ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশ ছাড়া যে কোন সভ্যজাতি চলতে পারে না, তা নতুন করে নিরীক্ষা করার কোন প্রয়োজন নেই। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা তথা আইন মান্যকারীদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে তাদের নৈমিত্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সহায়তা করা এবং একই সাথে আইন ভঙ্গকারী বা অমান্যকারীদের সমাজ প্রত্যাশিত আচরণ করতে বাধ্য করার জন্য পুলিশের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। অবশ্য আধুনিক সমাজে পুলিশকে আইন প্রয়োগকারী সরকারি যন্ত্রের চেয়ে, নাগরিকগণ, সমাজে শান্তিস্থাপন ও সংরক্ষণকারী হিসেবেই দেখতে চায়। আধুনিক পুলিশের মূলমন্ত্র, তাই, শান্তিপূর্ণ উপায়ে শান্তিরক্ষা করা। কিন্তু, শান্তিপূর্ণভাবে শান্তিরক্ষার কাজটি যতটা সহজে প্রত্যাশা করা যায়, ততোটা সহজে বাস্তবে সম্পন্ন করা যায় না। দায়িত্বপালন করতে গিয়ে, তাই, প্রায়শই পুলিশ ক্ষমতার বাড়াবাড়ি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দোষে দুষ্ট হয়।

তবে সমাজের আমজনতার সাধারণ বৈশিষ্ট্যাবলী যদি পুলিশের আচরণে হরহামেশাই প্রতিফলিত হয়, তাহলে পুলিশ সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার আদর্শিক ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয় না, অর্থাৎ পুলিশের কাজ জনগণের চোখে বৈধতা পায় না। যেমন, উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশ যদি নিজেরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে, তা হলে অবৈধ জনতা আর বৈধ পুলিশের মধ্যে পার্থক্য থাকে না। অবৈধ জনতার ইঁটের বদলে পুলিশের পাটকেল মারা পুলিশের জন্য প্রত্যাশিত আচরণ নয়। বিশৃঙ্খল জনতার ইঁট-পাটকেলের আঘাত প্রতিরোধ করার জন্য দাঙ্গাদমনে পারঙ্গম বিশেষ পুলিশ নিয়োগ করা যেতে পারে। এই সব পুলিশের মাথায় থাকবে হেলমেট, শরীরে থাকবে বুলেটপ্রুফ বা ইঁট-পাটকেল প্রুফ জ্যাকেট, পায়ে থাকবে শক্তিশালী বুট, হাঁটুতে থাকবে লেগগার্ড ইত্যাদি। তাদের সাথে থাকবে জলকামান, শর্টগান, গ্যাসগান, রাবার বুলেট ইত্যাদি হাজারো জিনিস। এই গুলোর সবই প্রয়োজন মাফিক বল প্রয়োগের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। তবে যতটুকু বল প্রয়োগ করা উচিৎ বা যে ন্যূনতম মাত্রার বল প্রয়োগে পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ উপায়ে শান্ত করা যায়, তার চেয়ে বেশি মাত্রার বল প্রয়োগের ক্ষমতা আইন ও জনগণ পুলিশকে দেয় নাই।

কিন্তু, সেই মাত্রাটি কতটুকু? শরীরের জ্বর মাপার জন্য পারদের থার্মোমিটার রয়েছে; জাগতিক দ্রব্যাদি পরিমাপের জন্য দাঁড়িপাল্লা, কেজি-কুইন্টালের বাটখারা রয়েছে, কিন্তু সমাজের শান্তি স্থাপনের জন্য অশান্ত পরিবেশকে শান্ত করার জন্য পুলিশ কতটুকু বল প্রয়োগ করতে পারবে তার সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য নির্ধারিত কোন মাত্রা বা পরিমাক নেই এবং কোন যন্ত্র দিয়ে তার পরিমাপও সম্ভব নয়। প্রত্যেকটি পরিস্থিতিই পৃথক। তাই, পুলিশের বল প্রয়োগের মাত্রা প্রত্যেক পরিস্থিতিতেই পৃথক হতে বাধ্য। এক্ষেত্রে পুলিশের স্বনির্ধারিত মাত্রাজ্ঞানই জনণের ভরসা।

