ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

অফিসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই গিন্নি ফোনে জানাল, বাসায় বিদ্যুৎ নেই। আমি বললাম, বিদ্যুৎ না থাকা নতুন বিষয় নয়। বিদ্যুৎ নিয়েই তো যত দোষাদোষি, সরকার পতন, সরকার উত্থান। তাই অপেক্ষা কর। বিদ্যুৎ চলে আসবে।

কিন্তু, গিন্নি বলল, পাশের ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ আছে। আমাদের ফ্ল্যাটে নেই। সে খোঁজ নিয়ে জানাল, বিল্ডিং এর কয়েকটি ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ আছে, কয়েকটিতে নেই। তার মানে, কোথাও একটা গণ্ডগোল আছে। এটা নিয়মিত লোড সেডিং নয়।

বিল্ডিং এর সভাপতিকে বিষয়টি জানানো হল। আমার প্রথম প্রতিবেশি নিজেই দুইটি ফ্ল্যাটের মালিক। তারও একটি ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ নেই। তাকেও জানান হল। তারা দু’জনেই বিদ্যুতের অভিযোগ শাখায় ফোন করলেন। কয়েক ঘন্টা কেটে গেল। কিন্তু, বিদ্যুতের কর্মচারীদের কেউ এল না।

গিন্নি আবার ফোন করলেন। আমি আমার প্রতিবেশি ও বিল্ডিং এর সভাপতিকে পূনরায় তাগিদ দিলাম। তারা বললেন, ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে তাদের কথা হয়েছে। তারা শিঘ্রই লোক পাঠাবেন। কিন্তু, আরো কয়েক ঘন্টা কাটল। কেউ এল না। গিন্নি অস্তির হয়ে উঠল। আবার ফোন। আবার বিদ্যুৎ বিভাগে ফোন। কিন্তু, বিদ্যুতের অভিযোগের ফোন শুধুই ব্যস্ত।

অফিস ছুটির সময় সমাগত। গিন্নির ফোন। অস্থির আমি। অফিস সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম।

পথিমধ্যে আমার প্রথম প্রতিবেশির আর একটি ফোন কল। তিনি বললেন, ভাই, বিদ্যুতের লোকজন বাসায় গিয়েছেন। কিন্তু, আমরা তো কেউ বাসায় নেই। ওরা তো কেউ না গেলে কাজ করবে না। আমাদের যে কাউকে তারা পাশে চায়।

কিন্তু কেন? আমি জানতে চাইলাম। আমার প্রতিবেশি আমতা আমতা করে বললেন, ভাই, আসলে ওদের তো কিছু দিতে হয়। তাই, আমরা যদি কেউ ওখানে না থাকি তো কে তাদের সন্তুষ্ট করবে?

তার মানে ওদের সন্তুষ্ট করতে হবে। কিন্তু, কীভাবে তাদের সন্তুষ্ট করতে হবে তা আমার জানা নেই। আমি ইতোপূর্বে কাউকে ঘুষ দেইনি। আমি নিজেও ঘুষ খাইনি। আমি নিজে ঘুষ না খেয়েই সন্তুষ্ট।

আমার প্রতিবেশি মিনতি করে বললেন, ভাই, আপনি কয়েক দিন পর অন্য খানে চলে যাবেন। আপনারা ক্ষমতার চাকরি করেন। হয়তো সরকারি বাসায় উঠবেন। কিন্তু, আজ যদি তারা খালি হাতে ফিরে যায়, পরে ওদের ফোন করে আর পাওয়াই যাবে না। তখন আমরা বিপদে পড়ব। আর টাকাটা আপনার পকেট থেকে দিতে হবে না। আমরা সার্ভিস চার্জ থেকে ওটা ম্যানেজ করে নিব। আপাতত আপনি ম্যানেজ করুন।

