ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ভূমিকাঃ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ভারত উপমহাদেশের পুলিশ বাহিনীগুলোকে বৃটিশ শাসকরা জনসেবার জন্য তৈরি করেনি। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত ভারতভূমিকে ভালবেসে শাসন করার জন্য কোন ইংল্যান্ডবাসী এদেশে আসেনি। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিল্পব ইংরেজদের শিক্ষা দিয়েছে যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ দমন করতে হলে সাদা চামড়ার সেনাবাহিনী যথেষ্ট নয়। তাই এমন একটা অস্ত্রধারী বাহিনী তৈরি করা দরকার যারা কালো বা শ্যামলা চামড়ার অধিকারী হয়ে ভারতবাসীর সাথে মিশে থাকবে। কিন্তু সাদা চামড়ার সাহেবদের মনের মত কাজ করবে। তাই এদেশের অশিক্ষিত হোমড়া-চোমড়া, সবলদেহী যুবকদের নিয়ে তারা তৈরি করে এক খাকি-পোষাকের পুলিশ বাহিনী। ১৮৬১ সালে এই জন্য প্রবর্তন করা হয় সেই আলোচিত ও সমালোচিত পুলিশ আইন। ১৮৬১ সালের ভারত সরকার কর্তৃক পাশকৃত পাঁচ নম্বর আইন ছিল এটি। তাই পাঁচ আইনের নামে অশীতিপর নারী-পুরুষগণ এখনও আঁতকে ওঠেন।

আদি থেকে আধুনিককালঃ ১৮৬১ সালের পূর্বে এ দেশে পুলিশ বাহিনী ছিল না, তা নয়। জমিদারগণ তখন নিজস্ব পুলিশ বাহিনী রাখতেন। জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীই ছিল মূলতঃ পুলিশ বাহিনী। ১৭৯২ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ বাংলা, বিহার, উড়িশ্যার জন্য পুলিশ রেগুলেশন জারী করলে জমিদারদের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী রাখার বিধান রহিত হয়। প্রত্যেক জেলাকে ৪০০ বর্গমাইলের কয়েকটি পুলিশ এলাকায় বিভক্ত করা হয় যা বর্তমানে থানা বলে পরিচিত। প্রত্যেক এলাকার জন্য একজন দারোগা নিয়োগ করা হতো। কিন্তু দারোগাকে নিয়মিত বেতন দেয়া হত না। তাকে উদ্ধারকৃত চোরাই মালের দশ ভাগের একভাগ দেয়া হত। আর একজন ডাকাত গ্রেফতার হলে দশ টাকা করে পুরস্কার দেয়া হত। বলতে কি, বখরা খাওয়ার যে প্রথা কর্নওয়ালিশ ১৭৯২ সারে চালু করেছিলেন তা থেকে আধুনিক বাংলাদেশের পুলিশ মুক্ত হতে পারে নি। বৃটিশ সরকারের মতো পাক-বাংলার সরকারও মনে করত, পুলিশের বেতন ভাতার দরকার নেই। পুলিশের স্থাপনা, যানবাহন, আবাসন, ছুটি-ছাটা, চিত্তবিনোদন ইত্যাদির উন্নয়ন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় কখনো স্থান পাই নাই। স্বাধীনতার পরবর্তী কালেও পুলিশের বেতন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নি।