পুলিশ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা হল, পুলিশ নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু, যে সমাজ থেকে পুলিশ সদস্যদের বাছাই বা নিয়োগ করা হয়, সেই সমাজটিই যদি নিরপেক্ষ না হয়। এখানে যদি, ন্যায্যতার কোন বালাই না থাকে, তখন? এ কথা অনস্বীকার্য যে পুলিশের আচরণ সমাজের পক্ষপাতিত্ব ও পূর্বসংস্কারেরই প্রতিফলন। এই পূর্বসংস্কারগুলোকে আমরা কেউ কেউ বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করি, কেউ কেউ আবার তার বৈধতা খণ্ডণের প্রচেষ্টা চালাই। আর এ জন্যই পুলিশকে যার যতটুকু সামর্থ্য ও ক্ষমতা আছে ততোটুকু দিয়েই নিজ স্বার্থের অনুকুলে ব্যবহারের প্রচেষ্টা চলে।

লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রাক্তন কমিশনার স্যার, রবার্ট মার্কের ভাষা, পুলিশ সমাজিক আচরণের উৎকৃষ্ট প্রতিফলন। সমাজ যদি উচ্ছৃঙ্খল হয়, পুলিশও উচ্ছৃঙ্খল হবে; সমাজ যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, পুলিশও দুর্নীতিগ্রস্ত হবে। অন্য দিকে, সমাজ যদি সহনশীল, শিক্ষিত ও মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হয়, পুলিশও একই রকম সহনশীল ও মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।

তবে এ কথা ঠিক যে, সমাজের প্রচলিত পচনের ধারায় পুলিশকে ফেলে দিয়ে রাষ্ট্র নিশ্চিত থাকতে পারে না। যদি সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রেখে কিংবা কার্যক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে সমাজে শান্তি বজায় রাখা পুলিশের প্রধানতম উদ্দেশ্য হয়, তাহলে পুলিশ সংগঠনকে সমাজের প্রচলিত অপ্রত্যাশিত মূল্যবোধের ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শিক মূল্যবোধে পরিচালিত করতে হবে। এই জন্য পুলিশের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ইত্যাদির ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শন করতে হবে।

এই প্রসঙ্গে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের গোড়ার কথা বলা যায়। ১৮২৯ সালে লন্ডনবাসীর প্রবল প্রতিরোধের মুখেও স্যার রবার্ট পীল পার্লামেন্টে মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠার বিল অনুমোদ করেন। ইংল্যান্ডের সামাজিক অবস্থা সেই সময় বর্তমানের মতো সুশৃঙ্খল ছিল না। কিন্তু, যে লন্ডনবাসীদের নিয়ে তিনি পুলিশ সংগঠন তৈরি করবেন, সেই লন্ডনবাসীরা সেই সময় সুশৃঙ্খল বলে সুনামের অধিকারী ছিল না। তা হলে কেমন ছিল তৎকালীন বৃটিশ সমাজ?।

