ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

‘হ্যালো’ বলার পর পরই একটা শর্ত দিয়ে বসলেন শ্রাবণী (আসল নাম নয়)। ‘আমি আপনার সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলব। কিন্তু সেগুলো আপনি আর কারো সঙ্গেই শেয়ার করতে পারবেন না।’ তাকে আশ্বস্ত করি, ‘আমার পেশার শর্তই হচ্ছে গ্রাহকের গোপনীয়তা। সেটা আমার পেশাগত লাইসেন্সেরও শর্ত।’ শ্রাবণী তাঁর কথা শুরু করতেই আমি হেসে ফেলি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিষয়টা নিয়ে অনেকেই ফোন করছেন। অবশ্য যারা ফোন করছেন তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। তবে কেউই কথা বলার আগে এভাবে শর্ত দিয়ে আলোচনা শুরু করেননি। কিন্তু যারাই ফোন করেছেন তাদের বিষয়টা আমাকে গোপন রাখতে হয়েছে পেশাগত বাধ্যবাধকতার কারণেই।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে বিষয়টা নিয়ে তারা কথা বলতে চাচ্ছেন বা তথ্য জানতে চাচ্ছেন সেটি মোটেও গোপনীয় কিছু নয়। কানাডীয়ান সরকার পহেলা ডিসেম্বর থেকে ‘সুপার ভিসা’ নামের একটি নতুন ভিসা চালু করেছেন। এই ভিসার আওতায় কানাডায় বসবাসরত যে কোনো নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা তাদের বাবা-মা বা দাদা-দাদিকে সর্বোচ্চ দুই বছরের জন্য বেড়াতে নিয়ে আসতে পারবেন। আগেও তারা তাঁদের আনতে পারতেন। দীর্ঘ সময়ের জন্য আনার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তবে স্পনসর করে স্থায়ীভাবে নিয়ে আসা যেত। কিন্তু বিভিন্ন দেশের ভিসা অফিসগুলোতে এত বিপুলসংখ্যক স্পনসরশিপ আবেদন জমা পড়ে আছে যে সেগুলো নিষ্পন্ন হতে আরো কয়েক বছর লেগে যাবে। এদিকে প্রতি বছরই তো নতুন নতুন আবেদনপত্র জমা পড়ছে। নাগরিকদের মধ্যে পুঞ্জীভূত হতাশা যাতেক্ষোভে রূপান্তরিত না হয় সে জন্যেই কানাডা সরকার মধ্যবর্তী একটি সমাধান বের করেছে।

সাধারণত বেড়াতে আসার জন্য ভিজিটর ভিসার মেয়াদ থাকে স্বল্পকালীন। স্বল্প সময়ের জন্য বিপুল ব্যয় করে পরিবারের সিনিয়র সদস্যদের কানাডায় নিয়ে আসা অধিকাংশ নাগরিকেরই পছন্দ নয়। সে জন্যেই ‘সুপার ভিসার’ প্রচলন। এই ভিসার আওতায় দুই বছরের জন্য বাবা-মা বা দাদা-দাদিকে নিয়ে আসা যাবে। আর এই ভিসার আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে আট সপ্তাহ। ফলে আবেদন করে দীর্ঘ সময় বসে থাকার ব্যাপার নেই। দুই বছরের জন্য পরিবারের সিনিয়র সদস্যদের নিজেদের মধ্যে পাওয়া গেল। এর মধ্যে স্পনসরশিপের আবেদনও প্রসেস হতে থাকল।

বলে রাখি, আমি ইমিগ্রেশন বিষয়ক পরামর্শক নই। পেশাগতভাবে আমি কাজ করি ইন্স্যুরেন্স সেক্টরে। সুপার ভিসার সঙ্গে একটি শর্ত বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে কানাডা সরকার। সেটি হচ্ছে আবেদনের সঙ্গে ন্যূনতম এক বছরের মেডিক্যাল ইন্স্যুরেন্স থাকার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। ফলে মেডিক্যাল ইন্স্যুরেন্স সম্পর্কিত তথ্য এবং ইন্স্যুরেন্সের জন্যই অনেকে আমাকে ফোন করছেন। সুপার ভিসার আবেদনের সঙ্গে আবেদনকারীকে কানাডীয়ান কোনো বীমা কোম্পানির কাছ থেকে ন্যূনতম এক বছরের মেডিক্যাল ইন্স্যুরেন্স নিতে হবে। আর এই ইন্স্যুরেন্সে স্বাস্থ্যসেবা তথা চিকিৎসা ব্যয়, হাসপাতালের খরচ এবং কোনো কারণে কানাডায় আসার পর আবেদনকারী মারা গেলে তার মৃতদেহ নিজদেশে ফিরিয়ে নেয়ার দায়িত্ব ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি বহন করবে- এই বিধান থাকতে হবে। আর এই ইন্স্যুরেন্স কভারেজের পরিমাণ হতে হবে ১ লাখ কানাডীয়ান ডলার।

