ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সড়ক দুর্ঘটনা ভাগ্যের লিখন না প্রতিরোধযোগ্য মানবিক আচরণ? এই বিষয়ে সম্প্রতি হাজারো বিতর্কের জন্ম হয়েছে। এই বিতর্কে সরকারের একাধীক মন্ত্রী থেকে শুরু করে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন পর্যন্ত যোগ দিয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী সরে জমিনে রাস্তায় নেমেছেন। তিনি ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারী গাড়ির চালকদের হাতে নাতে পর্যন্ত ধরে ফেলেছেন। রাস্তার গাঠনিক দুর্বলতাও তার নজর এড়ায় নি।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে অনেকে ট্রাফিক আইনের অদক্ষ প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগকে দায়ী করেছেন। কেউ কেউ আইনে গাড়িচালকদের অপ্রতুল শাস্তির বিধানকেও দায়ী করেছেন। কিন্তু ট্রাফিক আইনের অধীন অপরাধ আর দণ্ডবিধির অধীন সংঘটিত অপরাধের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। দণ্ডবিধির উদ্যেশ্য হল আইন ভঙ্গকারীদের শাস্তি দিয়ে সমাজের মানুষকে নিরাপদ রাখা যাতে এই শাস্তির ভয়ে একই ব্যক্তি পূনর্বার কিংবা অন্যরা নতুন করে এই জাতীয় অপরাধ করা থেকে বিরত থাকতে পারে। অধিকন্তু, অপরাধ হল মানুষের একটি আচরণ বা কৃতকর্ম। প্রত্যেক ব্যক্তিই তার কৃতকর্মের পরিণাম ভোগ করতে বাধ্য। কেউ আইনের মধ্য থেকে সঠিক কাজটি করলে যেমন তার কোন না কোন প্রাপ্তি বা পুরস্কার রয়েছে, তেমনি কেউ আইন ভঙ্গ করে খারাপ কাজ করলে তারও একটি পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকা দরকার। আইন ভঙ্গকারীদের শাস্তিদান, তাই, তাদের জন্য একটি প্রাপ্তি। তবে এই প্রাপ্তি হল নেতিবাচক। রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাথমিক দায়িত্ব হল, আইন ভঙ্গকারীদের আইনের আওতায় আনা এবং তাদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা। দণ্ডবিধি রাষ্ট্রযন্ত্রকে এই কর্তৃত্ব অর্পণ করে।

অন্যদিকে, ট্রাফিক আইনের উদ্যেশ্য নাগরিকদের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং নাগরিকদের শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে জনপথে যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীগণ কোন পেশাদার অপরাধী নন। তারা বিশেষ কারণে আইনের আওতায় যান চালনায় ব্যর্থ হয়েছেন। এখানে অবহেলা, বেপরোয়া, মাতাল হওয়া ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এমতাবস্থায়, পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রেই ট্রাফিক আইনে কারাদণ্ডের চেয়ে জরিমানা করার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।

সড়ককে নিরাপদ করতে হলে যানচালকদের শাস্তিদানের চেয়ে তাদের প্রশিক্ষিত ও মানবিক গুণসম্পন্ন করে তোলাই বেশি যৌক্তিক। আমাদের দেশে ট্রাফিক আইনের বাস্তবায়ন দুর্বল বলে অনেকেই মনে করেন। আর এই দুর্বলতা কেবল পুলিশের বলেই জোরসে প্রচার চালান হয়। কিন্তু এর সাথে রাস্তা নির্মাণকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, স্থানীয় পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষসহ অনেক বিভাগই যে জড়িত তা অনেকেই জানেন না এবং জানলেও বোঝেন না। মোটরযান চালনার প্রধানতম শর্ত হচ্ছে, চালকের যথাযথ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা। কিন্তু, এই লাইসেন্স প্রদানের ভার বিআরটিএ এর হাতে; পুলিশের হাতে নয়। পত্রপত্রিকার খবরমতে বর্তমানে দেশে প্রায় ২০ লাখ রেজিস্ট্রিকৃত মোটর যান রয়েছে। অন্যদিকে গাড়ির চালক রয়েছে প্রায ১০ থেকে ১১ লাখ। কিন্তু এই গাড়ির চালকদের প্রায় ১০ লাখই ভূয়া লাইসেন্স সংগ্রহ করে গাড়ি চালাচ্ছে[1]।

অন্যদিকে খোদ বিআরটিএ স্বীকার করেছে, তারা ১৯৯০ সাল থেকে এক শ্রেণির চালককে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও কোন প্রকার পরীক্ষা ছাড়াই পেশাদার লাইসেন্স দেওয়া শুরু করে। ২০১১ সাল পর্যন্ত তারা সাড়ে ছয় লাখ পেশাদার লাইসেন্স দিয়েছে যার মধ্যে প্রায় চার লাখ লাইসেন্সই বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের আবেদনের প্রেক্ষিতে যথাযথ পরীক্ষা এবং প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ইসু করেছে[2]।

