ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাদশা মিয়ার বউ রাতের বেলা প্রাকৃতিক কারণে বাইরে বের হয়েছিলেন। কিন্তু পাশের গ্রামের জনৈক যুবক আদিম কামনায় তাকে অধিকারের চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থল বাদশা মিয়ার বসত ঘরের সামান্য দূরে। মাগুরা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বাদশা মিয়ার বাড়ির লোকজন কোন রকমে লম্পটকে ধরে ফেললেন। উল্টাপাল্টা মারপিটও চলল। তবে এই উত্তম মধ্যমকে গণপিটুনি বলা চলে না। হাজার হলেও পাশের গ্রামের চেনা যুবকতো!

গ্রামের চৌকিদারকে খবর দেয়া হল। ফোনে ইউপি চেয়ারম্যানকে জানান হল। যুবকের আত্মীয় স্বজনরা বাদশা মিয়ার বাড়িতে এলেন। গ্রামের দশজন বসলেন তাৎক্ষণিক সালিসে। রফা হল, যুবককে রাতে ছেড়ে দেয়া হবে। আগামী কাল মেম্বার-চেয়ারম্যানদের নিয়ে একটা কিছু করা হবে। কিন্তু, আগামীকাল আর বসা হল না। লম্পট যুবকের পক্ষ থেকে কেউ বাদশা মিয়ার বাড়িতে এলো না।

যুবক পরদিন মাগুরা ২৫০ সজ্জার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হল। হাসপাতালে ভর্তির সনদপত্র দিয়ে মাগুরা সদর থানায় বাদশা মিয়া ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে তাকে অবৈধ আটক, পরিকল্পিতভাবে মারপিট করে আহত করা ও জীবন নাশের উদ্যোগের জন্য মামলা করলেন। বিষয়টি বাদশা মিয়া লোকমুখে শুনে দুই দিন পর ছুটলেন হাসপাতালে। বলে কী! আমরা আপোশ করতে চাইলাম; লম্পটকে ছেড়ে দিলাম। সে কি না আবার আমাদের নামে মামলা করছে?

সহজ-সরল চরিত্রের বাদশা মিয়া কি আর জানত, তার স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টাকারীর মামলায় তাকে হাজতে যেতে হবে? যুবককে দেখার জন্য হাসপাতালে গেলে, লম্পট পুলিশকে ডেকে বাদশা মিয়াকে তার করা মামলায় ধরিয়ে দিল। দেখ, কার জেল কে খাটে!

এদিকে বাদশা মিয়ার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ায় তার ভাইরা ক্ষেপে গেলেন । বাদশা মিয়ার বউকে দিয়ে তারা অগত্যা থানায় গিয়ে একটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দিলেন যার একমাত্র আসামী সেই লম্পট যুবক। খেয়াল করুন। বাদশা মিয়া কেবল যুবককেই অভিযুক্ত করেছে। যুবকের এক ভাই সার্কিট হাউজের কর্মচারী। জেলাপ্রশাসনের সাথে তার বড় খাতির। মূলত তার কূট বুদ্ধিতেই বাদশা মিয়াকে হাজতে যেতে হয়েছিল। তারা চাইলে তাকেও আসামী করতে পারত। কিন্তু, বাদশা মিয়ার ভাইরাও ছিল অতি সারল্য দোষে দুষ্ট। অন্য দিকে বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে লম্পট যুবক যে মামলা করেছিল তার আসামী ছিল বাদশা মিয়ার প্রায় গোটা পরিবার।

আমি যখন নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাটির তদন্ত তদারকিতে বাদশা মিয়ার বাড়িতে যাই, তখন তিনি হাজতে। আমার মাথায় ঢুকছিল না, আসামীকে মুক্ত রেখে বাদিনীর স্বামীকে পুলিশ গ্রেফতার করল কেন। আমার দারোগারা কি কানা? না আসামী পক্ষ কর্তৃক এতটাই ‘ম্যানেজ’ হয়েছে যে আসামী পক্ষের দখলে চলে গিয়ে বাদি পক্ষকে গ্রেফতার করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। স্থানীয় ব্যক্তিগণ পুলিশকে তেমন দোষারোপও করছে না। আরো মজার ব্যাপার হল, যে দারোগা বাদশা মিয়াকে গ্রেফতার করেছিলেন সেই দারোগাই আবার বাদশা মিয়ার বউয়ের মামলাও তদন্ত করছেন। বিষয়টা একে বারে লেজে গোবরে। পুলিশের বুদ্ধিশুদ্ধি কোথায় গিয়ে নেমেছে!