বৃটিশ ভারতে পুলিশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যঃ মুলতঃ ভারত বাংলা থেকে খাজনা আদায় করাই ছিল ভারত শাসনের মূখ্য উদ্দেশ্য। খাজনা আদায়ের দায়িত্ব ছিল কালেকটরদের উপর। যেহেতু খাজনা আদায় কোন সম্মতির কাজ ছিল না, যেহেতু প্রায়শই কৃষকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক খাজনা আদায় করা হত, সেইহেতু কালেকটরদের হাতকে শক্তিশালি করার জন্য পুলিশকে তাদের অধীনস্থ করাই যুক্তিযুক্ত ছিল। এ জন্য ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন অনুসারে পুলিশ এখনও ডেপুটি কালেকটর (ডেপুটি কমিশনার) দের অধীন। সমপ্রতি বিচার বিভাগ শাসন বিভাগ ( নির্বাহী বিভাগ) থেকে পৃথক হয়েছে। কিন্তু পুলিশ আইনের কোন পরিবর্তন না হওয়ার ফলে জেলা পুলিশের সাধারণ নিয়ন্ত্রণ এখনও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের হাতেই রয়ে গেছে। আর খাজনা আদায়ের দায়িত্ব নিয়োজিত ডেপুটি কারেক্টরগণ হলেন সেই জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট। যদিও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের বিচার সম্পর্কিত কোন কাজ নেই, তবুও পুলিশের আনুষ্ঠানিক আইনী নিয়ন্ত্রণ তিনি হারান নি। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার পরও ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের কোন পরিবর্তন না করার ফলে পুলিশের চেইন-অব-কমান্ডে কেবল একজন বাড়তি নিয়ন্ত্রক যুক্ত হয়েছেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের দীর্ঘ সুত্রতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

.

মেধাহীন কনস্টেবলঃ খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে ইংরেজরা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর। খরা, বন্যা, মহামারী, দুর্ভিক্ষ—– যাই হোক না কেন তাদের খাজনা আদায় ষোল আনা বজায় থাকতে হবে। ছিয়াত্তরের মনন্তরের কথা কে না জানে ? এই দুর্ভিক্ষে বাংলার এক কোটি লোক অনাহারে মৃত্যু বরণ করেছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় এই দুর্ভিক্ষের বছরে ইংরেজদের খাজনা আদায় এক কানা কড়িও হ্রাস পায়নি। পাবে কেন? তাদের হাতে পুলিশ ছিল যে! নিঃস্ব কৃষককে টেনে হেঁচড়ে সাহেবের সামনে হাজির করা বাংগালী পুলিশের জন্য ছিল কেবল হুকুমের ব্যাপার। হালের গরু বলেন, ক্ষেতের ফসল বলেন আর ভুখা কৃষকের যুবতী মেয়ে বলেন—- সব কিছুই খাকি পোষাকের পুলিশ জওয়ানরা একটি হুকুমের বলে সাহেবের সামনে হাজির করতে পারত। করবে না কেন ? ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনে নিম্ন পদস্থ কর্মচারীদেরকে ঊর্ধ্বতনদের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে। আর ভারত বাংলার পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসতেন বৃটেন থেকে। সাদা চামড়ার অধিকারী না হলে ভারত বাংলায় কেউ এএসপি হতে পারতেন না। আর একথাও সত্য যে ইংরেজদের মধ্যে সরকারী চাকুরী লোভীদের মধ্যে সবচেয়ে দুষ্ট লোকটিকে ভারতের পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হত। এখনও পুলিশে মাথামোটাদের আধিক্য উৎকটরূপে দৃশ্যমান। দেড় লাখ পুলিশের মধ্যে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজারই কনস্টেবল। কনস্টেবলদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও রেজিমেন্টশনে অজস্র ত্রুটি বিদ্যমান।

