ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমার বাবা আজকে মুখ আমসি কইরা বেশ রাতের বেলায় বাসায় আসছে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম , কি ব্যাপার আব্বা তোমার কি মন খারাপ ? আব্বা আমতা আমতা করে বলল, ন্না মানে, হ্যা মন খারাপ । আমি বললাম কেন ? আব্বা বললেন, আজকে থেকে শাহবাগের কর্ম সুচির পরিবর্তন করা হয়েছে , এখন থেকে শুধু শুক্রবারে শাহবাগে সমাবেশ হবে তাই মনটা একটু খারাপ লাগছে । আমার আব্বা একজন মুক্তি যোদ্ধা । মুক্তি যুদ্ধ চলাকালিন সময় তিনি ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন কোম্পানি কমান্ডরা হিসাবে । তারপর মেঘেমেঘে অনেক বেলা হোল (৪২ বছর) মোটামটি সে একজন ব্যর্থ মানুষ হিসেবে আমাদের( পরিবার, আত্মীয় স্বজন,বন্ধু-বান্ধব) কাছে পরিচিত হলেন কারন তার সাথের মানুষেরা এমনকি তার পিছনের মানুষেরাও অনেকেই তার হাত ধরেই তার সামনে চলে গেল আজ তারা কেউ নেতা, কেউ পাতি নেতা, কেউ উপনেতা,কেউ মহা নেতা এমন কি সে যে নিজের অর্থনৈতিক দিকটা মজবুত করবে সেইটাও করতে পারে নাই ।এর পিছনের মূল কারন হচ্ছে তার সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ধারা। সমবায়ের চিন্তাধারা । সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা ধারা । সে ১৯৯০ সালে সংসদ নির্বাচনে দাঁড়ালো যথারীতি হেরেও গেলো তার কারন তার দলের প্রতীকই গ্রামের মানুষ চিনেনা অথচ তার সুযোগ ছিল নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার ( বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন আপা তাকে বলেছিলেন তার দল থেকে নমিনেশান নিতে প্রতিউত্তরে আমার বাবা তার আপাকে বলেছিল , আমি কেন আমার দল ছাড়বো আপনি বরং আমার দল থেকে নির্বাচন করুন ) । সেই সময় আমার বাবা তার আপাকে নিয়ে বিভিন্ন কর্ম সূচি করতো বলে তার দলের এবং নিজের লোকেরাই বলতো আমরা কি আওয়ামীলীগ করি নাকি ? অথচ আজ সেই সব মানুষের মুখেই আপার গুণগান , বঙ্গবন্ধুর গুনগান আমার কাছে হাসিই লাগে আবার আব্বার দিকে যখন তাকাই খুব কষ্ট লাগে । কিসের টানে যে প্রতিদিন সকালে বের হয় আবার রাতে বাসায় আসে আমি বুঝি না , বুঝতে চেষ্টা করি খুব কিন্তু বুঝি না । সবসময় দেখি দুর্বলদের সাথে তার সখ্য । এই দুর্বলেরা যখন সবল হয় আর তাকে চেনেনা ।এই ধরনের মানুষের স্ত্রীদের যে কি অবস্থা হয় তা আমি জানি কারন আমি আমার মাকে খুব কাছে থেকে দেখেছি , তার যে কি অপরিসীম ধৈর্য , কষ্ট সহ্য করার শক্তি, এক দিকে বাবার বৈরাগ্য অন্য দিকে অর্থনৈতিক দিক সামলানো সব করতে হতো আমার মাকে একা , এতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের দুই ভাই- বোন কে আমার মা সুন্দর করে বড় করে তুললেন আমাদের কে শিক্ষিত করালেন । আমার একমাত্র ছোট ভাই আবু ফয়সাল আহম্মেদ তুর্য আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষদের মধ্যে একজন, সে ছিল ভীষণ ভালো ছাত্র ,একজন সংবেদনশীল মানুষ মাত্র তেইশ বছর বয়সে গ্রাজুয়েশান শেষে চাকরি শুরু করলো এবং চাকরিতে ভাল করতে থাকলো আমরা সবাই ( আম্মা , আব্বা, আমি ) খুব খুশি । আম্মার মুখে আত্মতৃপ্তির হাসি ।

