ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

মানুষের বিচ্যূত আচরণগুলোর মধ্যে দুর্নীতি অন্যতম। যেদিন থেকে মানুষ আদিমতা পরিত্যাগ করে সভ্য জীবনে প্রবেশ করেছে, সম্ভবত সেই দিন থেকেই দুর্নীতির কালো ছায়া তাদের পিছু নিয়েছে। দুর্নীতি উত্তরাধুনিক যুগে একটি সুপরিচিত অনাধুনিক আচরণ। একে মানুষের পশু প্রবৃত্তির আধুনিক রূপও বলা যেতে পারে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলা ভূখণ্ডেও দুর্নীতির ধারণা বড় পুরাতন। কৌটিল্যের অর্থ শাস্ত্রসহ অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থে পুরাকালের রাজ্যগুলোর বিভিন্ন দফতরে ও রাজ্য পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির চিত্র ধরা পড়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভের অব্যবহিত পরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নবীন সরকারকে যেসব অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছিল, তাদের মধ্যে দুর্নীতি ছিল প্রধানতম।

১৮৬০ সালের ভারতীয় দণ্ড বিধিতে (বাংলাদেশে শুধু ‘দণ্ডবিধি’) দুর্নীতির দায় শুধু সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু, বর্তমানে দুর্নীতির ধরন বেড়েছে। বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দেশের টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাঠান কিংবা বিদেশের প্রকৃত পাওনাকে দেশে নিয়ে না আসাকেও বর্তমানে দুর্নীতির পর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে। তবে দুর্নীতির অন্যসব ধারণা বা ধারণাকে ছাড়িয়ে বর্তমানে সরকারি কর্মচারীদের উপরি পাওনা বা অর্থের বিনিময়ে কর্মসম্পাদন বা কর্ম বিরতিকেই সমধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দুর্নীতির ঘটনাগুলোর অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা রুজু ও মামলা পরিচালনার জন্য বর্তমানে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আইনে কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার অনেক উপাদান থাকলেও নানা কারণে এটা আশানুরূপ কাজ করতে পারছে না। তবে, এখন পর্যন্ত এই কমিশন যা করেছে বা এখনও করছে তা একেবারে তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই।

সম্প্রতি পত্রিকার প্রতিবেদনে জানা যায়, দুর্নীতিদমন কমিশন অতি শিঘ্রই সরকারের বিভিন্ন দফতরের ঘুষখোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের হাতেনাতে প্রমাণসহ গ্রেফতারের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবে[1]। কিন্তু, স্বপ্রণোদিত আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নিজস্ব কোন বাহিনী নেই। তারা দুর্নীতির মামলার অনুসন্ধান, তদন্ত কিংবা এই সম্পর্কে প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনার জন্য উপযুক্ত হলেও তারা পুলিশ নয়। তাই তাদের পুলিশের সাহায্যের প্রয়োজন। আর এই কাজের সহায়তার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন গত ৩ মে/২০১২ এর বৈঠকে পুলিশের ডিএমপি ও র‌্যাবের কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ করেন ও তাদের সহায়তা কামনা করেন। ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির পাগলা ঘোড়ার মুখে লাগাম পরাতে দুর্নীতি দমন কমিশনের এমন একটি অভিযান পরিকল্পনা অবশ্যই প্রশংসারযোগ্য।

দুর্নীতির নানা রূপ ও ধরণ রয়েছে। আমার মতে, রাস্তার ভিক্ষুকটি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধীষ্ঠিত দেশের এক নম্বর নাগরিকটিও কোন না কোন ভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারেন। আগেই বলেছি, দুর্নীতি হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোন কাজ করা বা না করাকেও বোঝায়। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা থেকে শুরু করে মিগ-২৯ জঙ্গী বিমান কেনার চুক্তি করার বিনিময়ে বিমানের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কমিশন গ্রহণের বিষয়টিও দুর্নীতির পর্যায়ভুক্ত। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের কোন কাজ করিয়ে দেওয়ার জন্য বা না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগী ব্যক্তির কাছ থেকে নগদ অর্থ বা পণ্য সামগ্রী গ্রহণ করাকে আমরা ঘুষ বলব।