বঙ্গ-পুলিশের নিয়ন্ত্রণ ও আইনী দায়িত্বঃ ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের প্রস্তাবনায় পুলিশকে কেবল অপরাধ দমন, অপরাধ প্রতিরোধ ও তা তদন্তের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আইনের ৪৪টি ধারার কোথাও পুলিশকে জনগণের বন্ধু হবার তাগিদ দেয়া হয়নি। নাগরিকদের বিরুদ্ধে পুলিশের ক্ষমতার বাড়াবাড়ি, অসদাচারণ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘণের প্রতিকার প্রাপ্তির কোন আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি এই আইনে নেই। আইনে পুলিশ বাহিনীর তত্ত্বাবধান সরকারের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। কিন্ত কি উপায়ে সরকার তার তত্ত্বাবধান করবেন তার কোন তরিকা দেয়া হয় নি। ফলে সরকার ইচ্ছে মত পুলিশকে ব্যবহার করতে পারে। কেবল আইনের সীমাবদ্ধতার জন্যই এ দেশের পুলিশ স্বকীয় কোন সত্তা পরিগ্রহ করতে পারে নাই। বাংলার পুলিশ ক্ষমতাসীনদের সংকীর্ণ স্বার্থ সিদ্ধির কাজে প্রতিবাদনহীন আজ্ঞাবহ হওয়া ছাড়া অন্য, কোন রূপ পরিগ্রহ করতে পারে নি। সরকারের রঙেই পুলিশ রঞ্জিত হয়— যদি সরকার গণতান্ত্রিক হয়, পুলিশও গণতন্ত্র চর্চা করে; সরকার যদি স্বৈরাচার হয়, পুলিশও পেটোয়া বাহীনিতে পরিণত হয়। প্রত্যেক আমল, প্রত্যেক যুগ ও প্রত্যেক সরকারের সময় পুলিশকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হতে দেখি।

বৃটিশ ববি বনাম বঙ্গ পুলিশঃ ১৮৬১ সালে যখন ইংরেজরা বৃটিশ ভারতে সরকারের কর্তৃত্ব মূলক পুলিশ বাহিনীর প্রবর্তন করে, ঠিক সেই সময়ে ইংরেজরা তাদের নিজ বাসভূমে মেট্রোপলিটন পুলিশ (রবার্ট পিল কর্তক ১৮২৯ সালে প্রবর্তিত) এবং বৃটিশ কনস্টেবুলারি পুলিশিং ব্যবস্থা প্রচলন করেছিল। বৃটিশ ভারতের পুলিশকে পুরোপুরি ভাবে সরকারের তাবেদার করা হলেও লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ ছিল সরকারের ভাল মন্দ কাজ-কর্মের দায়ভার থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন| তারা পুলিশকে সরকার থেকে অন্ততঃ অপারেশনাল ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে দিয়েছিল। কোন কাজটি সরকারের আর কোন কাজটি পুলিশের তা জনগণ সহজেই শনাক্ত করতে পারত (এখনও পারে)। বিতর্কিত পরিস্থিতিতে ইংরেজ পুলিশ সরকারের চেয়ে আইনের বিধান ও কোর্টের নির্দেশনার প্রতি অনুগত থাকে— সরকারের প্রতি নয়। একই ভাবে বৃটিশ চিফ কনস্টেবল কোন নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের প্রতিই দায়বদ্ধ নয়। কৃত কর্মের ব্যাপারে কনস্টেবুলারী এখনও স্বাধীন| কথিত আছে, বৃটিশ চিফ কনস্টেবল অপারেশনাল ব্যাপার-স্যাপারে তার শ্রষ্টা, তার রানী এবং তার বিবেক ভিন্ন অন্য কারো নিকট কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নন।

উৎকোচের সাহিত্যঃ প্রতিষ্ঠার আদিকাল থেকেই ভারত বাংলার পুলিশ অত্যাচার, নির্যাতন, ঘুষ দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়। যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে পুলিশের নেতিবাচক ভূমিকার যে ছাপ পড়ে গেছে তা বটতলার আড্ডা থেকে সুকুমার রায়ের সাহিত্য পর্যন্ত আশ্রয় পেয়েছে। মহাজনের সুদ খাওয়া আর দারোগার ঘুষ খাওয়ার প্রবাদ সুকুমার রায় তার কবিতায় আশ্রয় দিয়েছেন এভাবে —-
সবে হল খাওয়া শুরু, শোন শোন আরো খায়,
সুদ খায় মহাজনে ঘুষ খায় দারোগায়।

পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী উপন্যাস পর্যন্ত সবখানেই পুলিশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি লক্ষ্যনীয়। পুলিশকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করা আমাদের ঐতিহ্যগত পূর্বসংস্কার। তাই কোন পুলিশ সদস্য কারো সন্তুষ্টি বিধান করলে আমরা মন্তব্য করি— ভদ্রলোক আমার দারুণ উপকার করেছেন। তাকে পুলিশ বলে মনেই হয় না।