আমি স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার ভাবে জানার চেষ্টা করলাম। কারণ, আমার দারোগাও বাদশা মিয়াকে গ্রেফতারের বিষয়টি আমার কাছে গোপন গোপন রেখেছিলেন। ঘটনাস্থলে না গেলে হয়তো আমি জানতেও পারতাম না যে বাদিনীর স্বামী আসামী কর্তৃক দায়েরকৃত মামলায় হাজতে আছেন; আসামী দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার দারোগার ভাষ্যমতে, বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার বাদি যেহেতু নিজেই আসামী বাদশা মিয়াকে ধরিয়ে দিয়েছিল এবং তখন পর্যন্ত বাদশা মিয়ার বউ কোন মামলা করেনি অর্থাৎ নারী নির্যাতনের বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে নি, তাই তিনি আসামী অর্থাৎ বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে রুজুকৃত মামলার বাদি কর্তৃক প্রভাবিত হয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি। এখন তিনি বুঝতে পেরেছেন, ঘটনা আসলে অন্য রকম। কিন্তু যে আসামীকে একবার কোন মামলার অভিযুক্ত হিসেবে আদালতে প্রেরণ করেছেন, একমাত্র মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রদান ছাড়া তিনি সেই আসামীকে ছেড়ে দেয়ার জন্য আদালতে অন্য কোন প্রতিবেদন প্রেরণ করতে পারেন না। দারোগার প্রতি আমার প্রচ- ৰোভ হলেও এই আইনী প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করার উপায় ছিল না।

আমার তদন্ত তদারকিকালে লম্পট যুবকের বিরুদ্ধে বাদিনীর অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হল। গ্রামের চৌকিদার সাক্ষ্য দিলেন, তিনি বাদশা মিয়ার স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টাকারী যুবককে ঘটনার পরপরই তার আইনী হেফাজতে নিয়েছিলেন। বাদশা মিয়ার পরিবারের সবাই একই রকম সাক্ষ্য দিলেন। আসেপাশের বাড়ির বাসিন্দারাও যুবকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফোনে জানালেন, বিষয়টি সঠিক। তিনি একটা আপোস টানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আসামী পক্ষ সেই সুযোগ না দিয়ে গোপনে গোপনে বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করে বিষয়টি জটিল করে তুলেছে। তবে ঘটনা যাই হোক না কেন বাদিনীর সাথে অভিযুক্তের যে একটা ফষ্টি নষ্টির ব্যাপার স্যাপার ছিল, সে অনুমান মন থেকে কিছুতেই দূর করতে পারলাম না।

বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং বাদশা মিয়ার বউ কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হল। তবে লম্পট যুবক তখনও রয়ে গেল পুলিশের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এখন আদালত থেকে তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট হবে। মামলার অভিযোগপত্র নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালে গৃহীত হল।

মাস খানেক পরে মলিন বেশে বাদশা মিয়া আমার অফিসে এসে সাক্ষাৎ প্রার্থী হল। বলতে কি সেই দিনের পূর্বে বাদশা মিয়াকে আমি দেখিনি। মামলার একমাত্র আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের পরও বাদি পক্ষ মামলার তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তার কাছে কেন আসবেন তাও পরিষ্কার ছিল না। তবে মামলার তদন্ত তদারকি করার সময় বাদি পক্ষের প্রতি আমি যে সহানুভূতি দেখিয়েছিলাম তা বাদশা মিয়া হয়তো জানতে পেয়ে তার মনে হয়েছিল আমি তাকে সাহায্য করতে পারব। কিংবা তার কষ্টের কথা শুনব।

ভূমিকা না করে বললেও আমি বাদশা মিয়াকে শনাক্ত করতে পারলাম। তিনি আমার পুলিশি জীবনের দেখা হতভাগ্য স্বামীগুলোর অন্যতম। তার স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টাকারী লম্পট মুক্ত বাতাসে ঘুরছে। আর তিনি জেল খেটে বের হয়ে পুলিশের দুয়ারে ধর্ণা দিচ্ছেন।

