ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, পুলিশের অদক্ষতা বা ব্যর্থতা তথা আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে চোর-ডাকাত-সন্ত্রাসী-চরমপন্থিদের খালাস পাওয়ার খবরে বিতৃঞ্চ হয়ে কেউ কেউ প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে কথিত অপরাধীদের দুনিয়া থেকে চির বিদায়ের দাবী তোলেন। পুলিশের চাকরি করতে গিয়ে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অনেক পরিবর্তন দেখেছি। অনেক দুর্বলতা প্রত্যক্ষ করেছি। অনেক সময় যৎপরোনাস্তি বিরক্তও হয়েছি। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস ও সমর্থন কোন দিনই হারাইনি।

পুলিশে যোগদানের পূর্বে ছাত্র অবস্থায় পুলিশের প্রতি ইঁট পাটকেল নিক্ষেপের সামান্য অনুশীলন অন্যান্য সচেতন ছাত্রদের মতো আমারও ছিল। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর কোন এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলাশী মোড় থেকে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল ছাত্রনামধারীকে দুই পুলিশ সদস্যকে ধরে জন্মদিনের পোশাকে সারা ক্যাম্পাস ঘোরাতে দেখেছি। এই জঘন্য ঘটনার আমি নিছক দর্শক হলেও এই অপকর্মের দায় এড়াতে পারি না। জনরোষ যে কী ভয়ানক রূপ নিতে পারে তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু জনরোষের বলে আইন বহির্ভূত কোন কিছুকে কখনই সমর্থন করি নাই।

পুলিশ আইনের রক্ষক। পুলিশের কাস্টডি বা হেফাজত হল আইনানুসারে নিরাপদ হেফাজত। হেফাজতটা নিরাপদ বলেই পুলিশ হেফাজতে কারও স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলেও পুলিশকে জবাব দিতে হয়। এ জন্য মৃত ব্যক্তির সুরুতহাল প্রতিবেদন পুলিশের পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেকে দিয়েও করানো হয়। এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। পুলিশের ইচ্ছাকৃত অবহেলা বা সহিংসতা প্রমাণিত হলে পুলিশের বিরুদ্ধে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থাই নয়, ফৌজদারি আইনে মামলা পর্যন্ত হয়।

সভ্য দেশের বিচার ব্যবস্থার নীতি বলে, যে অপরাধীর বিরুদ্ধে হাজারটি খুন করার অভিযোগ রয়েছে, কিংবা যে ভয়ংকর সন্ত্রাসী বা দেশদ্রোহী, একবার পুলিশের হেফাজতে এলে তার জীবনটি রক্ষা করাও পুলিশের আইনী দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। পুলিশের হেফাজতে রুবেল নামের একজন ছাত্র মারা গেলে যেমন পুলিশকে হত্যা মামলা মোকাবেলা করতে হয়, তেমনি একজন ডাকাত মারা গেলেও তাকে ছাড় দেবার কোন বিধান নেই।

২০১০ সালের মে মাসে নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানা পুলিশের রিমান্ডে থাকা অবস্থায় একজন ডাকাতি মামলার আসমী মারা যায়। পুলিশ সুপার আমার নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল গঠন করেন। আমি তৎক্ষণাৎ থানায় গিয়ে এর অনুসন্ধান শুরু করি। প্রত্যক্ষদর্শীসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাক্ষী এবং অবস্থাগত সা্ক্ষ্যে প্রমাণিত হল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদকালীন তাকে নির্যাতন করেছে। সে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় নি। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করে তার বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যা মামলা গ্রহণের জন্য মতামত দিলাম। হত্যা মামলা রুজু করা হল। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হল। মামলা তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হল। সম্ভবত, বাংলাদেশের ইতিহাসে এইটিই ছিল সর্বপ্রথম ঘটনা যেখানে পুলিশ হেফাজতে কোন আসামী মারা যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, মৃত ব্যক্তির লাশের সৎকারের পূর্বেই অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

সভ্য রাষ্ট্র পুলিশ রক্ষণাবেক্ষণ করে তার কোন নাগরিকের জীবনহানীর কারণ হওয়ার জন্য নয়। পুলিশের অস্ত্র, গোলাবারুদ, হাতের লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, রায়ট ভ্যান এগুলোর সবই নাগরিকের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য। পুলিশের প্রশিক্ষণে শেখানো হয়, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান অন্য কিছু পৃথিবীতে নেই। হতে পারে না। তাই পুলিশের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষই হল দেশের নাগরিকদের জীবন রক্ষা করা।