ঐতিহাসিকদের মতে পীলের নতুন পুলিশ প্রতিষ্ঠার বহু বছর পূর্ব থেকেই বৃটেন একটি বিশৃঙ্খল ও অপরাধসংকুল সমাজ বলে পরিচিতি পেয়েছিল। পঞ্চদশ শতকে ইংল্যান্ডে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকে। একজন বিদেশি পর্যটক সেই সময় ইংল্যান্ড সফরের অভিজ্ঞতায় লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীতে এমন কোন দেশ নেই যেখানে ইংল্যান্ডের চেয়ে বেশি চোর ও দস্যু রয়েছে’। এই সময় বৃটেনের দণ্ডবিধি ছিল পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম আইনগুলোর অন্যতম। এখানে ১৫৩০ থেকে ১৬৩০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭৫ হাজার লোককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৮ শতকের দিকে বৃটেনে ২২৫ টি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। এমনকি সাত বছরের শিশুদেরও একটি মাত্র পকেট-রুমাল চুরির দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেত।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন পুলিশ তৈরি করতে গিয়ে রবার্ট পীল অসম্ভব সতর্কতা ও কঠিনতম অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় সচেষ্ট হন। পুলিশ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি রিচার্ড মাইনি ও চার্লচ রওয়ান নামের দুজন দক্ষ ব্যক্তিকে পুলিশ কমিশনার নিয়োগ করেন। প্রথম পর্যায়ে এক হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়ায় রবার্ট পীল নিজেই উপস্থিত ছিলেন। পীলের মেট্রাপলিটন পুলিশের আকার হওয়ার কথা ছিল দুই থেকে তিন হাজার সদস্যের। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে এক হাজার সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয় । এক হাজার পদের বিপরীতে প্রায় ১২ হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এই সব প্রার্থী বাছাইয়ের প্রকিয়ায় পীল স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি নিজেই তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সুঠাম দেহশৈষ্ঠব, গড় বুদ্ধিমত্তার চেয়ে উন্নত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ও উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী যুবকদের সতর্কতার সাথে বাছাই করে পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

কিন্তু, এর পরও পীল তার কাঙ্খিত চরিত্রের যুবকদের পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ দিতে পারেন নাই। কেননা, ঘুনে ধরা সমাজের সদস্যরা ব্যতীক্রম ক্ষেত্র ভিন্ন ঘুনমুক্ত হতে পারে না। এমন কি প্রথম উদ্বোধনী প্যারেডেই বাছাই করা পুলিশ সদস্যদের মাতাল হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের রাতে আনন্দফূর্তি করতে গিয়ে পীলের নতুন পুলিশ সদস্যগণ এত বেশি মদ্যপান করেছিল যে, তাদের মধ্যে বেশ কিছু পুলিশ সদস্য প্যারেড লাইনে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছিল।

নষ্ট সমাজের ভদ্রতম যুবকদের অসম্ভব সতর্কতার সাথে বাছাই করার পরও পীল তার নতুন পুলিশ বাহিনীতে নিত্য নৈমিত্তিক গতিতে শুদ্ধি অভিযান অব্যত রেখেছিলেন। পুলিশ তৈরির প্রথম তিন বছরেই, তাই, ৫,০০০ পুলিশ সদস্যকে শৃঙ্খলাজনিত কারণে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং আরো ৬,০০০ পুলিশ সদস্যকে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। অর্থাৎ পুলিশের শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে পীল কোন ছাড় তো দেনই নাই, বরং তিনি অত্যধিক কঠোরতা অবলম্বন করেছিলেন। সতর্ক নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব পালনে ও শৃঙ্খলার কঠোরতার জন্যই রবার্ট পীলের লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ আজ সারা বিশ্বের কাছে একটি আদশ পুলিশ বাহিনী।

অন্য দিকে ঔপনিবেশিক ভারত-বঙ্গের পুলিশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আমাদের কি তথ্য দেয়? ভারত উপমহাদেশের পুলিশ বাহিনীগুলোকে বৃটিশ শাসকরা জনসেবার জন্য তৈরি করেনি। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত ভারতভূমিকে ভালবেসে শাসন করার জন্য কোন ইংল্যান্ডবাসী এদেশে আসেনি। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিল্পব ইংরেজদের শিক্ষা দিয়েছে যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ দমন করতে হলে সাদা চামড়ার সেনাবাহিনী যথেষ্ট নয়। তাই এমন একটা অস্ত্রধারী বাহিনী তৈরি করা দরকার যারা কালো বা শ্যামলা চামড়ার অধিকারী হয়ে ভারতবাসীর সাথে মিশে থাকবে। কিন্তু সাদা চামড়ার সাহেবদের মনের মত কাজ করবে। তাই এদেশের অশিক্ষিত হোমড়া-চোমড়া, সবলদেহী যুবকদের নিয়ে তারা তৈরি করে এক খাকি-পোষাকের পুলিশ বাহিনী। ১৮৬১ সালে এই জন্য প্রবর্তন করা হয় সেই আলোচিত ও সমালোচিত পুলিশ আইন। ১৮৬১ সালের ভারত সরকার কর্তৃক পাশকৃত পাঁচ নম্বর আইন ছিল এটি। তাই পাঁচ আইনের নামে অশীতিপর নারী-পুরুষগণ এখনও আঁতকে ওঠেন।

