ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বাংলাদেশ তথা গোটা বিশ্বে ধর্ম হচ্ছে রাজনীতির এক বড় হাতিয়ার, পারমাণবিক বোমার চাইতেও শক্তিশালী এই ধর্মীয় উন্মাদনা যেটাকে রাজনীতির কেন্দ্রে এনে আইএস, আল কায়েদা বা তালেবানরা শান্তিপূর্ণ পৃথিবীকে অশান্ত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। জন্মলগ্ন থেকেই ধর্ম এবং ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির ভয়াবহ সময় বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে বিভিন্ন ইস্যুতেই, যখনি প্রগতিশীল কোন আন্দোলন হয়েছে এই দেশের মাটিতে তখনি এর ভয়ংকর থাবা আমরা দেখেছি। আমরা দেখেছি মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে যখনি কেউ কথা বলেছে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সংগঠন জামাত শিবিরের বিরুদ্ধে যখনি কেউ কথা বলেছে তখনি সেই ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করেছে ধর্ম ব্যবসায়ীরা। শহিদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করার জন্য যেমন ধর্মের ব্যবহার দেখেছিলাম জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদকে কেন্দ্র করে ঠিক তেমনি ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে ভিন্ন ধারাতে নেয়ার জন্য আবারো নতুন বোতলে পুরোনো মদ নিয়ে হাজির হয় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী হেফাজতে ইসলাম।

শহিদ জননীর আন্দোলনের সময় হরকাতুল জিহাদ আর শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় হেফাজতে ইসলাম, দুটির চরিত্র রূপ একই। হরকাতুল জিহাদ প্রতিষ্ঠার এক যুগ পর দেশব্যাপী যখন দফায় দফায় গ্রেনেড বিস্ফোরণ হলো তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বুঝেছে যে, ধর্ম কার্ড খেলে তাদেরকে ধোঁকা দিয়েছে এই জঙ্গিরা। কিন্তু শহিদ জননীর আন্দোলনকে ধর্মের নামে যখন নাস্তিক ট্যাগ দেয়া হলো তখন কিন্তু এই সমাজ ব্যবস্থায় বেড়ে উঠা অধিকাংশ মানুষ সেটাকে বিশ্বাস করেছে, আর এর মূল কারণ হলো আমাদের সমাজের ধর্মীয় কুসংস্কার, অজ্ঞতা, সুশিক্ষার অভাব এবং ভুল শিক্ষা নিয়ে বড় হওয়া বেশিরভাগ কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। পত্রিকা, বিভিন্ন মিডিয়া এবং সব রকমের সংবাদের সাথে সংস্পর্শ না থাকা একটা প্রজন্ম এই দেশে বেড়ে উঠছে যারা কেবলমাত্র হুজুরের কথাকেই তাদের আদর্শের বাণী হিসেবে গ্রহণ করছে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদেরকে ভুল পথে পরিচালিত করছে এবং এর কুফল ভোগ করছে এই রাষ্ট্র।

হরকাতুল জিহাদ সম্পর্কে আমার মনে হয় না খুব বেশি বলার কিছু আছে কেননা একবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নে গোটা বিশ্ব যখন প্রগতির পথে নিজেদেরকে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে, এই হরকাতুল জিহাদ তখন বাংলাদেশকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো মধ্যযুগীয় বর্বরতায়। ২১ আগস্ট, ২০০৪ সাল, কোন দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয় বরং আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে এই হত্যাকান্ড ছিলো একবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নে সমগ্র মানবজাতির উপর ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। ২১ আগস্টের পড়ন্ত বিকেলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ-এর নিথর লাশগুলো ছিলো ভুলন্ঠিত মানবতার স্মারক। আর এর নেতৃত্ব দিয়েছিলো এই সন্ত্রাসী সংগঠন হরকাতুল জিহাদ। সেই সময় আরো অনেক নৃশংস গ্রেনেড বিস্ফোরণের জন্মদাতা এই জঙ্গি গোষ্ঠী যারা কিনা ধর্মের নাম করে প্রগতিশীল আন্দোলনকে বাধাগ্রস্থ করার জন্য তৈরি হয়েছিলো। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট  হরকাতুল জিহাদ কর্তৃক বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে বিভীষিকাময় গ্রেনেড হামলা।

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে আরও একটি বার প্রকম্পিত করে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে বড় স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে উঠে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ খুব অল্প সময়ে তরুণ সমাজকে আন্দোলিত করে এবং দেশ বিদেশে থাকা লাখো লাখো বাঙালি স্ব স্ব স্থানে গড়ে তুলে এক একটি ‘প্রজন্ম চত্বর’। আমি আগেই বলেছি মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে যারাই কথা বলবে তাদেরকেই ধর্মের বেড়াজালে ফেলে যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তি এবং সংগঠন ফায়দা আগেও লুটেছে এবং ভবিষ্যতেও লুটবে। গণজাগরণ মঞ্চ কথা বলেছে মওদুদীবাদ নিয়ে, জামাত শিবিরের নিষিদ্ধ নিয়ে এবং তাদের আর্থিক সব প্রতিষ্ঠান বাজেয়াপ্ত করা নিয়ে আর তাই রাজপথে নামিয়ে দেয়া হয়েছে নতুন সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতারা আফগান ফেরত তালেবান যারা কিনা জঙ্গি কার্যক্রম করে এখানে এসেছে। ধীরে ধীরে তাদের মুখোশ উন্মচিত হচ্ছে সাধারণ জনতার কাছে। হেফাজতে ইসলাম ধর্মের নাম করে তাদের জঙ্গি কার্যক্রম কিভাবে পরিচালনা করছে তার কিন্তু নতুন তথ্য এবার উঠে এসেছে সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। নতুন জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডকে অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া বিএনপির নেত্রী আইনজীবী শাকিলা ফারজানাসহ আরও দুইজন আইনজীবী আদালতে স্বীকার করেছেন, হেফাজতের শীর্ষ চারজন নেতার মামলা পরিচালনার দায়িত্ব তাদের উপর পরেছিলো এবং এই বাবদ এক কোটি আট লাখ টাকাই ব্যাংকের মাধ্যমে পরবর্তীতে তারা ফেরতও দিয়েছেন। কিন্তু হেফাজতের পক্ষ থেকে বলা হয়, মামলা পরিচালনা করার জন্য ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাসহ এ তিন আইনজীবীর কাউকেই কোনো টাকা দেননি তারা। তাদের কাছে হেফাজতের কোনো মামলাও নেই। অথচ ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাসহ গ্রেফতারকৃত তিন আইনজীবীই ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে লেনদেন হওয়া টাকা হেফাজতের মামলা বাবদ নেওয়া পারিশ্রমিক বলে জানিয়েছেন আদালতকে।