অপরাধ প্রতিরোধ কিংবা আইন প্রয়োগকালীন পুলিশের সামনে কোন শত্রু থাকে না। পুলিশের সামনে থাকে আইন ভংগকারী নাগরিকগণ । এরা হতে পারে পরিস্থিতির কারণে আইন ভঙ্গকারী কিংবা বিচ্যূত চরিত্রের কেউ। এদের মূলত সমাজই সৃষ্টি ও লালন পালন করে। একজন নাগরিকের প্রাপ্য যাবতীয় মৌলিক বা মানবিক সুযোগ সুবিধা একজন অপরাধীরও প্রাপ্য বটে। তবে কিছু কিছু নাগরিক সুবিধা আইন বলেই তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। যেমন, কোন অপরাধী গ্রেফতার হলে তার চলাফেরার স্বাধীনতা হরণ করা হয়।

অপরাধীদের অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে রাষ্ট্র তাদেরকে প্রকাশ্য আদালতে প্রচলিত বিচারের মাধ্যমে সাজার ব্যবস্থা করে থাকে। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্র কোন নাগরিকের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারে না। বরং বলা চলে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রাপ্য পুরস্কার পরিশোধে তৎপর থাকে। আইন অনুযায়ী আরোপিত শাস্তিও আইন ভংগকারীর জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ব প্রাপ্য। কেননা, মানুষের প্রতিটি কাজই কোন না কোন ফল বয়ে নিয়ে আসে। শাস্তি হল, অপরাধীর জন্য একটি ঋণাত্বক পুরস্কার।

অপরাধীদের গ্রেফতার ও অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পুলিশকে সুনির্দিষ্ট আইনী নিয়মের মধ্যেই চলতে হয়। এই নিয়মের বাইরে গেলেই ঘটে বিপত্তি। পুলিশ আইনের বাইরে গিয়ে আইন প্রয়োগ করলে বা আইন রক্ষা করলে পুলিশ আর পুলিশ থাকে না। পুলিশ তখন হয়ে পড়ে বৈধ অস্ত্রধারী আইনী ক্ষমতাধর সন্ত্রাসী বাহিনী। এই বাহিনী তখন পেশাদার ডাকাতদলের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে পড়ে।

কোন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কৃত অপরাধ কর্মের বিচারের ভার পুলিশ বাহিনীর হাতে ছেড়ে দিতে পারে না। এমনকি কোন সুস্থ মানুষ এমনটি চিন্তাও করতে পারে না। বিচারের ভার আদালতের উপর ন্যাস্ত হয়। এই আদালতকে হতে হয় নির্লোভ, নির্মোহ এবই আইনের পূজারী। আদালত শুধু ফরিয়াদির আদালত নয়; আদালত আসামীরও আদালত। আদালত পুলিশের আদালত, চোরেরও আদালত। আদালত কোন মানুষের বিচার করে না আদালত অপরাধের বিচার করে। বিচারের উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়। বিচারের উদ্দেশ্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে বাদী-বিবাদি উভয়কে তাদের নিজ নিজ প্রাপ্য বুঝে দেওয়া। পুলিশ আদালতকে তার কাজে সহায়তা করে ও আদালতের আদেশ বাস্তবাযন করে মাত্র।

কোন পিতার একাধিক সন্তানের মধ্যে একটি অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়লে পিতা তার আদর্শ বিচ্যূত সন্তানকে হত্যা করতে পারে না। সভ্যতার ইতিহাসে কোন পিতা এখন পর্যন্ত তা করে নাই। পিতা তার সন্তানদের উচিৎ প্রাপ্য বুঝিয়ে দিবেন। সন্তান অপকর্মে লিপ্ত হলে, পিতার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিতও হন না। আর সন্তান যদি বিপথে যায়, তবে অস্বীকার করার কিছু থাকে না যে এর পিছনে পিতামাতার উদাসীনতা রয়েছে। এর দায় দায়িত্ব পিতামাতা এড়াতে পারে না। সভ্য সমাজে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের পিতৃতুল্য। নাগরিকগণ রাষ্ট্রের সন্তান। রাষ্ট্র পুলিশকে দিয়েই তার সন্তানদের রক্ষা করে।