আরবিসি ইন্স্যুরেন্সের অ্যাডভাইজার হিসেবে এই সংক্রান্ত যে কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেয়া এবং আগ্রহীদের ইন্স্যুরেন্স করে দেয়া আমার পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু শ্রাবণীর চাওয়াটা তার চেয়ে বেশি। প্রথমত তিনি ‘সুপার ভিসা’ সম্পর্কে কিছুই জানেন না, দ্বিতীয়ত তিনি এই ব্যাপারে তার পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের কাউকে এখনি কিছু জানাতেও চান না। আরও হয়ত অনেকেই তাদের মতো করে সুপার ভিসার বিস্তারিত তথ্যাদি সংগ্রহ করতে চাইছেন। শ্রাবণীর সঙ্গে আলোচনার পরই এই সংক্রান্ত বিস্তারিত খোঁজ নেয়া।

কারা আবেদন করতে পারবেন
বাংলাদেশে বা বিশ্বের যে কোনো দেশে বসবাসরত নারী-পুরুষ এই ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তাদের কতগুলো শর্ত পূরণ করতে হবে।
১. যিনি সুপার ভিসার জন্য আবেদন করবেন তার ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনি যে কেউ কানাডায় বসবাসরত কানাডীয়ান নাগরিক কিংবা স্থায়ী বাসিন্দার (পারমানেন্ট রেসিডেন্ট) হতে হবে।
২. আবেদনকারীকে কানাডায় প্রবেশাধিকার পাওয়ার যোগ্য হতে হবে। কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি কোনো মামলা থাকলে বা মামলায় দ-প্রাপ্ত হলে সাধারণভাবেই কানাডা সরকার তাকে ভিসার জন্য মনোনীত করেন না। তাছাড়া সংক্রামক কোনো রোগ থাকলেও তাঁর আবেদন বিবেচিত হয় না। এগুলো হচ্ছে সাধারণ নিয়ম। সুপার ভিসার জন্য আবেদনকারী কানাডায় প্রবেশাধিকার পাওয়ার যোগ্য কী না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তÍ নেয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেন ভিসা কর্মকর্তা।
ক. প্রথমত আবেদনকারীকে সত্যিকার অর্থেই ভিজিটর হতে হবে যিনি ভিসার মেয়াদ শেষে স্বেচ্ছায় নিজদেশে ফিরে যাবেন।
খ. নিজ দেশের সঙ্গে আবেদনকারীর সম্পর্ক। এক্ষেত্রে তারা সামাজিক এবং পেশাগত সম্পৃক্ততা বিবেচনা ও পর্যালোচনা করে দেখা হবে।
গ. কি উদ্দেশ্যে তিনি কানাডা যেতে চাচ্ছেন তার যৌক্তিক বিবরণ দিতে হবে।
ঘ. আবেদনকারীর পারিবারিক এবং আর্থিক অবস্থা।
ঙ. সংশ্লিষ্ট দেশটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