বিদ্যুতের লাইন মেরামত করা হল। বিদ্যুৎও এল। বাসার নিচে দারওয়ান আমাকে ডাকতে থাকে। আমার প্রতিবেশি আমাকে ফোন করে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকদের কাছে যেতে অনুরোধ করেন। আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিচে গেলাম।

বিদ্যুতের লোকজন বললেন, তাহলে আপনাকে ম্যানেজার সাহেব পাঠিয়েছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি আমাকে নিচে আসতে বললেন। বিদ্যুতের লোকজন আমার দিকে চেয়ে থাকে। আমি তাদের দিকে চেয়ে থাকি। ওরা আমার কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করছে। আমি আমার পিছন পকেটে মানিব্যাগের উপর হাত দিলাম। হাতটি আবার সরিয়ে নিলাম। তাহলে আমাকে কী কিছু ঘুষ দিতেই হবে?

সাধারণত অতি প্রয়োজন না হলে, ইউনিফর্মহীন অবস্থায় নিজের পরিচয় প্রকাশ করি না। অপ্রস্তুত স্বরে বললাম, ভাই, আমি পুলিশে চাকরি করি। তবে কখনো ঘুষ খাইনি। ঘুষ দিয়েছি বলেও মনে পড়ে না। বলেন, আপনাদের কত টাকা ঘুষ দিতে হবে?

বিদ্যুতের লোকজন কাঁচুমাচু করে বলল, স্যার, আমরা ঘুষ নেই না। তবে কেউ খুশি হয়ে চা পানি খেতে দিলে নেই। আপনাকে দিতে হবে না।

জানি না বিদ্যুতের লোকজন শেষ পর্যন্ত আমার সম্পর্কে কী চিন্তা করেছে। তবে আমার পরবর্তী চিন্তাও সুখের নয়। মাত্র দুই তিনশ’ টাকার বকশিসরূপী ঘুষ না দেওয়ায় পরবর্তী ডাকে তারা কীভাবে সাড়া দিবে তাই ভাবনার বিষয়। আজ অভিযোগ জানানোর প্রায় ছয় ঘন্টা পর তারা এসেছিল। কিন্তু সামনের দিনগুলোতে কত ঘন্টা পরে আসবে, না আদৌ আসবেন না, তা কে বলবে? এক মাঘে কী আর শীত যায়?

সরকারি হোক আর বেসরকারি হোক নাগরিক সেবা পেতে হলে বাংলাদেশের মানুষকে নিয়মিত পাওনার চেয়েও বাড়তি পাওনা পরিশোধ করতে হয়। এটা তাদের নিয়তি। কোন অফিসে মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে যেতে হয় কিংবা তার সেবা নিতে হয়, আর কিছু বাড়তি অর্থ খরচ করতে হয় না, এমন অফিস কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো বিরল। বিদ্যুৎ-সেবা গ্রহণের জন্যও তাই মানুষ বকশিস ছাড়েন। এই বসশিসের পরিমাণ কত? বাসার দারোয়ান জানালেন, এক বা দুই শত টাকা দিলেই চলে।

২০০৫ সালের টিআইবির খানা জরিপ মতে বাংলাদেশের মানুষকে ৯টি সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ২৫ প্রকারের সেবা পেতে নির্ধারিত ফি এর বাইরে প্রায় ৬,৭৯৬ কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল। এর মধ্যে যারা বিদ্যুতের জন্য ধর্না দিয়েছিল তাদের শতকরা ৭০ জনকে বিদ্যুতের সংযোগ নিতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মাথা পিছু ১১৭৪ টাকা হারে ঘুষ দিতে হয়েছিল। লিংক । তবে টিআইবি এর এই জরিপে বিদ্যুতের লাইনম্যানদের এই জাতীয় বকশিস গ্রহণের হিসেব নিশ্চয়ই নেই। পুলিশ, প্রশাসক, বিচারক, শিক্ষক প্রমুখের চেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগও কম যায় না।