পুলিশ-ভীতির উত্তরাধিকারঃ পুলিশকে ভয় পায় না এমন লোক ভারত-বাংলায় নেই। বাংলার জনগণকে অত্যাচারের মাধ্যমে খাজনা দিতে বাধ্য করা, সামান্য অপরাধে দেশীয় কাল চামড়া বলে নির্যাতন করা. স্বাধীকার আন্দোলনকারীদের নির্মম ভাবে দমন করা, অপরাধ কর্ম না করেও নির্দোষ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা ———কোন কাজটি পুলিশকে দিয়ে করানো হয় নি? বৃটিশ ভারতের অত্যাচারী পুলিশ পাক-বাংলার সূচনা লগ্নেই তার আসল রূপ প্রকাশ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রফিক, সফিক, জব্বারদের বুকে গুলি চালিয়ে। কিশোর মতিউরের বুক ঝাঁঝরা করার জন্য সাদা চামড়ার পুলিশ আমদানী হয় নি। এমনকি স্বাধীনতার সিকিযুগ পরে নূর হোসেনের কাঙ্খিত গণতন্ত্রকে নস্যাতের ষড়যন্ত্রে পুলিশকে যে ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে দেশবাসী তো তা কখনই ভুলবেন না।

বিশ্বাস নেই পুলিশের আশ্বাসেঃ পুলিশের নিরংকুশ নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের অনুকম্পা অর্জণে পুলিশ কর্তারা স্বাভাবিক কারণেই অধিকতর ব্যস্ত থাকেন। তাই পুলিশের কৃত কর্মে দেশবাসির কি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা তারা ভাবার সময়টুকু পান না। যে কৃতকর্মের কর্তা পুলিশ নয়, তার দায়ভার অবশ্য পুলিশকেই নিতে হয়েছে। বৃটিশ, পাকিস্তান আর স্বাধীন দেশের স্বৈর-শাসকগণের পতন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশ তার গণ-বিরোধী ভূমিকার ঐতিহ্য নিয়ে এখনও মানুষের নিরাপত্তা বিধানের মন্ত্র উচ্চারণ করছে। আর যেহেতু ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়। তাই বাংলাদেশের মানুষও পুলিশের আশ্বাসে বিশ্বাস করে না। কারণ, দলীয় সরকারে ক্ষমতা গ্রহণের পরের দিন থেকে পুলিশের আচরণ কিরূপ হয় তা তারা বার বার পর্যবেক্ষণ করছে।

বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি হারাবার কিছু নেইঃ বাংলাদেশ পুলিশ যে উত্তরাধিকার বহন করে তার কোন পর্যায়েই ইতিবাচক ভাবমূর্তি ছিল না। যারা হাফ প্যান্ট পরা, পাগড়ী মাথায় দেয়া দারোগার নিষ্ঠুরতা দেখেছেন তারা বর্তমানের পুলিশকে অবশ্যই ভাল বলবেন। আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছেমত প্রতিপক্ষকে হয়রানী করা এবং স্বপক্ষীয় ব্যক্তিদের গুরুতর অপরাধ করার পরেও রেহাই দেয়, এবং, সর্বোপরি যে অপরাধীদের গ্রেফতার করা উচিত সেই সব অপরাধীদের কাছ থেকে অনুগ্রহ প্রার্থনা করা ইত্যাকার হাজারো কারণে বৃটিশ বাংলার পুলিশ সাধারণ মানুষের কাছে রীতিমত এক ভয়ের বস্তু। যদি গভীর রাতে কোন ভদ্রলোকের বাসায় পিছন দরজা দিয়ে চোর ঢোকে এবং একই সাথে সামনের দরজায় পুলিশ এসে দাঁড়ায়, ঐ ভদ্রলোক চোরকে ঘরে রেখে পুলিশকে বিদায় দিতে পারলেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। তাই বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তির ব্যাপারে হারানোর কিছু নেই। কারণ, যার কোন গৌরবই ছিল না, তার গৌরব আবার হারাবে কি?