সব যখন ভাল চলছিল হঠাৎ করেই আসলো ভয়াল সেই দিন ২০০৬ সালের ১৯ অগাস্ট । আমার ভাইটা ১৭ আগস্ট তারিখে আম্মাকে বলল “ আম্মা কাজের প্রেশারে খুব এক্সসটেট লাগতেসে এইবারের জন্ম দিন ( ২০আগস্ট ওর জন্ম দিন) টা বন্ধুদের সাথে রাঙ্গামাটি তে কাটাই ? আম্মা নিমরাজি হয়েও রাজি হল আমিও আম্মা কে বললাম, যাক না আম্মা ওর ভাললাগবে । ও গেল —- আর আমাদের কাছে আসলো না । জন্ম দিনের আগের দিন ( ১৯ আগস্ট ২০০৬) কাপ্তাই লেকে ডুবে ভাইটা আমার মাত্র ২৪ বছর বয়সে মারা গেল । ওর জন্ম দিনের দিন ওকে আমরা কবর দিলাম । এই রকম ভাবে কেউ যে না ফেরার দেশে চলে জেতে পারে সে দিন বুঝলাম । আমার মা হয়ে গেলেন স্কিজফ্রেনিয়ার রুগী । এক দিকে আমার মা , অন্য দিকে আমার ৪ বছরের ছেলে , আমার চাকরি তার উপর আমি ৪ মাসের অন্তসবত্তা কি যে অবস্থা ,আমি আর আমার স্বামী কি ভাবে যে আমাদের সময় গুলো পার করেছি (এখনও করছি) তা আর বলার কিছু নাই কিন্তু এত কিছুর মাঝে যেটা হয়েছে সেই সময় গুলাতে আমি আমার বাবাকে সময় দিতে পারি নাই।তার কষ্টের কথা শোনা হয় নাই । সে আরও অন্য রকম হয়ে গেল। সে যা বলতে চায় তার পরিচিত জনেরা বোঝে না , পরিচিত জনদের কথা সে বঝেনা। সে বিশ্বাস করে একতায় আমরা বিশ্বাস করি একায় ।সে বিশ্বাস করে স্বার্থ হীনতায় আমরা করি স্বার্থপরতায় । কয়েক দিন আগে আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম , আচ্ছা আব্বা তুমি ঢাকায় অন্তত একটা বাড়ি তো করতে পারতা , তাইলে আজকে নিজের একটা থাকার অন্তত জায়গা থাকতো , কেন করলানা ? সে আমাকে উত্তর দিলো “ আমি ভাবসিলাম এত বড় পরিবার —— বাকিটা থাক আর লিখবো না আপাতত । কি যে লিখতে বসছিলাম আর কি লিখতেসি ,ও আব্বার মন খারাপ প্রসঙ্গে। গত ১৭ দিন আব্বারা কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা তার মধ্যে যুদ্ধাহত যোদ্ধারাও আছেন সবাই মিলে বিকাল হলেই চাদর বিছিয়ে বসে পরেন শাহবাগ চত্বরের কছেই । কখন পিজির সামনে , আবার কখন বারডেমের সামনে আবার পাবলিক লাইব্রেরী সামনেও বসেন । তাদের চোখে মুখে সেকি দিপ্তি, আনন্দ উন্নিপনার ঝিলিক , কেউ তাদের যেতে বলেনি কিন্তু তারা যান যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা কষ্ট করে বাসে চেপে প্রতিদিন ঠিক চলে যান শাহবাগে ।