ঘুষ আমাদের সরকারি অফিস-আদালতের কর্মসম্পাদনের একটি অত্যাবশ্যক চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ঘুষ ছাড়া আমাদের সরকারি যন্ত্র চালুই হয় না। ডেসার বিদ্যুৎকর্মী গণ বিদ্যুতের ছেঁড়া তার জোড়া দিতে ঘুষ চান। কেরানীদের ঘুষ না দিলে কোন সরকারি অফিসের ফাইল নড়ে না। ঘুষ না দিলে থানায় মামলা রুজু হয় না। মামলা একবার রুজু হলেও তদন্তকারী দারোগাকে উপরি পাওনা না দিলে তিনি আসামী ধরাতো দূরের কথা মামলার ঘটনাস্থলটি পর্যন্ত মাড়াতে রাজি হন না। ঘুষ ছাড়া ব্যাংক থেকে লোন পাওয়া যায় না। আয়কর অফিসে নিজের ফাইলটি কর্মচারীদের ঘুষ না দিলে খুঁজেই পাওয়া যায় না। ঘুষ না দিকে হিসাবরক্ষণ অফিসে সরকারি কর্মচারীদের প্রথম বেতন হয় না, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হয় না, কষ্টার্জিত ভ্রমণভাতা পাওয়া যায় না। কোন ঠিকাদার ঘুষ ছাড়া ঠিকাদারি পান না, ঘুষ ছাড়া একাউন্টস অফিস থেকে তার বিলও তুলতে পারেন না। ঘুষ আদান-প্রদান, ঘুষের দাবি পাল্টাদাবি যে আমাদের নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক ঘটনা, তা নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার দরকার নেই। এটা স্বতঃসিদ্ধভাবেই প্রতিষ্ঠিত।

তবে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হল, সরকারি-বেসরকারি সকল বিভাগেই ঘুষগ্রহণ তথা দুর্নীতি বর্তমানে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। এক্ষেত্রে গড়ে উঠেছে একটি অলিখিত অথচ অলঙ্ঘনীয় চেইন-অব-কমাণ্ড। প্রতিষ্ঠানের নিম্নতম কর্মচারীটি কর্তৃক আদায়কৃত ঘুষের ভাগ ঊর্ধ্বতম কর্মকর্তার কাছেও নিয়মানুসারে চলে যায়। প্রতিষ্টানের কোন সেবাটি প্রদানের জন্য কত টাকার উৎকোচ গ্রহণ করা হবে, তার একটি হারও নির্ধারণ করা থাকে। তাই, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীগণ বসদের সহজে ঠকাতে পারেন না। জনগণ সরকারকে কর দিতে না চাইলেও ঘুষের আকারে প্রত্যক্ষ করটুকু আমাদের সরকারি কর্মচারিদের পকেটে আলবৎ চলে যাচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশন্যালের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশের প্রায় ৬৬% নাগরিক রাষ্ট্র পরিচালিত নয়টি সেবা সেক্টরের সেবাসমূহ পেতে ঘুষ দিয়ে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মতে এই হার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি[2]।

কিছু কিছু ঘুষের ক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহিতা উভয়েই লাভবান হয়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ, সমাজ, দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মূল্যবোধ। যেমন, আয়কর নিধারণের ক্ষেত্রে দাতা তার আয় গোপন করে করের পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করতে পারে এবং আয়কর আদায়কারী সরকারি কর্মচারী তা অনুমোদ করে দু্‌ই পয়সা রোজগার করতে পারে। জমি নিবন্ধনে ক্রেতা ও বিক্রেতা জমির মূল্য কম দেখিয়ে সরকারকে রাজস্ব কম দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে; রেজিষ্ট্রেশন কর্মকর্তা তা অনুমোদন করে কিছু অর্থ পকেটস্থ করতে পারে। এই প্রকার উভয়ের স্বার্থসিদ্ধকারী দুনীতিকর্ম (symbiotic corruption) সাধারণত জনসম্মুখে প্রকাশিত হয় না। কারণ এখানে কোন ব্যক্তি ভূক্তভোগী নন; বরং উভয়পক্ষই অপরাধী।

অন্যদিকে, পুলিশ কর্মচারিগণ কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে তাকে অবৈধভাবে চেড়ে দেওয়ার জন্য উৎকোচ দাবী করলে বা তদন্তকার্য পরিচালনার জন্য বাদী বা বিবাদীর কাছ থেকে অর্থ দাবী করলে শুধু পুলিশ কর্মচারীই লাভবান হয়। তাই, এটা উৎকোচ আদান-প্রদানের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার সম্ভবনা বেশি।

