ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

রাজ্জাক মাষ্টার পান চিবাইতে চিবাইতে আমারে কইলো, ‘লাবু মিয়া না! কই যাও?’
‘বাজারে যাইতাছি’
‘বাজারে তো আগুন লাগছে’
‘আগুন!! কন কি?’
‘হ, আমার ছোট পোলার জন্য এট্টু দুধ কিনতে গেছিলাম, গিয়া দেখি গরমে হাত দেওন যায় না’
‘দুধে গরম?’
‘খালি কি দুধ, যেইটাই ধরছি সেইটাই’
‘কি কইতাছেন মাষ্টার! আমার মাথায় গিট্টু লাইগা গেল, এট্টু কিলিয়ার কইরা কন।’
‘কিলিয়ার আর কি কমু কও, ভোট তো দিসিলাম দশ ট্যাকা সের চাউল খামু বইলা; কিন্তু আইজকাও বাজারে গিয়া দেখি প্রতিটা জিনিসের দাম বাড়ছে। সব আগুন কি চোখ দিয়া দেখন যায়?’
মাষ্টার যে আমারে নিয়া মশকারা করতাছে সেইটা বুঝতে আমার এট্টু দেরী হইল। কিন্তু বুঝনের পর মনে হইলো য্যেন বাজারের আগুন সে আমার মাথায় লাগাইয়া দিসে।

কইলাম, ‘আমাগো ইশকুলের মাষ্টার বইলা আপনারে ভক্তি-সোদ্ধা করতাম, আপনে শিক্ষিত মানুষ; কিন্তু আইজকা অশিক্ষিতের মতো এইডা কি কইলেন? সরকার কি সত্যই দশ ট্যাকা সের একদিনও খাওয়ায় নাই? ইলেকশনের পরপরই আমি নিজে গিয়া বাজার থাইকা বারো ট্যাকা সের চাউল কিনছি। দশ না পারে বারো তো পারসে, না কি?’
‘হুনছিলাম তোমাগো মতো দুয়েক জন কিনছে, আমি তো পাই নাই।’
‘সবাই পাইলো আর আপনে না পাইলে আর কি করণ যায়?’
‘সবাই আর কই? তোমাগো মতো দুয়েক জন’
‘দুইজন কন আর দশ জন কন কিনছে তো? এইটারে অস্বীকার করেন ক্যান? আপনাগো মতো জ্ঞান পাপী গো লাইগা দ্যাশে কিছু করণ যায় না, ভাল কাম তো আপনাগো চোখে পড়বো না, চোখে পড়বো কখন পান থাইক্যা চুন খসলো, কখন কে এট্টু উসটা খাইলো এইগুলাই তো দ্যাখবেন।’
‘আইচ্ছা বুজলাম দুই দিন বাজার দর কম ছিল, তয় পরে বাড়লো ক্যা?’
‘আপনে মাষ্টার মানুষ এই জিনিসটা বুজলেন না? আরে ভাই আমাগো দেশের বেশির ভাগ মানুষ হইলো কৃষক, কৃষকরে মাইরা সরকার আপনাগো যদি কম দামে চাউল খাওয়ায় তাইলে কি দেশের উন্নয়ন হইবো? হেরা কি এদেশের ভোটার না?’
‘ক্যান আমরা কি ভোটার না?’
‘আরে ভাই এই জন্যেই তো আপনাগো বেতন এক লাফে ডাবল কইরা দিসে। তখন তো কইলেন না যে বেতন বড়াইলো ক্যান এইটা নিমু না।’
তারপর বুঝলেন তো, রাজ্জাক মাষ্টারের মুখটা অফ হইয়া গেল। আসল কথা কি কমু আমাগো দেশের আবাল পাবলিক রাজনীতির র’ও বুঝে না খালি ফাল পাড়ে।
একটু দম নিয়া মাষ্টাররে কইলাম, ‘বর্তমান সরকার এই তিন সাল পুরা করলো, এ পর্যন্ত কোন বড় সমস্যা দেখছেন? স্বাধীনতার পর থিকা যে কয়বার দল ক্ষমতায় ছিল সেই কয়বারই দেশে উন্নয়ন আর গণতন্ত্র ঠিক রাইখা দেশে শান্তি আনছে।’
‘হ কি শান্তিতে যে আছি, শান্তি য্যেন উপচাইয়া পড়তাছে’
‘আপনার মুখে সরকারের গিবত ছাড়া ভাল কোন কথা শুনলাম না। অশান্তির কি হইলো এইডা এট্টু বয়ান করেন, শুনি।’
‘দেখো লাবু মিয়া, এই একুশে ফেব্রুয়ারির দিন তোমাগো দলের পোলাপাইন গুলা কি করলো?’