এতো গেল লাইসেন্সের কথা। এ ছাড়াও গাড়ির ফিটনেস সনদ, রুট পারমিট ইত্যাদি প্রদানের দায়িত্ব তো পুলিশের নয়। প্রতিদিন হাজারো লক্কর-ঝক্কর মার্কা গাড়ি রাস্তায় চলছে। এসব গাড়ি যত পুরাতন বা চলাচলের অনুপযোগী হোক না কেন, এগুলোর প্রায় সবই বিআরটিএ অফিস থেকে বৈধ ফিটনেস সার্টিফিকেট বের করে নিয়েছে। হ্যাঁ, এই সব ফিটনেস সার্টিফিকেট সম্পন্ন আনফিট গাড়ি রাস্তায় পুলিশ আটক করে সাময়িক ব্যবস্থা নিতে পারে। ভূয়া লাইসেন্সধারী ড্রাইভারদের লাইসেন্স আটক করতে পারে। পুলিশ যে তা করছে না তা একদম সঠিক নয়। কিন্তু, এই কাজ পুলিশের জন্য আসলে ওয়াসার পাম্প দিয়ে সাগর সেচার প্রচেষ্টার মতো। ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থা কোন প্রকার জবাবদিহিতা ছাড়াই অযোগ্য গাড়িকে যোগ্যতার সনদ দিবে, অযোগ্য ড্রাইভারকে ড্রাইভিং সনদ দেবে, আর পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতেই থাকবে — এই অশুভ গোলক ধাঁধাঁয় পুলিশকে ফেলে হেস্ত-নেস্ত করা কতটুকু যৌক্তিক?

রাস্তায় ট্রাফিক দুর্ঘটনা ঘটার পিছনে নানাবিধও কারণ জাড়িত থাকে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে মাত্রাতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, রাস্তার জ্যামিতিক ত্রুটি, নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালনা, পথচারী ও যাত্রীদের অসাবধানতাসহ ১৭টি কারণ চিহ্নিত করেছেন[3]। এই সব কারণের মধ্যে অধিকাংশ কারণই পুলিশ কর্তৃক নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। যেমন, রাস্তার গাঠনিক ত্রুটি বা পথচারী বা চালকদের অসাবধানতা পুলিশ দূর করতে পারে না। অযোগ্য চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান পুলিশ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সবটুকুর জন্য পুলিশকে দোষারোপ করা ঠিক নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব বলে মনে করা হয় না। অনেক দেশে এই কাজ থেকে পুলিশকে সম্পূর্ণ অব্যহতি দেওয়ার প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ, নিউজিল্যান্ড সকরার ১৯৩৬ সালে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পুলিশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিশেষ বিভাগের উপর অর্পণ করেছিল। কিন্তু ১৯৯২ সালে তা আবার পুলিশের কাছে প্রত্যাবর্তন করা হয়। ঠিক একই রকমের ব্যর্থ নিরীক্ষা চালানো হয়েছিল পশ্চিম আস্ট্রেলিয়াতেও। কিন্তু ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ৭ বছরের মাথায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ও কর্তৃত সরকার পুলিশের উপর অর্পণে বাধ্য হয়েছিল[4]

পূর্বেই বলেছি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সকল বিষয়ই পুলিশের উপর ছেড়ে দেওয়ার উপায় নেই। পৃথিবীর সব দেশেই এর সাথে একাধীক সংস্থা জড়িত থাকে। তবে উন্নত দেশে এই সব সংস্থা অত্যন্ত দক্ষ ও পরস্পরের সাথে সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ ও সত্যিকারভাবে স্ব স্ব কর্তব্য পালনে প্রতিশ্রুতিবন্ধ। কিন্তু বাংলাদেশে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা, মোটরযান আইনের প্রয়োগ ইত্যাদি নিয়ে এখানে শুধু পুলিশকে দোষারোপের প্রতিযোগিতা চলে। এ দেশে নীতি নির্ধারণ, সমন্বয়সাধন ইত্যাদি ক্ষেত্রে পুলিশকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এমনও দেখা গেছে, দেশে যানজন নিরসনের জন্য উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠিত হয়েছে যেখানে রেলওয়ের প্রতিনিধি পর্যন্ত রয়েছে, কিন্তু সেই কমিটিতে ট্রাফিক পুলিশের নাম-গন্ধ পর্যন্ত নেই[5]। এখানে দায় পুলিশের কিন্তু দায়িত্ব অন্যদের।

——————————————————————————–
[1] |http://www.newsbna.net/print.php?id=23874
[2] Prothom-alo 07-08-2011; http://www.prothom-alo.com/detail/news/176229
[3] Prothom-alo 09-02-2010/ http://www.prothom-alo.com/detail/news/41138
[4] Police for the Future by David H. Baiyley,p-135, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস.
[5] দৈনিক যায় যায় দিন ০৮ নভেম্বর, ২০০৭