ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
jamalpur-rajon

কোন হত্যাকাণ্ডই ব্যক্তিগতভাবে একজন সুস্থ মানুষ সমর্থন করতে পারেনা, আর রাজনকে যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো তা স্পষ্টত মানবতাকে উপহাস ছাড়া আর কিছুই না। কতোটুকু মনুষ্যত্বহীন হলে একজন শিশুকে পৈশাচিক আনন্দে হত্যা করা হয় এবং সেই ভিডিও খুনিরা নিজেরাই ইউটিউবে ছাড়ে সেটা ভেবে আমি আঁতকে উঠছি। আমি আঁতকে উঠছি এই কারণে যে, রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই মানবতাবিরোধীরা আজকে যে সাহস দেখিয়েছে তার ফলাফল ভবিষ্যতে কি হতে পারে! আজকে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুততার সাথে সম্পন্ন না হলে এই দেশ, দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আদৌ কি আমরা বিশ্বাস রাখতে পারবো? আজকে এই প্রশ্নগুলো আমাদের সামনে আসার কারণ হলো আমাদের দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি। একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটে কিন্তু অপরাধীরা পাড় পেয়ে যায়, বিচারের নামে হয় প্রহসন, কখনো বা প্রশাসনযন্ত্র কর্তৃক অথবা রাজনৈতিক বিবেচনায় খুনিরা থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আজকের রাজন হত্যাকাণ্ড মূলত বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির আর একটি উদাহারণ ছাড়া কিছুই না, আজকের রাজন তার জীবন দিয়ে বুঝিয়ে গিয়েছে এই সমাজ মনুষ্যত্বহীন, বিবেকহীন।

রাজন হত্যাকাণ্ড এই স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়, সার্বিকভাবে একের পর এক এ ধরণের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং প্রশাসনযন্ত্রের নিশ্চুপ ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকার ফল হিসেবে আজকে রাজন নামের একটি শিশুকে হায়েনাদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। এর দায় কার? এর দায় শুধুমাত্র প্রশাসনের না এর দায় আমার,আপনা্‌র, আমাদের সকলের। কারণ প্রতিটি হত্যাকান্ডের পর আমরা ব্যথিত হই, মর্মাহত হই কিন্তু প্রতিবাদ জানাতে কি রাস্তায় নামি? হ্যা নামি কিন্তু সংখ্যায় সেটা অল্প যা রাষ্ট্রযন্ত্রের টনক নড়াতে সক্ষম নয়। এর আগের কিছু ভয়াবহ ঘটনা যার বিচার আজ পর্যন্ত হয় নি শুধুমাত্র প্রশাসনযন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তার কারণে। ১৭ জুলাই ২০১১, চার বছর আগে সাভারের আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে শবে বরাতের রাতে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর কি দেখি আমরা? আজ পর্যন্ত অপরাধীদের কোন বিচার হয়নি এবং আমরা সাধারণ জনগণও সেই বিচারের দাবীতে সোচ্চার ছিলাম না, আমাদের সচেতনতা এবং প্রতিবাদ হয়তো পারতো সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করাতে, আমরা রাস্তায় নেমে প্রশাসনকে বাধ্য করাতে পারতাম বিচারের জন্য, তাহলে হয়তো আজকে রাজনের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের দেখতে হতো না। সার্বিকভাবে দীর্ঘদিন যাবত যে বিচারহীনতার একটা ধারা আমাদের সমাজ লালন করে এসেছে সেটার দায় আমাদের সকলকেই নিতে হবে কেননা শুধুমাত্র রাষ্ট্র বা প্রশাসনযন্ত্রকে দোষ দিয়ে তা আমরা এড়িয়ে যেতে পারিনা। আমাদের চোখের সামনেও এরকম অনেক গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটে এবং হত্যা পর্যন্ত করা হয় কিন্তু আমরা সেখানে প্রতিবাদ করিনা, আমাদের সামনেই অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে কিন্তু আমরা ব্যক্তিপর্যায় থেকে সেটার প্রতিবাদ করছি না তাই সার্বিকভাবে এর বৈরি প্রভাব পড়ছে আমাদের সমাজের উপরেই।