শীর্ষপদে নিযুক্তি- এই আছে, এই নাইঃ একটি পেশাদার ও সেবাপ্রদানে প্রত্যয়ী পুলিশ সংগঠনের জন্য তার বাহিনী প্রধানের পদটির একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থায়ীত্ব প্রয়োজন। পাশ্চাত্য বা প্রচীচ্যের যে সব দেশের পুলিশের জনসেবার ব্রাত্য নিয়ে আমরা মুখে ফেনা তুলি এবং তাদের সাথে আমাদের দেশের পুলিশের তুলনা করে প্রত্যহ হা-হুতাশ করি, সেইসব দেশের পুলিশ-প্রধানের পদটির স্থায়ীত্ব আইনবলে নিশ্চিন্ত। লন্ডন পুলিশের কমিশনারকে বৃটিশ সরকার ইচ্ছে করলেই সরিয়ে দিতে পারে না। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাষ্ট্রের/ নগরের পুলিশ-প্রধানগণও একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে কর্তব্য পালনের নিশ্চয়তা ভোগ করে।

কিন্তু প্রচলিত আইনি কাঠামোতে বাংলাদেশ পুলিশের শীর্ষ পদটি অস্থায়ীত্বের মন্দ হাওয়া দুলতে থাকে। এই পদের নিযুক্তির কোন স্থায়ীত্ব নেই। সরকার ইচ্ছে করলে একই দিনের সকালে একজন ও বিকেলে অন্য একজন পুলিশ অফিসারকে পুলিশের প্রধান বানাতে পারেন। বস্তুত সংগঠনের শীর্ষ পদের নিযুক্তিতে স্থায়ীত্ব না থাকার কারণে পুলিশ বিভাগে দীর্ঘস্থায়ী কোন পরিকল্পনা গৃহীত হতে পারে না। নেতার পরিবর্তনে নীতির পরিবর্তন হতে বাধ্য। বাংলাদেশ পুলিশের ভাগ্যে কোন নীতির বালাই নেই। অন্য দিকে পুলিশ-প্রধান পদের আস্বাদ নিতে ঊর্ধ্বতন পদের কর্মকর্তাগণ সর্বদাই ক্ষমতাসীনদের তোষামোদে ব্যস্ত থাকেন। নিজ বিভাগের সুখ-দুঃখের বিনিময়ে রাজনীতিবিদ ও তাদের চামচাদের খুশী করেন।

খণ্ডিত চেইন-অব-কমাণ্ডঃ যে পুলিশ বাহিনীকে দিয়ে পুলিশ-প্রধান দেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করেন, অপরাধ দমন, নিয়ন্ত্রণ ও তদন্তকার্য পরিচালনা করেন, সেই পুলিশ বাহিনীর সকল সদস্যের নিয়োগ, বদলী, পদায়ন, শাস্তি-পুরস্কার বা তিরস্কারে তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। পুলিশ-প্রধান জানেন না যে তার অধীন কোন জেলার এসপি কে হবেন কিংবা কখন কাকে প্রত্যাহার করা হবে। আর অধীনস্ত ইউনিট প্রধানদের পদায়ন, অপসারণে তার কোন কর্তৃত্ব নেই। অন্য দিকে, অনেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বদলী, শাস্তির ব্যাপারেও বাইরের হস্তক্ষেপ প্রচন্ড আকারে ধারণ করে। রাজনৈতিক লেজুড় বৃত্তি পুলিশ বিভাগের অফিসারদের স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু এই লেজুড় বৃত্তি কালক্রমে এত বেশী মহামারী রূপ ধারণ করে যে অনেক সাব-অর্ডিনেট কর্মকর্তা সুপিরিয়র কর্মকর্তাদের পুলিশ বিভাগ থেকে চিরতরে বিদায়ের কারণ হয়েও দাঁড়ান। আইনের এই দুর্বলতা পৃথিবীর অন্য কোন দেশের পুলিশ বাহিনীতে আছে কি না, সন্দেহ আছে।

