ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আফ্রিকাকে অন্ধকারাচ্ছ মহাদেশ বলেই পশ্চিমারা সারা বিশ্বে প্রচার করেছে। ঘন বন, দুর্গম পাহাড়, আধুনিক সভ্যতার সাথে পরিচয়হীনতা এবং সর্বোপরি গায়ের রংগের কৃঞ্চতার জন্য সারাবিশ্বে আফ্রিকার এক বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আফ্রিকাকে নিষিদ্ধ মহাদেশ বলেও প্রচার করা হত। আবার এই আফ্রিকাকে নিয়ে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদিরে কাড়াকাড়ির ইতিহাসও বিশ্ববাসী জানে। বিচিত্র আফ্রিকার বৈচিত্র্য অন্বেষণে সেখানে ছুটে গেছে পর্যটক, আবিষ্কারক ও অভিযাত্রীর দল।

এই বৈচিত্র্যময় আফ্রিকার কোন দেশে কখনও যাব এমনটি কখনো ভাবিনি। অথচ জীবনে প্রথমবার জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশ পরামর্শক হিসেবে কাজ করার জন্য আমাকে আফ্রিকাতেই যেতে হল। সুদানের দক্ষিণাঞ্চলের সাথে উত্তরাঞ্চলের ক্ষমতাসীনদের বিরোধ থেকে অর্ধশতাব্দী ব্যাপী যে গৃহযুদ্ধ চলছিল, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ( এউএনএমআইএস) ছিল তারই পরিণতি। দক্ষিণ সুদানের ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’ ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে যে সমন্বিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তারই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সুদানে শান্তিরক্ষী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। আমি ২০০৮ সালের ২৯ শে এপ্রিল সুদানের শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেই।

সুদানের রাজধানী খার্তুমের মিশন সদর দফতরে পনের দিনের আত্মীকরণ প্রশিক্ষণ শেষে আমাকে পদায়ন করা হল দক্ষিণ সুদানের ওয়াউ সেক্টরে। এই সেক্টরের সদর দফতর ছিল বাহারুল আল গজল রাজ্যের রাজধানী ওয়াউ শহরের উপকণ্ঠে। মে মাসের ১৪ তারিখে আমাকে জাতিসংঘের নিজস্ব বিমানে ওয়াউ রওয়ানা হতে হবে। খার্তুম থেকে ওয়াউ শহরের দূরত্ব ১৫ শত কিলোমিটার। তবে রওয়ানা হওয়ার আগের দিন আমাদের লগ-বেইজে গিয়ে আমাদের বোচকা পেটরা জমা দিতে হল। কারণ, বিমানে ওঠার সময় ২০ কেজির অতিরিক্ত মাল বহন করা যাবে না। অথচ আমাদের সাথে ছিল চাল, ডাল, শুকনো খাবার, মসলা, সারা বছরের জন্য কাপড়-চোপড় ও বেডিংপত্রসহ প্রায় দুইশত কেজির জিনিস। তাই, এই সব জিনিস আগের দিন কার্গো বিমানে বুক করতে হবে।

লগ বেইজে গিয়ে দেখলাম মাল-পত্র টানছে এক কালো যুবক। আফ্রিকায় সবাই কালে। কিন্তু এই যুবককে বিশেষভাবে কালো বললাম এই জন্য যে, খার্তুমের সুদানিজগণ মূলত আরব। তাদের শরীর কালো হলেও তাদের শরীরে আলকাতরার রঙ নেই। কিন্তু এই যুবকের শরীরের ছিল আলকাতরার কাঁচা রং। সবচেয়ে বড় কথা হল, এই যুবকের মুখের নিচের পার্টির কয়েকটি দাঁত ছিল না। তার কপালে ছিল কয়েকটি পুরাতন কাটা দাগ। এই দাগগুলো ছিল বেশ শৈল্পিক। ইংরেজী ভি-অক্ষরের মতো মাথার দুই দিক থেকে শুরু করে নাকের উপরে কাটা দাগগুলো মিলে গিয়েছিল। যদি ছিনতাই কারীর কবলে পড়তো বা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হত, তাহলে এমন শৈল্পিক দাগ হতো না। আমি কৌতূহল বসত তার ছবি তুলতে চাইলাম। কিন্তু, সে কিছুতেই ছবি তোলার অনুমতি দিল না। আর অনুমতি ছাড়া ছবি তুললে আমাকে অসদাচরণের দোষে অভিযুক্ত হতে হতো। কারণ, সুদানে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ভিন্ন ছবি তোলা নিষেধ।

বাসায় ফেরার পথে ন্যাশনাল স্টাফ আলাদিনের কাছ থেকে যুবকটি সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলাম। আলাদিন বললেন, এরা হল ডিংকা জাতীর লোক। কপালের দাগগুলো দুর্ঘটনা বা ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে হয় নাই। এগুলো তারা পরিকল্পিতভাবেই করেছে। এটা অন্য জাতি থেকে নিজেদের পৃথক করার বিশেষ উপায়।

বলতে কী প্রথম দর্শনেই আমি ডিংকাদের সম্পর্কে বিশেষ উৎসাহী হয়ে পড়লাম। অবাক কাণ্ড! অন্যদের কাছ থেকে নিজেদের আলাদা করতে মানুষ নিজেদের কপালে চাকুর পোচ দেয়? তাও আবার একটি নয়, দুইটি নয় কয়েকটি! খার্তুম থেকে ওয়াউ আসার পথেও কয়েকজন ডিংকাকে পাশে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই সময় তাদের সাথে গল্পগুজব করার সুযোগ পাইনি। তবে সেই সময় আমি জানতাম না যে, যে ওয়াউ শহরে আমি যাচ্ছি সেই শহরে এই ডিংকাদের সাথেই আমাকে বসবাস করতে হবে। আমি এখানে যে বাসায় বসবাস করতাম সে বাসা ছিল এক ডিংকা ব্যাংকারের। আমাদের সাথে ভাষা সহকারী যারা ছিল তারা প্রায় সবাই ডিংকা। আমাদের বাসায় কাজের জন্য যে ছেলেটি থাকত সেও ডিংকা। তবে কাজের জন্য যে মেয়েটি থাকত সে ছিল সাজিয়ারা গোত্রের, ডিংকা নয়। যাহোক, আমার এই ভ্রমণ কাহিনীতে মূলত ডিংকাদের সাথে বসবাসের গল্পই বলব।