ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশিং একটি বিজ্ঞান, কলা, না একটি যাদুবিদ্যা, তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক করা যায়। চাকরির জন্য বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সময় ঐচ্ছিক হিসেবে গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, সংস্কৃত ও পালি ইত্যাদি বিষয়ের মধ্যে সামরিক বিজ্ঞান নামেও একটি বিষয় ছিল। অনেকে বলেছিলেন, এই সব বিষয়ে বেশ ভাল নম্বর পাওয়া যায়। তবে সেই সময় পুলিশ সাইন্সের কথা শুনিনি। বলতে কি পুলিশিং বিষয়ে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি দিতে পারে, এমন কোন তথ্য সারদায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ কালেও আমি জানতাম না। আর এও বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক মানুষই এ ব্যাপারে জানেন।

বলা বাহুল্য পুলিশিং বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আহরণ বা বিতরণের বিষয়টি অতি হাল আমলের। আজ থেকে একশ’ বছর আগে খোদ আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রেও মনে করা হত, পুলিশের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। সাধারণ প্রশাসনের আর দশটি চাকরির মতো পুলিশও চলত যেমন-তেমন ভাবে। ১৯০৭ সালে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অংগ রাজ্যের বার্কলি পুলিশ-প্রধান আগস্ট ভলমার পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম পুলিশ প্রশিক্ষণ স্কুল চালু করেন। তবে এই স্কুলের প্রশিক্ষণ প্রথম দিকে বাধ্যতামূলক ছিল না। উৎসাহী পুলিশ সদস্যরা তাদের নিয়মিত ডিউটির বাইরে অতিরিক্ত কার্যক্রম হিসেবে এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত। এই স্কুলে সাক্ষ্য আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কৌশল আয়ত্ব করার প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করা হত।

ছোট থাকতে শুনতাম বাবা-মার দুষ্ট ছেলেগুলো বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে নাকি পুলিশের যোগ দেয়। বঙ্গ-ভারতের ইতিহাসে বিষয়টির সত্যতাও রয়েছে। এই দেশীয় না হলেও বিলেতের সাদা চামড়ার দুষ্ট ছেলেগুলো যে বৃটিশ ভারতের পুলিশের উচ্চ পদেও আসীন হত, তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অবশ্য পুলিশ একটি শ্রমঘন কর্মকাণ্ড হওয়ায় সব সময় প্রয়োজনীয় শিক্ষিত জনবল পাওয়াও দুষ্কর। এটা শুধু সেই সময়ের জন্য নয়, এখনও সত্য।

পুলিশে উচ্চ শিক্ষিত যুবকদের প্রবেশ করার ইতিহাসও হাল আমলের। পৃথিবীর ইতিহাসে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে পুলিশ প্রধান আগস্ট ভলমারই সর্বপ্রথম কলেজ গ্রাজুয়েটদের পুলিশে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রদের খণ্ডকালীন হিসেবে নিয়োগ করে তিনি পুলিশে উচ্চ শিক্ষিত যুবকদের আকৃষ্ট করেন। তার খণ্ডকালীন নিয়োগকৃত ছাত্ররূপী পুলিশ সদস্যদের ডাকা হত ‘কলেজ-কপ’ নামে।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে তথা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয় ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিভাগ চালু করা হয় মূলত বার্কলে পুলিশ বিভাগের অফিসারদের প্রশিক্ষণ ও তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদানের জন্য। আগস্ট ভলমারই ছিলেন এই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান। পরবর্তী সময়ে তার হাতে তৈরি ‘কলেজ-কপ’দের অনেকেই এই বিভাগের প্রশিক্ষক ও প্রধান হয়েছিলেন। তাই, বলা যেতে পারে, আজ বিভিন্ন দেশে এমন কি বাংলাদেশেও ক্রিমিনোলজি বা অপরাধ বিজ্ঞান বলে যে বিষয়ে ডিগ্রি দেওয়া হয়, তার সূচনা হয়েছিল একজন পুলিশ অফিসারের হাতেই।

বঙ্গ-ভারতে বিধিবদ্ধ পুলিশ যাত্রা শুরু করে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের মাধ্যমে। কিন্তু পুলিশ সৃষ্টির ৫২ বছরের মধ্যেও পুলিশ সদস্যদের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের জন্য কোন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ছিল না। ১৯১২ সালে রাজশাহীর সারদায় পুলিশ ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই ট্রেনিং স্কুলটি ক্রমান্বয়ে একটি কলেজে ও সর্বশেষ একটি পূর্ণাঙ্গ একাডেমি হিসেবে বর্তমানে স্বীকৃতি পেয়েছে। বৃটিশ বাংলায় এটিই ছিল একমাত্র পুলিশ প্রশিক্ষণ কলেজ।

আমাদের পুলিশ প্রবিধানে এখনো লিটারেট কনস্টেবল বা এলসি কথাটি চালু রয়েছে। সেই সময় বাংলার প্রায় সব কনস্টেবল হতো অশিক্ষিত। এদের মধ্যে যে দু’চারজন শিক্ষিত হতো তারা থানায় কেরাণির কাজের জন্য নির্বাচিত হত। এখনও থানায় একজন কনস্টেবল মুন্সির কাজ করেন। এনিই হলেন আধুনিক কালের লিটারেট বা শিক্ষিত কনস্টেবল।

শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ ভিন্ন কোন পেশারই উন্নতি আশা করা যায় না। কিন্তু, বাংলাদেশের পুলিশের তদন্ত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত সেকালে ও অপ্রতুল। বলতে কি মৌলিক প্রশিক্ষণে একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে পিটি-প্যারেড আর ফৌজদারি আইনের বাইরে তদন্ত কৌশল শিক্ষা দেওয়ার ফুসরৎ নেই। মাঠ পর্যায়ে তাদের যে থানা, সার্কেল অফিস, রিজার্ভ অফিস ইত্যাদি স্থানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তারও কোন বাপ মাও নেই। এই সব স্থানে তারা শিখল, কি শিখল না, তার বাস্তব কোন তদারকি নেই বললেই চলে। এটাকে প্রশিক্ষণ না বলে গুরুর কাছে যাদু বিদ্যার পাঠ নেওয়া বলা যেতে পারে। কিন্তু, যাদুগুরুর সাথে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারদের পার্থক্য হল, গুরু তার শিষ্যের প্রতি যত্ন নেন। কিন্তু পুলিশ অফিসারগণ তাদের শিক্ষানবিশদের ব্যাপারে থাকেন বড়ই উদাসীন।

তদন্ত প্রশিক্ষণের জন্য সিআইডিএর অধীন একটি ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুল রয়েছে। কিন্তু সকল তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সময় মতো প্রশিক্ষণ দেওয়ার সামর্থ্য এই স্কুলের নেই। অনেক সাব-ইন্সপেক্টর পদোন্নতি পেয়ে ইন্সপেক্টর হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে এখানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। প্রশিক্ষণের পূর্বে প্রায় ১০/১৫ বছর, বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা, বলতে পারেন, যাদুবিদ্যার মতো তদন্তকার্য পরিচালনা করেন। অধিকন্তু পুলিশের তদন্ত প্রশিক্ষণের পাঠ্যক্রমও সেকেলে। আধুনিক সাক্ষাৎকার বা জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল এখানে শেখানোর লোক নেই। অধুনা শুরু হলেও আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ডিএনএ প্রযুক্তি, কম্পিউটার ফরেনসিক ইত্যাদি উচ্চতর প্রযুক্তিতের বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ নেই বললেই চলে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের অবস্থাও তথৈবচ। সাম্প্রতিককালে সারদায় এএসপিদের মৌলিক প্রশিক্ষণের সিলেবাস পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু, পাঁচ বছর আগেও তাদের প্রশিক্ষণ এসআইদের প্রশিক্ষণের চেয়ে বড় বেশি ভিন্ন ছিল না। পৃথিবীর প্রায় সকল পুলিশ একাডেমীতে পুলিশ অফিসারদের স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হয়। কিন্তু, বাংলাদেশে এই রেওয়াজ নেই। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের মাস্টার্স অব-পুলিশ সাইন্স(এমপিএস) ডিগ্রি দেওয়া হলেও একই একাডেমীতে প্রশিক্ষণরত ক্যাডেট এসআইদের এই ডিগ্রি দেওয়া হয় না।

ছাত্রজীবনে বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে বিজ্ঞানের সংজ্ঞা পড়েছি। পৌরনীতি পড়তে গিয়ে পৌরনীতি’ কাকে বলে তাও শিখেছি। কিন্তু, চাকরি জীবনে পুলিশিং পেশায় প্রবেশ করে পুলিশিং কী তা আমাদের পড়তে হয়নি। অন্তত, আমি নিজে এক বছর সারদায় প্রশিক্ষণ নিয়েও ‘পুলিশিং’ কাকে বলে, তা শিখি নাই। আমার প্রশিক্ষণ পাঠ্যসূচিতে তা ছিলনা। আমার কোন প্রশিক্ষক এই বিষয়টির অবতারণা করেন নি। কারণ, আমার সিলেবাসে পুলিশিং শেখানোর উপাদান ছিল না, ছিল ফৌজদারি আইন, পিটি, প্যারেড, অস্ত্র চালনা, ঘোড়া চালনা — এই সব, আর কি!

আমাদের দেশে পুলিশিং বিষয়ে ডিগ্রি দেবার কোন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় নেই। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য কেরানি তৈরি করতে আগ্রহী হলেও পুলিশ বিভাগ বা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার জন্য তেমন কিছুই করতে রাজি নন। টাঙ্গাইলে মাওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্য ‘অপরাধ বিজ্ঞান ও পুলিশ সাইন্স’ নামে একটি বিভাগ রয়েছে। তবে, এখানেও শিক্ষকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিকের স্বল্পতা রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের কিছু কিছু অফিসার সেখানে খণ্ডকালিন পাঠ দানও করেন। কিন্তু একটি দক্ষ একাডেমিশিয়ান শ্রেণি তৈরি না হলে শিক্ষাদান পরিপূর্ণ হয় না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ক্রিমিনোলোজি ও ক্রিমিনাল জাসটিস সিস্টেম’ নামে একটি স্নাতোত্তর কোর্স চালু করা হয়েছে। কিন্তু, দেশের জন্য একটি নিবেদিতপ্রাণ পেশাদার অপরাধ বিজ্ঞান চর্চাকারী শ্রেণি তৈরি হতে আমাদের আরো অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।