‘ক্যান কি করছে?’
‘কি করছে এখন জিগাইতেছো, তারা সকাল থাইক্যা রাস্তা আটকাইয়া সবাইরে একটা কইরা কালো ব্যাজ লাগাইয়া দিতাছে আর দশ টাকা কইরা নিতাছে।’
‘এর মইধ্যে আপনি খারাপের কি দেখলেন? ভাষা দিবসের চেতনা ছড়াইয়া দিতাছে।’
‘আমি তো ঐ চেতনা নিয়াই বেশি চিন্তায় পইড়া গেছি।’
‘কেন আপনার কি সেইটায় অভাব পড়ছে?’
‘না অহনো অভাব পড়ে নাই, তবে তোমাগো কাজ কারবারে তো মনে হয় খালি অভাব না দুর্ভিক্ষ শুরু হয়া যাইবো’
‘মানে?’
‘একুশে ফেব্রুয়ারির দিন সকালে তোমার ছোট ভাই রাস্তায় দাঁড় করাইয়া একটা কালো ব্যাজ পড়াইয়া কইলো ‘স্যার আমাগো দশ ট্যাকা দেওন লাগবো।’
আমি কইলাম, ‘দশ ট্যাকা কেন আমি খুশি হইয়া যা দিমু তাই নিবা।’
সে মাথা নাড়ায়, ‘না স্যার এই বছরে দশ ট্যাকাই ফিক্সড, আমরা বেশিও নিমু না কমও নিমু না।’
আমি বুঝলাম দশ ট্যাকা আমারে দেওনই লাগবো, তাই কইলাম যে, ‘আচ্ছা বাবু, তুমি আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেও দেখি।’
‘কি জিগাইবেন জিগান।’ বাবু আমারে বলল।
‘আচ্ছা কও দেখি একুশে ফেব্রুয়ারিতে কে কে শহীদ হইছিল?’
‘তারপর?’ আমি রাজ্জাক মাষ্টাররে জিগাইলাম।
‘তারপর তো তোমার ভাই কোন জবাব তো দিতে পারলো না উল্টা আমারে কি কয় জানো?’
‘কি কয়?’
‘কয় স্যার চান্দা দিলে দেন না হইলে চইলা যান, এখন আমাগো অনেক কাম। আফনের লাইগা আমরা লস করতে পারুম না।’
’আফনে তো দেহি রাস্তার মইধ্যে ইশকুল বসাইয়া ফালাইছেন। কে কুন জায়গায় শহীদ হইছিল, হেইডা জিগানোর কি আছে। আপনারা মাষ্টার মানুষ সব অকাজের কথা কইতে পারেন, এখন সময় পাল্টাইছে মিয়া এট্টু কাজের আলাপ করেন।’
‘অকাজের আলাপ কই কইলাম।’
‘আমি কি আর জানি না, চেরাপুঞ্জি কোথায় অবস্থিত? আর স¤্রাট আকবরের পোলাগো নাম কি? এইসব কি কামে লাগে আফনেই কন? আর এহন জিগাইতেছেন একুশে ফেব্রুয়ারীতে কে কে শহীদ হৈছিল। যত আকামের কতা আপনাগো কাছে।’
এর পর আর কি? মাষ্টার আমার মুখের দিকে হা কইরা তাকায়া থাকলো। হেইদিন দিসি হালারে মুখ বন্ধ কইরা।