ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

অপরাধ প্রতিরোধের প্রাথমিক দায়িত্ব জনগণের। এই দায়িত্ব জনগণের উপর কেউ চাপিয়ে দেননি। এটা জনগণ নিজের প্রয়োজনে নিজের উদ্যোগেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। প্রাচীন সমাজে এমন কি আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার প্রথম দিকেও জনগণের স্বউদ্যোগে অপরাধ প্রতিরোধের প্রমাণ পাওয়া যায়।

ইউরোপ, আমেরিকা এমনকি ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগে জনপদগুলো স্বশাসিত ছিল। তাদের অপরাধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা্‌ও ছিল কমিউনিটি-ভিত্তিক। ইংল্যান্ডে ১৮২৯ সালে আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের পূর্বেও জনগণ স্বউদ্যোগে সেবার ভিত্তিতে নিজেরাই নিজেদের এলাকার বা জনপদের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ করত। আমেরিকার নতুন জগতে কলোনীসমূহ স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে দিবা ও রাত্রিকালীন পাহারার ব্যবস্থা করেছিল। অনেক স্থানে এই অপরাধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সহিংস রূপও নিত। জনগণ অপরাধীদের গ্রেফতার করে আনুষ্ঠানিক বিচারে সোপর্দ না করে তাদের সোজাসুজি ফাঁসিতে লটকাতো বা গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করত। আমেরিকায় কয়েকটি রাজ্যে এই পদ্ধতিকে বলা হত লিঞ্চিং। এ ছাড়াও একটি বহুল প্রচলিত পরিভাষা ছিল ভিজিলিন্টিজম। অর্থাৎ জনগণের স্বউদ্যোগে উল্টাপাল্টা বিচার। এক্ষেত্রে পায়শই অপরাধীদের ঝুলিয়ে মারা হত।

আধুনিক রাষ্ট্র অপরাধ প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত পুলিশ বাহিনী গঠন করে জনগণের এই অপরাধ প্রতিরোধের ভারের কিয়দংশ নিজ কাঁধে তুলে নেয়। কিন্তু পুলিশ জনগণের পক্ষে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য যত ব্যবস্থাই গ্রহণ করুক না কেন, রাষ্ট্র জনগণকে অপরাধ প্রতিরোধের প্রাথমিক দায়িত্ব থেকে রেহাই দেয়নি। অথবা জনগণই রাষ্ট্রের উপর অপরাধ প্রতিরোধের যাবতীয় দায়িত্ব অর্পণ করতে চায় নি।

ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী স্যার রবার্ট পীল ইংল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি নিয়মিত পুলিশ বাহিনী গঠনের প্রস্তাব করলে ইংল্যান্ডের জনপ্রতিনিধি তথা জনগণ প্রথমে রাজি হয় নাই। পীলের প্রস্তাবিত লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ বিল পার্লামেন্টে প্রথম তোলা হয় ১৮১৬ সালে। কিন্তু, পার্লামেন্ট তা বাতিল করে দেয় এর পর ১৮১৮ সালে এমন কি ১৮২২ সালেও তা নাকচ হয়ে যায়। অবশেষে চতুর্থ প্রচেষ্টায় ১৮২৯ সালে স্যার রবার্ট পীল পার্লামেন্টকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন পেশাদার পুলিশ বাহিনী গঠনে প্রস্তাব পাশ করতে রাজি করান। তবে একটি পেশাদার সার্বক্ষণির দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ বাহিনী তৈরির ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হলেও জনগণ অপরাধ প্রতিরোধের মতো এত বড় ও এত বেশি গুরুত্বপূণ একটি বিষয়কে পুলিশের উপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারে নাই।

রবার্ট পীল তার নতুন পুলিশ বাহিনীর কর্তব্য পালনের জন্য যে নয় দফা নির্দেশনা জারি করেছিলেন তার নবম নির্দেশনায় বলা হয়েছে, “

পুলিশ হল সমাজের সেই সব সদস্য যারা সমাজের কল্যাণ ও অস্তিত্বের স্বার্থে প্রতিটি নাগরিকের যে সব দায়িত্ব পালন করা দরকার, সেই সব দায়িত্বই বেতন ভোগের বিনিময়ে সার্বক্ষণিকভাবে পালন করবেন।”

অর্থাৎ জনগণের প্রত্যেকের যে দায়িত্ব রয়েছে, পুলিশ তাই পালন করবে। কিন্তু জনগণের পক্ষে পুলিশ যাই করুক, জনগণের দায়িত্বমুক্ত হওয়ার কোন উপায় নেই।

কমিউনিটি পুলিশিং বলতে অনেকেই বোঝেন জনগণ পুলিশকে তাদের কাজে অর্থাৎ অপরাধ প্রতিরোধে সহায়তা করবে। তাদের মতে অপরাধ প্রতিরোধ হল পুলিশের কাজ জনগণ পুলিশকে মাঝে মাঝে সহায়তা করবে। কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে বিষটি পুরোপুরি উল্টো। এ সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ বিষয়ক রাজকীয় কমিশনের উপসংহারে বলা হয়েছে,

It is destructive both of police and public social heath to attempt to pass over to the police the obligations and duties associated with the prevention of crime and the preservation of public tranquility. These are obligations and duties of the public, aided by the police and not the police, occasionally aided by some public স্পিরিটের Citizens .