কিন্তু প্রশ্নতা উঠেছে আরও একটি জায়গায় যে, চারজন শীর্ষ নেতার জন্য যদি ১ কোটি ৮ লক্ষ টাকা খরচ করে হেফাজত তাহলে শত শত মামলার জন্য কতো টাকা খরছ করছে? আর এই টাকার উৎস কি? সমকালকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে বলতে শুনলাম, দ্বীন ইসলামকে ভালোবেসে নাকি মানুষ হেফাজতকে বিপুল অর্থ দিচ্ছে যা কেবল অলৌকিকই না হাস্যকরও বটে!

গণজাগরণ মঞ্চ
মূল বিষয় জানা গেলো এই প্রেক্ষাপটেই যে, মামলা পরিচালনার ফান্ডে থাকা টাকার একটি বড় অংশ আসছে সৌদি আরব থেকে। শহীদ হামজা ব্রিগেড প্রতিষ্ঠার টাকাও আসছে একই দেশ থেকে। সৌদি নাগরিক আল্লামা লিবদি এ জন্য একাধিকবার বাংলাদেশও সফর করেছেন। সৌদি আরবের পাশাপাশি মিসর, ইরান ও পাকিস্তান থেকেও টাকা আসছে হেফাজতের জন্য। বিদেশ থেকে আসা এসব টাকা কারা কীভাবে পাঠাচ্ছেন তার নজরদারি কেনো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে নেই সেটা একটা বড় প্রশ্ন বটে। হেফাজতে ইসলামের ফান্ডে প্রতি বছর কী পরিমাণ টাকা আসে তা কেনো আজ পর্যন্ত বের করতে পারেনি প্রশাসনের লোকেরা? আশা রাখছি মামলা পরিচালনা বাবদ তিন আইনজীবীকে এক কোটি আট লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর এখন নড়েচড়ে বসবেন আমাদের প্রশাসন।

শুধু তাই না, নতুন জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের হয়ে যোগাযোগ করতেন তিন-চারজন শীর্ষ নেতা। তাদেরই দুইজন হেফাজতের নায়েবে আমির মুফতি ইজহারুল ইসলাম ও তার ছেলে মুফতি হারুন ইজহার। বিদেশ থেকে ফান্ড এনে তারা নতুন এ জঙ্গি সংগঠন তৈরির পাশাপাশি হেফাজতের নেতাদের মামলা থেকে মুক্ত করার দায়িত্বও নিয়েছিলেন। মুফতি ইজহার চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে সংসদ নির্বাচনও করতে চেয়েছিলেন। এ এলাকায় তার জানাশোনা বেশি থাকায় শহীদ হামজা ব্রিগেডের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তোলা হয় বাঁশখালীরই দুর্গম একটি জঙ্গলে। আবার শহীদ হামজা ব্রিগেডের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও তার লালখান বাজারের মাদ্রাসায় রাখতেন মুফতি ইজহার। শহীদ হামজা ব্রিগেডের বোমা বিশেষজ্ঞ নুরুন্নবী লালখান বাজারের মাদ্রাসাতেই বোমা তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে মারা যান। নতুন এ জঙ্গি সংগঠনের অপর ছয় সদস্য রাকিব, নাসির, আজিজ, আবদুল্লাহ, শামসু ও মনিরুজ্জামান মাসুদ ওরফে ডনেরও নিয়মিত যাতায়াত ছিল লালখান বাজারের মাদ্রাসায়।

এভাবেই মূলত ধর্মের নাম করে বাংলাদেশ এবং এই দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে ধোঁকা দিয়ে গেছে মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী মওদুদীবাদের অনুসারীরা, কখনো হরকাতুল জিহাদ নামে আবার কখনো হেফাজতে ইসলাম নামে আবার কখনো হামজা ব্রিগেড বা আনসারুল্লাহ নামে। যখনি প্রগতির কথা বলতে রাজপথে মানুষ দাঁড়িয়েছে, সাম্য ও ন্যায়ের সমাজ গঠনের জন্য গণহত্যাকারীদের বিচার চেয়েছে তখনি ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে এই বদ্বীপে। কিন্তু তারপরেও জয় হয়েছে মুক্তিকামী মানুষের। জয় হবেও মুক্তিকামী মানুষের। কারণ আমাদের রক্তে আছে প্রীতিলতা ও সূর্যসেনের রক্ত, আমাদের রক্তে বহমান বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিনের রক্ত, আমাদের ধারা শহিদ জননীর ধারা আর তাই জয় আমাদেরই হবে। জয় বাঙলা