বাদশা মিয়া তার স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টাকারীকে গ্রেফতারের অভিযোগ নিয়ে আসেন নি। তিনি এসেছেন তার বউয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে শুনানির তারিখ পড়েছে। কিন্তু বাদশা মিয়ার বউ বাদশা মিয়াকে হুমকী দিচ্ছে, আদালতে গিয়ে তিনি আসামীর বিরুদ্ধে তো বলবেনই না, বরং আদালতকে বলবেন যুবকের আসলে কোন দোষ নাই। তিনি এই মামলা করতে চান নাই। তার স্বামী ও স্বামীর ভাইগণ জোরপূর্বক তাকে দিয়ে এই মামলা করিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে, আসামীর মামলাটাই সঠিক। সেদিন রাত্রের বেলা আসামীকে রাস্তা থেকে ডেকে এনে তার স্বামী পক্ষের লেক জন মারপিট করেছিল। বাদিনীর এই রূপ সাক্ষ্য যে মামলাটি গুড়ে বালি করবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এর জন্য বাদশা মিয়ার কোন সমস্যা হবার কথা নয়, তা কোন ভাবেই বাদশা মিয়াকে বোঝাতে পারছিলাম না। যাহোক, কোন ভাবে শান্তনা আর আশ্বাস দিয়ে বাদশা মিয়াকে সেই দিনের মতো বিদায় করলাম।

পক্ষকাল পরে বাদশা মিয়া আবার আমার অফিসে এসে হাজির। বাদশা মিয়ার বউ আদালতে যা বলার তাই বলেছে। তিনি এই মামলা বাধ্য হয়ে করেছেন। কিন্তু আদালত বাদিনীর কথার উপর কোন আদেশ দেন নাই। মামলার শুনানী সেই দিনের মতো মূলতবী করেছেন। বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে লম্পট যুবকের করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালত গ্রহণ করেন নাই। তখনকার আদালত আর সার্কিট হাউজের নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিরা একই বসের অধীন চাকরি করতেন। সার্কিট হাউজে চাকরি করা লম্পটের ভাইয়ে প্রভাব কি আর কম! মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

বাদশা মিয়ার দুর্ভাগ্যের এখানেই শেষ নয়। তার বিরুদ্ধে লম্পটের এক ভাই আদালতে ১০৭ ধারার মামলা করেছে। এর জন্য তার কাছে সমন পাঠানো হয়েছে। সমন আর ওয়ারেন্টের মধ্যে যে বিসত্দর পার্থক্য তা বাদশা মিয়াকে বোঝান দায়। এর মাঝে বাদশা মিয়াকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। পরবর্তী হাজিরার তারিখ পড়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ধারা যে কোন শাস্তিমূলক আদেশ দিতে পারে না তা কি আর বাদশা মিয়া বোঝেন, না তাকে বোঝান সম্ভব? তিনি কেবলই আকুতি করেন স্যার, আমাকে বাঁচান। আমি শেষ হয়ে গেলাম! ১০৭ ধারার রায় বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে গিয়েছিল। তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ভবিষ্যতে শান্তি ভঙ্গ না করার মুচলেকা দিতে হয়েছিল। স্ত্রীর সাথে মতবিরোধ ও ফৌজদারি মামলার ঠেলায় অশান্ত বাদশা মিয়াকে শেষ পর্যন্ত লম্পটের পরিবারের শান্তি ভঙ্গের চেষ্টার অভিযোগেই অভিযুক্ত হতে হল।

আমি মাগুরা থেকে ঝালকাঠী জেলায় বদলী হয় ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে। শেষ মুহূর্তে সাক্ষাতে বাদশা মিয়া জানিয়েছিল তার বউ তাকে ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে। সেখান থেকে বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে যৌতুকের দায়ে মারপিট করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ এনে কোর্টে একটি মামলা করার হুমকী দিচ্ছে। আপাতত এই অভিযোগ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানে কাছে করা হয়েছে।

পরে বাদশা মিয়ার ভাগ্যে কি ঘটেছিল, আমি জানতে পারি নি। তবে বাদশা মিয়ার কপালে যে অনেক দুর্ভোগ আছে এবং তিনি ইতিমধ্যে চিতার আগুনে পুড়ে যে ছাই হয়েছেন, তা চোখ বুঝলেই দেখতে পাই। মন দিয়ে অনুভব করতে পারি। বাদশা মিয়ার বউয়ের নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে হয়তো পত্রিকায় খবর হবে। মানবাধিকার ও নারী অধিকার কর্মীগণ বাদশা মিয়ার বউয়ের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু, বাদশা মিয়া একা । তার পাশে কেউ দাঁড়াবে না।