ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

গত ২৬ মে, ২০১২ তারিখে ঢাকা মহানগরীর আগার গাঁওয়ের মহিলা পলিটেকনিক্যাল কলেজের ছাত্রীদের সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ছবি তুলতে গিয়ে প্রথম আলোর তিনজন ফটো সাংবাদিক পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডিসি, ইমাম হোসেন, কমিউনিটি ও মিডিয়া সার্ভিসের এডিসি মাসুদুর রহমানসহ অন্যান্য ঊধ্বর্তন পুলিশ কর্মকর্তারা আহত সাংবাদিকদের দেখতে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে যান। সাংবাদিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে পুলিশ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই ঘটনার সাথে জড়িত তেজগাঁ জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার শহিদুল ইসলামকে প্রত্যাহার এবং শেরে বাংলা থানার নয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। অধিকন্তু ডিএমপি এর যুগ্ম কমিশনার জনাব শাহাবুদ্দিন কোরাইশীকে ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। (লিংক)

প্রচার মাধ্যমের খবরে যা জানা গেছে তাতে ছাত্রীদের সড়ক অবরোধ ঘটনায় এমন কিছু ঘটে নাই যার ছবি তোলা থেকে সাংবাদিকদের বিরত রাখার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। প্রথম আলোর খবর অনুসারে ফটো সাংবাদিক জাহিদ কাছে থেকে ছবি তোলার জন্য রাস্তার উল্টো দিক দিতে র‌্যাবের একটি গাড়ির পিছনে পিছনে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন মাত্র। তাই এ ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের অতি উৎসাহই এরূপ একটি অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল বলে প্রতীয়মান হয়।

সংবাদকর্মীদের সাথে পুলিশ কিরূপ আচরণ করবে, সে সম্পর্কে সঠিক কোন দিক নির্দেশনা পুলিশ সদস্যদের দেওয়া হয় না। থানা প্রশাসনে যারা কাজ করেন, সেই সব পুলিশ সদস্যদের সাংবাদিকদের প্রতি এক প্রকার পূর্বসংস্কার জাত নেতিবাচক ধারণা অনুভব করা যায়। কতিপয় অসৎ সাংবাদিকের সংকীর্ণ স্বার্থের উপর আঘাত পড়লেই তারা পুলিশ সম্পর্কে উল্টাপাল্টা খবর প্রকাশ করে বলে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা অনুমান করা যায়। অন্যদিকে পুলিশ সদস্যদের অপকর্ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা সাংবাদিকগণ চক্ষুশূল ভাবতে পারেন।

পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন, সাংবাদিকগণ পুলিশের প্রতি সহানুভূতিশীল নন। প্রায়শই তারা পুলিশের উভয় সংকটাপন্ন অবস্থাকে মনোহর রূপ দিয়ে জনগণের সামনে উপস্থাপন করে। কোন প্রকার বাছ বিচার ছাড়াই পুলিশে বিরুদ্ধে প্রতিবেদন পত্রিকায় অহরহই ছাপানো হচ্ছে। পুলিশ সদস্যদের পক্ষে প্রায় ক্ষেত্রেই এর প্রতিবাদ করা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া সাংবাদিক তো ভাল খবর লেখে না। তাদের কাছে খারাপ খবরই হল ভাল খবর। এমতাবস্থায়. কোন সাংবাদিক পুলিশের কাছে আসলে যে পুলিশের খারাপ খবরটিই লিখবেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাই, তারা মনে করে সাংবাদিকদের যত বেশি দূরে রাখা যায়, ততোই মঙ্গল।

পুলিশ ও সাংবাদিকদের পেশার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি প্রচ্ছন্ন আবহ রয়েছে। পুলিশ চায় সঠিক তথ্যটি বের করে তার পর তা জনগণের সামনে হাজির করতে। কিন্তু সাংবাদিকের কাছে তখন এই খবর বাসি হয়ে পড়ে। তারা চায় তাৎক্ষণিক খবর। তাই কোন বিষয়ের উপর অসম্পূর্ণ বা অর্ধসত্য খবরও প্রকাশিত হতে পারে। কোন সংবাদ পত্র ভুল বা মিথ্যে খবর প্রকাশ করলে তার সাজা হল পত্রিকায় পর দিন তার সংশোধনী প্রকাশ করা এবং কার্যক্ষেত্রে পাঠকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা বা আরো বেশি হলে ক্ষমা চাওয়া। কিন্তু পুলিশের মিথ্যা খবর বা দায়িত্বের অবহেলা নিয়মিত মামলায় রূপ নিতে পারে। তাকে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা ফৌজদারি অপরাধ দুটোতেই অভিযুক্ত করা হতে পারে।