ঔপনিবেশিক বঙ্গ-ভারতের পুলিশে ভারত-বাঙ্গালদের ঊর্ধ্বতন পদে প্রবেশাধিকার ছিল না বললেই চলে। ভারতীয়রা বড় জোর অধঃস্তন পদে নিয়োগ পেত। তাদের নিয়োগ কনস্টেবল থেকে হাবিলদার পর্যন্তই সীমীত থাকত। অন্য দিকে. ইংল্যান্ড থেকে আগত স্বল্প মেধা ও দুষ্ট ও উচ্ছৃঙ্খল চরিত্রের মায়ে তাড়ানো বাপে খেদানো যুবকগণ সরাসরি সার্জেন্ট বা ইন্সপেক্টর পদেও নিয়োগ পেত। যদিও বৃটিশ রাজত্বের শেষের দিকে ভারতীয় পুলিশে ভারতীয়দের ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়, তবুও সংখ্যালঘু হওয়া ও প্রতিষ্ঠিত পুলিশ সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে জনগণের প্রত্যাশিত পুলিশিং উপহার দেওয়া সেই সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নাই। বরং তারা নিজেরাও ঔপনিবেশিক মানসিকতার ধারক-বাহকে পরিণত হন।

যাহোক, বৃটিশ বঙ্গ থেকে পাকিস্তান ঘুরে স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীতে লোকবল বৃদ্ধি, কতিপয় সুবিধাদান, থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের পরিবর্তে চাইনিজ রাইফেল, তড়িৎ সাড়াদানের জন্য গাড়িঘোড়া, টেলিফোন-ওয়াকি-টকি ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু, এই সব পরিবর্তন জনগণের প্রত্যাশা পূরণের চাইতে, সময়ের দাবী মোকাবেলার জন্যই করা হয়েছে বলে বললে অত্যুক্তি হয় না। সময়ের দাবী আর জনগণের দাবীর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সময়ের দাবী আধুনিকতার, কিন্তু জনগণের দাবী সুশাসন ও সদাচারণের।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি, ছাত্র আন্দোলন, নৈমিত্তিক আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি ব্যাপারে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের আলোচিত অসদাচারণের ঘটনাবলী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও পুলিশের দায়িত্বপালনের ধরণে মৌলিক কোন পরিবর্তন আসেনি। অথচ এটাই জনগণের কাঙ্খিত পরিবর্তন হওয়ার কথা। পুলিশের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এর সৃষ্টি লগ্ন থেকেই চলে আসছে। বহুবার এই সব কারণে পুলিশ পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি বা দায়িত্বের অবহেলাজনিত কারণে পুলিশ নেতৃত্বকে যতটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে, তার চেয়েও অনেক গুণ বেশি বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে পুলিশের অসদাচরণের জন্য। রাজনৈতিক কর্মীদের বুকে রায়ট-পোশাকে পুলিশের পা তুলে দেওয়া, শ্লোগানদাকারীদের গলা টিপে ধরা, ফটো সাংবাদিকদের উপর চড়াও হওয়া, মহিলা বিচারপ্রার্থীর প্রতি আদালত পাড়ায় অশোভন আচরণ করা ইত্যাদি ঘটনাগুলো কোন মারাত্ম বল প্রয়োগের ঘটনা নয়। কিন্তু, এগুলোর সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি মারাত্মক।