আব্বাকে দেখি সকালেই ফোনে বলছেন ‘বিকালের প্রগ্রাম ঠিক আছে তো ? “ মাঝে মাঝে আমিও যেয়ে তাদের সাথে বসি , তাঁদের গল্প শুনি , ভালো লাগে । সে কারনেই আব্বার বোধ হয় একটু খালি খালি লাগছিলো । হয় তো তরুণদের চোখে নিজের তারুন্য দেখতে পায় , তরুণদের স্লোগানে নিজের যৌবনের স্মৃতি মনে পরে সব মিলিয়ে শাহবাগে এই গণজাগরণ শুধু তরুণদের একার নয় আমার বাবার মত এই রকম অনেক মুক্তি যোদ্ধাদের প্রানের জায়গা হয়ে গেছে । এই সব মানুষেরা তাদের প্রতিদিনের উপস্থিতি দিয়ে গণজাগরণকে আর শুদ্ধ করেছেন । যাক , আব্বার আজকের একটা কথা দিয়ে লিখাটা শেষ করবো কারন সেই জন্যই আজকের এই লিখতে বসা ।আজ রাতে খাওয়ার টেবিলে আব্বাকে দেখি মিটি মিটি হাসছে আমি বললাম ,কি ঘটনা আব্বা হাসতেস ক্যান ? সে আমারে উল্টা প্রশ্ন করলো আগে বোলো এই শাহবাগের গণজাগরণ থেকে তুমি কি বুঝলা , কি জানলা ? আমি উত্তর দিলাম আমার মত করে তারপর সে আমারে বলল, শুধু তাই না , সারাটা জীবন তো খালি শুনে আসলাম টাকা আর পেশী শক্তি ছারা নাকি কিছু হয় না । কিন্তু আজ দেখ, ব্যাক্তিগত স্বার্থের বাইরেও মানুষ কেবল জাতিগত স্বার্থে এক হয়ে গেল ।দেখ, আমাদের এই অধিক জন সংখ্যা আজ আমাদের শক্তিতে পরিণত হয়াছে । আজ দেখ , গোটা বাংলাদেশ ফুসে উঠেছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষ্যার জন্য। জাগরণের এই ঢেউ সমুদ্রের ঢেউ এর থেকেও মারাত্মক , এই গর্জন স্লোগান হয়ে তরুণদের মুখে মুখে ফিরছে । যেই সকল মানুষেরা নিজেদের মনে করতো তারাই সমাজের হর্তা কর্তা বিধাতা ,আজ তারাই গণজাগরণ মঞ্চে একটু নিজেদের চেহারা দাখাবার জন্য হাসফাস করছে ।তরুণরা তাদের বার বার প্রত্যাখ্যান করছে তার পরও ওই সকল স্বার্থান্বেষী মানুষ গুলো বারবার মঞ্চে উঠার চেষ্টা করছে । এই ভাবেই দেখবা এই দেশটা একদিন বদলে যাবে । আমাদের এই দেশ সত্যি সত্যি সোনার বাংলাদেশ হয়ে উঠবে ।দেশে একটা যুদ্ধাপরাধীও থাকবে না । ধর্মের দহাই দিয়ে অধর্ম হবে না । এত দিন বোধহয় বেচে আছি এই দিন গুলা দেখার জন্য , তাই না লোপা ?

আমি জানিনা আব্বা যা ভাবছে তা আদৌ হবে কি না তবে এই শাহবাগের তরুণদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা সবসময় থাকবে কারন তাদের কারনেই আমার বাবার মতো কতো গুলো হতাশ মানুষ আশার আলো দেখতে পাচ্ছে । তাঁরা ভাবতে পারছেন হয়ত মৃত্যুর আগে তাঁরা সত্যি বিজয় দেখে যেতে পারবেন । এই দেশের তরুণেরা তা এনে দিবে । তবে যে যাই বলুন আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বর্তমান সরকারকে কারন তারা যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু না করতেন তাহলে আজ এতদূর পর্যন্ত আসাই যেত না । কারন বিরোধী দল তো রাজাকারদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগাবার ব্যাবস্থা করেই দিয়েছিলেন।— –

জয় বাংলা । জয় বঙ্গবন্ধু । জয় শাহবাগ ।জয় বাংলার মেহনতি মানুষ । বাংলাদেশ চিরজীবী হউক ।