেবলদের মধ্য থেকে পরবর্তী এক বছরে প্রতিটি ইউনিটে পদ খালী থাকা সাপেক্ষে কনস্টেবলদের এএসআই পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত প্রবল। মেধা তালিকায় প্রথম দিকে থাকতে না পারলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও পদোন্নতি পাওয়া যায় না। তা ছাড়া মেধা তালিকার প্রথম বা দ্বিতীয় ব্যক্তিতে পদোন্নতি বঞ্চিত করে তালিকার নিচ থেকে পদোন্নতি দেওয়ার নিয়ম বা নজির কোনটাই নেই। এমতাবস্থায়, পদোন্নতি পরীক্ষার মেধা তালিকায় এক থেকে পাঁচ এর মধ্যে যে কোন মূল্যে স্থান করে নেওয়ার নানা প্রকার তদবির ও প্রলোভনসহ বিভিন্ন ধরণের অনিয়ম ঘটানোর প্রচেষ্টা পরিলক্ষ্যিত হয়।

সাধারণত তিন সদস্যের একটি পদোন্নতি পরীক্ষা কমিটি বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষা পরিচালন না করেন। সংশ্লিষ্ট ইউনিটের প্রধান (পুলিশ সুপার) কমিটির সভাপতির পদটি অলংকৃত করেন। পার্শ্ববর্তী দুই ইউনিট থেকে দুইজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বা সহকারী পুলিশ সুপার কমিটির সদস্য হন। সংশ্লিষ্ট পুলিশ রেঞ্জের ডিআইজি এই কমিটি গঠন করে থাকেন।

২০০৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত কোন ইউনিটের বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষা পরিচালনা, পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন, সাক্ষাৎকার গ্রহণ ইত্যাদি সকল প্রকার কার্যক্রমে এই কমিটিই সর্বময় অধিকার ভোগ করতো। কিন্তু, এই ক্ষেত্রে পদোন্নতিতে ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক ও বহির্বিভাগীয় হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। এই ক্ষেত্রে পরীক্ষা কমিটিকে সহজেই ম্যানেজর করার সুযোগ থাকত। পুলিশ বিভাগের মধ্যে এমন একটি বিশ্বাস জন্মে যে ইউনিট প্রধান বা কমিটির সদস্যদের দেহরক্ষী, অর্ডালী বা ঘনিষ্ঠজনরাই মেধা তালিকায় প্রথম কয়েকটি পদ অধিকার করে। এর ফলে মেধা থাকা সত্ত্বেও যোগ্য ব্যক্তিরা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়; পক্ষান্তরে মেধাহীনরা পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সার্ভিসের মানের অবনতি ঘটাতে থাকে।

এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য নিয়ম করা হয়, কোন ইউনিটের পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি সেই ইউনিটের পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করবেন না। পরীক্ষাগ্রহণ করে জেলার নিয়োগ কমিটি উত্তর পত্রগুলোতে কোড বসিয়ে সেগুলো সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ ডিআইজির দফতরে পাঠিয়ে দিবেন। ডিআইজিগণ খাতার কোড সমবলিত অংশটুকু তার কাছে রেখে দিয়ে নাম-ঠিকানাবিহীন খাতাগুলো অন্য জেলায় পাঠিয়ে দিবেন। অন্য জেলার পরীক্ষা কমিটি এই সব উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে ডিআইজি অফিসে পাঠিয়ে দিবেন। পরে ডিআইজি লিখিত পরীক্ষায় প্রাপ্ত উত্তরপত্রগুলো নির্ধারিত কোডের সাথে মিলিয়ে স্ব স্ব জেলায় প্রেরণ করবেন।

এই ব্যবস্থার ফলে কোন জেলার বা ইউনিট প্রধানই পদোন্নতি প্রদান প্রক্রিয়ায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রইলেন না। এই প্রক্রিয়ায় ডিআইজি এর মাধ্যম্যে পৃথক পৃথক কমান্ডের দুই দুইটি কমিটির প্রায় ছয়জন পুলিশ কর্মকর্তা একত্রিত হলেন। তাই, কোন পদোন্নতি প্রত্যাশী কনস্টেবল তার নিজ জেলা/ইউনিট প্রধানের যত কাছাকাছিই হোক বা তাকে যেভাবেই ম্যানেজ করার চেষ্টা করুক না কেন, লিখিত পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানো কমানোর ক্ষেত্রে তার কোন কর্তৃত্ব থাকল না। এই ব্যবস্থার ফলে প্রকৃত মেধাবী কনস্টেবলগণ এএসআই হওয়ার ক্ষেত্রে সুবিচার পাওয়া শুরু করল।

আমাদের আলোচিত সালেক মিয়ার বিভাগীয় পদোন্নতি প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছিল না। সব কিছু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে আমি তার কাছ থেকে জানতে চাইলাম, একজন রাজনীতিবিদ কীভাবে তাকে বিভাগীয় পরীক্ষায় মেধা তালিকায় প্রথম স্থানে বসাতে পারবে? সালেক বলল, এই রাজনীতিবিদ ডিআইজিকে নির্দেশ দিবেন। ডিআইজি নির্দেশ দিবেন এসপিকে এবং এসপি পরীক্ষা কমিটির অন্যান্যদের নির্দেশ দিয়ে তার নম্বর বাড়িয়ে দিবেন। কত সরল সালেকের ধারণা! পুলিশের সকল কর্মকর্তাই তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অধীন। এখানে সেবাদান প্রক্রিয়া ও অভিযান পরিচালনা চলে সুনির্দিষ্ট কমান্ড ও কন্ট্রোলের মাধ্যমে। কিন্তু, দুর্নীতির বিষয়টি যে সুনির্দিষ্ট কমান্ডের মধ্যে পড়ে না, কনস্টেবল সালেক তা অনুধাবন করতে অপারগ।

যাহোক, কনস্টেবল সালেকের ঘটনাটি একটি বিষয়কে আমাদের সামনে সুস্পষ্ট করে তুলেছে। তা হল, পুলিশ প্রশাসনের উপর বহির্বিভাগীয় হস্তক্ষেপ অত্যন্ত প্রবল। এই হস্তক্ষেপ এতটাই নিম্নরূপ পরিগ্রহ করেছে যে একজন পুলিশ কনস্টেবল বিশ্বাস করে, একজন রাজনীতিবিদ নির্দেশ দিলে বা অনুরোধ করলেই তার ডিআইজি, এসপি এবং অন্যান্যরা তৎক্ষণাৎ তার পরীক্ষার খাতায় নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে তাকে পরীক্ষায় প্রথম বানিয়ে দিবে।

বিষয়টির এখানেই শেষ নয়। কনস্টেবল সালেকের মতে, সেই রাজনীতিবিদকে তার মতো অনেক কনস্টেবলই টাকা দিয়েছেন। কিন্তু কেউই কাঙ্খিত ফল পান নাই। তবে, কেউ কারো কাছে মুখ খোলেন না। তবে প্রত্যেকেই বিভিন্নভাবে সেই রাজনীতিবিদের জ্ঞাতী ভাইয়ের কাছে টাকার জন্য ফোনে বা সশরীরে গিয়ে ধর্না দিচ্ছেন। কিন্তু, বর্তমানে সেই ব্যক্তি লাপাত্তা হয়েছে। পদোন্নতির প্রচেষ্টায় উৎকোচ দিতে গিয়ে এই জেলার অনেক পুলিশ কর্মচারিই এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।