রাজন হত্যার নির্মম ভিডিও প্রকাশের কারণে হয়তো আমরা দেখতে এবং জানতে পেরেছি এই নির্মমতার ধরণ কিন্তু আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটছে এমন ঘটনা। প্রতিটি ঘটনা পর্যালোচনা করলে আপনি একটি বিষয় পাবেন যে, প্রায় ৯০ ভাগ ঘটনা সবল কর্তৃক দুর্বলের উপর আক্রমণ। আমরা প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় দেখি শিশু ও নারী নির্যাতন, গৃহকর্মীর উপর বর্বর পাশবিক নির্যাতন, চায়ের স্টলে বা বিপনী বিতানে কাজ করা ছেলেকে নির্যাতন মানে এসব ঘটনা আজকের প্রতিদিনের খবর এবং এই সংবাদ্গুলো এই সমাজের উঁচু নিচু যে ভাগ সেটারই প্রতিফলন। অর্থাৎ এটা আমাদের সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। আমরা মানুষ ১৬ কোটি কিন্তু মনুষ্যত্ব থাকা মানুষের সংখ্যা নেহায়তই কম, হিসেব করলে সেই সংখ্যা যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা এই ঘটনাগুলো এবং তার প্রতিবাদের চিত্র দেখলেই আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

আশার কথা হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে এবং দোষীদের শাস্তির দাবীতে দেশব্যাপী ফুঁসে উঠেছে সাধারণ জনতা। দেশের সব জায়গায় আজ প্রতিবাদী মানববন্ধন, সমাবেশ হচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইনে চলছে তুমুল প্রতিবাদ এবং দাবী একটাই এসব মানবতাবিরোধীদের বিচার খুব দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা। সরকার এক কথায় বাধ্য এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার করতে এবং তাঁদের সদিচ্ছা থাকলে যে তাঁরা পারেন তার প্রমাণ দেখিয়েছেন খুব দ্রুততার সাথে খুনিদের অনেককেই গ্রেফতার করে। হত্যাকান্ডের পর সৌদিআরবে পলায়নকারী কামরুল ইতোমধ্যে জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হয়েছে। বাকিদের খুব দ্রুততার সাথে গ্রেফতারের জন্য স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। রাজনের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ রাজন হত্যার পর পরেই কামরুল গ্রেফতার হয়েছিলো কিন্তু পুলিশের এসআই আমিরুল তাকে ৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। অভিযোগ যেহেতু সরাসরি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও তাই এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ক্ষেত্রে সরকার চাইলেই একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। এর আগেও ইয়াবা ব্যবসা ও মানব পাচার সহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ পুলিশ জড়িত থাকার প্রমাণ থাকলেও বিচারের আওতাধীন আনা হয়নি, আর এর ফলেই মূলত প্রশাসনের ছত্রছায়ায় পাড় পেয়ে যায় এসব খুনিরা। তাই এখন কালক্ষেপণ না করে হত্যাকারীদের এবং তাদের পালাতে সহায়তাকারী আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের উপযুক্ত শাস্তি দেখার অপেক্ষায় গোটা জাতি। সর্বোচ্চ শাস্তিই এই ঘাতকদের জন্য প্রযোজ্য কেননা এটা শুধুমাত্র একটা হত্যাকাণ্ড নয়, এটা রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হোক যেনো ভুলেও কেউ সাহস না করে এমন ঘটনা ঘটানোর।

আমাদের ক্ষমা করো না রাজন!

সবশেষে সকল আইনজীবীদের প্রতি অনুরোধ রাখবো স্ব-প্রণোদিত হয়ে বা অল্প কিছু অর্থের বশবর্তী হয়ে আগে ভাগেই যেনো কেউ এই নরঘাতকদের মামলা না লড়ি। আইনজীবীরা সবাই একসাথে হয়ে সিদ্ধান্ত নিন যে, রাজন হত্যাকারীদের পক্ষ নিয়ে কেউ মামলা লড়বেন না। হুম, আইনী প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নের জন্য হয়তো এদের পক্ষ নিয়ে মামলা লড়তে হবে তবে সেটা সরকার নির্ধারণ করুক। কারণ এরকম পরিস্থিতির তৈরি হলে সরকার আইনজীবী নিয়োগ দেবে বলেই নিয়ম আছে, মুম্বাই হামলাতেও এরকম পরস্থিতির সম্মুখে পড়তে হয়েছিলো ভারত সরকারকে এবং আমরা তখন দেখেছিলাম যে সরকার আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছিলো। অন্তত এই ঘাতকদের বিরুদ্ধে আইনজীবীরা একটি বার্তা পৌঁছে দিক যে, এ ধরণের জঘন্য অপরাধীর পক্ষে কেউ নেই এমনকি আদালতে কোন আইনজীবীও এই ঘৃণিতদের পক্ষে মামলা লড়তে চায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই বিচার শুধু একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, এই বিচার সর্বোপরি বিচার হীনতার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসার একটি ধাপ। এটাই হোক শেষ, আর না, এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়, আমাদের ক্ষমা করো না রাজন কারণ আমরা ক্ষমা পাওয়ার অযোগ্য।