আমাদের মতো উন্নয়নশীল সমাজে অসচেতন জনগণ অপরাধ প্রতিরোধে নিজেদের দায় হয়তো সারল্য দোষে অস্বীকার করতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি নাগরিক অপরাধ প্রতিরোধের জন্য নিজস্ব যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তা পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়, জনগণ অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে পুলিশের উপর নির্ভরশীল নয়। যেমন, যত নিঃস্বই হোক না কেন, প্রতিটি নাগরিক তার বসতবাড়ির জন্য একটি নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। শোয়ার আগে ঘরের হুড়কো বা খিল লাগানো, কোথাও বেড়াতে গেলে বা বাড়িতে না থাকলে ঘরে তালা দেওয়া, বাড়ির চারিদিকে বেড়া বা দেওয়াল দেওয়া এ সবই জনগণের অপরাধ প্রতিরোধের প্রাথমিক পদক্ষেপ । বাড়ির বাইরে টহল পুলিশ থাক বা না থাক; কোন নির্দিষ্ট লোকালয়ে পুলিশের অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রম থাকুক বা না থাকুক লোকালয়ের বাসিন্দারা তাদের বসতবাটি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য স্বউদ্যোগে যতদূর সম্ভব পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। এই ব্যবস্থা ঘরে তালা লাগানো থেকে শুরু করে নিজস্ব পাহারাদার নিয়োগ করা পর্যন্ত বিস্তৃত।

বলাবহুল্য, আমাদের সমাজেও জনগণ অপরাধ প্রতিরোধের সকল দায়িত্ব পুলিশের উপর চাপিয়ে দেয় নাই। আবার দায়িত্বের কিছু অংশ নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে সেই দায়িত্ব পালনের জন্য কোন নাগরিক এখন পর্যন্ত পুলিশ বা সরকারের কাছে কোন পারিশ্রমিক দাবি করে নাই। উদাহরণ স্বরূপ, বলা যায়, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোন নাগরিক থানা বা সরকারের কাছে গিয়ে অনুযোগ করেনি যে গত এক মাস ধরে তিনি তার ঘরের দরোজা সঠিকভাবে বন্ধ করেছিলেন। যার প্রেক্ষিতে তার ঘরে চোর বা ডাকাত প্রবেশ কোন সম্পদ বেআইনীভাবে গ্রহণ করে নাই। তিনি পুলিশের পক্ষে এই কাজটি করেছিলেন। তাই, পুলিশ যেন তার দীর্ঘ এক মাসের পারিশ্রমিক পরিশোধ করে। অর্থাৎ নিজেদের বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রাথমিক দায়িত্বটুকু জনগণ নিজেরাই পালন করতে অভ্যস্ত। যেখানে এর ব্যতীক্রম, সেখানেই ঘটে বিপত্তি। যে জনপদের বাসিন্দারা অপরাধ প্রতিরোধ প্রক্রিয়ায় নিজেদের সম্পৃক্ত না করে শুধু পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর নির্ভর করে, সেই জনপদ কখনই নিরাপদ থাকতে পারে না।

সর্বশেষ কথা হল, অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে জনগণের প্রাথমিক দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবেই স্বীকৃত| আদিম সমাজ থেকে শুরু করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত সমাজের মানুষ তাদের এই দায়িত্ব পালন করে চলেছে। যেখানেই এই দায়িত্বকে অস্বীকার করা হয়, কিংবা জনগণ তাদের উপর স্বাভাবিকভাবে অর্পিত এই দায়িত্ব পালন করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয় বা বিরত থাকে, সেখানেই নিরাপত্তার হানি ঘটে। আধুনিক সমাজ বা কমিউনিটির নিরাপত্তা পুলিশ ও জনগণের যৌথ উদ্যোগেরই ফসল।

রচনা সূত্রঃ
১. The Report of the Royal Commissions on Police, 1967,/ Changing Policing Theories for 21st Century Societies by Charles Edwards, p-120 বইতে উদ্ধৃত