ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
SUST-3-BCL

শাবিপ্রবির ঘটনাতে তোলপাড় সোশ্যাল মিডিয়াসহ বাংলাদেশের গণমাধ্যম কিন্তু এই ঘটনা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে নতুন কিছু মনে হচ্ছে না! মনে না হওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, শিক্ষক রাজনীতির ফাঁদে পরা আবার কখনো বা রাজনৈতিক দলের ফাঁদে পা দেয়া নোংরা ছাত্র রাজনীতি, অথবা এই শিক্ষক লাঞ্ছনা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। যে সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে সেই সরকারের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী দ্বারা বাবা-মা তুল্য শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হন প্রতিনিয়ত। আর এ রকমি একটি ঘটনা ঘটলো শাবিপ্রবিতে, যার মূল প্রেক্ষাপট শুরু হয়েছিলো নিয়মতান্ত্রিক উপায় না মেনে মৌখিকভাবে একটি ভবন ভিসি কর্তৃক তার অনুগতের কাছে দিয়ে দেয়া মানে সেমিনার লাইব্রেরির জন্য সিভিল ডিপার্টমেন্টকে দেয়াকে কেন্দ্র করে। তারপর দফায় দফায় আন্দোলন যার এক ভয়াবহ রূপ আমরা দেখলাম ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছনার মাধ্যমে। এই ঘটনার ছবি এবং ভিডিওটি যখন দেখছিলাম তখন একজন ছাত্র হিসবে নিজের প্রতিই আমার ঘৃণা জন্মাচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো এই আমার বাংলাদেশ! ছি!

শাবিপ্রবিতে শিক্ষক লাঞ্ছিত

নিঃসন্দেহে আজকের এই ঘটনাটি আমাদের ঘুনেধরা সমাজের একটি প্রতিচ্ছবি, ভুলুন্ঠিত বিবেকের স্মারকচিহ্ন। জাফর ইকবাল স্যার যথার্থই বলেছেন, এরা যদি আমার ছাত্র হয়ে থাকে তবে আমার এখনি উচিৎ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করা। সত্যিই তো, এর চাইতে আর কিইবা বলার থাকতে পারে একজন শিক্ষকের? স্যারের এই বক্তব্য মূলত আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থার গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ে দিয়েছে, এই বক্তব্য আরেকবার আমাদের নোংরা ছাত্র রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ করেছে, স্যারের এই বক্তব্য চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির ভয়াবহ কুফল! কোন সভ্য সমাজ এই ঘটনা দেখতে প্রস্তুত নয় এবং আমাদের সমাজে যে এখনো অসভ্য ও বর্বররা বিচরণ করছে তার প্রমাণ ক্ষণে ক্ষণেই আমরা দিয়ে যাই। আজকের এই ঘটনা যদি মনে করেন পরে আর ঘটবে না তাহলে ভুল বরং আজকের ঘটনার পর বিভিন্ন বিবৃতি প্রমাণ করে যে এই ঘটনা সামনে আরো ঘটবে এবং একটি চলমান প্রক্রিয়া।

প্রথমেই আসি শাবিপ্রবির ভিসি আমিনুল হকের বক্তব্যে, উনি স্পষ্ট করেই বলেছেন ‘যাদের হামলাকারী বলে শিক্ষকরা চিহ্নিত করেছেন, সেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন করছেন!’ শুধু তাই না উনি অভিযোগ করেছেন তার উপর নাকি শিক্ষকরা হামলা চালিয়েছে। উনি আরও বলেন, “আমাকে কার্যালয়ে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী আমি একাডেমিক কাউন্সিল করতে এসেছি। শিক্ষকদের হামলায় আমি পায়ে ব্যথা পেয়েছি। শিক্ষকদের বাধায় আমি রাস্তা দিয়ে অফিসে প্রবেশ করতে পারিনি। আমাকে কাদা মাটি ও ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে আসতে হয়েছে।” যদিও এই সংক্রান্ত কোন ছবি বা ভিডিও এখন পর্যন্ত আমার চোখে পরেনি, হয়তো সবার অজান্তেই সেই ভয়াবহ কাজটি শিক্ষকরা করেছেন! প্রথম কথা হচ্ছে ঘটনার একেবারে শুরুতে ভিসির অনৈতিক কাজের জন্য যখন শিক্ষকরা ভিসির কাছে যায় তখন আমিনুল হক অপমান করে শিক্ষকদের বের করে দেয়ার দুঃসাহস কোথা থেকে পান? রাজনীতির কোন বলয় উনাকে এই অধিকার দিয়েছেন? কিছু ছাত্রলীগের নেতা যখন শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলেন সেটাকে কিভাবে সমর্থন করেন এই ভিসি? স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনার পর ভিসির নৈতিক শিক্ষা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোললে এটা অবান্তর হবে না।