পুলিশ সংস্কার শুধুই ফাঁকা বুলিঃ পুলিশকে সংস্কার করার কথা বৃটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল হয়ে বর্তমান আমল পর্যন্ত সব সরকারই জোরে সোরে বলেছে। পুলিশকে কার্যকর ও জনবান্ধব করার সুপারিশ খুঁজতে কয়েক ডজন কমিশন ও কমিটি পর্যন্ত হয়েছে। এসব কমিটি/কমিশন অনেক সুন্দর সুন্দর সুপারিশও তৈরি করেছেন। কিন্ত কোন সুপারিশ বাস্তবে কার্যকর হয়নি। পুলিশকে ঢেলে সাজাবেন বলে অনেক সরকার গালভরা বুলিও ছুড়েছেন। কিন্তু তারা পুলিশকে কেবল ঢেলে ঢেলে তাকে বিকৃতই করেছেন, জনবান্ধব করে সাজান নি অথবা সাজানোকে দলীয় স্বার্থের উপযোগী বলে মনে করেন নি। বরং ক্ষমতায় আসার প্রথম দিনই তারা পুলিশকে হাতের মুঠোয় নিতে চায়। নিঃশর্ত আনুগত্যশীল নয়, এমন পেশাদার পুলিশ অফিসারদের পুলিশ থেকে বিদায় করেন। দলীয়ভাবে অনুগতদের কবর থেকে তুলে আনেন কিংবা অপেক্ষাকৃত জুনিয়রদের দলীয় স্বার্থে অভিজ্ঞ ও সিনিয়রদের উপরের পদে পদায়ন করেন। সৎ পুলিশ অফিসারতে রাজনীতিবিদগণ সহ্য করতে পারেন না। সংসদ সদস্যগণ বেছে বেছে অসৎ পুলিশ অফিসারদের নিজ নির্বাচনী এলাকায় বদলী করে আনেন, তাকে দিয়ে অপকর্ম করান এবং প্রয়োজনীয় সুবিধাদি প্রদান করেন।

সংস্কারের কয়েকটি দিকঃ পুলিশের আইনী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূণ।সরকার কর্তৃক পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক আইনী কাঠামো তৈরি করতে হবে। এমন ভাবে আইনের বিধান করতে হবে যেন ক্ষমতাসীনরা চাইলেই পুলিশকে অপব্যবহার করতে না পারেন। এবং একই সাথে পুলিশও জনগণ তথা আইন কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে। পুলিশকে আর্থিক, প্রশাসনিক ও অপারেশনাল স্বকীয়তা দিতে হবে। একই সাথে এই সব ক্ষমতার যাতে অপব্যবহার করা না হয়, তা কোন নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করতে হবে। পুলিশ প্রধানের পদটির স্থায়ীত্ব দিতে হবে। এটাকে টেনিউর পদ হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে।

উপসংহারঃ বাংলাদেশ পুলিশকে উন্নত দেশের পুলিশের মতো জনবান্ধব, সহানুভূতিশীল, মানবাধিকার সংবেদী ও গণতান্ত্রিক দেশের উপযোগী করতে হলে এর ভিতর ও বাহির দুই দিকেরই সংস্কার করতে হবে। কেবল বেতন, ভাতা ও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি কিংবা অপারেশন, তদন্ত ইত্যাদির জন্য লজিষ্টিক সুবিধা বৃদ্ধিতে কোন কল্যাণ হবে না। পুলিশের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলী, পদায়ন সব কাজেই সংস্কার করতে হবে। প্রশিক্ষণে ব্যাপক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধন করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হল, বিদ্যমান পুলিশ আইনের বিলুপ্তি ঘটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি আইনে পুলিশকে পরিচালিত করতে হবে