আমাদের পুলিশ আইন বা পুলিশ প্রবিধানে সাংবাদিকদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করতে হবে তার সঠিক কোন নির্দেশনা নেই। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে একটি মিডিয়া গাইড লাইন্স প্রচার করা হলেও অধিকাংশ পুলিশ সদস্য সে সম্পর্কে ওয়াকেফহাল নন। অথচ মুক্ত তথ্য প্রবাহের অধিকার স্বীকৃত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পুলিশকে প্রতিনিয়তই সাংবাদিকদের মোকাবেলা করতে হয়। উন্নত দেশের পুলিশের আচরণবিধিতে মিডিয়াকর্মীদের সাথে মিথস্ক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত পাঠ থাকে।

এ সম্পর্কে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কেরালা অংগ রাজ্যের পুলিশ আইনের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ২০১১ সালের ১৫ আগস্ট গৃহীত কেরালা পুলিশ আইনের ৩৩(২) ধারায় বলা হয়েছে গণস্থানে কিংবা ব্যক্তিগত স্থানে পরিচালিত পুলিশের যে কোন কর্মকাণ্ডের ভিডিও, অডিও বা অন্যকোন ইলেকট্রোনিক রেকর্ড যে কোন নাগরিক ধারণ করতে পারবে। আইন অনুসারে করা এই কাজে কোন পুলিশ অফিসার বাধা দিতে পারবে না। যদি কোন পুলিশ অফিসার তা করে, তবে তিনি আইনের ১২১ ধারা বলে অনুর্ধ ছয় মাসের কারাদণ্ড কিংবা দুই হাজার রুপি জরিমানা কিংবা উভয়বিধ শাস্তি পেতে পারেন।

অন্যদিকে একই আইনের ৩৩(১) ধারা বলে পুলিশও তাদের কৃতকর্মের ভিডিও, অডিও বা ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে পারবে যা পরবর্তীতে কোন মামলা বা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে পুলিশি কর্মের ন্যায্যতা ও আইনানুগতার সাক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশ আইনে এমন কোন বিধান নেই। তাই একটি যুগোপযোগি আইনে এই জাতীয় বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা দরকার। আর যত দিন পর্যন্ত সেই বিধান হবে না, ততো দিন পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের সাংবাদিকদের সাথে কিরূপ আচরণ করতে হবে, কোন ঘটনায় তারা ছবি তুলতে পারবে এবং কোন ঘটনায় পারবে না ( না পারার পক্ষে কোন বিধান নেই) সে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

ইদানিং হরতালসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা জনিত পরিস্থিতিতে পুলিশের আচরণ বিষয়ে পত্রিকায় যেসব ছবি ও খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে পুলিশ বহুলাংশে অসহিঞ্চু হয়ে পড়েছে। আইন-শৃঙ্খলাজনিত ডিউটিতে নিয়োগের আগে ও পরে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ব্রিফিং ও ডিব্রিফিং এর আয়োজন করতে হবে। এই ব্রিফিং-ডিব্রিফিং অনুষ্ঠানে রাস্তায় নিয়োজিত পুলিশের কর্তব্য ও সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে সঠিক নির্দেশনা দিতে হবে। সাংবাদিকদের সাথে বা মিছিল-মিটিং বা অবরোধকারীদের সাথে কিরূপ আচর করতে হবে সে বিষয়ে একটি ডুমেন্টারী বা ট্রেনিং ভিডিও তৈরি ও প্রচার করা যেতে পারে। প্রত্যেক পুলিশ ইউনিটের পুলিশ সদস্য বিশেষ করে যারা অপারেশনাল ইউনিটে কাজ করেন, তাদের জন্য এই জাতীয় একটি ভিডিও বড় উপকারে আসতে পারে। অধিকন্তু, অপেশাদার আচরণে জড়িত ও অভ্যস্ত পুলিশ সদস্যদের বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় পুলিশ দ্রুত জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। সকল পর্যায়ের পুলিশ নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে সমাজে পুলিশের প্রতি জনগণের যে মনোভাব তার সিংহভাগ গঠিত হয় মিডিয়া তথা সাংবাদিকদের মাধ্যমে।

***
ফিচার ছবি: http://www.bdnews24.com থেকে সংগৃহিত