অবৈধ জনতার উপর পরিস্থিতির চাপে পড়ে পুলিশ আইনগতভাবেই মারাত্মক বল প্রয়োগ করতে পারে এবং ক্ষেত্রমতে প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটাতে পারে। কোন বিশেষ অভিযানে গিয়ে দুর্বিত্তদের দ্বারা আক্রান্ত বা ঘেরাও হলে ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার জন্য পুলিশ গুলি চালিয়ে দুর্বৃত্ত-সুবৃত্ত নির্বিশেষে একাধিক ব্যক্তিকে নিহত পর্যন্ত করতে পারে। বলা বাহুল, প্রতিনিয়ত এই সব পরিস্থিতির মোবাবেলা পুলিশ বল প্রয়োগের মাধ্যমে করছে। কিন্তু, এই সব কাজের জন্য পুলিশের তেমন সমালোচনা হয় না। অথচ, পত্রিকায় প্রকাশিত একজন মিছিলকারীর গলাটিপে ধরার একটি মাত্র স্থির ছবি সমাজে পুলিশের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তির জন্ম দিয়েছে, তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ পুলিশকে অনেক বেশি কাঠখড়ি পোড়াতে হবে।

পুলিশকে পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পুলিশের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মধ্যে একটি দুইধারা তরবারির মতো ভয়ংকর পরিণতির সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে। এর এক দিকে রয়েছে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা এবং সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য ক্ষমতার অপরিহার্যতা; অন্যদিকে রয়েছে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অপব্যবহারের ঝুঁকি। এই ক্ষমতার অপব্যবহার নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ক্ষতির কারণ হতে পারে। এমনকি, গোটা সমাজের উপর এই ক্ষমতার অপব্যবহার নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে।

আমাদের বুঝতে হবে, জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি শুধু একটি আধুনিক পুলিশ সংগঠনই নয়; জনগণের প্রত্যাশা একটি সদাচারী, নিরপেক্ষ, দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ সার্ভিস। শুধু আধুনিক অস্ত্র, বিলাশবহুল গাড়ি, সুসজ্জিত অফিস, পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা কিংবা পিটি-প্যারেড নির্ভর প্রশিক্ষণ কোন পুলিশ সংগঠনকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে না। এর জন্য চাই পুলিশের ঔপনিবেশিক মানসিকতার পরিবর্তন।

পুলিশের পরিবর্তন একটি মন্থর গতির সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। এই পরিবর্তন যতটা না বাহ্যিক, তারচেয়েও বেশি অভ্যন্তরীণ, মানসিক বা আচরণগত। তাই প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা করতে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিক উপাদানগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। উপরন্তু, পুলিশকে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি-বিধানের বিশ্লেষণ, গ্রহণ, বর্জন, প্রয়োজনে নতুন আইনও বিধি তৈরি, পুলিশ-ব্যবস্থার উপর নাগরিক নজরদারি প্রতিষ্ঠা এবং পেশাগত মানদণ্ড রক্ষার দিকে আশু দৃষ্টি দিতে হবে।

২০১২ সালের মধ্যে প্রতি থানায় দশটি করে ডাবল ক্যাবিন পিকআপ সরবরাহ, থানা-ফাঁড়ির সকল অফিসারের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসা-বাড়ির ব্যবস্থা, পুলিশ কনস্টেবলদের বেতন স্কেল ৪ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকায় নির্ধারণ এবং নায়েক-হাবিলদারের হাতে কয়েক ডজন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তুলে দিলেই ২০১৩ সাল থেকে পুলিশ জনগণের বন্ধু বনে যাবে — এ জাতীয় দিবাস্বপ্ন দেখার কোনই অবকাশ নেই।

রচনাসূত্রঃ
১।ফোর্সেস অব ডেভিয়েন্সঃ আন্ডারস্ট্যান্ডিং দি ডার্ক সাইট অব পুলিশিং- ভিক্টর ডি কেপলার ও অন্যরা
২। পাইওনিয়ারস ইন পুলিশিং: ফিলিপ জন স্টিড