এবার আসি বাংলাদেশের সবচাইতে আদি এবং বৃহৎ ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে মানে যারা সরাসরি এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে। শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে সেটা অস্বীকার করে ইতোমধ্যে শাবিপ্রবি ছাত্রলীগ বক্তব্য দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেছেন, ‘হামলাকারীরা ছাত্রলীগের কেউ না। একদল শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে কিছু শিক্ষার্থী ওই হামলা চালিয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’ আর এতেই তাদের কাজ শেষ? আমি যদি ধরেও নেই এই হামলা আপনারা করেননি তারপরেও বলতে হচ্ছে এই হামলার পর ছাত্রলীগের কি দায়িত্ব ছিলো? শিক্ষকদের উপর তাও আবার মুক্তিযুদ্ধের কথা, বাংলাদেশের কথা যারা তাদের বক্তব্যতে সব সময় তুলে ধরে এই তরুণ প্রজন্মকে একাত্তর নিয়ে জানতে ও বুঝতে শিখিয়েছেন তাঁদের উপর হামলার পর আপনার ছাত্র সংগঠন কি করেছে? একটা প্রতিবাদ মিছিল পর্যন্ত বের করার মত সাহস বা শক্তি কি ছাত্রলীগের নেই? এমন কি এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে দিন পেরিয়ে রাত হয়ে যাওয়ার পর যখন আপনাদের বক্তব্য আসে তখন এই দেশের মানুষ সবাই বুঝেই যায় যে হামলা কারা করেছে এবং কেনো করেছে। আপনারা নিজেদের দায় স্বীকার করে উপযুক্ত শাস্তির আওতায় অপরাধীদের না এনে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন তার ফলাফল যে কি হবে তা কল্পনাও করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। প্রতিটি ঘটনা যখন ছাত্রলীগ ঘটায় আর সেটার পর পরই যখন অস্বীকার করে বিবৃতি আসে তাতে সেই অপরাধীরা আরো বেশি উৎসাহ পায় এবং এই ধরণের ঘটনার সংখ্যা তখন বাড়তেই থাকে। বিশ্বজিত হত্যাকান্ড কেনো ঘটে, কেনো সারাদেশে ছাত্রলীগ বেপোরোয়া টেন্ডারবাজিতে লিপ্ত হয়, কেনো ত্রাসের রাজত্ব এই ছাত্রলীগ কায়েম করে তা তাদের এসব বক্তব্য বিশ্লেষণ করলেই পাওয়া যায়।
sust

আজকের এই পরিস্থিতি কেনো হয়েছে? শাবিপ্রবিতে কেনো একের পর এক অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করছেন ভিসি? কাদের ইন্ধনে এই শিক্ষক লাঞ্ছনা? এসবের যৌক্তিক এবং সঠিক উত্তরই পারে এই শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে। ভিসিকে অপসারণ করে আজকের এই ঘটনায় দোষীদের শাস্তি না দিতে পারলে এর ভয়াবহ ফল প্রত্যক্ষ করতে হবে এই সরকারকে সর্বোপরি এই রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে। শিক্ষাঙ্গনের সন্ত্রাস পুরো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিতে পারে তাই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগ একান্ত কাম্য।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কিন্তু আপনাকে আমরা বিবেচনা করিনা কেন না আপনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। আশা রাখি সেই বিষয়টা আপনার মাথাতে সবসময়ই থাকে সেটা হোক প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময় অথবা বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে থাকার সময়। এসব কর্মকাণ্ড আপনার বর্তমান সরকারের অবস্থান এবং নৈতিক ভিত্তিকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে সেই বিষয় কি একবার ভেবেছেন? যে সংগঠন বঙ্গবন্ধুর যৌবনের উত্তাপে গড়া, যে সংগঠন বাংলাদেশের সবকটি প্রগতিশীল আন্দোলনে নিজেদের জীবন বাজি রেখে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে সেই সংগঠন যখন এই হামলার নেতৃত্ব দেয় তখন স্বাভাবিকভাবেই অপমানিত হয় এই বাংলাদেশ, অপমানিত হয় আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শিক চেতনা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে কোথায় দাঁড়িয়ে আজকের ছাত্রলীগ? কাদের কারণেই বা একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত এই সংগঠন? প্রশ্নের উত্তরগুলো আপনাকেই খুঁজতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। লাগাম টেনে ধরুন ছাত্রলীগের নাহলে এর ভয়াবহ পরিণতি প্রত্যক্ষ করতে হবে আপনাকে, আমাকে সর্বোপরি এই রাষ্ট্রকে! মনে রাখবেন, চূড়ান্ত ক্ষমতা চূড়ান্ত পরিণতি ডেকে আনে!