তবে দুর্নীতির অঙ্গণে ঘুষের টাকার অংকের পরিমাণ খুব বেশি নয়। টিআইবি এর হিসেব মতে দেশের নয়টি সেবাখাতে নাগরিকদের এক বছরে প্রদেয় ঘুষের পরিমাণ মাত্র ৬,৭৯৬ কোটি টাকা। যদিও এই টাকার লেনদেনের সাথে দুর্নীতির অন্যান্য উপঙ্গগুলোর কার্যকরিতা জড়িত রয়েছে, তবুও বলা যায়, আমাদের গোটা অর্থনীতিতে দুর্নীতি খাতের মোট টাকার অংকে এটা অতি সামান্য।

এ সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাতের একটি পুরাতন জরিপ প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করা যেতে পারে। ২০০৪ সালের ১৩ মে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে সেই সময় মোট ৭০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছিল যার মধ্যে প্রত্যক্ষ ঘুষ ছিল মাত্র চার হাজার কোটি টাকা। অথচ শুধু আবগারী শুল্ক ফাঁকির পরিমাণই ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। তাই, দুর্নীতি দমন কমিশনকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ গ্রহণ রোধের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ের দিকে সমধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
.

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ১৭ অনুচ্ছেদে কমিশনের ১১ টি দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে[3]। কিন্তু, পর্যালোচনায় দেখা যায় এই সব কাজের ৬টি কাজই প্রতিরোধমূলক গবেষণাকর্ম পরিচালনা করা ও গণসচেতনা সৃষ্টি করা। যেমন,

1) দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য কোন আইনের অধীন স্বীকৃত ব্যবস্থাদি পর্যালোচনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন পেশ করা,

2) দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ে গবেষণা পরিকল্পনা তৈরি করে তা রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা,

3) দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টি করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তোলা,

4) কমিশনের কার্যবলী বা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এমন সকল বিষয়ের উপর সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা ইত্যাদি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা,

5) দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন প্রেরণ করা,

6) দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত অন্য যে কোন কার্য পরিচালনা করা।

কিন্তু, গবেষণা, প্রচারণা, প্রতিরোধমূলক গণসতেচনতা তৈরি কাজে দুর্নীতি দমন কমিশনে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তাই প্রতিকারমূলক অভিযান পরিচালনার বাইরেও কমিশনকে প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্ষোভ রয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন তা অতি সহজেই কাজে লাগিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণজোয়ার সৃষ্টি করতে পারে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপ মতে বাংলাদেশের শতকরা ৯৪ জন মানুষ মনে করে, দুর্নীতি দমনে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে[4]। কিন্তু, সাধারণ মানুষকে সংঘবদ্ধ করার কোন কার্যকর প্রচেষ্টা কোন দিক থেকেই লক্ষ্য করা যায় না।

মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতি বিরোধী মনোভাব তৈরি ও প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য এক সময় দুর্নীতি দমন কমিশন সারা দেশের জেলায় জেলায় দুর্নীতি বিরোধী কমিটি তৈরি করেছিল। কিন্তু কেন্দ্র থেকে সঠিক নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এগুলোর কোন কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যায় না। অতি সত্তর এই সব কমিটিকে কার্যকর করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের জেলা বা আঞ্চলিক অফিসগুলো এই ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা তৈরির মতো একটি বড় কর্মযজ্ঞ কমিশনের একক প্রচেষ্টায় সম্পাদন করা সম্ভব নয়। এমতাবস্থায়, তাদের অন্যান্য সরকারি, বেসরকারি সেবাদানকারী বা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন বাংলাদেশ পুলিশের কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের সাথে তাদের কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারে।

[1] http://66.226.79.61/details.php?nid=MjE3OA==&ty=&s=27&c= ; Dainik Manab Zamin 3 May, 2012
[2] DAILY LIVES AND CORRUPTION: PUBLIC OPINION IN SOUTH ASIA ; http://berndpulch.files.wordpress.com/2011/12/ti_southasia_web.pdf
[3]http://bdlaws.minlaw.gov.bd/bangla_sections_detail.php?id=914&sections_id=26985
[4] DAILY LIVES AND CORRUPTION: PUBLIC OPINION IN SOUTH ASIA ; http://berndpulch.files.wordpress.com/2011/12/ti_southasia_web.pdf