কিভাবে আবেদন করবেন
আপনি নিজেই পর্যালোচনা করে দেখলেন যে, আপনি কানাডার সুপার ভিসার জন্য আবেদন করার যোগ্যতা রাখেন। সেক্ষেত্রে কানাডা ইমিগ্রেশন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট www.cic.gc.ca থেকে নির্ধিারিত ফরম ডাউনলোড করে সেটি প্রিন্ট করে পূরণ করে ফেলতে পারেন। আবেদনপত্রের সঙ্গে কিছু দলিলপত্রও আপনাকে জমা দিতে হবে। সেটি ওই আবেদনপত্রেই উল্লেখ করা আছে। সমুদয় কাগজপত্র এবং নির্ধারিত ফিসহ আবেদনপত্রটি স্থানীয় কানাডীয়ান হাই কমিশনে জমা দিতে হবে।
অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে কানাডায় বসবাসরত আপনার সন্তান কিংবা নাতি-নাতনি কারো কাছ থেকে লিখিত একটি আমন্ত্রণপত্র অবশ্যই জমা দিতে হবে। আমন্ত্রণপত্রে যাকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে তার শুদ্ধ পূর্ণ নাম (পাসপোর্ট অনুসারে), জন্ম তারিখ, ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর, আমন্ত্রিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, আমন্ত্রিত ব্যক্তি কানাডায় কতদিন অবস্থান করবেন, কানাডায় অবস্থানকালীন সময়ে তাঁর থাকা খাওয়া ও অন্যান্য ব্যবস্থা এবং প্রাক্কলিত ব্যয়ের হিসাব, নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সম্ভাব্য তারিখ অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
আর যিনি আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন তারও কিছু তথ্য এই আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখ করতে হবে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, পূর্ণ নাম, জন্ম তারিখ, কানাডায় বসবাসের ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর, পেশা। তিনি কানাডার নাগরিক নাকি পারমানেন্ট রেসিডেন্ট তারও উল্লেখ করতে হবে আমন্ত্রণপত্রে। সেই সঙ্গে তার একটি প্রমাণপত্রের কপিও দিতে হবে। যারা কানাডীয়ান নাগরিক তারা পাসপোর্ট কিংবা সিটিজেনশিপ কার্ডের ফটোকপি দিতে পারেন। আর যারা পারমানেন্ট রেসিডেন্ট তারা পিআর কার্ডের ফটোকপি দেবেন।
পরিবারের সকল সদস্যের নাম ও জন্মতারিখসহ একটি বিবরণী এবং আমন্ত্রিত ব্যক্তির কানাডা অবস্থানকালীন সময়ের যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের লিখিত একটি অঙ্গীকারনামাও আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে দিতে হবে। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ভিসা অফিসার আমন্ত্রণপত্রের নোটারাইজড কপি দেখতে চান। ফলে আমন্ত্রণপত্রটি নোটারি করে পাঠানোই ভালো।
সুপার ভিসার আবেদনের সঙ্গে কানাডা থেকে যিনি আমন্ত্রণপত্র পাঠাচ্ছেন তার আর্থিক আয়ের প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে। সুপার ভিসার আবদনের জন্য কাউকে আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে সংশ্লিষ্ট কানাডীয়ানের নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক ন্যূনতম আয় থাকতে হবে। আয়ের সেই শর্ত পূরণ না হলে সেই আবেদনপত্র বিবেচিত হবে না। আমন্ত্রণকারী এবং আমন্ত্রিত ব্যক্তির সম্পর্কের একটি প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে আবেদনপত্রের সঙ্গে।

আয়ের শর্ত
কাউকে আমন্ত্রণপত্র পাঠাবার আগে দেখে নিতে হবে আপনার বার্ষিক আয়ের পরিমাণ সুপার ভিসার শর্ত পূরণ করে কী না। সুপার ভিসা চালু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত আয় সম্পর্কিত নতুন কোনো নির্দেশনা জারি করেনি কানাডা সরকার। তবে ২০১১ সালের জারি করা নির্দেশনাটিই এখনো কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
সেই নির্দেশনা অনুসারে পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১ জন হলে ন্যূনতম বার্ষিক আয় হতে হবে ২২ হাজার ২২৯ কানাডীয়ান ডলার । পরিবারের সদস্য সংখ্যা ২ জন হলে ২৭ হাজার ৬৭৪ ডলার, ৩ জন হলে ৩৪ হাজার ২২ ডলার, ৪ জন হলে ৪১ হাজার ৩০৭ ডলার, ৫ জন হলে ৪৬ হাজার ৮৫০ ডলার, ৬ জন হলে ৫২ হাজার ৮৩৮ ডলার, ৭ জন হলে ৫৮ হাজার ৮২৭ ডলার আয় থাকতে হবে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭ জনের বেশি হলে প্রতি সদস্যের জন্য ৫ হাজার ৯৮৯ ডলার বাড়তি আয় থাকতে হবে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা হিসাব করার সময় যাদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করে নিতে হবে। অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রী দুজনের কোনো পরিবার যদি বাংলাদেশ থেকে দুজনকে আমন্ত্রণ জানান তাহলে তাদের ন্যূনতম বার্ষিক আয় থাকতে হবে চার জনের পরিবারের জন্য নির্ধারিত আয় সীমার সমান অর্থাৎ ৪১ হাজার ৩০৭ ডলার।

মেডিক্যাল ইন্স্যুরেন্সের কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি। আবেদনপত্র জমা দেয়ার পর আবেদনকারীকে মেডিক্যাল পরীক্ষা করতে হবে। সেটি করতে হবে সংশ্লিষ্ট হাই কমিশনের নির্ধারিত চিকিৎসকের কাছেই।
বলে রাখা ভালো, কানাডা ইমিগ্রেশনের ওয়েবসাইটে সুপার ভিসার আবেদনপত্রসহ বিস্তারিত তথ্য দেয়া আছে। কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে এই নিবন্ধের লেখকের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন।

shaugat@gmail.com
***
লেখাটি প্রকাশিথ হয়েছিল: http://shaptahik.com